রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা: ২. প্রথম অভিযান ৩. প্রথম সফল অভিযান : ৪. ভারতীয় অভিযান : ৫. ১৯৯১–এর অভিযান : ৬ উপসংহার।
এভারেস্টের হাতছানিতে
১. ভূমিকা: দুর্গমের আকর্ষণ দুর্নিবার । পাহাড় দুর্গম। হিমালয় আরও দুর্গম। হিমালয়ের টানে বহু মানুষ ঘর ছেড়েছে। তার নিত্য নতুন নিসর্গ সৌন্দর্যে মানুষ আত্মহারা হয়েছে। তার তুষার- বিছানো শয্যায় কত অভিযাত্রী ঘুমিয়ে পড়েছে। সে ঘুম আর কখনও ভাঙেনি । হিমালয়ের শত সহস্র শৃঙ্গের মধ্যে এভারেস্ট সর্বোচ্চ। বিশ্বের উচ্চতম শৃঙ্গ। এভারেস্টের হাতছানিতে দুঃসাহসী অভিযাত্রীকের দল বারবার ছুটে গেছে সেখানে । দুর্গমকে জয় করতে চেয়েছে। শীর্ষভূমি জয়ও করেছে। জয় করেও তৃপ্তি নেই। কাছে পেয়েও বিচ্ছেদের বেদনায় অনুক্ষণ হৃদয় মথিত হয়েছে। আবার ছুটে গেছে তার কাছেই ।
২. প্রথম অভিযান: অভিযানের প্রস্তুতি অনেক দিনের। পাহাড়ের টান মানুষের অনেক দিনের। গিরিপথের নির্মমতা ও যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে মানুষ অনেক আগেই দেশে-দেশান্তরে বেরিয়ে পড়েছে। সরকারীভাবে প্রথম এভারেস্ট অভিযান ১৯২১ সালেই। এটি ছিল বৃটিশ অভিযান । দলনেতা ছিলেন কর্নেল হাওয়ার্ডবুরী । ৯ সদস্য বিশিষ্ট ওই দলে ছিলেন আলপাইন পর্বত-আরোহী দক্ষ, নির্ভীক, দৃঢ়চেতা ও বলিষ্ঠ জর্জ ম্যালোরি । এই অভিযানে কেউই এভারেস্টে আরোহণ করতে পারেননি । কিন্তু দীর্ঘ সময় নিয়ে এঁরা নদীনালা, পাহাড়-পর্বত, আবহাওয়া, নৃতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, শরীরবৃত্ত ইত্যাদি সম্পর্কে বহু মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করেন । ম্যালোরি ও বুলক পূর্ব রংবুক হিমবাহ থেকে ‘নর্থ কল’ যাওয়ার পথটি আবিষ্কার করেন । আবিষ্কার করেন উত্তর গিরিশিরা, উত্তর-পূর্ব গিরিশিরা, রংবুক উপত্যকা, রংবুক হিমবাহ, পশ্চিম রংবুক। কিন্তু প্রথম অভিযানটিও ছিল বেদনায় আশ্রুসিক্ত । অভিযানের পথেই কাম্পাজং-এ মারা গেলেন অক্সিজেন বিশেষজ্ঞ ডাঃ কেলাস । টিংরীজং-এ মারা গেলেন একজন কুলি ।
৩. প্রথম সফল অভিযান: প্রথম অভিযানের পর সত্তর বছর কেটে গেল । এর মধ্যে অভিযানের ধারা কখনও থেমে থাকেনি । একের পর এক অভিযান হয়েই চলেছে । মৃত্যু সেই ধারাকে রুদ্ধ করতে পারেনি । ব্যর্থতা পারেনি হতাশ করতে । পারেনি এভারেস্ট জয়ের স্বপ্নকে কেড়ে নিতে । কত বেদনানীল স্মৃতি এখনও মানুষের মনে জেগে রয়েছে । জয়ের কাছাকাছি এসেও হিমশীতল নীরবতার মধ্যে চিরতরে হারিয়ে গেছেন কত দুর্গমের সাধক । বাকিরা ফিরেছেন বিষাদের স্মৃতি নিয়ে । চুপ করে বসে থাকেননি । আবার নতুন উদ্যমে পাড়ি দিয়েছেন হিমালয়ের কোলে । আরও কত তরুণ প্রাণে ছড়িয়ে দিয়েছেন এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন । ১৯৫৩ সাল । এবারও বৃটিশ অভিযান । দলনেতা কর্নেল