রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা; ২. জন্ম ও শিক্ষাজীবন; ৩. কর্মজীবন; ৪. নিরুদ্দেশ ও আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক ৫. নেতাজীর আহ্বান ও যুদ্ধ ঘোষণা; ৬. উপসংহার।
নেতাজী সুভাষচন্দ্ৰ
১. ভূমিকা: সুভাষচন্দ্র ছিলেন ভারতের মুক্তির অগ্রদূত। ছিলেন স্বাধীনতার জ্বলন্ত মশাল। তিনি দুর্গম পথের অভিযাত্রী। দুঃসাধ্যের সাধক। ভারতবাসীর চিরপ্রিয়, চিরবাঞ্ছিত মহান নেতা। কোন পার্থিব ভোগসুখই তাঁকে ব্রতভ্রষ্ট করতে পারেনি। পারেনি প্রবল পরাক্রান্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই নির্ভীক-প্রাণ বিপ্লবীর কণ্ঠরোধ করতে।
২. জন্ম ও শিক্ষাজীবন: ১৮৯৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি। উড়িষ্যার কটক শহর। জন্ম নিলেন পরাধীন ভারত জননীর এক রাজদ্রোহী অগ্নি-শিশু। সুভাষচন্দ্র তাঁর নাম। পিতা জানকীনাথ বসু। মাতা প্রভাবতী দেবী। কটকের এক মিশনারি স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু। সেখান থেকে র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুল। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার। কলকাতায় আগমন। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি। বিবেকানন্দের উদাত্ত আহ্বান। মনে বৈরাগ্যের রঙ। গৃহত্যাগ। তীর্থে তীর্থে পরিভ্রমণ। প্রত্যাবর্তন। আই. এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। দর্শনশাস্ত্রে অনার্স নিয়ে আবার প্রেসিডেন্সি কলেজ। অধ্যাপক ওটেনের ভারত-বিরোধী অশালীন উক্তির তীব্র প্রতিবাদ। কলেজ থেকে বহিষ্কার। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি। বি. এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার। ১৯১৯ সাল। এর পর আই. সি. এস. পরীক্ষার জন্য ইংলন্ড যাত্রা। আই. সি. এস. পরীক্ষায় তাঁর চতুর্থ স্থান অধিকার। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রাইপোজ নিয়ে বি. এ. পাস। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন। সরকারী চাকুরির নানা প্রলোভন। ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান। দেশবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধারূপে শুরু হলো মুক্তি-সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায়।
৩. কর্মজীবন: সুভাষচন্দ্রের কর্মজীবন নানা ঘটনার তরঙ্গমালায় পরিপূর্ণ। দেশবন্ধুর নির্দেশে তিনি জাতীয় মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হলেন। দায়িত্ব নিলেন পৌর নিগমের মুখ্য কার্যনির্বাহকের পদের। পরে তার প্রধান কর্মকর্তা। ১৯২১ সালের ১০ই ডিসেম্বর। বরেণ্য নেতাদের সঙ্গে কারাবরণ করলেন। ১৯২২-এ উত্তরবঙ্গের ভয়ঙ্কর বন্যায় ছুটলেন আর্তের সেবায়। দেশবন্ধুর ‘স্বরাজ্যদল’ গঠনের তিনি অক্লান্ত কর্মী। দেশবন্ধু-প্রতিষ্ঠিত ‘ফরোয়ার্ড’ পত্রিকার তিনি প্রচার-সচিব। তাঁর ওপর তখন