রচনা–সংকেত: ১. ভূমিকা ; ২. জীবনচরিত পাঠের উপকারিতা; ৩. মহাপুরুষের জীবনচরিতে দেশকালের চিত্র; ৪. জীবনচরিত নির্বাচন; ৫. উপসংহার।
জীবনচরিত পাঠের প্রয়োজনীয়তা
১. ভূমিকা: সাধারণের জীবনচরিত নেই। অসাধারণেরই জীবনচরিত। অসাধারণত্ব তাঁদের অপরাজেয় পৌরুষে, মনুষ্যত্বের সাধনায়, হৃদয়ের ঐশ্বর্যে। তাঁরা আমাদের শুভ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাঁদের নামস্মরণ ‘আমাদের সমস্ত দিনের বিচিত্র মঙ্গল চেষ্টার উপযুক্ত উপক্রমণিকা’। তাঁরা যুগে যুগে স্মরণীয়, বন্দিত মহাপুরুষ। তাঁদের উদ্দেশ্যেই আমাদের বিনত ভক্তির অর্ঘ্য। তাঁদের মহৎ জীবনকথা আমাদের চলার পাথেয়। তাঁদের জীবনচরিত আমাদের হতাশায় আশার আলো, শোকে সান্ত্বনা।
২. জীবনচরিত পাঠের উপকারিতা: মহাপুরুষের জীবনচরিত পাঠ শুধু কৃতজ্ঞতার ঋণ স্বীকার নয়। ‘যে ভক্তি করে সে ভাল হয়’। তাঁদের মহৎ জীবনব্রত ক্ষুদ্র-প্রাণ মানুষের কাছে এক উজ্জ্বল আদর্শ। মহাজীবনের সেই আদর্শই সাধারণকে সুস্থ সুন্দর জীবন যাপনে অনুপ্রাণিত করে। উদ্বুদ্ধ করে নবতর চেতনায়। মুছে দেয় সাংসারিক ক্ষুদ্রতা-তুচ্ছতার মালিন্য। বেঁচে থাকাকে করে অর্থময়। জীবনচরিতই শেখায় কি করে অসীম ধৈর্যে দুঃখকে জয় করতে হয়, কি করে ঈর্ষা-লোভ-স্বার্থপরতার চোরা স্রোত পেরিয়ে মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। শেখায় কর্তব্যে অবিচল থাকার ক্ষমতা। জীবনচরিত আমাদের দিগ্ভ্রান্ত, অস্থির জীবনে এক নতুন দিগ্দর্শন। মহাপুরুষের জীবনী তাই যথার্থ অর্থেই বেঁচে ওঠার বীজমন্ত্র। মহৎ জীবন তো মহৎ হওয়ারই প্রেরণা। মহাপুরুষের উদার, বিশ্বমুখী জীবন আমাদের মানবতার মন্ত্রে দীক্ষিত করে। তাঁরা আমাদের কাপুরুষতা দূর করেন। দূর করেন মৃত্যু-বিভীষিকা। দেন সংগ্রামের দুর্বার, বলিষ্ঠ মানসিকতা। স্পর্শমণির মতনই জীবনচরিতের এক আশ্চর্য ক্ষমতা।
৩. মহাপুরুষদের জীবনচরিতে দেশকালের চিত্র: সমাজ বহতা নদীর মতই চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেখানে নানা ঘাত-প্রতিঘাত। স্বার্থের নিত্য সংঘাত। লোভের নির্বিবেক মত্ততা। সুখ-দুঃখ, বিরহ-বেদনার ভঙ্গুর খেলাঘর। রাজনৈতিক-সামাজিক-আর্থনীতিক-ধর্মীয় নানা তরঙ্গে সে-জীবন সর্বদাই অস্থির। মহাপুরুষের জীবন দেশকাল বিচ্ছিন্ন কোন একক ব্যক্তিত্ব মাত্র নয়। বরং, সংসারের নানা ঘটনার প্রবাহে আলোড়িত-আন্দোলিত সে-জীবন। তাই মনীষীর জীবন পাঠে আমরা জানতে পারি সেই দেশের সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-ধর্মবিশ্বাস, আচার-আচরণ, যুগ-লক্ষণ ইত্যাদির নানা তথ্য। জীবনী-গ্রন্থ অলক্ষ্যে হয়ে ওঠে ইতিহাসের অন্যতম উপাদান সংগ্রহের উৎস। এর মধ্যে দিয়ে উদ্ঘাটিত হয় ইতিহাসের অনেক অনালোকিত, অনুদ্ভাসিত, বিস্মৃত তথ্য। জীবনী-গ্রন্থ তাই এক অর্থে ঐতিহাসিক দলিলও।
৪. জীবনচরিত নির্বাচন: ‘জীবনী যাহার যেমনই হোক, যে লোক কিছু একটা করিতে পারে তাহারই জীবনচরিত’। সুতরাং, জীবনচরিতের অভাব নেই। চরিত গ্রন্থের এই ভিড়ের মধ্যেই আমাদের খুঁজে নিতে হবে সেই পরম বাঞ্ছিত জীবনকে। যে জীবনচরিত আমাদের কর্মপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে, করে কর্তব্যনিষ্ঠ, শুদ্ধ বিবেকের অধিকারী, সেই জীবনই আমাদের কাম্য। যে জীবনচরিত আমাদের দুঃখকে জয় করার সাহস যোগায়, আকর্ষণ করে মহত্ত্বের পথে, নিয়ে যায় বৃহৎ জীবনের বেদীমঞ্চে, সেই জীবনচরিতই আমাদের অবশ্য পাঠ্য। যাঁরা বুক পেতে সয়েছেন সংসারের অশেষ নির্যাতন, স্বর্গ থেকে এনেছেন অমৃতের পাত্র, এনেছেন বিশ্বাসের ছবি, তাঁদেরই জীবনচরিত আদর্শ, প্রত্যেকের প্রত্যহ স্মরণযোগ্য। ‘যে মহাত্মা জীবনযাত্রার আদর্শ দেখাইয়াছেন তাহারই জীবনচরিত সার্থক; যাঁহারা সমস্ত জীবনের দ্বারা কোনো কাজ করিয়াছেন তাঁহাদেরই জীবন আলোচ্য।’
৫. উপসংহার: বর্তমান বিশ্বের সর্বত্রই মানুষ আজ দিশেহারা, বিভ্রান্ত। চোখে তার বিশ্বজয়ের নেশা। সে আজ অমিত শক্তির অধীশ্বর। তাই নিয়ে সে ছুটে চলেছে গ্রহে-গ্রহান্তরে। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল সর্বত্রই আজ তার অবাধ বিচরণক্ষেত্র। দেশে দেশে অশুভ, স্পর্ধিত শক্তির প্রতিযোগিতা, আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণের আস্ফালন। তার জন্যে নিত্য নতুন মহড়া। বর্তমানের এই হৃদয়হীনতার দুঃসময়ে প্রয়োজন তাই আত্মশুদ্ধির। আর মহৎ জীবনের কাছেই পাওয়া যাবে তার সন্ধান। পাওয়া যাবে মনের হারানো বৈভব, সঠিক পথের নির্দেশ।
📝 অনুসরণে লেখা যায়
১. জীবনচরিত পাঠের উপকারিতা
২. জীবনচরিত পাঠের গুরুত্ব
৩. জীবনচরিত ও তার পাঠ-মূল্য