রচনা–সংকেত: ১ . ভূমিকা ; ২ : সমাজমুখী কর্মধারা; ৩ নিরক্ষরতা দূরীকরণ ; ৪. অসহায়ের বন্ধু; ৫. অন্যায়ের প্রতিবাদ ; ৬ উপসংহার ।
জনকল্যাণ ও ছাত্রসমাজ
১. ভূমিকা: জীবনের যে পর্বটা স্কুল-কলেজে নির্দিষ্ট পঠন-পাঠনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে তারই নাম ছাত্রজীবন । সংসারের মালিন্য তাদের ছুঁতে পারে না। সাংসারিক ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা তাদের দরিদ্র করে না । তাদের চোখে স্বপ্ন । বুক উষ্ণ আবেগে থরো থরো । মন কেবলই অজানাকে জানার জন্যে ছটফট করে। তারা দূর্বার প্রাণশক্তিতে ভরপুর । দুর্জয় পথের পথিক। তারা দুঃসাধ্যের সাধক। সমাজকে তারা নতুন করে গড়তে চায় । কুসংস্কারের অচলায়তনকে ভাঙতে চায় । সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততার বিরুদ্ধে তাদের বলিষ্ঠ প্রতিবাদ । নানা গঠনমূলক কাজে তারা নিজেদের উজাড় করে দেয় । দেশের স্বাধীনতার জন্যে তারা প্রাণ উৎসর্গ করে। দেশের অগ্রগতির তারাই প্রধান হাতিয়ার। জাতির দুর্দিনে ছাত্ররাই নির্ভীক সৈনিক । যেখানে অন্যায় অবিচার, যেখানে শোষণ নির্যাতন সেখানে তারা বিদ্রোহী । মানুষ যেখানে পীড়িত, অসহায় সেখানে তারা পরম সুহৃদ।
২. সমাজমুখী কর্মধারা: মানুষ সামাজিক জীব । সমাজের ভালমন্দের সঙ্গেই মানুষের ভালমন্দ । যে কাজ জনগণ তথা সমাজের পক্ষে হিতকর নয়, সে কাজ বর্জনীয়। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠিস্বার্থ আরও বড় । আত্মপরতা সমাজ-অগ্রগতির প্রতিবন্ধক । সেই অন্তরায় দূর করার জন্যে, সমাজের সামগ্রিক উন্নতির জন্যে যে কর্মপ্রবাহ, তারই মধ্যে মানুষের সত্যিকার পরিচয়। মানুষ যদি সমাজবিমুখ, স্বার্থমগ্ন হয় তবে তার বেঁচে থাকা অর্থহীন । মানুষের জীবন তখন যথার্থ হয়ে ওঠে, যখন পরহিতে নিজেকে বিলিয়ে দেয় । ছাত্রজীবন শুধু পঠন-পাঠনের মধ্যেই সীমিত থাকা নয় । সমাজভাবনা থেকে দূরে থাকাও তার কাম্য নয়। জনকল্যাণমুখী কর্মধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েই পঠন-পাঠন সম্পূর্ণ, যথার্থ হয় । নিরক্ষরতার অভিশাপে কত জীবন পঙ্গু । দারিদ্র্যের দুঃসহ পীড়নে কত জীবন বেদনা-নীল । গণমুখী কর্মধারায় সেই অভিশাপ মোচনেরই অঙ্গীকার । বেদনা অপসারণের মহান ব্রত । এই সমাজ কল্যাণ যজ্ঞে ছাত্রদেরও এক গৌরবময় ভূমিকা থাকা বাঞ্ছনীয় ।
৩. নিরক্ষরতা দূরীকরণ: নিরক্ষরতা মানুষের জীবনে এক অভিশাপ। সেই অভিশাপ দেশ ও জাতির এক অনপনেয় কলঙ্ক । অজ্ঞতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কুসংস্কার এসে ঘিরে ধরে । অগ্রগতি ব্যাহত হয় । এভাবেই মানুষ যুগে যুগে ম্লানমুখ, নতশির। শিক্ষার ছোঁয়াতেই মানুষ আবার জেগে ওঠে। তার চারপাশের জমাট অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যায়। নতুন চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয় । মানুষে মানুষে ব্যবধান ঘুচে যায়। পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। মনের যোগাযোগের রাস্তা তৈরি হয়। ঐক্যসূত্রে গ্রথিত হয় মানুষ । সেই শিক্ষা সম্প্রসারণে ছাত্রদেরও এক বড় ভূমিকা আছে। আজ দেশ জুড়ে নিরক্ষরতার অন্ধকার অপসারণের জোয়ার এসেছে। সেখানে ছাত্রসমাজ এগিয়ে আসবে । সাক্ষরতার অভিযানে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য । তারা পাড়ায় পাড়ায় সংগঠন গড়ে তুলবে । নিরক্ষর বয়স্ক মানুষদের উৎসাহিত করবে। শিক্ষায় অনাগ্রহীদের মধ্যে আগ্রহের সঞ্চার করবে । নিজেদের পঠন-পাঠনের সময় বাঁচিয়ে তারা এদের জন্যে কিছু সময় ব্যয় করবে । এদের অক্ষরদান সম্পন্ন করে তোলার মধ্যে তারাও শিক্ষার এক নতুন অর্থ খুঁজে পাবে । খুঁজে পাবে সামাজিক মানুষ হয়ে ওঠার এক পথ । এতে তাদেরও হৃদয় প্রসারিত হবে । কল্যাণমুখী কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারাও জীবনের আরও এক গভীর অর্থ খুঁজে পাবে । শিক্ষায় যুক্ত হবে এক নতুন মাত্রা।