এইচ সি জি হান্ট । উপনেতা ডাঃ আর সি ইভান্স। দলে ইংরেজরা ছাড়াও নিউজিল্যান্ডের কয়েকজন সদস্য ছিলেন । ছিলেন শেরপা তেনজিং নোরগে । সামিট ক্যাম্প থেকে চার্লস এভিও ও টম বুডিলং-ই প্রথম এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশে রওনা হলেন। কিন্তু বিধি বাম। খানিকটা এগিয়েছেন এমন সময় তুষার ঝড়। সামিট ক্যাম্পে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন । পরের দিন অর্থাৎ ২৯শে মে যাত্রা করলেন এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে । ভাগ্য সুপ্রসন্ন । কোন বাধা পেলেন না । পৌঁছে গেলেন এভারেস্টের শীর্ষভূমিতে। পনেরটি অভিযানের পর প্রথম সাফল্য । প্রথম জয়ের দুর্লভ গৌরব অর্জন করলেন এঁরা দুজন । অমর হয়ে রইলেন এভারেস্ট জয়ের ইতিহাসে ।
৪. ভারতীয় অভিযান: প্রথম জয়ের পর আরও অনেকেই সেখানে পৌঁছেছেন। ১৯৬০ সাল । প্রথম ভারতীয় এভারেস্ট অভিযান । দলনেতা ব্রিগেডিয়ার জ্ঞান সিং। ১২ই মার্চ নামচে বাজার। সেখানে দলটির দু সপ্তাহের অপেক্ষা। চলে শরীরকে সইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি। এপ্রিলের গোড়ায় বেসক্যাম্প স্থাপন । ১০ই এপ্রিল এক নম্বর ক্যাম্প। ৯ই মে ‘সাউথ কল’-এ ক্যাম্প স্থাপন । মাঝে আরও একাধিক ক্যাম্প। ২৩শে মে দলটি ‘সাউথ কল’-এ পৌঁছোয়। ২৪শে মে শেষ ক্যাম্প। ২৫শে মে এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছোবার উদ্দেশে যাত্রা। কিন্তু আবহাওয়া প্রতিকূল। তুষার ঝড়। তীব্র কনকনে পাহাড়ি হাওয়ার দাপাদাপি। টাল সামলাতে পারছিলেন না অভিযাত্রীরা। ৩ জনের দল। প্রথমে গম্বু, পরে কুমার ও শেষে সোনাম । দলটি সাউথ সামিটের নিচে ২৮৩০০ ফুট উঁচুতে । আর মাত্র ৭০০ ফুট । আবহাওয়া ক্রমশই ঘোরালো হচ্ছে । ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার । ঝড়ো হাওয়ায় বরফ উড়ছে । জয়ের দোরগোড়া থেকে অভিযাত্রীরা ফিরে এলেন । ১৯৬২-তে হলো দ্বিতীয় ভারতীয় অভিযান । দলনেতা মেজর জন ডায়াস। সেবারেও ব্যর্থ তা। উত্তর গিরিশিরা ধরে দলটি ২৮৬০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছেও ফিরে এসেছিল । ১৯৬৫-তে আবার তৃতীয় অভিযান । এই অভিযানের দলনেতা এম এস কোহলি । উপনেতা এন কুমার। ‘৬৫-এর ২০শে মে ভারতের পর্বতারোহণের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় । এ এস চিমা ও নওয়াং গম্বু এভারেস্টে আরোহণ করলেন । ২২শে মে সোনাম গিয়াৎসু ও সোনাম ওয়াংখাল শীর্ষে পৌঁছান । ২৪শে আর একটি দল আরোহণ করলেন । শেষ দলটি গেলেন ২৯শে মে । একটি দলর ৯ জন অভিযাত্রীই শীর্ষভূমি আরোহণ করে এক নতুন ইতিহাস রচনা করলেন। ১৯৬৫-এর পর আবার ১৯৮৪ । এবার মহিলা ও পুরুষের সম্মিলিত একটি দল। দলপতি কর্নেল খুল্লার । এবারও সফল অভিযান । উল্লেখ্য ঘটনা, ভারতের প্রথম মহিলা ও বিশ্বের পঞ্চম, বাচেন্দ্রী পালের হিমালয় শীর্ষে আরোহণ । তাঁর সঙ্গে ছিলেন লাটু দোরজি। ১৯৮৫-তে ভারতের আরও একটি অভিযান হয়েছিল । সেই অভিযানের বিষাদ এখনও ম্লান হয়নি । সেই অভিযানের চার অভিযাত্রী আর ফিরে এলেন না।
