রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ; ২. পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সহিষ্ণুতা ; ৩. মহৎ জীবনে সহিষ্ণুতা; ৪. সহিষ্ণুতা ও চারিত্র–শক্তি ; ৫. সহিষ্ণুতা ও দুর্বলতা; ৬. উপসংহার ।
যে সহে সে রহে
১. ভূমিকা: সহ্য করার ক্ষমতা বা শক্তিই সহিষ্ণুতা । এই গুণ সবার থাকে না । যার থেকে জয় তারই । সৃষ্টির শুরু থেকেই চলছে এই জয়-পরাজয়ের খেলা । এমনি করেই পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেল কত জাতির আদি জীবন-বৃত্তান্ত । শুকিয়ে গেল কত জীবনের ধারা । কত বিশালকায় শক্তিমত্ত প্রাণী বিচ্ছিন্ন থেকে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল । টিকে আছে আজও কত ক্ষুদ্র প্রাণী। আর এই টিকে থাকার জাদুই হলো সহিষ্ণুতা । সহিষ্ণুতা এক দুর্লভ গুণ । এই গুণই মানুষের কাছে দুঃখজয়ের সোনার কাঠি । প্রতিকূলতাকে জয় করার এক দুর্বার প্রেরণা। সহিষ্ণুতা এক অনন্ত শক্তি । এই শক্তির অমৃত ছোঁয়ায় সবকিছুই প্রাণময় হয়ে উঠছে ।
২. পারিবারিক সামাজিক জীবনে সহিষ্ণুতা: সুন্দর হয়ে উঠছে মানুষের পারিবারিক সামাজিক জীবন । এর জাদুকাঠি দিয়েই মানুষ জীবনকে ও নানাভাবে অর্থময় করে তুলছে। জীবন তো প্রতিমুহূর্তে ঘটনা-সংঘাতে, দুঃখে-দৈন্যে, বিপদে-আপদে নিত্য আলোড়িত। চিত্ত নিয়ত সংঘাত-চঞ্চল । বিক্ষোভ-অসন্তোষে মানুষ কেবলই ক্লিষ্ট-প্রাণ। এরই মধ্যে যে মানুষ শান্ত-চিত্ত, ধৈর্যশীল, জীবন-যুদ্ধে জয় তারই। সিদ্ধি সহিষ্ণু মানুষেরই। অসহিষ্ণু মানুষ পারিবারিক জীবনে অসুখী । অসহিষ্ণুতার প্রশ্রয়েই পরিবারের শান্ত-শ্রী নষ্ট হয় । হতাশা, ব্যর্থতা আর মালিন্যে ভরে ওঠে সে-জীবন । অথচ সহিষ্ণুতা গার্হস্থ্য জীবনে আনে সুন্দরের স্বপ্ন । আনে শান্তির প্রবাহ । সহিষ্ণুতাই আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে গড়ে তোলে প্রীতির সম্পর্ক । সহিষ্ণুতাই শেখায় পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে ছন্দ রেখে চলতে । পরিবারের বাইরে রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক জীবন। সেখানেও এর ভূমিকা অনন্য। অসহিষ্ণু, বিবেকহীন মানুষ সমাজজীবনেও অবাঞ্ছিত । অকারণ উষ্মা, পরমতসহিষ্ণুতার অভাবে সমাজে উদ্ভব হয় নানা বিশৃঙ্খলার। দিকে দিকে জ্বলে ওঠে এক সর্বনাশের আগুন। অসহিষ্ণু মনোভাবই মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, দেশে দেশে সৃষ্টি করে বৈরী সম্পর্ক । জন্ম দেয় ধর্মান্ধতার । এরই অভাবে সাম্প্রদায়িকতা, অরাজকতা মাথাচাড়া দেয় । পারিবারিক সামাজিক জীবনে সহিষ্ণুতার প্রভাব তাই এমন গভীর, অপরিসীম।
৩. মহৎ জীবনে সহিষ্ণুতা: মহৎ জীবন মাত্রই সহিষ্ণুতার প্রতিমূর্তি। সহিষ্ণু ব্যক্তিরাই মানব-জন্মকে সার্থক করে তোলেন । তাঁদের কর্মের পথে নানা বাধা, নানা প্রতিকূলতা । তাঁদের জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে কত দুরন্ত ঝড় । পেয়েছেন কত লাঞ্ছনা । তবু কাঁটা-ভরা পথের ওপর দিয়ে তাঁরা হেঁটে গেছেন অবিচল নিষ্ঠায়। ত্যাগে, ধৈর্যে তাঁদের জীবন হয়েছে মহিমাময়। নিজেরা পান করেছেন জীবনমন্থনের গরল । সাধারণ মানুষের হাতে দিয়েছেন