রচনা–সংকেত: ১. ভূমিকা; ২. কবি পরিচিতি; ৩. কবির রচনা বৈশিষ্ট্য; ৪. উপসংহার ।
আমার প্রিয় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১. ভূমিকা: আমাদের বাড়িতে বাবা এবং মা দুজনেই কবিতার ভক্ত। ছেলেবেলায় মা সুকুমার রায়ের ছড়া সুরেলা কণ্ঠে আবৃত্তি করে শোনাতেন। বাবাও ভারী গম্ভীর স্বরে আবৃত্তি করতেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সুকান্ত, আল মাহমুদ প্রমুখ কবির কবিতা । শব্দের অর্থ বুঝতাম না । ছন্দও আমার জানা নেই । তবু ওই কণ্ঠস্বর আমাকে আনমনা করত । কবিতা আমাকে নিয়ে যেত অন্য এক জগতে । সেই থেকেই আমার কবিতাপ্রীতি । বাবার প্রিয় কবি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । মায়ের গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী । আমার প্রিয় কবি কিন্তু বাবা-মায়ের প্রিয় কবিদের কেউ নন । আমার চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে মা-বাবার বিরাট প্রভাব থাকলেও কবি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি কিন্তু স্বাধীন মনের অধিকারী । আমার প্রিয় কবি চল্লিশ দশকের বিখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ।
২. কবি পরিচিতি: নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জন্মকাল — ১৯২৪ । পেশা সাংবাদিকতা । তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’ তাঁকে খ্যাতি এনে দেয় । তারপর বহু কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন । এখনও লেখা অব্যাহত । তার মধ্যে ‘নীরক্ত করবী’, ‘অন্ধকার বারান্দা’, ‘প্রথম নায়ক’, ‘নক্ষত্র জয়ের জন্য’, ‘কলকাতার যীশু’, ‘উলঙ্গ রাজা’, ‘আজ সকালে’, ‘খোলা মুঠি’ প্রধান । লিখেছেন একটি স্মরণীয় উপন্যাস । কবিতার ছন্দ নিয়েও একটি উল্লেখযোগ্য বই লিখেছেন । চল্লিশের কবিদের মধ্যে একমাত্র তিনিই নিয়ত সৃষ্টিশীল । আজও আশির দশকে তিনি একের পর এক চমকপ্রদ সব কবিতা লিখে চলেছেন । আমরা জানি, কবিতার কলম সবার হাতে শোভা পায় না। একথাও জানি, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ নীরেন্দ্রনাথ সম্বন্ধে খোলা গলায়, নির্দ্বিধায় বলা চলে, তিনি সব অর্থে আপাদমস্তক একজন কবি । বয়স আজও তাঁর হাত থেকে কলমের সক্রিয়তা কেড়ে নিতে পারেনি । জীবন এবং জগৎ, মানুষ এবং প্রকৃতি, স্বপ্ন এবং বাস্তব কবি নীরেন্দ্রনাথ অন্তর দিয়ে অনুভব করেছেন । আলো, নদী, ফুল, পাখি, শিশু, রৌদ্র, বৃষ্টি সবকিছুই তাঁর কবিতায় কথা বলে ওঠে । পৃথিবীর রহস্যময় সৌন্দর্যকে তিনি ভালোবাসেন । সেই সৌন্দর্যের গভীর দেশে ডুবে থাকেন । তারপর একসময় সৌন্দর্যের তন্ময়তা ভেঙে তিনি আমাদের এই গরীব দেশের কান্নার ফোটাগুলো তুলে আনেন কবিতার চরণে । তিনি একদিকে স্বভাব কবি, অন্যদিকে স্বাভাবিক কবি । জ্ঞানের সঙ্গে আবেগ মিশিয়ে তিনি কবিতার শরীর নির্মাণ করেন । কিন্তু তাঁর কবিতা কখনোই তত্ত্ব কথা বা জ্ঞানের কথা নয় । প্রকৃতি থেকে মানব, মানব থেকে রহস্যময় বেদনা, বেদনা থেকে বিশ্বের হৃৎপিণ্ডে হাত রাখবার ক্ষমতা তাঁর আছে বলেই তিনি মানবতাবাদী কবি ।
