রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ;২. নীতিবোধ ও অতীতে ব্যবসা–বাণিজ্য ; ৩. ভারতের ব্যবসায় দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ; ৪. দুর্নীতির চিত্র ; ৫. দুর্নীতিদমনে ; ৬. উপসংহার ।
ভেজাল এক সামাজিক অপরাধ
১. ভূমিকা: মানুষ সামাজিক জীব । মানুষের কল্যাণেই সমাজ । সমাজের মঙ্গলেই মানুষ । সমাজের ভালোমন্দ মানুষের ভালোমন্দের ইচ্ছের ওপরই নির্ভর করে । মনুষ্যত্ব নিয়েই মানুষ । মনুষ্যত্ব বিহনে মানুষই অমানুষ । মানবতাবোধ মানুষের বড় গুণ । এই গুণের অধিকারী হয়েই মানুষ এত বড়। প্রাণিজগতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ—সে পরহিতে জীবন দান করে। যে জীবন আত্মসুখে মগ্ন, সে-জীবন স্বার্থপর । সে-জীবন অমানবিকতায় পঙ্গু, আত্মকেন্দ্রিকতায় কলঙ্কিত ।
২. নীতিবোধ ও অতীতে ব্যবসা–বাণিজ্যের: নীতিবোধ মানুষের জীবনে অনেক বড় জিনিস। এই নীতিবোধকে বিসর্জন দিয়ে মানুষ কখনও বড় হতে পারে না । চোরাপথে জীবনের যে সাফল্য তা ক্ষণস্থায়ী । নীতিবোধই মানুষের বড় আশ্রয়। তার রক্ষাকবচও বটে। সঙ্গে সমাজজীবনের সম্পর্ক নিবিড় । অতীতেও আমাদের দেশের সওদাগরেরা ব্যবসা-বাণিজ্য সপ্তডিঙা মধুকর সাজিয়ে বাণিজ্যের তরী ভাসিয়েছেন । বাণিজ্যের পসরা নিয়ে গেছেন দেশে-দেশান্তরে । এসেছেন অন্য দেশের বণিকদের দল । সেদিনও সওদাগর তাঁর সিন্ধুক ভরেছেন লাভের মুদ্রায় । কিন্তু সেই মুনাফা নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে নয় । সেদিন বাণিজ্য ছিল তাঁদের কাছে সাধনার বিষয়। তাঁরা নিষ্ঠা, নীতিবোধ নিয়ে লক্ষ্মীর আরাধনা করেছেন । আর লক্ষ্মীর অন্তরের কথা হচ্ছে কল্যাণ । ‘চোরাবাজার’ শব্দটি সেদিন ব্যবসায়িক অভিধানে ছিল একেবারে অপরিচিত, অজ্ঞাত । সেদিন ধর্মবুদ্ধি ছিল মানুষের কাছে গৌরবের, মর্যাদার বিষয়।দিন বদলে গেল । ইংরেজ হলো দেশের শাসক। বোম্বেটেদের অত্যাচারে ভারতের
৩. ভারতের ব্যবসায় দুর্নীতির অনুপ্রবেশ: বহির্বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ হলো। ভারতীয় সওদাগরের কপাল ভাঙল । সমাজজীবনেও চলল নানাভাবে মূল্যবোধ বিনষ্টির কাজ। ধীরে ধীরে স্বার্থবুদ্ধি মানুষকে গ্রাস করল। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে মানুষ দিশেহারা হলো। বেঁচে থাকার আত্যন্তিক তাগিদে নীতিবোধ বিসর্জন দিল মানুষ। ইংরেজ শাসনে আমাদের জীবন থেকে ধর্মবোধ ও নীতিবোধ ক্রমশ দূরে সরে যেতে লাগল । তার ওপর দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৩ সালের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ আমাদের অর্থনৈতিক জীবন তছনছ করে দিয়েছে। সেই পথেই অনুপ্রবেশ করেছে দুর্নীতি । কিছু স্বার্থগৃধু, অসাধু ব্যবসায়ী ইংরেজের প্রশ্রয়ে দুর্নীতির গলিপথটাকে রাজপথে পরিণত করেছে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতি আমাদের সাধুতার ভিত্তি ভেঙে দিয়েছে। কিছু মজুতদার-কালোবাজারী-চোরাকারবারীর দুরভিসন্ধি বাংলার জনজীবনে নিয়ে এলো করাল বিভীষিকা । সুদখোর-মহাজন, দালাল-কন্ট্রাক্টরদের দৌরাত্ম্য বাড়ল । মুনাফাশিকারী, কালোবাজারী, চোরাকারবারীদের ভিড়ে বাজার ছেয়ে গেল ।
