রচনা সংকেত : ১. ভূমিকা ২. বিজ্ঞান ও মানব জীবন ৩ প্রতাহিক জীবন বিজ্ঞান, ৪. বিজ্ঞানের অপকারিতা ও উপসংহার।
প্রতিদিনের জীবনে বিজ্ঞান
১. ভূমিকা: সভ্যতার সেই ধূসর দিনে মানুষ একদিন বিস্ময়ের চোখে চারপাশের রহস্যময় জীবনের দিকে চেয়ে থাকত। সেদিন প্রকৃতির খেয়ালখুশিতেই নিয়ন্ত্রিত হতো তার জীবন। কিন্তু তার সেই অসহায় নিরুপায় জীবন ভালো লাগল না। সে চাইল সেই রহস্য ভেদ করতে। প্রকৃতির রুদ্ররোষকে জয় করতে চাইল। চাইল তার স্বপ্ন ও সাধকে সফল করে তুলতে। শুরু হলো তার নতুন শক্তিসাধনা। অবশেষে সে পেল জলে-স্থলে-মহাশূন্যে আধিপত্য বিস্তারের ছাড়পত্র। আর বিজ্ঞানই হলো সেই ছাড়পত্র। তার সাধনার সিদ্ধি।
২. বিজ্ঞান ও মানব জীবন: বিজ্ঞান এমন এক জ্ঞান যা পরীক্ষা, প্রমাণ, যুক্তি আর অভিজ্ঞতা দিয়ে পাওয়া যায়। এই শক্তি দিয়েই সে প্রকৃতির ঔদ্ধতাকে বশ মানিয়েছে। একে প্রয়োগ করেছে নিজের প্রয়োজনে। ও মানুষের অন্তজীবন বহিজীবনকে রাঙিয়েছে নানা রঙে। নিশীথ-অন্ধকার যুগ যুগ ধরে শিশুমনে ছড়িয়ে দিত ভূত-পেত্নীর ভয়, বিদ্যুতের দীপ্তি তাকেই দিয়েছে ভূত-ভয় জয়ের সাহস। রোগজর্জর মানুষ একদিন রোগ-মুক্তির আশায় ধরনা দিত অন্ধদেবতার দুয়ারে। ছুটে যেত অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ওঝার কাছে। বিজ্ঞান আজ তার হাতে তুলে দিয়েছে জীবনদায়ী ওষুধ। বিজ্ঞানের জীবনকাঠির ছোয়াতেই উষর ভূমি হয়েছে উর্বর। বন্ধ্যা ভূমি হয়েছে কৃষি-সম্ভব। বিজ্ঞানই রুক্ষ প্রান্তরকে সাজিয়েছে সবুজের সমারোহে। উচ্ছল নদীতরঙ্গকে সে করেছে সেতুবন্দী। সমুদ্রের বুক থেকে তুলে এনেছে হাজারো মণিমুক্তা। পাতাল খুঁড়ে এনেছে রাশি রাশি সম্পদ।
৩. প্রাতাহিক জীবনে বিজ্ঞান: বিজ্ঞানেই আধুনিক জীবনের চরম উৎকর্ষ, অফুরন্ত ঐশ্বর্যবিলাস। ভোরের ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্র দুনিয়ার অসংখ্য খবরের বোঝা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। বেতারে শোনা যায় দেশ-বিদেশের বার্তা। দুরদর্শনের পর্দায় ভেসে ওঠে দূর-দূরান্তের ছবি। ঘরে-বাইরে আমাদের প্রতিটি কাজের সঙ্গেই বিজ্ঞানের আজ অচ্ছেদ্য বন্ধন। তার অকৃপণ দাক্ষিণ্যেই আমাদের জীবন সুন্দর, সার্থক। সামান্য তালভঙ্গ হলেই টের পাই প্রতিদিনের জীবনে তার ভূমিকা কত গভীর ও ব্যাপক। কর্মব্যস্ততার মুহূর্তে দূরভাষের সাহায্যে ঘরে বসেই আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় কাজ সারি। শীততাপ কোন বিলাসী প্রেক্ষাগৃহে রঙিন ছায়াছবি দেখে ক্লান্তি দূর করি। অবসাদ বিনোদনের আরও কত না আয়োজন! প্রিয় মুখকে যেমন ধরে রাখি