৪. অসহায়ের বন্ধু: শুধু নিরক্ষরতা দূর করা নয়। দুর্বার প্রাণশক্তির আধার এই ছাত্রসমাজ অসহায়, দুর্গত মানুষের পরম আশ্রয়, বন্ধু । মানুষই শুধু মানুষের দুঃখ টেনে আনে না । প্রকৃতিও মানুষের জীবনকে নানাভাবে বিপন্ন করে তোলে । বন্যা-ভূমিকম্প-ঝড় এসবই প্রকৃতির রুদ্ররোষ । বন্যা ঘর ভাসায় । ভূমিকম্প জনজীবন বিধ্বস্ত করে । ঝড় সব এলোমেলো করে দেয় । মানুষ তখন অসহায় । সেই দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ছাত্রসমাজ দুঃখ লাঘবের চেষ্টা করে । ত্রাণের কাজে তারাও অংশ নেয় । আর্তের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করে । তাদের রক্তে তারুণ্যের জোয়ার । জীবনের মায়া করে না। তারা । এভাবেই ছাত্রসমাজ এক দুর্লভ মানবিক ঐশ্বর্যে নিজেদের ঋদ্ধ করে তোলে । এতে মনের প্রসারতা ঘটে। এক মহৎ সমাজ মানসিকতা তৈরি হয়।
৫. অন্যায়ের প্রতিবাদ: যুগ যুগ ধরে সমাজের বুকে জমে ওঠে নানা অন্যায় অবিচার । কত শোষণ আর অত্যাচারে জর্জরিত হয়েছে সাধারণের জীবন । আজও হয়। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বলে ওঠে। কত জীবন সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কত অকারণ রক্তের হোলিখেলায় মেতেছে মানুষ । প্রতিহিংসায় কত জীবন শেষ হয়ে গেছে । তবু মানুষের এই লাঞ্ছনার ইতিহাস শেষ হলো না । জীবনহরণের ছলনার সমাপ্তি ঘটল না । এখনও বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে । ছাত্রসমাজ এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। প্রতিরোধ গড়ে তোলে । সমাজ-জীবনকে যারা প্রতিনিয়ত ভেজালে, নেশায়, হঠকারিতায় পঙ্গু, হীনবল করছে ছাত্রসমাজ সেখানে প্রবল প্রতিবাদ । দেশের স্বাধীনতার জন্যে তারা জীবন উৎসর্গ করে । ছাত্ররা কোন সঙ্কীর্ণতা, ক্ষুদ্রতাকে প্রশ্রয় দেয় না । মনুষ্যত্বের দীক্ষাই তাদের কাছে বড় দীক্ষা । মানুষের জন্যই সমাজ । সমাজের জন্যে মানুষ নয় । ছাত্ররা সেই সমাজকেই সুন্দর, সুস্থ করার জন্যে সংগ্রাম করে । রক্ত ঝরায় । নতুন পৃথিবী তাদের কাছে বার্তা পাঠায় । সেই নতুন স্বপ্নের পৃথিবী গড়ার তারা সংগ্রামী যোদ্ধা । জনকল্যাণ-কর্ম-ধারায় এও এক নতুন দিগন্ত ।
৬. উপসংহার: ছাত্র মানে শুধু পঠন-পাঠন নয় । প্রতিযোগিতা, স্বার্থপরতাও নয় । ছাত্র মানে শুধু জ্ঞানভিক্ষ হওয়া নয় । শুধু পরীক্ষায় কৃতিত্বের পরিচয় দেওয়া নয় । ডিগ্রী পাওয়াটাও তার জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য নয় । ছাত্র মানে সহানুভূতি, মমতা দিয়ে নিজেকে তৈরি করা । সমাজমুখী চিন্তাধারার শরিক হওয়া । ছাত্র মানে অন্যায়ের প্রতিবাদ । আর্তের বন্ধু । ছাত্র মানে সুস্থ, শোষণমুক্ত সমাজগঠনের সংগ্রামী সৈনিক । মহৎ কর্মে জীবন আহুতির জ্বলন্ত নজির। ছাত্র মানে মনুষ্যত্বের জাগরণ। আর এই জাগরণ সামাজিক মঙ্গলকর্মের ভেতর দিয়েই সম্ভব। এর বোধন মন্ত্রেই তাদের জীবন পূর্ণ ও সার্থক হয়ে ওঠে।