রচনা সংকেতঃ ১. ভূমিকা; ২. বই মেলার উদ্দেশ্য; ৩ বইমেলার সময় ৪ পশ্চিম– বঙ্গে বইমেলা; ৫. বইমেলার সার্থকতা; ৬. বই– মেলার অসুবিধে ; ৭. বইমেলার বৈচিত্র্য ; ৮. উপসংহার
বইমেলা
১. ভূমিকা: জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হলে যে জিনিসটির প্রয়োজন সর্বাধিক, তার নাম বই । অনেকে বলে থাকেন বই অবসর বিনোদনের অঙ্গ । কিন্তু তা ঠিক নয়। বই ছাড়া জীবনের সবকিছু মনে হয় অসম্পূর্ণ । প্রকৃতি, মানবজগৎ এবং জীবনকে জানতে হলে বা উপলব্ধি করতে হলে বইয়ের সাহায্য ছাড়া আর কোনো উপায় নেই । শাড়ি নিয়ে মেলা হয়, চিত্র নিয়ে মেলা হয়, বিভিন্ন পুজো-পার্বণ নিয়ে মেলা হয়, এগুলো তো আমরা জানি । কিন্তু শুধু বই নিয়ে মেলা ? এ তো অভিনব এক কল্পনা ! এই অভিনব কল্পনাকেই বাস্তবে সত্য করে তুললেন বইয়ের প্রকাশকরা ।
২. বইমেলার উদ্দেশ্য: বইমেলার কিছু নির্ধারিত উদ্দেশ্য আছে । প্রথমত, প্রকাশকদের প্রকাশিত বই অনেক সময় পাঠকদের অজান্তে ধীরে ধীরে প্রচারের অভাবে লুপ্ত হয়ে যায় । বইমেলায় প্রকাশকরা তাঁদের প্রকাশিত বইগুলো তাজা অবস্থায় মেলায় আগত মানুষের কাছে মেলে ধরতে পারেন । দ্বিতীয়ত, পাঠক, প্রকাশক এবং লেখক—এই তিন গোষ্ঠীর মধ্যে বইমেলার মাধ্যমে একটা ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র গড়ে ওঠে । প্রকাশকরা বুঝতে পারেন পাঠক কি ধরনের বই পড়তে বা কিনতে আগ্রহী । লেখকরা বুঝতে পারেন, পাঠক তাদের কোন্ লেখাকে বেশি গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছেন । অর্থাৎ বইমেলার সূত্র ধরে লেখকরা পাঠকের রুচি এবং মানসিকতা ধরতে বা বুঝতে পারেন । তৃতীয়ত, পাঠকেরা নিজেদের পছন্দমাফিক বা রুচিমাফিক বিষয়ের কথা সরাসরি প্রকাশক এবং লেখকদের কাছে উন্মোচন করতে সক্ষম হন । পাঠকরা লেখকদের লেখার ভালো-মন্দ, গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে লেখকদের সচেতন করে দিতে পারেন । লেখকরা পাঠকদের তৃপ্তি এবং অতৃপ্তির জগৎ সম্বন্ধে অবহিত হন । চতুর্থত, প্রতি বছর বইমেলা উপলক্ষে নিত্য নতুন বই প্রকাশিত হয়ে থাকে, যার ফলে বাংলা সাহিত্য আজও বন্ধ্যা হয়ে যায়নি বা আচমকা তার সৃষ্টির রথ কোথাও থমকে যায়নি। পঞ্চমত, বইমেলাকে কেন্দ্র করে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে একটি সুস্থ মানবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ষষ্ঠত, দোকানে গিয়ে বই কেনা এবং বইমেলায় এসে বই কেনার মধ্যে একটা বিরাট তফাত আছে । দোকানে পাঠক বা ক্রেতা দীর্ঘক্ষণ ধরে বই নেড়েচেড়ে দেখবার দুর্লভ সুযোগ পান না । বইমেলায় এই সমস্যা নেই । পাঠক এখানে ইচ্ছেমত স্বাধীন ভাবে বই ঘেঁটে দেখবার সুযোগ লাভ করেন ।
৩. বইমেলার সময়: মোটামুটিভাবে প্রতি বছর ২৪শে জানুয়ারী থেকে ৫ই ফেব্রুয়ারী এই সময়েই বইমেলা হয়ে থাকে । ছুটির দিনে বেলা ১২টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মেলা চলে । অন্যান্য দিনে মেলার সময় ২টা থেকে ৮টা । প্রবেশপত্রের মূল্য আর নাই।
৪. পশ্চিমবঙ্গে বইমেলা: ১৯৭৬ সাল । বইমেলার আসর বসল বিড়লা তারামণ্ডলের বিপরীত দিকের মাঠে । শীতের মরশুমে এই মেলার শুরু । উদ্যোক্তা ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক-সেলার্স গিল্ড’ । ১৯৮১ সালে পার্ক সার্কাস ময়দানে শুরু হলো ‘পশ্চিমবঙ্গ গ্রন্থমেলা’ । এর উদ্যোক্তা ‘বঙ্গীয় প্রকাশক ও পুস্তক-বিক্রেতা সমিতি’ । বইমেলা এখন আর শহরেই বন্দী নয় । এ মেলা এখন শহর-শহরতলি, গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে ।
৫. বইমেলার সার্থকতা: শুধুমাত্র বইয়ের টানে বহু দূর-দূরান্ত থেকে নানা রকমের, নানা ধর্মের, নানা মাপের নরনারী এই বইমেলায় এসে উপস্থিত হয়। বইয়ের মাধ্যমে সব জাতের সব ধরনের মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । এ যেন এক মহান তীর্থক্ষেত্র । এখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের কোন ভেদাভেদ নেই । এখানে বিত্তবান এবং বিত্তহীনের পার্থক্য নেই । বইমেলায় এসে মানুষ বইয়ের সঙ্গে মিলিত হয়। মিলিত হয় মানুষের সঙ্গে । মানুষে মানুষে মিলনে এ এক মহামিলন। এ মিলন শুদ্ধতার, পবিত্রতার । বইমেলার মাধ্যমে মানুষ শুধু বইকেই ভালোবাসতে শিখছে না। শিখছে মানুষের গোটা রক্তমাংসের জীবনকেই ভালোবাসতে ।