সেলুলয়েডের স্বচ্ছ আধারে, তেমনি প্রিয় কণ্ঠকে বেঁধে রাখি টেপের অদৃশ্য রেখাতরঙ্গে। দ্রুততম কোন যানে চড়ে উড়ে যেতে পারি হাজার হাজার মাইল দূরের আত্মীয়ের কাছে। যানবাহন আজ আমাদের জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী। এরই জন্যে ‘দূর’ হয়েছে ‘নিকট। আমাদের জীবন আজ একান্তই বিজ্ঞান-নির্ভর। মুক্ত হাওয়ার বদলে বাতানুকূল ঘরের টান আমাদের কাছে আরও বেশী। কালি-কলম-কাগজ-মুদ্রণের নেপথ্যেও রয়েছে বিজ্ঞানের উদ্ভাবনী শক্তির নানা ইতিহাস। পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘরবাড়ি, পথঘাট, ওষুধপত্র, কৃষিজ-খনিজ-কলকারখানার ভোগ্যপণ্য, সবই তো বিজ্ঞানের প্রযুক্তিবিদারে ফসল। বিজ্ঞানই আজ নানাভাবে আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমাদের জন্মে বিজ্ঞান, মৃত্যুতে বিজ্ঞান। শ্বাস-প্রশ্বাসের মত প্রতি মুহূর্তেই আমাদের জীবনে তার অস্তিত্ব। আমাদের ব্যবহারিক জীবনে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে, লক্ষ্যে অলক্ষ্যে সর্বক্ষণই তার অজস্র উপচার।
৪.বিজ্ঞানের অপকারিতা: আধুনিক জীবনে আজ বিজ্ঞানের অপরিমিত নির্ভরতা। বাড়ছে কৃত্রিম অভাবের মাত্রাবোর জীবনকে মানুষ অর্থহীন আলস্যে ভরিয়ে তুলছে। সামান্য কাজের দায়িত্বও তুলে দিচ্ছে বিজ্ঞানের হাতে। যন্ত্র এখন ঘরের কাজেও পটু। ঝড়পোছ করে। কাপড় কাচে। চা এনে দেয়। আরও কত কি। দৈনন্দিন হিসেব-নিকেশের দায়িত্ব নিয়েছে যন্ত্রগণক। এতে মানুষ রুমেই প্রকৃতির কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কখনও কখনও বিজ্ঞান মানুষের মনে ছড়িয়েছে বিভীষিকা, আতর। প্রচন্ড আক্রোশে বিজ্ঞান মানুষের ঘরবাড়ি ভস্মীভূত করেছে। ফসল পুড়িয়েছে। জলবায়ুতে বিষ মিশিয়েছে। বিজ্ঞান তখন এই হয়েছে এক মহৎ কল্যাগৱত থেকে। যুদ্ধের রক্ত-ক্ষয়িত পটভূমিকায় বিজ্ঞান আজ মানুষের কাছে অভিশাপ। আর শক্তিমত্ত স্বার্থপর মানুষই এজন্যে দায়ী।
৫. উপসংহার: বিশ শতক শেষ হতে চলেছে। অর্থনৈতিকভাবে ভারত এখনও দুর্বল। বিজ্ঞান-শক্তির ব্যবহার ব্যয়সাপেক্ষ। আজও ভারত তাই পরিপূর্ণভাবে বিজ্ঞান-নির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি। ভারতের শতকরা আশিভাগ মানুষ গ্রামবাসী, কৃষিজীবী, দরিদ্র ও নিরক্ষর। তাদের গৃহবাসে আজও বিদ্যুতের কুণ্ঠিত অপেক্ষা। এখনও তাদের জীবনধারায় অতীত শতাব্দীর জীর্ণতা। আজও তারা আকাশের কাছে জল প্রার্থনা করে। প্রকৃতির করুণা ভিক্ষা করে। এর মধ্যেও আজ বিজ্ঞান যেন আমাদের জীবনে হয়ে ওঠে প্রগতির বাহন। হয়ে ওঠে এগিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার।