রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ; ২. জন্ম ও শিক্ষা; ৩. সাহিত্য সাধনা ; ৪. সমাজ ও স্বদেশ; ৫. সংগঠকের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ; ৬. উপসংহার।
কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ
১. ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথ এক বিস্ময়কর প্রতিভা। খন্ডকালের হয়েও তিনি সর্বকালের। বিশেষ দেশের হয়েও সব দেশেই তাঁর সাদর-প্রতিষ্ঠা। তিনি দেশ ও জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তিনি ভাষাসাধক, কবিশ্রেষ্ঠ। তিনি চিন্তাবিদ, দার্শনিক। তিনি মনুষ্যত্বের চির-উন্নত শির। ভারত-আত্মার বিগ্রহ। অন্যায়ের বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। তিনি সুপ্তিমগ্ন জাতির স্বপ্নভঙ্গের গান। প্রতিভার এমন সর্বতোমুখিতা, এমন গভীরতা, এমন ব্যাপ্তি যথার্থ বিস্ময়কর। রবীন্দ্রনাথ আমাদের অহঙ্কার, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের প্রেরণা, আমাদের সমৃদ্ধি।
২. জন্ম ও শিক্ষা: বঙ্গাব্দ ১২৬৮-র ২৫শে বৈশাখ। ইংরেজী ১৮৬১-র ৭ই মে। জোড়াসাকোঁ ঠাকুর পরিবার। সেই বিখ্যাত পরিবারে জন্ম নিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভা। সেই প্রতিভার নাম রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুর পরিবারের স্বাতন্ত্র্য-উজ্জ্বল পরিবেশেই শুরু হলো ভাবিকালের কবি সার্বভৌমের বিদ্যাচর্চা। ছ’বছর বয়সে তিনি ভর্তি হলেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে। পঠন-পাঠনে ছিল যান্ত্রিকতা। পরিবেশে ছিল নিষ্প্রাণ গতানুগতিকতা। শিশুমন ক্ষুব্ধ হলো। তারপর চলল স্কুল ছাড়া আর ভর্তি হওয়ার পালা। ওরিয়েন্টাল সেমিনারি থেকে নর্মাল স্কুল। সেখান থেকে বেঙ্গল একাডেমি। এ-সময় তাঁর উপনয়ন হয়। পিতার সঙ্গে তাঁর বোলপুর যাত্রা। সেখান থেকে ডালহৌসি পাহাড়। প্রকৃতিকে খুব কাছে থেকে দেখলেন। মুগ্ধ হলেন। এ-সময় মহর্ষি আকাশের গ্রহতারা দেখিয়ে পুত্রকে সৌরলোক সম্বন্ধে শিক্ষা দিতেন। হিমালয় থেকে ফিরে আবার সেই বেঙ্গল একাডেমি। সেখান থেকে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল। এবার প্রবাসের হাতছানি। ১৮৭৮-এর সেপ্টেম্বরে পাড়ি দিলেন বিলেতে। সেখানে প্রথমে পাবলিক স্কুল, পরে লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়। দেড় বছর পরে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন।
৩. সাহিত্য সাধনা: ঠাকুর পরিবারের সৃজনশীল পরিমণ্ডলেই রবীন্দ্রনাথের কাব্যচর্চার শুরু। বড়রা তাকে উৎসাহ দিতেন। নতুন বউঠান কাদম্বরী দেবী তাঁকে দিতেন প্রেরণা। তেরো বছর বয়সে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় বেরোলো তাঁর প্রথম কবিতা। তেরো থেকে আঠারো পর্যন্ত রচিত কবিতাসম্ভার নিয়ে প্রকাশিত হলো ‘শৈশব সঙ্গীত’। ষোল-সতেরতে লিখলেন ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’। এ ছিল উত্তরকালের কবিশ্রেষ্ঠের প্রস্তুতি-পর্ব। এবার তাঁর সাহিত্য-সাধনার নব পর্যায়। সৃষ্টি প্রাচুর্যে ভরে উঠল তাঁর কাব্যের ‘সোনার তরী। প্রেম-প্রকৃতি-সৌন্দর্য-স্বদেশকে ঘিরে কবি-ভাবনা হলো উচ্ছ্বসিত, হলো বাঁধনহারা। এর পর এক মহৎ প্রতিভার দীর্ঘ পথ-পরিক্রমা। তাঁর প্রতিভার ছোঁয়া পেয়ে বাংলা সাহিত্যের সব বিভাগই সৃষ্টিমুখর হলো। বৈভবে, প্রাচুর্যে উপচে পড়ল তার ভাণ্ডার। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্যে পেলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সম্মান ‘নোবেল পুরস্কার’। সময় ১৯১৩। কবি-বন্দনায় মেতে উঠল বিশ্বের মানুষ। কথা ও সুরের সমন্বয়ে সঙ্গীতেও রবীন্দ্রনাথ এক বিরল ব্যক্তিত্ব।