৩. কবির রচনা বৈশিষ্ট্য: অত্যন্ত দুরুহ কথাকে, অত্যন্ত জটিল তত্ত্বকে সহজ সরলভাবে প্রকাশ করেন কবি নীরেন্দ্রনাথ । তাঁর কবিতা পড়তে হলে বা তাঁর কবিতার রস আস্বাদন করতে হলে আমাদের কোন অভিধান প্রয়োজন হয় না । মধুসূদনের কাব্য তৎসম শব্দসম্ভারে জটিল বলে তা আমার মনে রসের আবেদন সৃষ্টি করতে পারে না । জীবনানন্দ বড় কবি । কিন্তু দুরুহ মন এবং মনন । নীরেন্দ্রনাথ সেক্ষেত্রে ভাবের দিক থেকে সহজ । তাঁর চিত্রকল্প বা প্রতীক ব্যবহার বোঝা খুব একটা শক্ত নয় । আমার মনের সঙ্গে তাঁর কবিতার একটা যোগ খুঁজে পাই । তাঁর কবিতার তির্যক ভাষণ আমার হৃদয়কে স্পর্শ করে। যেমন,
১. ‘যাও পাখি, তাকে বোলো যে, আমার ঘর
এখনও অন্ধকারে
মূর্ছিত হয়ে আছে, শুধু সেই পারে
শোনাতে আলোর স্বর ।
বোলো, আমি তার জন্য আলোর ঘর
বানাব অন্ধকারে ।’ (যাও পাখি)
২. ‘দুদিকে উদ্যত মৃত্যু, তুমি তার মাঝখান দিয়ে
টলতে টলতে হেঁটে যাও ।
যেন মূর্ত মানবতা, সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে
সমগ্র বিশ্বকে তুমি পেতে চাও
হাতের মুঠোয় ।
ভিখারী-মায়ের শিশু
কলকাতার যীশু
সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্র বলে থামিয়ে দিয়েছ ।’ (কলকাতার বীশু)
—এইসব কবিতা পড়তে পড়তে একটি আশ্চর্য পরম উপলব্ধিতে মন ভরে যায় । অথচ মন কেমন করে ওঠে । কি একটা অতৃপ্তি ভেতরে ভেতরে জেগে ওঠে । কিংবা যখন কবি বলেন :
——তুমি মৌন ছলোছলো
কালো মেঘ সন্ধ্যার আকাশে
যে মেঘ পৃথিবী থেকে ঢের দূরে গিয়েও আবার
অশ্রুর আবেগে ফিরে আসে।’ (উন্মোচন)
৪. উপসংহার: —তখন আমি স্তব্ধ হয়ে যাই । আমার চোখের সামনে ভাসতে থাকে একটা কালো মেঘ, সন্ধ্যার আকাশ, মৌন ছলোছলো অচেনা পৃথিবী । মনে মনে প্রশ্ন করি, কে কাঁদছে আকাশজুড়ে এমন করে ? কে ? সে কে ? উত্তর পাই না । নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এভাবেই এক সময় আমার হৃদয় রাজ্য অধিকার করে নেন। প্রিয় কবির সিংহাসনে দেখি তিনি বসে আছেন । বাংলা কাব্যের ইতিহাসে বহু স্মরণীয় কবির আবির্ভাব ঘটেছে। ভবিষ্যতেও ঘটবে । রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মোহিতলাল, যতীন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুকান্ত প্রমুখ বরেণ্য কবিদের প্রত্যেকেই আমার নমস্য, শ্রদ্ধেয় । কিন্তু আমার কচি মনের মণিকোঠায় নীরেন্দ্রনাথ—নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্মরণীয়। চিরস্মরণীয় । তাঁর ছন্দ-স্বাতন্ত্র্য, শব্দ ব্যবহারের নিজত্ব আমাকে অভিভূত করে । প্রতীক ও চিত্রকল্প ব্যবহারে তাঁর কুশলতা আমাকে মুগ্ধ করে ।
📝 অনুসরণে লেখা যায়
১. একজন আধুনিক কবি
২. বাংলা কবিতায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর স্থান