ইংরেজের রোষদৃষ্টি। পরিণামে কারাবরণ। ইংরেজের কারাগৃহের অন্ধকারেই এই রাজদ্রোহী নায়কের জীবনের সিংহভাগ কেটেছিল। ১৯২৭ সালে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত। স্বাস্থ্যের ক্রম অবনতি। পরে ভিয়েনার স্বাস্থ্য-নিবাসে ভর্তি। এরপর আরও কয়েকবার যাওয়া-আসা, প্রতিবাদ, কারাবরণের পুনরাবৃত্তি। এরই মধ্যে কংগ্রেসের সভাপতি, গান্ধীজী প্রমুখ নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধ ও কংগ্রেস ত্যাগ।
৪. নিরুদ্দেশ ও আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক: পশ্চিম দিগন্তে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো ছায়া। ১৯৪০-এ আবার কারাজীবন। পরে মুক্তিলাভ। স্বাস্থ্যের অবনতির জন্যে স্বগৃহে অন্তরীণ। ‘নির্জনবাস’। ১৯৪১-এর ১৬ই জানুয়ারি তিনি নিরুদ্দেশ হলেন। প্রথমে কাবুল। পরে রাশিয়া-বার্লিন-জাপান হয়ে সিঙ্গাপুর। ১৯৪১-এর ডিসেম্বরে গোপনে চালু হলো ‘আজাদ-হিন্দ বেতার কেন্দ্র’। গড়ে উঠল ‘আজাদ হিন্দ সঙ্ঘ’। ১৯৪২-এর ১৫ই ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের পতন। ক্যাপ্টেন মোহন সিং-এর হাতে জাপান সরকারের বন্দী ভারতীয়দের দায়িত্ব অর্পণ। স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য একটি কার্যকরী সমিতি গঠন। সভাপতি বিপ্লবী রাসবিহারী বসু। মোহন সিং সামরিক অধ্যক্ষ। রাসবিহারীর সঙ্গে মতবিরোধ। বন্দী হলেন মোহন সিং। সুভাষচন্দ্র টোকিও পৌঁছলেন ১৯৪৩-এর ১০ই জুন। ২৫শে আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি হলেন এর সর্বাধিনায়ক। হলেন সবার প্রিয় নেতাজী।
৫. নেতাজীর আহ্বান ও যুদ্ধ ঘোষণা: ১৯৪৪-এর ৪ঠা ফেব্রুয়ারি। রেঙ্গুন থেকে শুরু হলো আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান। তিনি আবেগদীপ্ত কন্ঠে বললেন, ‘ঐ নদীর ওপারে অরণ্য পর্বত শেষে আমাদের চিরবাঞ্ছিত দেশ, আমাদের পবিত্র জন্মভুমি। শোন, ভারতবর্ষ আমদের ডাকছে। ভারতের রাজধানী দিল্লী আমাদের ডাকছে, আত্মীয় ডাকছে আত্মীয়কে। ওঠ, আর সময় নেই। অস্ত্র ধর’। ভারত সীমান্তের সবচেয়ে কাছের ব্রিটিশ ঘাঁটি মোডক। মেজর রাতুরি আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শত্রু সৈন্য পিছু হটল। ভারতের মাটি স্পর্শ করল আজাদ হিন্দ বাহিনী। ভারতের মাটিতে উড়ল প্রথম জাতীয় পতাকা। তার পরের ইতিহাস বেদনার ইতিহাস। ইংরেজ ব্রহ্মদেশ দখল করল। জাপানের আত্মসমর্পণ। প্রকৃতির প্রতিকূলতা। পরাজয় এসে তাঁর স্বপ্ন কেড়ে নিল। জাপানী বিমানে তিনি যাত্রা করলেন। আজও সে চলার শেষ হলো না।
৬. উপসংহার: কিন্তু স্বদেশবাসী আজও এই মরণজয়ী বীরের মৃত্যু বিশ্বাস করে না। পৃথিবীর এমন কোন শক্তি নেই যারা তাঁকে পরাভূত করে। এমন কোন বন্দীশালা নেই যেখানে তাঁকে বন্দী রাখা যায়। আজও অগণিত ভারতবাসীর শ্রদ্ধার আসনে তিনি প্রতিষ্ঠিত। ‘মুক্তি পথের হে অগ্রদূত! পরাধীন দেশের হে রাজদ্রোহী! তোমাকে শতকোটি প্রণাম।”