রচনা-সংকেত: ১. ভূমিকা; ২. অতীতের উৎসব বৈশিষ্ট্য; ৩. বর্তমানের উৎসব বৈশিষ্ট্য ; ৪. ধর্মীয় উৎসব; ৫. সামাজিক উৎসব ৬. ঋতু উৎসব; ৭. জাতীয় উৎসব; ৮. উপসংহার।
বাংলার উৎসব
১. ভূমিকা: উৎসব সব দেশে সব কালেই মানুষের এক বাঞ্ছিত সঙ্গী। উৎসব এক অপরিহার্য সামাজিক সত্তা। মানুষের জীবনে এর তাৎপর্য গভীর ও ব্যাপক। উৎসবের দিনেই মানুষ মহৎ, বৃহৎ। উৎসবই সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণপ্রবাহ। উৎসবের দর্পণেই জাতির সামগ্রিক পরিচয়। উৎসবে থাকে না প্রতিদিনের জীর্ণতা, ক্ষুদ্রতা। থাকে না সাংসারিক মালিন্য, বেদনাভরা চিত্র। উৎসব হলো সবাইকে উদারভাবে আহ্বান করার পটভূমি।
২. অতীতের উৎসব বৈশিষ্ট্য: বাঙালী উৎসব-প্রিয় জাতি। উৎসবেই পাওয়া যায় তার প্রাণের ছোঁয়া। অতীতে এই প্রাণের স্পর্শই উৎসবকে মধুময় করত। সার্বজনীনতায় হতো সমৃদ্ধ। সকলের সহযোগিতায় উৎসব হয়ে উঠত প্রাণের সামগ্রী। যত্ন, চেষ্টা, উৎসাহ আর আনন্দে উৎসবকলা সর্বাঙ্গসুন্দর হতো। সেদিন একের উৎসব সহৃদয়তার গুণে হয়ে উঠত সকলের উৎসব। উৎসব সামান্যকেও অসামান্য করে তুলত।
৩. বর্তমানের উৎসব বৈশিষ্ট্য: দিন বদলায়। বদলায় তার সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান। উৎসবেও লাগল পরিবর্তনের হাওয়া। হৃদয়ের উষ্ণতা কমল। উৎসব হারাল তার সজীবতা। সেখানে এলো হুজুগপ্রিয়তা। এলো উচ্ছৃঙ্খলতা । বাড়ল বারোয়ারী উৎসবের সংখ্যা। সেই সঙ্গে চাঁদার উৎপাত। উৎপাত নানারকমের। বাড়ল সমাজ-বিরোধীদের দৌরাত্ম্য। ভক্তির বদলে এলো আড়ম্বর। আন্তরিকতার জায়গায় এলো কৃত্রিমতা। অন্তরে শুভ আকুতি গেল হারিয়ে। উৎসব হলো স্বল্পবিত্ত মানুষের কাছে আতঙ্কের বিষয়।
৪. ধর্মীয় উৎসব: এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-জৈন-খ্রীষ্টান নানা ধর্মমতের মানুষের বাস। ধর্মীয় উৎসবের এখানে নিত্য কলগুঞ্জন। সিদ্ধিদাতা গণেশের পুজো দিয়ে বাঙালী হিন্দুর নববর্ষের শুরু। তারপর একের পর এক উৎসবের বিচিত্র মিছিল। দশহরা-রথযাত্রা-রাখীপূর্ণিমা-মনসা-বিশ্বকর্মা শেষ হতে না হতেই আসে হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ শারদোৎসব। তারপর লক্ষ্মী-কালী-কার্তিক-জগদ্ধাত্রী-সরস্বতী-অন্নপূর্ণা পুজোর উৎসব। মুসলমান সমাজের আছে মহরম, ঈদুজ্জোহা, ঈদ-উল-ফিত্র। আর আছে বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা, জৈনদের পরেশনাথ, খ্রীষ্টানদের বড়দিন, ইস্টার স্যাটারডে, গুড ফ্রাইডে ইত্যাদি উৎসব। উৎসবের মধ্যেই বাঙালী দুঃখ জয় করেছে। এরই মধ্যে রয়েছে তার এক চিরন্তন কল্যাণ কামনা। তার অধ্যাত্মসাধনা ইহবিমুখ নয়, ইহমুখীন।