৫– ১৯৯১–এর অভিযান: ১৯৯১-এর ১লা আগস্ট। আবারও একটি ভারতীয় দল এভারেস্ট জয় করতে যাত্রা করেছিলেন । বিশেষত্ব, দলটির অধিকাংশ সদস্যই বাঙালি । বাঙালির কাছে নিঃসন্দেহে একটি স্মরণীয় দিন। স্মরণীয় যে কোনও পর্বতপ্রেমীর কাছেই। কেননা অভিযাত্রীরা গিয়েছিলেন চীনের পথ ধরে । সে পথ সবচেয়ে দুর্গম । দলনেতা প্রাণেশ চক্রবর্তী । ফ্লাইয়িং লিডার অপূর্ব ভট্টাচার্য। দলে দুজন মহিলাও ছিলেন । পর্বতারোহণকে সারা ভারতে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে বাঙালির প্রচুর অবদান । পর্বতপ্রেমে তাঁদের তুলনা নেই । কিন্তু কোন বড় অভিযানের সুযোগ আসেনি । এবার এসেছিল । কিন্তু পথ দুর্গম । এই পথে খুব কমই অভিযান হয়েছে। ভারতের কোন অভিযানই এই ‘নর্থ ফেস রুট’ বেছে নেওয়ার দুঃসাহস দেখায়নি । পর্বত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই পথে আরোহীদের ব্যক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি । ‘নর্থ ফেস’ দিয়ে শেষ পর্যায়ের অভিযানটুকু খুব দীর্ঘ ও কঠিন । প্রায় আটশ থেকে ন’শ ফুট নিচে সামিট ক্যাম্প স্থাপন করতে হয় । বাকি পথটুকু একেবারে খাড়া। এক মিনিট কোথাও দাড়াবার সুযোগ নেই । ওঠা যেমন কঠিন, নেমে আসাটা আরও কঠিন। ওঁরা চেষ্টা করেছিলেন। বিপদের ঝুঁকিও নিয়েছিলেন। পারেননি এভারেস্টের শীর্ষ জয় করতে। কিন্তু দুঃসাহসের পরিচয় রেখে এসেছেন পথে পথে ।
৬. উপসংহার: পর্বতপ্রেমী মানুষের কাছে হিমালয় চিরদিনই এক দুর্বার প্রলোভন । প্রলোভন তার শীর্ষ শিখরকে একবার ছুঁয়ে আসা । এই মহাব্রত নিয়েই দুর্গমের সাধকরা বেরিয়ে পড়েন । এভারেস্ট তো শুধু হিমালয়ের শীর্ষভূমিই না তো শুধু হিমালয়ের শীর্ষভূমিই নয়, এভারেস্ট পর্বতপ্রাণ ভক্তের কাছে এক মহাতীর্থ।সাধকের সাধনা ব্যর্থ হয় না । অনেক প্রাণের বিনিময়ে একদিন সেই মহাতীর্থের পথের সন্ধানও পেয়ে যান যেতে হয় সেই স্বপ্নের দেশে । কিন্তু মন ভরে না । অভিযানও শেষ হয় না । প্রতিবারেই পথের ভক্তের দল । কত সব দুর্গম গিরিগাত্র ধরে বাধা । প্রতিবারেই পথের দুর্গমতা । তার অনিশ্চয়তা, রহস্যময়তা একটুও কমে না । আজও সে উন্নত মহিমায় একই রকম উদাসীন । তার তুষার-বিছানো পথে হাঁটতে হাঁটতে ম্যালোরি, আরভিন হারিয়ে গেলেন । ফ্রাঙ্ক স্মাইথ তিন দিন তিন রাত একটানা তুষার ঝড়ের মধ্যে মৃত্যুকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতন দেখলেন । মেজর জয় বহুগুণা, রণজিৎ সিং বকসি, ভি এম নেগি ও এম ভি ভি রাও আর কোনদিনও ফিরে আসবেন না । ফিরে এলেন না আরও অনেকেই । তবু চির পরিচিত হয়েও এভারেস্ট চির নতুন, চির কাম্য হয়েই রইল ।