৪. সমাজ ও স্বদেশ: নিরুদ্দেশ সৌন্দর্যের পথে পথেই যে কবির নিরন্তর পরিক্রমা, তা নয়। সমকালীন বহু ঘটনাই তাঁর মনে ঝড় তুলেছে। রুখে দাঁড়িয়েছেন প্রবলের উদ্ধত, মত্ত বর্বরতার বিরুদ্ধে। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না। তবু মূঢ়-ম্লান-মূক-নতশির মানুষের মুখে প্রতিবাদের ভাষা দিয়েছেন। দিয়েছেন জাতির কণ্ঠে গণসঙ্গীত। অনুপ্রাণিত করেছেন যথার্থ দেশপ্রেমে। মানুষের সুখ-দুঃখের শরিক হয়েছেন। জালিয়ানওয়ালাবাগে ইংরেজের পাশব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছেন। পরিত্যাগ করেছেন ইংরেজের দেওয়া রাজকীয় খেতাব। সোচ্চার হয়েছেন বাংলার তরুণ বিপ্লবীদের ওপর ইংরেজের চণ্ডনীতির বিরুদ্ধে। সমকালীন অনেক রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপই তিনি সমর্থন করেননি। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উপলব্ধির গভীরতা, দূরদর্শিতার অনেক অভ্রান্ত স্বাক্ষর রেখে গেছেন বহু রচনায় ।
৫. সংগঠকের ভূমিকায়: শুধু কবিশ্রেষ্ঠই নন, সাংগঠনিক কাজেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সমান দক্ষ। শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে তিনি আদর্শ শিক্ষাবিদ। প্রকৃতির পাঠশালাতেই তিনি ছাত্রদের ডাক দিলেন। যান্ত্রিক রবীন্দ্রনাথ নিরানন্দ শিক্ষার হাত থেকে শিক্ষার্থী মুক্তি পাবে, এই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। কালক্রমে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হলো ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’। এ যেন নবজীবন সাধনারই এক তপোবন। শান্তিনিকেতন হলো সব দেশের মানুষের, সব দেশের ভাব-বিনিময়ের এক মহাতীর্থ। বিশ্বভারতীর অনতিদূরে তিনি গড়ে তুললেন ‘শ্রীনিকেতন’।
৬. উপসংহার: অবশেষে রবি-জীবনে এলো শেষযাত্রার বিষাদ মুহূর্ত। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ। ইং ৭ই আগস্ট, ১৯৪১ সাল। সেদিনও ছিল ঘনঘোর বাদলের দিন। এই মহাজীবন মরলোক ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু দেশ ও জাতির কাছে রেখে গেলেন অফুরান ঐশ্বর্যের খনি। রেখে গেছেন মহৎ উত্তরাধিকার। তিনি মহাকবি বাল্মীকি-বেদব্যাস-কালিদাসের সার্থক উত্তরসূরি। তিনি ছিলেন মানবতার সাধক। ছিলেন দুঃখী-অবমানিতের পরম হিতৈষী। তিনি আধুনিক ভারতের নব তীর্থভূমি। এই তীর্থে এসেই জানা যায় ভারতকে।
📝 অনুসরণে লেখা যায়
- তোমার প্রিয় কবি
- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ
- নানা রবীন্দ্রনাথের একটি মালা
পরীক্ষার প্রস্তুতি: প্রতিটি বিষয়ের জন্য ভূমিকা, মূল আলোচনা এবং উপসংহার আলাদা করে অনুশীলন করো। প্রশ্নের সঙ্গে মিলিয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহার করো।