৫. সামাজিক উৎসব: সামাজিক উৎসবে একদিকে বাঙালীর প্রাণপ্রাচুর্যের প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে এক মহৎ জীবনবোধের অভিজ্ঞান। নিছক আমোদ-প্রমোদে তার উৎসবকলার চরিতার্থতা নয়। চরিতার্থতা সকলের আন্তরিক, শুভ ইচ্ছায়। এই কল্যাণী ইচ্ছা তার বারব্রত, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন, জামাইষষ্ঠী, ভাইফোটা, বিয়ে, জন্ম ইত্যাদি সামাজিক অনুষ্ঠানে ছড়িয়ে আছে। এখানে জন্মগ্রহণে উৎসব। উৎসব মৃত্যুতে। প্রতিটি উৎসবই এখানে স্বতন্ত্র। স্বাতন্ত্র্য তার মন্ত্রসঙ্গীতে, তার ক্রিয়াকলাপে। সামান্য উৎসবও তাই এখানে অসামান্য তাৎপর্যে ভরে ওঠে। ব্রত উৎসবগুলোও সামাজিক উৎসবের অঙ্গ। ‘ব্রত হলো মনস্কামনার রূপটি। আলপনায় তার প্রতিচ্ছবি। গীতে বা ছড়ায় তার প্রতিধ্বনি; এবং প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার
৬. ঋতু উৎসব: বাঙালীর জীবনচেতনায়, তার সুখ-দুঃখের রোজনামচায় প্রকৃতিরও রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। বৈশাখের পুণ্য প্রভাতে শুরু হয় বাঙালীর নববর্ষের উৎসব। বর্ষার মধ্যে শোনে জীবনবিকাশের স্পন্দন। বীজবপন, ধান্যরোপণ, বৃক্ষরোপণ, বর্ষামঙ্গল ইত্যাদি উৎসবের মধ্যে দিয়ে উৎসারিত হয় তার বর্ষা-বন্দনা। শরৎকালে শারদীয় উৎসব শ্রেষ্ঠ ঋতু-উৎসব। অগ্রহায়ণ মাসে বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ধান্যে নবান্ন উৎসবের ধূম। পৌষে পৌষমেলা, পিঠে-পার্বণ উৎসব। ফাল্গুনে হোলি উৎসব। চৈত্রের ধূ-ধূ প্রান্তরে বেজে ওঠে গাজনের বাজনা। এভাবেই বর্ষ বিদায়, বর্ষারম্ভ। শুরুতেও উৎসব। শেষেও উৎসব।
৭. জাতীয় উৎসব: এছাড়াও আছে জাতীয় উৎসব। এগুলো তার কাছে জাতীয়তাবোধ ও সংহতি চেতনার অঙ্গীকার। এদের মধ্যে রয়েছে পনেরই আগস্ট—ভারতের স্বাধীনতা দিবস; ছাব্বিশে জানুয়ারি–ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ; পঁচিশে বৈশাখ—রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন; তেইশে জানুয়ারি–নেতাজির জন্মদিন ইত্যাদি।
৮. উপসংহার: একদিন বাঙালীর ছিল অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। ছিল অফুরন্ত প্রাণশক্তি। আজ আর নেই তার অতীতের আর্থিক স্বচ্ছলতা। আজ তার জীবনে নানা সমস্যা। নানা জটিলতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা। আজ তার মূল্যবোধের বিনষ্টি ঘটেছে। সেখানে নাগরিক জীবনের বহিরঙ্গ বিলাস। উৎসবগুলোও তাই নিষ্প্রাণ। শুধু মণ্ডপসজ্জা, আড়ম্বর প্রতিযোগিতা। তবু উৎসব আসে। উৎসব শেষ হয়। এই কৃত্রিমতার দিনেও উৎসব আমাদের কাছে ক্ষণিকের আনন্দ। সমস্যা-জর্জর জীবনে উৎসব একমুঠো মুক্তির বাতাস । ‘আমাদের উৎসবে ভাবেরই প্রাধান্য—বাহিরের সমারোহ তার প্রধান অঙ্গ নহে।’
📝 অনুসরণে লেখা যায়
১. বাঙালীর বার মাসে তের পার্বণ
২. সমাজে উৎসবের ভূমিকা
৩. বাংলার পূজা-পার্বণ