রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ;২. জনস্বাস্থ্য বলতে কি বোঝায় ; ৩. কেন এই জনস্বাস্থ্য আন্দোলন ; ৪. নর্মান বেথুন ও জনস্বাস্থ্য আন্দোলন ; ৫. জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মসূচী ; ৬. উপসংহার ।
জনস্বাস্থ্য আন্দোলন
১. ভূমিকা: মানুষ নিয়েই সমাজ। সমাজের জন্যই মানুষ। সব মানুষই সুস্থভাবে বাঁচতে চায়। সমাজকেও সুস্থ রাখার জন্যে সে নিয়ত সংগ্রাম করে। স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার যেমন একদিকে ব্যক্তির, অন্যদিকে তেমনি সমাজের। একদিকে তার নিজের স্বাস্থ্য, অন্যদিকে সমাজের স্বাস্থ্য। তথা জনস্বাস্থ্য। কিন্তু সেই ব্যক্তি-সামাজিক স্বাস্থ্যই বিশ্বের দিকে দিকে নানাভাবে বিপন্ন হচ্ছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজজীবনের নানা স্তরে অসাম্য আর বঞ্চনাই বেড়েছে। কোটি কোটি মানুষের আজও ক্ষুধার অন্ন জুটে না। কত মানুষ আজও বিনা চিকিৎসায় মরছে। কত মানুষের এখনও মাথার ওপর ছাদ নেই। সেজন্যেই প্রয়োজন গণ-জাগরণ, গণ-চেতনার। জনস্বাস্থ্য আন্দোলন সার্বিক সুস্থতারই অঙ্গীকার। সামাজিক সুস্থতারই আর এক নাম জনস্বাস্থ্য আন্দোলন।
২. জনস্বাস্থ্য বলতে কি বোঝায়: জনস্বাস্থ্য আন্দোলন শুধু চিকিৎসা-ব্যবস্থা ও ওষুধের অভাব মেটানোর বিষয় নয় । জনস্বাস্থ্য আন্দোলন খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের সংগ্রাম। সংগ্রাম শিক্ষা ও সুস্থ জীবনের । জনস্বাস্থ্য চেতনা প্রসারও এই আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য। দেশে খাদ্য আছে অথচ ক্ষুধার জ্বালায় ধুঁকছে অগণিত মানুষ । শিক্ষা ব্যবস্থা আছে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের জীবনে অশিক্ষার অন্ধকার । দেশে সরকার আছে অথচ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে বা তার আর্থ-সামাজিক নীতির অপপ্রয়োগে দারিদ্র্য বাড়ছে । বাড়ছে বেকারের সংখ্যা । অপুষ্টি, অনাহার, রোগ-ব্যাধির শিকার হচ্ছে মানুষ । প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধিও অর্থাভাবে, খাদ্যাভাবে প্রতিকারহীন। স্বাস্থ্য বলতে একদিন চিকিৎসকরা বুঝতেন রোগের অনুপস্থিতি । সে ধারণা যান্ত্রিক । আজ স্বাস্থ্য বলতে বোঝায় ‘শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুখাবস্থা । তাই স্বাস্থ্যের জন্যে তিনটি পরস্পর নির্ভরশীল অবস্থারই প্রয়োজন । অধিকাংশ রোগভোগ বা মৃত্যুর নেপথ্যে থাকে আর্থ-সামাজিক কারণ । সেই কারণ দূর করার জন্যে যে সংঘবদ্ধ সংগ্রাম, তারই নাম জনস্বাস্থ্য আন্দোলন । স্বাস্থ্য-সচেতনা যত তীব্র হবে, জনস্বাস্থ্য আন্দোলনও তত জোরদার হবে।