৪. দুর্নীতির চিত্র: আজকের ব্যবসায় স্বার্থবুদ্ধি বড় । অভাব নীতিবোধের । শিশুর খাদ্য মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যায় । রোগীর ওষুধে ভেজাল । খাদ্যে ভেজাল । ভেজাল খাদ্য খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মানুষ । পঙ্গু হয়ে যায় সারাজীবনের জন্যে । পৃথিবীতে ভারতের মত আর কোনো দেশে খাদ্যে এত ভেজাল মেশানো হয় না । এক্ষেত্রে ভারতের স্থান বোধ হয় শীর্ষে। এখানে সিমেন্টের সঙ্গে গঙ্গামাটি মেশানো হয়। সরষের তেলের সঙ্গে শেয়ালকাঁটার বীজের মিশ্রণ ঘটে। শিশুর দুধে নির্বিকার চিত্তে নোংরা জল মেশাতে পারে এদেশের গোয়ালারাই। ওষুধে ভেজাল মেশাতে হাত কাঁপে না এখানকার মুনাফাখোরদের । চালে কাঁকর, ডালে কাঁকর । মসলাপাতিতে ভেজাল । শাক-সবজিতেও রঙ করা হয় । ফলে ভেজাল । সুকৌশলে জীবনধারণের অপরিহার্য সব পণ্য সরিয়ে দিয়ে কৃত্রিম অভাব তৈরি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী । এভাবেই বেড়ে চলে ব্যক্তিগত মুনাফার অঙ্ক ।
৫. দুর্নীতিদমনে: স্বাধীনতার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল, আমরা ইংরেজ আমলে হারানো মূল্যবোধ, ধর্মবোধ। আর নীতিবোধকে আবার ফিরে পাব । ফিরে পাব বিধ্বস্ত সততা । কিন্তু দেশভাগের ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও তীব্র হলো । সংকট এলো মূল্যবোধে । স্বাধীনতার আগে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু সদম্ভে বলেছিলেন, তাঁর হাতে ক্ষমতা থাকলে তিনি চোরাকারবারীদের প্রকাশ্য রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে ফাঁসি দিতেন । তিনি সুদীর্ঘ সতের বছর ভারতভাগ্যবিধাতা ছিলেন, কিন্তু একজন চোরাকারবারীকেও কঠোর শাস্তি দিতে শোনা যায়নি । তাঁর সময়েও চোরাকারবারীরা তেলে ভেজাল মিশিয়েছে । শিশুর খাদ্যে, ওষুধে ভেজাল মিশিয়েছে । সমাজদ্রোহীরা দিনে দিনে পুষ্ট হয়েছে । ঘৃণ্য ব্যবসায়ীদের এখানে কঠোর শাস্তি হয় না । দুর্নীতি দমনের জন্যে গঠিত হয়েছিল ‘সদাচার সমিতি’ । কিন্তু তাও কার্যকর হলো না । সদাচার সমিতিই ভরে উঠল বাস্তু ঘুঘুদের নিয়ে । ভেজালরোধে ‘খাদ্য ভেজাল নিবারণী বিধি ১৯৬৪’ প্রবর্তিত হয়েছিল । সেই আইনেও সমাজবিরোধী ব্যবসায়ীদের ঘায়েল করা গেল না। আইন দিয়ে কখনও মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন করা যায় না। বিবেকবোধকে পায়ে দলিত করেই তারা পার্থিব সুখের শিখরে ওঠে ।
৬. উপসংহার: এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা আয়কর ফাঁকি দেয় । জনগণকে এরা নানাভাবে প্রবঞ্চিত করে । বেনামীতে সম্পত্তি হস্তান্তর করে । উপর মহলে ঘুষ দেয় । বিদেশের ব্যাঙ্কে টাকা জমায় । ফাঁকি দেয় বৈদেশিক মুদ্রা । এরা চিনি, শিশুর খাদ্য, ওষুধ, গাঁজা-চরস, সোনা ইত্যাদি নিয়ে চোরাচালানের কারবার করে। এদের জন্যে দেশে কোন আইন তৈরি হয় না । এরা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে । এদেরই পাতা ফাঁদে পড়ে কত জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে । কত তরুণ-তরুণীর জীবনে নামছে গাঢ় অন্ধকার । ভারতের লক্ষ লক্ষ গরীব মানুষ খাদ্য পানীয় ওষুধের ভেজাল খেয়ে প্রতিনিয়ত ধুঁকছে। ভেজালের সর্বনাশা বিভীষিকা থেকে কি মানুষের মুক্তি নেই ? মানুষের শুভবুদ্ধি কি এমনি করেই তমসাচ্ছন্ন থাকবে ? কবে আর এদের বিরুদ্ধে গণরোষ দুর্বার হবে ? ভেজাল এক সামাজিক অপরাধ । ভেজাল এখন মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য ছেড়ে তার রক্তের মধ্যে প্রবেশ করেছে । কে জানে, এ আরও কোনো মহাধ্বংসের পটভূমি রচনা করছে কিনা !
📝 অনুসরণে লেখা যায়
- ভেজালের শিকার
- ব্যবসায় দুর্নীতির চিত্র
- বাণিজ্যে নীতিবোধের প্রয়োজনীয়তা
📖 পরীক্ষার প্রস্তুতি
এই বিষয়ে রচনা লেখার সময় ভেজালের সংজ্ঞা, ভেজালের কারণ, জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব, অসাধু ব্যবসায়ীদের ভূমিকা এবং ভেজাল প্রতিরোধের উপায় আলোচনা করো। ভূমিকা, মূল আলোচনা ও উপসংহার আলাদা করে লিখবে। প্রাসঙ্গিক উদাহরণ ব্যবহার করবে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের সাহায্যে বক্তব্যকে স্পষ্ট করবে।