অমৃতের পাত্র । সেই মহাজীবন ত অনন্ত সহনশীলতারই প্রতীক । প্রবলের রক্তচক্ষুও তাঁদের ব্রতভ্রষ্ট করতে পারেনি । অসীম ত্যাগ আর তিতিক্ষায় জয় করেছেন প্রতিকূলতাকে । এমনি করেই যুগে যুগে কত পরিত্রাতা মহাপুরুষের পুণ্য আবির্ভাবে ধরণীর ধূলি হয়েছে পবিত্র । সহনশীলতা তাঁদের জীবনকে সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত করেছে । এসেছেন কত সমাজ-সংস্কারক। এসেছেন নতুন যুগের অগ্রদূত । সাহিত্যে, বিজ্ঞানে, শিল্পে এমনি করেই কত স্মরণীয় ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে । কত নিন্দা-সমালোচনার শরাঘাতে বিদ্ধ হয়েছেন তাঁরা। চরম হতাশা, দারিদ্র্যের মধ্যেও তাঁরা সুন্দরের আরাধনা করেছেন । মৃত্যুর ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে দুর্গম পর্বতশিখরে রেখে এসেছেন জয়ের নিশান । সহিষ্ণুতাই ছিল সেদিন তাঁদের মন্ত্র ।
৪. সহিষ্ণুতা ও চারিত্র শক্তি: সহিষ্ণুতা মানুষকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে । তার মধ্যে সঞ্চার করে এক দুর্জয় তেজ ও সাহস । এই সাহসই জীবন-যুদ্ধে মানুষের বড় অবলম্বন । সভ্যতার শুরু থেকেই চলছে বেঁচে থাকার লড়াই । সে লড়াই আজও থামেনি । সেই সংগ্রামে জয়ের জন্যে মানুষের চাই সাহস ও সহনশীলতা। এই সহনশীলতা মানুষের এক মহৎ চারিত্র লক্ষণ। এই লক্ষণই মানুষকে দৃঢ়-চিত্ত করে। করে ধৈর্যশীল। কোন প্রতিকূল আঘাতেই সে আর তখন ভেঙে পড়ে না। সহিষ্ণুতা দিয়েই মানুষ প্রতিকূলতাকে জয় করে। নিরন্তর অনুশীলনেই ঘটে এর বিকাশ। এই মহৎ মানবিক গুণটির জন্যেও প্রয়োজন সযত্ন লালন, পরিচর্যা। আর দুর্বল-চিত্ত মানুষ কখনও সহিষ্ণু হতে পারে না। সামান্য আঘাতেই তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে।
৫. সহিষ্ণুতা ও দুর্বলতা: সহিষ্ণুতাকে অনেকেই দুর্বলতা বলে ভুল করেন। যেখানে মানবতার লাঞ্ছনা, যেখানে অন্যায় অবিচার প্রত্যক্ষ করেও মানুষ প্রতিবাদ করতে পারে না, বরং ভীত, সন্ত্রস্ত, সেখানে সহিষ্ণুতার অর্থ ভীরুতা, কাপুরুষতা। মানুষ যেখানে ভীরু নতশির, সহিষ্ণুতা সেখানে নিশ্চেষ্টতা । এ নিশ্চেষ্টতা মানুষের কোন গৌরব নয়, তার কলঙ্ক । কিন্তু সহিষ্ণুতা মনুষ্যত্বকে খর্ব করে না। বরং, নতুন প্রাণশক্তিতে তাকে দুর্বার করে । সহিষ্ণু মানুষ প্রবলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে । কোন শক্তিমত্তের কাছেই সে নতিস্বীকার করে না । সহিষ্ণুতার শক্তিতেই সে শক্তিমান । মনুষ্যত্বের প্রকাশেই সে উন্নতমস্তক ।
৬. উপসংহার: সহিষ্ণুতা তাই মানবজীবনের এক প্রার্থিত ঐশ্বর্য। এই ঐশ্বর্যেই মানবসভ্যতা হয়েছে মহিমময়। সহিষ্ণুতাই মানুষের দুঃখজয়ের অভয় মন্ত্র। এই দুর্লভ গুণের অধিকারী হলেই মানুষের জীবন নানা সার্থকতায় ভরে ওঠে। পূর্ণতার দীপ্তিতে তখন সে জীবন হয় ভাস্বর। সহিষ্ণুতাই পারে মানুষের জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে এক মহামিলনের স্বপ্নকে সার্থক করে তুলতে। পারে মানুষের ক্ষুদ্রতা, ভীরুতা দূর করে মানুষকে অমৃতের পুত্র করে তুলতে।
📝 অনুসরণে লেখা যায়
১. সহিষ্ণুতার মূল্য
২. সহিষ্ণুতা ও সাফল্য
৩. সহিষ্ণুতাই জীবন-যুদ্ধে জয়ের চাবিকাঠি