৩. কেন এই জনস্বাস্থ্য–আন্দোলন: মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন যাপনের দিনে স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা ছিল সমষ্টির স্বার্থে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে স্বাস্থ্য পরিণত হলো পণ্যে। স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা হলো শোষণ ও শাসনের হাতিয়ার। শুধুমাত্র শাসকশ্রেণী ও তাঁদের অনুগত প্রজারাই পেত চিকিৎসার সুযোগ। বাকিরা মড়ক আর মারীর সঙ্গে লড়াই করে মরত। দেশে দেশে শোষণ বাড়ে। আমাদের দেশে জনসংখ্যার শতকরা আশি ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। সত্তর ভাগ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে। প্রয়োজনীয় পরিমাণ খাদ্যের অভাব। অপুষ্টি এখানে অসুখ-বিসুখের অন্যতম কারণ। অকালমৃত্যু মানুষের অভিশাপ। পানীয় জলের খুব অভাব। জলে নানা রোগের জীবাণু। নানা রোগের আক্রমণ। পয়ঃপ্রণালীর অব্যবস্থা। স্বাস্থ্যকর বাসগৃহের অভাব। পাঁচজনের একটি পরিবার ধরে ১৯৯০-৯১ সালে বাসগৃহের অভাবের পরিমাণ ছ’কোটি । দেশের শতকরা সত্তর ভাগ মানুষ আজও নিরক্ষর । স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয় আজও তাদের কাছে অজ্ঞাত । স্বাস্থ্য-সচেতন করার জন্যে শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য । বহুজাতিক সংস্থা ও পুঁজিপতিদের অতিমাত্রায় মুনাফার লোভ। অমানবিক, নিষ্ঠুর অর্থলোলুপতা । জীবনদায়ী ওষুধের অভাব । অভাব হাসপাতালের। অভাব স্বাস্থ্যকেন্দ্রের। বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে সরকারী অধিগ্রহণে কেন্দ্রীয় সরকারের নেতিবাচক নীতি । তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আস্ফালন, যুদ্ধাস্ত্র তৈরির মত্ততা। এসব কিছু নিয়েই এক জটিল পরিস্থিতি । জনস্বাস্থ্যেরও অবনতি ।
৪. নর্মান বেথুন ও জনস্বাস্থ্য আন্দোলন: কানাডার টরেন্টো শহর । ১৮৯০ সালের ৪ঠা মার্চ । জন্ম নিলেন নর্মান বেথুন । তিনি মানবতার জীবন্ত বিগ্রহ। জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের পথিকৃত। আন্তর্জাতিকতাবাদের শরীরী প্রকাশ । চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। গেলেন লণ্ডন শহরে । সেখানে দার্শনিক ওয়াল্টার পিটারের মতবাদে প্রভাবিত হলেন । মানুষের সেবায় নিজেকে নিখাদ অগ্নিশিখার মতন জ্বালিয়েছিলেন । গেলেন স্পেনে । আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের মেডিক্যাল মিশনের তিনি নেতা । সেখানে তখন চলছে ফ্রাংকোর ফ্যাসিস্ট শক্তির মত্ততা। স্পেনের মানুষ জীবনপণ লড়াই করছে । বেথুন তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন । রণক্ষেত্রের অনতিদূরে আহত সৈনিকদের তিনি চিকিৎসা করতে লাগলেন । স্পেনের মানুষের প্রতি সৌভ্রাতৃত্ব, সাহায্যের আবেদন নিয়ে তিনি গেলেন ফ্রান্স, আমেরিকা, ইংলণ্ড, কানাডায় । গ্রহণ করলেন মার্কসীয় মতবাদ । শল্যচিকিৎসক হিসেবে তখন তাঁর জগৎব্যাপী খ্যাতি । ১৯৩৮ সালের ২০শে জুন ছুটে গেলেন চীনদেশে । প্রচণ্ড উদ্যম আর গভীর ভালবাসা নিয়ে তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ালেন। তাদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করলেন । অস্ত্রোপচার করার সময় তিনি আহত হলেন । হলেন গুরুতর অসুস্থ । ১৯৩৯ সালের ১২ই নভেম্বর