৬. বইমেলার অসুবিধে: কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার বর্তমান স্থায়ী ঠিকানা করুণাময়ী, সল্টলেক-এর সেন্ট্রাল পার্ক মেলাপ্রাঙ্গণ (বইমেলা প্রাঙ্গণ)। দীর্ঘ বছর ধরে এখানেই এই মহামেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ফলে রবীন্দ্রসদনের বিপরীতে বইমেলা হওয়ার যে কথাটি পূর্বে উল্লেখ ছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা পরিবর্তিত হয়েছে।
সল্টলেকের এই প্রশস্ত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হলেও বইমেলার কিছু চিরাচরিত অসুবিধে এখনও প্রকট। বইমেলার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের বাঁধভাঙা ভিড়। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগমের কারণে মেলা প্রাঙ্গণে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। ছুটির দিনগুলোতে ভিড় এমন জায়গায় পৌঁছায় যে হাঁটাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়াও, এত মানুষের পদচারণায় ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের কারণে প্রচুর ধুলো ওড়ে, যা বয়স্ক মানুষ এবং শিশুদের পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জল ছিটানো হলেও গুমোট ভাব ও ধুলোর উপদ্রব পুরোপুরি দূর হয় না। তবে রবীন্দ্রসদনের আগের সংকীর্ণ জায়গার তুলনায় সল্টলেকের এই বিশাল চত্বর মেলাটিকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, ক্রমবর্ধমান ভিড় সামলাতে আরও উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং আরও সুপরিকল্পিত পরিকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
৭. বইমেলার বৈচিত্র্য: বইমেলায় মানুষকে নানা রূপে, নানা ভূষণে, নানা মানসিকতায় দেখতে পাওয়া যায় । কেউ মুখোশ পরে । কেউ মাথায় কাগজের লম্বা টুপি পরে, কেউ বা ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়ে মেলার আনন্দ বা মেলার মেজাজ অব্যাহত রাখে । খোলা জায়গায় কোন নবীন শিল্পী গান শুরু করে দেয় । তাকে ঘিরে জমে যায় ভিড় । কেউবা তার দল নিয়ে খোলা পরিসরে নাট্যাভিনয় করে । সেখানেও মজা পাওয়া যায় । ‘লিটল ম্যাগাজিনের স্টল’ থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসে ছড়া বা কবিতার আবৃত্তির অংশ । মাইক্রোফোনে কোন প্রখ্যাত শিল্পী গেয়ে ওঠেন ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা। তখন মন আমার উদাস হয়ে যায় ।
৮. উপসংহার: প্রতি বছরেই বইমেলা আমাদের জীবনে ফিরে ফিরে আসে । আসে আকর্ষণীয়ভাবে । এ যেন বইমেলা নয়, বাঙালীর জীবনে আরও একটি নতুন উৎসব । আমরা বলতে পারি, বাঙালীর বারো মাসে চৌদ্দ পার্বণের নাম—বইমেলা। এবারে ছিল চতুর্দশ বইমেলা । বাইরে থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন রেজিস দেব্রে এবং লাপিয়ের । কিশোর এই উৎসবটি এখন বাঙালী জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে । এর টানে প্রবাস থেকে ছুটে আসে বাঙালী পাঠক । এবারের বইমেলায় বড় সাফল্য ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ-তালিকা প্রকাশ । ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড’-এর উদ্যোগে তালিকাটি প্রকাশিত । এবারেও ধুলোর ঝড় ছিল । গান ছিল, ভিড় ছিল । বইমেলার যে-দৃশ্যটি আজও স্মরণীয়, তা হলো, একটি অল্পবয়সী মেয়ে, বুকের ওপর আকুলভাবে ধরে রেখেছে সদ্য-কেনা কিছু বই। সব সময়ই মনে হয়, এই বুঝি বইগুলো পড়ে যাবে। কিন্তু আমরা আজ একথা জেনে গেছি—বাঙালীর বুক থেকে কোনদিনও কোনো বই পড়ে যেতে পারে না । বইমেলা বাঙালীর আজ এক নতুন গর্ব ।