রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ; ২. পারিবারিক পরিবেশ ; ৩. সামাজিক পরিবেশ ৪. প্রকৃতির পরিবেশ ; ৫. পঠন–পাঠনের পরি বেশ ; ৬. উপসংহার ।
মানব জীবনে পরিবেশের প্রভাব
১. ভূমিকা: মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ জীবনের ভলো-মন্দের সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর । অচ্ছেদ্যও। শিশুর জন্ম জৈবিক উত্তরাধিকার নিয়ে, কিন্তু তার বিকাশ সামাজিক উত্তরাধিকারে । যে শিশু আজ জন্ম নিল, পিতামাতা তার প্রথম স্বজন । আত্মীয় পরিজনই তার প্রথম পরিবেশ । তারপর পাড়া-পড়শী । সমাজ । অবারিত মাঠ প্রান্তর অরণ্য নদী তার নেপথ্য প্রেক্ষাপট। পরিবেশই তাকে দেয় মনুষ্যত্বের দীক্ষা । দেয় সহনশীলতার শক্তি । পরিবেশ মানুষকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করে । পরিবেশ তার জীবন-চেতনার সার্বিক অভিব্যক্তির পথনির্দেশ। তার অদৃশ্য চালিকাশক্তি । ব্যক্তিত্ব বিকাশের চাবিকাঠি। পরিবেশই তার চরিত্র গঠনের নেপথ্য উৎস।
২. পারিবারিক পরিবেশ: পরিবারের সীমিত পরিসরেই নবজাতকের প্রথম চলাফেরা। বাবা-মা, ভাই-বোন আত্মীয় স্বজনের স্নেহে ও শাসনে, ভালোবাসা ও তর্জনে শিশু বড় হয়ে ওঠে। এখানেই তার জীবন-গঠনের প্রথম পাঠ। শুরু ভাবী জীবনের দীক্ষা। তখন থেকেই তার মনের জমিতে সঞ্চিত হতে থাকে পরিবারের বিশেষ প্রবণতা, শিক্ষা, রুচি, আদর্শ ও মানসিকতা। তার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে চলে বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের ধারা । পারিবারিক শিক্ষার ওপরই নির্ভর করে তার ভাবী জীবনের সাফল্য, ব্যর্থতা । পরিবারের আদর্শ পরিবেশ থেকেই সে নেয় ভাবী জীবনের রসদ। পরিবারের আদর্শ, সুরুচির শিক্ষা তার জীবনকে অমৃতময় করে তোলে। আর আত্মসর্বস্ব, অনুদার, স্থূল কুরুচি ও স্বার্থপরতার শিক্ষায় সে-জীবন হয় বিষময় ।
৩. সামাজিক পরিবেশ: সমাজই শেষ পর্যন্ত মানুষের যথার্থ বিচরণভূমি। সমাজ বন্ধনই তার বড় বন্ধন । সমাজের বুকে উঠছে নিরন্তর ঘাত-প্রতিঘাতের নানা ঢেউ। সেই ঢেউ মানুষের জীবনে নিয়ত আছড়ে পড়ছে । সমাজ পরিবেশেই গড়ে ওঠে দেশ ও জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি । গড়ে ওঠে জগৎ জীবনকে দেখার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। সামাজিক পরিবেশই মানুষের জীবনযাত্রায় বিভিন্নতা আনে। রচনা করে গৌরব-অগৌরব, আলো-অন্ধকার, অগ্রগতি-অবনতির ইতিবৃত্ত । সুস্থ সামাজিক পরিবেশ মানুষের বেঁচে থাকাকে সার্থক করে । পূর্ণ করে তার ইতিহাসের ধারা। আর অসুস্থ, পঙ্গু পরিবেশ জন্ম দেয় ব্যভিচার, উচ্ছৃঙ্খলতার। সামাজিক পরিবেশ তাই নানা দোষগুণের আকর। এই পরিবেশই ধনীদের করে বিলাসী, অমিতাচারী। দরিদ্রদের করে বেপরোয়া, স্বনির্ভর। পরিবেশই সৃষ্টি করে চোরাকারবারী, ভেজাল-কুশলীদের। সামাজিক পরিবেশের গুরুত্ব তাই গভীর ও ব্যাপক।