তিনি মরলোক ছেড়ে চলে গেলেন । কিন্তু মানুষের জন্য রেখে গেলেন এক সুস্থ, সুন্দর পৃথিবী গড়ার বলিষ্ঠ হাতিয়ার । তারই নাম জনস্বাস্থ্য আন্দোলন । তিনি সমাজের চেহারা পাল্টানোর কথা বলতেন । বলতেন অর্থনীতি বদলানোর কথা । কেননা, অসাম্যের অর্থনীতিই জন্ম দেয় স্বাস্থ্যহীনতার । তামাম দুনিয়ায় লাঞ্ছিত মানুষের জন্যেই ছিল তাঁর ভাবনা । পৃথিবীর সব সাধারণ রোগাক্রান্ত মানুষই ছিল তাঁর স্বজন । সামাজিক অব্যবস্থার মধ্যেই থাকে রোগের মূল কারণ। সেই মূল কারণ উৎসাদনই ছিল তাঁর জীবনের মহাব্রত ।
৫. জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মসূচী: স্বাস্থ্য বলতে এখন আর শুধুমাত্র কিছু রোগ, আর তার ওষুধ, কিছু ডাক্তার আর হাসপাতাল বোঝায় না। বোঝায় দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। বোঝায় সমস্ত দেশের, সব মানুষের স্বাস্থ্যহীনতার কারণ । জনস্বাস্থ্যের অবনতির অর্থ দেশের জনসম্পদের বিনষ্টি । এর জন্যেই চাই আন্দোলন । আন্দোলন খাদ্য, পানীয় জল, শিক্ষা আর বাসস্থানের জন্যে। আন্দোলন বহুজাতিক সংস্থার অর্থলোলুপতার বিরুদ্ধে । আন্দোলনের জন্যে প্রয়োজন সংগঠন। বলিষ্ঠ সংগঠনই বলিষ্ঠ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে । এজন্যে জনস্বাস্থ্য কমিটি গঠিত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য আন্দোলন গণ-আন্দোলনেরই আর এক নাম। রোগমুক্তি আর শোষণমুক্তির আন্দোলন এখন আর ভিন্ন নয় । এই জনস্বাস্থ্য কমিটিই দেশের দিকে দিকে আন্দোলন গড়ে তুলবেন। কিন্তু জনস্বাস্থ্য কমিটি গঠনের আগে ‘নৰ্মান বেথুন জনস্বাস্থ্য আন্দোলন সংস্থা গড়ে উঠেছে। সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরাও স্বাস্থ্যহীনতার মৌলিক ও সামাজিক কারণগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরছেন । স্বাস্থ্য-সচেতনার জন্যে তাঁরা পুস্তিকা প্রকাশ করে বিতরণ করছেন। বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে জনগণকে আন্দোলনে সংগঠিত করছেন। অপ্রয়োজনীয়, ক্ষতিকারক ওষুধ ও চিকিৎসা বন্ধ করার আন্দোলন গড়ে তুলছেন ।
৬. উপসংহার: সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি তৈরি করা সম্ভবপর নয় । স্বাস্থ্য-আন্দোলন তাই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সামিল। স্বাস্থ্য-আন্দোলন অর্থনৈতিক সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। আজ দেশের দিকে দিকে খাদ্যের কৃত্রিম অভাব। অভাব পরিশ্রুত পানীয় জলের। অভাব সাক্ষরতার। সমস্যা বাসগৃহের। বেকারত্বের সুতীর দহনে জ্বলছে দেশের অসংখ্য যুব-প্রাণ। ঘরে ঘরে দুঃসহ দারিদ্র্য । অপুষ্টিতে মরছে হাজার হাজার শিশু। ঘরে ঘরে প্রসূতির মৃত্যু। এজন্যেই জনস্বাস্থ্য আন্দোলন । শুধু অসুস্থকে সুস্থ করা নয়, লোক যাতে অসুস্থ না হয় তার ব্যবস্থা করা । কবির সঙ্গে আজ আমাদেরও দাবি হোক, ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু, চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু ।