রচনা–সংকেত: ১. ভূমিকা ; ২. একটি নির্জন দুপুরের চিত্র ; ৩. প্রতিক্রিয়া ; ৪– উপসংহার।
একটি নির্জন দুপুর
১. ভূমিকা: প্রতিদিনই সকাল হয় । সকালের পরে নির্জন দুপুর । পরে বিষণ্ণ সন্ধ্যা । সন্ধ্যার পর আবার গভীর রাত্রি । রাত্রিশেষে ফের প্রভাত পাখির গান । ঘুম ভাঙে অরণ্যের। শুরু হয় মানুষের ব্যস্ততা। এই ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষ কখনও কখনও পেয়ে যায় খণ্ড সময়ের চকিত উপহার। আমিও একদিন উপহার পেলাম এক নির্জন দুপুর। এর আগেও এসেছে কত সকাল দুপুর সন্ধ্যা। তারা চলেও গেছে নিঃশব্দ চরণে। কখনও কিছু মনে হয়নি। কিন্তু একদিন, হঠাৎ-পাওয়া নির্জন দুপুর আমার সামনে খুলে দিল এক নতুন দিগন্ত । এ এক নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন উপলব্ধি । বিস্ময়ের সীমা রইল না । এই নিঃসঙ্গ, স্তব্ধ দুপুরে আমি নতুন করে যেন নিজেকে চিনলাম। নির্জনতা যে এমন সুন্দর হয়, এমন গা ছমছম করা এক অনুভূতি নিয়ে আসে, রূঢ় বাস্তবকে এমন করে ভুলিয়ে দেয়, তা আগে জানা ছিল না। জানা ছিল না নির্জনতাও কথা বলে । অনেক কথা। আরও গভীর কথা । নির্জন দুপুরেরও এক মোহিনী রূপ আছে। সে রূপের স্মৃতি কখনও ভোলা যায় না ।
২. একটি নির্জন দুপুরের চিত্র: কর্মব্যস্ত সকাল একসময় ঝিমিয়ে এলো। আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। সেই আগুনে পুড়ছে গাছপালা, পশুপাখি, মানুষজন। বাতাসে আগুনের হল্কা। সেই আগুন গায়ে মেখে বাতাস ছুটে যাচ্ছে দূরে। রাস্তায় লোক চলাচল কমে গেছে। যানবাহনের ঠেলাঠেলিও কম। রাস্তার পিচ গলছে। পথচারীর চটি আটকে যাচ্ছে। কাছেই একটা ঝিল । রকমারি গাছ। নিস্পন্দ । মাঝে মাঝে তপ্ত হাওয়ার ছোটাছুটি। পাতায় পাতায় শিহরণ। ঝিলের ধারে রোদ-ভেজা কাক । স্নান করে । পাখা ঝাপটায় । গাছের ডালে শালিক ডাকে। আকাশে চিলের চিৎকার। রাস্তায় কোথাও ছায়া নামে। সেই ছায়ায় পথের কুকুর ঘুমোয়। জিভ বের করে হাঁপায়। আশপাশের বাড়ির কপাট-জানালা বন্ধ । এরই মধ্যে ফেরিঅলার কণ্ঠস্বর। গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়তে পুড়তে বেঁচে থাকার লড়াই । বাড়ির আলসেয় ক্লান্ত কাক হাঁ করে শ্বাস নেয়। পথের নলকূপে জল নেই। মাঝে মাঝে ঘটাং ঘটাং শব্দ। ঘাম জবজবে মানুষ ছুটে যাচ্ছে।
৩. প্রতিক্রিয়া: এই নির্জনতারও এক জাদু আছে । আমার সামনে রূপকথার সেই ঘুমন্ত নির্জন রাজপুরীর ছবি ভেসে ওঠে । আমিও তখন নির্জন তেপান্তরের মাঠের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছি । দুপুরের এই নির্জনতা আমাকে ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করছিল। ফেরিঅলার হাঁক আমার কানে যেন আরও গভীর কথা বলে গেল। জীবন এরকমই—লড়তে লড়তে বাঁচা, বা বাঁচতে গিয়ে লড়াই । আমার চোখে ঘুম নেই । পড়ার তাড়া নেই । নেই কোথাও যাওয়ার উৎসাহ । এই নির্জনতা আমাকে ঘুমুতে দেয় না । কত কী মনে পড়ে ! এই স্তব্ধ দুপুর শহরের ফ্ল্যাট বাড়িতে আতঙ্ক ছড়ায় । দুপুরের নির্জনতার সুযোগে কত বাড়িতে চুরি-ডাকাতি, খুনখারাপি হয় । কত গা-হিমকরা কাণ্ডই না ঘটে যায় ! মনে হলে গা ছমছম করে । আগুন ঝরা এই নির্জন দুপুর আমাকে যেন কোথায় নিয়ে চলেছে । আমি চেয়ে আছি কিন্তু কিছুই দেখছি না । কেমন এক ঝিমঝিমভাব । সব কেমন অস্ফুট স্বপ্নের মত মনে হয় । ছায়া ছায়া কত ব্যথা এই নির্জনতার গায়ে গায়ে মাখা । সব শব্দ, কোলাহল যেন সহসা স্তব্ধ হয়ে গেছে । ভেতর মহলের কপাট খুলে যাচ্ছে একটার পর একটা । এই নীল নির্জন দুপুরে আমি সেই রূপকথার অন্দর মহলে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম । ঘরে ঘরে সাজানো কত কান্না হাসি, কত দীর্ঘশ্বাস । আমাকে পেয়ে কথারা জেগে ওঠে । জেগে ওঠে বেঈমাবেঈমী । জাগে ঘুমন্তপুরীর রাজকন্যা, রাক্ষসখোক্ষসের দল । ঘোড়াশালে ঘোড়া জাগে । হাতিশালে হাতি ।
৪. উপসংহার: এমনি তন্দ্রাচ্ছন্নের মধ্যে কতক্ষণ কাটালাম জানি না । কুকুরের চিৎকারে একসময় ঘোর কাটল । রোদের রঙ বদলাতে শুরু করেছে । দুপুর যায় যায় । বিকেল উকি মারে । নীরব দুপুর আবার সরব হতে চায় । জানি, ওই নির্জন দুপুরে অরণ্যের স্নিগ্ধ ছায়া নেই । গ্রামের শান্ত শ্রীও এখানে অনুপস্থিত । এখানে শস্যহীন মাঠ নেই । গরু চরে না । শোনা যায় না হাম্বারব । নদীকূলে নৌকো বাঁধা নেই । তবু রোদভরা নির্জন দুপুর আমাকে উদাস করে । এই নির্জনতায় আমি সকলের মধ্যে একাকার হয়ে যাই। নির্জনতা আমার সত্তাকে আলোড়িত করে । জন্ম দেয় এক নতুন বোধের । উপলব্ধি করি নির্জনতা কোন বিচ্ছিন্ন সত্তা নয় । নির্জন দুপুর আজ আমার কাছে পূর্ণতার প্রতিমূর্তি হয়েই হাজির । এক অনন্ত সৌন্দর্যের প্রতীক । এই স্তব্ধ শান্ত দুপুর আমাকে মনে করিয়ে দেয় ধরিত্রীর সঙ্গে আমার জন্মজন্মান্তরের সম্পর্কের কথা । মুহূর্তে ধরা পড়ে নিসর্গ লোকের এই খণ্ড মুহূর্তটি এক অখণ্ড রূপেরই প্রকাশমাত্র। নির্জন দুপুরের কাছে আমি এবার নতুন পাঠ নিলাম ।