৪– প্রকৃতির পরিবেশ: প্রকৃতিই মানুষকে উদার করে, মহৎ করে। জাগরণ ঘটায় মনুষ্যত্বের। প্রকৃতি মানুষের দ্বিতীয় ধাত্রী । মানুষের সঙ্গে তার জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক । উদার আকাশ তাকে দেয় মুক্তির আনন্দ । সমুদ্র নদীর কলতানে সে শোনে মহাজীবনের গান। অরণ্য পর্বতে সে খোঁজে বিজয়ী প্রাণের ছোয়া। মানুষের চারপাশে শ্যামল সবুজের সমারোহ । কোথও বা আতঙ্ক পাণ্ডুর মরুক্ষেত্র । প্রকৃতিই তাকে দেয় মহৎ উপলব্ধির আশ্বাস । দেয় বৃহৎ জীবনের দীক্ষা । নিঃসীম নীলাকাশ মানুষকে উদার করে । নদী সমুদ্র তাকে ঘর ছাড়া করে । অরণ্য পর্বত দুর্গমতাকে জয় করার নেশা ধরায়। গাছে গাছে, বনে বনে, পুষ্পবাহার তাকে মুগ্ধ করে। সূর্যোদয় সূর্যাস্তের ডাককে মানুষ উপেক্ষা করতে পারে না । মাঠে প্রান্তরে বিছানো থাকে বিশালতার আস্তরণ। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ লীলা চলছে সৃষ্টির মুহূর্ত থেকেই। একে মানুষ কি করে অস্বীকার করে ! প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার অর্থ, সে-জীবন প্রতিদিনের স্থূল প্রয়োজনে সঙ্কুচিত, স্বার্থপরতায় মলিন, অমানবিকতায় ক্ষুদ্র।
৫. পঠন–পাঠনের পরিবেশ: পিতামাতার স্নেহাঞ্চলেই শিশুর জীবন কাটে না। শিশুকেও একদিন ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোতে হয় । ঘরের বাইরে আছে বিশাল, বিচিত্র কর্মধারা । আছে নবীন জীবন বিকাশের এক অস্থিরতা । তার মনে তখন নবীন বিস্ময়, নবীন প্রীতি, নবীন কৌতূহল । বাইরের পৃথিবী তাকে হাত-ছানি দেয় । ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যে থাকে এক প্রস্তুতি পর্ব । স্কুল-কলেজ সেই প্রস্তুতি পর্বেরই আর এক প্রেক্ষাপট । এখানেই সে গ্রহণ করে অনাগত জীবনের পাঠ । আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সে খুঁজে পায় নবীন কল্পনা বিকাশের প্রয়োজনীয় উপকরণ । শিক্ষা তাকে সমাজমুখী করে । আদর্শ শিক্ষা তার মধ্যে বপন করে মানবিক গুণাবলীর বীজ । যথার্থ অর্থে তাকে মানুষ করে । আর শিক্ষা যেখানে গতানুগতিকতায় আচ্ছন্ন, যান্ত্রিকতায় নিরানন্দ, বিচ্ছিন্নতায় ক্ষুদ্র, স্বার্থপরতায় অন্ধ, শিক্ষার্থীর জীবন সেখানে ‘অভিশাপের শিকার।
৬. উপসংহার: তাই, মানুষের জীবনে পরিবেশের প্রভাব গভীর ও ব্যাপক। ক্ষুদ্র দলাদলি, স্বার্থচিন্তা, হিংসার মত্ততা, সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধতা, রাজনৈতিক ধূর্তামি—এ সব কিছুই অসুস্থ পরিবেশের অনিবার্য পরিণাম । আবার পরিবেশই এক অমিত শক্তির আধার । পরিবেশই সুস্থতার অঙ্গীকার, পরিবেশই অসুস্থতার ফলশ্রুতি । পরিবেশই জীবনের জয়গান, পরিবেশই মৃত্যুর দূত। পরিবেশই উত্থান, পরিবেশই পতন । পরিবেশই মানুষের মহাজীবনের মন্ত্র, আবার মনুষ্যত্বের নিত্য নিগ্রহ । পরিবেশই মানুষের জীবনে এক দুর্নিবার নেপথ্যচারী নিয়ন্ত্রণ শক্তি ।