রচনা–সংকেত: ১. ভূমিকা; ২. ইংরেজ আমলে বাঙালীর বিজ্ঞান–চর্চার নতুন পর্ব; ৩. প্রথম যুগের বাঙালী বিজ্ঞানী ৪. বাঙালীর বিজ্ঞান–চর্চার দ্বিতীয় পর্যায় ৫. বাঙালীর বিজ্ঞান–সাধনার তৃতীয় পর্যায় ৬. চিকিৎসা বিজ্ঞানে বাঙালীর কৃতিত্ব ; ৭. উপসংহার ।
বাঙালীর বিজ্ঞান চর্চা
১. ভূমিকা: বিজ্ঞানের সাধনা দিয়েই মানুষ পৃথিবীকে বৈচিত্র্যময়ী করেছে। এরই মধ্যে দিয়ে মানুষ এক অনন্ত শক্তির উৎস সন্ধান করেছে। আকাশ-পাতাল জুড়ে মানুষ তার আধিপত্য বিস্তার করেছে । প্রকৃতির রুদ্র রূপ দেখে সে যেমন ভয় পেয়েছে, তেমনই ভয় দূর করার শিক্ষাও পেয়েছে প্রকৃতির কাছ থেকে। বিজ্ঞান দিয়েই প্রতিকূলতাকে জয় করেছে । রোগ-মহামারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিজ্ঞানই হয়েছে মানুষের হাতিয়ার । পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়েছিল এর সাধনা, আজও তার শেষ নেই । অতীত ভারতেও ছিল বিজ্ঞান-সাধনার এক গৌরবময় অধ্যায়। সেদিনের ভারতীয় বিজ্ঞান-সাধনায় বাঙালীর মনীষাও স্বীকৃত হয়েছিল ।
২. ইংরেজ আমলে বাঙালীর বিজ্ঞান–চর্চার নতুন পর্ব: ভারতের বিজ্ঞান-সাধনার প্রাচীন ধারাটি এক সময় হারিয়ে গেল । তারপর দীর্ঘকাল আর কোন বিজ্ঞান-চর্চা হলো না। মধ্যযুগীয় অন্ধকার গ্রাস করলো জাতিকে । ইংরেজী শিক্ষার প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান-শিক্ষারও নতুন পর্যায়ের শুরু । তরুণ শিক্ষার্থীরা আবার বিজ্ঞান-চর্চায় মেতে উঠলো । অনুপ্রাণিত হলো নতুন করে । কিন্তু দেশ তখনও পরাধীন । বাঙালীর প্রতিভার অভাব ছিল না । কিন্তু পরাধীন দেশের মানুষ বলে বাঙালীর ভাগ্যে বিশ্বজয়ের গৌরব জুটল না । গবেষণার ক্ষেত্রেও পেল না রাষ্ট্রের আনুকূল্য । তবু এরই মধ্যে তার খ্যাতি বিশ্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল । নতুন উদ্ভাবনার ক্ষেত্রেও ছিল তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ । ইংরেজই প্রথম বিজ্ঞান-শিক্ষার সুযোগ এনে দিয়েছিল । বিজ্ঞান-চর্চায় বাঙালীর সীমাহীন কৌতূহল ও আগ্রহ সঞ্চার করেছিল । কিন্তু তা সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহারের সুযোগ ইংরেজ সরকার তাকে দেয়নি
৩. প্রথম যুগের বাঙালী বিজ্ঞানী: তবু সেদিন বাঙালী তার সীমিত ক্ষমতা নিয়েও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-চর্চার ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছিল । ফলিত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে রাধানাথ শিকদারের নাম করা যায় । তিনি গাণিতিক সূত্র প্রয়োগ করে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা নির্ধারণ করেছিলেন । প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও স্মরণীয়। পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত মহলানবীশও এক স্মরণীয় নাম। এক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় আরও একটি নাম । তিনি মহেন্দ্রলাল সরকার । তাঁর সর্বস্ব ব্যয় করে তিনি ‘বিজ্ঞান-সাধনায় ভারতীয় সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । এই প্রতিষ্ঠানটি পরে ‘সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন’-রূপে খ্যাত হয় । আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণায় প্রথম স্মরণীয় বাঙালী হলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু । প্রথম রেডিও আবিষ্কারের খ্যাতি থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন, কিন্তু উদ্ভিদ-বিজ্ঞানে তিনি বিশ্বকে চমকে দিলেন । ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ তাঁর জীবনের এক মহৎ কীর্তি ।
৪. বাঙালীর বিজ্ঞান–চর্চার দ্বিতীয় পর্যায়: আচার্য জগদীশচন্দ্রের পরেই যার নাম স্মরণীয়, তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় । রসায়ন-বিজ্ঞানে তাঁর আবিষ্কার বিশ্বের দৃষ্টি ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে । তিনিই প্রথম ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’ যৌগটি আবিষ্কার করেন । এছাড়া আরও কয়েকটি পারদঘটিত যৌগ উদ্ভাবন করেন। তিনি রচনা করলেন ‘হিন্দু রসায়নশাস্ত্রের ইতিহাস,। বেঙ্গল কেমিকেলের প্রতিষ্ঠা তাঁর অন্যতম কীর্তি । কলকাতার বিজ্ঞান কলেজের প্রতিষ্ঠাও তাঁর স্মরণীয় অবদান। বিজ্ঞান-চর্চার ক্ষেত্রে তিনি জোয়ার এনেছিলেন। তাঁর কৃতী ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন নীলরতন ধর, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রিয়দারঞ্জন রায়, রসিকলাল দত্ত প্রমুখ বিজ্ঞানীরা । আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বিজ্ঞানকে প্রথম ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিলেন। বিজ্ঞানকে অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ব্যবহার করেছিলেন তিনি ।
৫. বাঙালীর বিজ্ঞান সাধনার তৃতীর পর্যায়: এই পর্বের পদার্থবিদ্যায় স্মরণীয় নাম ডঃ মেঘনাদ সাহা। পরিসংখ্যান-তত্ত্বে স্মরণীয় সত্যেন্দ্রনাথ বসু । সৌরমণ্ডলের গবেষণায় শিশিরকুমার মিত্র। মেঘনাদ সাহার স্মরণীয় কীর্তি ‘ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’ বর্তমানে পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আবিষ্কার পারমাণবিক গবেষণার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে।
৬. চিকিৎসা–বিজ্ঞানে বাঙালীর কৃতিত্ব: চিকিৎসাক্ষেত্রেও বাঙালীর অবদান যথেষ্ট । কালাজ্বরের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী জগৎখ্যাত হয়েছেন । রাধাগোবিন্দ কর, নীলরতন সরকার, বিধানচন্দ্র রায় প্রমুখ চিকিৎসাবিদদের অবদানও কম নয় । ডাঃ সুবোধ মিত্রের ‘মিত্র অপারেশন’-এরও বিশ্বজোড়া খ্যাতি। টেস্ট টিউব বেবীর স্রষ্টা ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নাম আজ কে না জানে !
৭. উপসংহার: দেশ স্বাধীন হয়েছে । বিজ্ঞান-শিক্ষার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয়েছে। বিজ্ঞানের সাধনায় তরুণ বাঙালীর সংখ্যা বেড়েছে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখছেন । তবুও বাঙালী বিজ্ঞানীরা বিদেশে পাড়ি দেন । বিদেশে বিজ্ঞান-গবেষণায় মগ্ন থাকেন । আজও এখানে বিজ্ঞান-সাধনার উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি হয়নি ।