রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ; ২. ম্যাণ্ডেলার জন্ম ও শিক্ষা ; ৩. ম্যাণ্ডেলার জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান ও কারাবরণ; ৪. মুক্তিকামী মানুষের প্রতিনিধি হলেন ম্যাণ্ডেলা ; ৫. উপসংহার ।
নেলসন ম্যাণ্ডেলা
১. ভূমিকা: নেলসন ম্যাণ্ডেলা আজকের দুনিয়ার এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব । দক্ষিণ আফ্রিকার এই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষটি এক অমিত শক্তির প্রতীক । মানবিকতার এক জ্বলন্ত আদর্শ । তিনি শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের মুক্তির দূত নন, তিনি বিশ্বমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক । প্রিটোরিয়া সরকার তাদের জঘন্য হিংস্রতা নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ নরনারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। অত্যাচার সেখানে তুঙ্গে। মানুষের বেঁচে থাকার মৌল অধিকার সেখানে উপেক্ষিত । নেলসন ম্যাণ্ডেলা আজ কোন ব্যক্তি নন, দক্ষিণ আফ্রিকার অসংখ্য অত্যাচারিত মানুষের প্রেরণা ও মানবিক অধিকার ফিরে পাওয়ার এক বলিষ্ঠ অঙ্গীকার ।
২. ম্যাণ্ডেলার জন্ম ও শিক্ষা: ১৯১৮ সালের ১৮ই জুলাই ম্যাণ্ডেলার জন্ম হয়েছিল উমাতার কুনোতে। এটি ট্রানস্কি প্রদেশের রাজধানী-গ্রাম । এই ট্রানস্কির পাহাড়ী উপত্যকায় কেটেছিল তাঁর ছেলেবেলা । মবমি নদীর তীরে ছিল ওঁদের ছোট কুটির। পুবদিকে ধূ ধূ মাঠ । তাঁর বাবা ছিলেন হেনরি গাডলা । উনি ছিলেন থেম্বু উপজাতির নেতা । নেলসনের মা ছিলেন নোসেকেনি । তিনি ছিলেন একজন দৃঢ় চরিত্রের মহিলা । ছোটবেলায় নেলসন বাড়ির পশু চরাতেন, চাষ-আবাদে সাহায্য করতেন। একটু বড় হলে মিশনারি স্কুলে তিনি ভর্তি হলেন । সেখানে পড়তে গিয়ে পাঠ্য ইতিহাসের বই-এ জানতে পারলেন, কৃষ্ণাঙ্গরা অশিক্ষিত, বর্বর, ডাকাত। সাদারাই সভ্য, দক্ষিণ আফ্রিকায় শান্তির দূত । কালো মানুষের অকাতরে রক্তদানও সেখানে অস্বীকার করা হয়েছে । মনে পড়লো শ্বেতাঙ্গদের আরও অত্যাচারের নানা স্মৃতি। করেস্পন্ডেসে বি. এ. পাস করলেন। তারপর উইটওয়াটারস্ট্যাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে শুরু করলেন। শিক্ষানবীশ হিসেবে একটি আইনজীবীক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হলেন । ১২ বৎসর বয়সেই কৃষ্ণাঙ্গদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্যে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন ।
৩. ম্যাণ্ডেলার জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান ও কারাররণ: ১৯১২ সালে জন্ম হয় সাউথ আফ্রিকায় নেটিভ ন্যাশনাল কংগ্রেসের। কৃষ্ণাঙ্গদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করাই ছিল এর প্রথম কাজ । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আফ্রিকান কংগ্রেসকে একতাবদ্ধ করেছিল । ১৯৪৪ সালের এপ্রিল মাস। লেমবিডি হলেন লিগের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, টেম্বু সেক্রেটারী আর নেলসন ম্যাণ্ডেলা পেলেন খসড়া পরিকল্পনা রূপায়ণের দায়িত্ব। ম্যাণ্ডেলা গ্রহণ করলেন প্রকৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি । তাঁদের প্রথম কাজ হলো আফ্রিকার প্রাচীনতম অধিবাসীদের সুপ্রতিষ্ঠিত করা। আর দ্বিতীয় কাজ, প্রয়োজন অনুসারে, বিদেশী সভ্যতাকে গ্রহণ । ১৯৪৬ সাল । জেনারেল স্মার্টের ‘ঘেটো বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেন যৌথভাবে ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানরা । এই যৌথ প্রতিবাদ আফ্রিকানদের নবমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করল । ঘুম ভাঙল অত্যাচারিত শ্রমিকদের । ম্যাণ্ডেলা এ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘যখন আমরা রুটির জন্যে আমাদের হাত বাড়িয়ে দিলাম তখন আমাদেরই সেই হাতে দেওয়া হলো পাথর।’ বর্ণবৈষম্য নীতিকে আরও জোরদার করা হলো । ‘পপুলেসন রেজিস্ট্রেসন অ্যাক্ট’ নামক একটি আইন চালু হলো। এই আইনে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের তাদের নামধাম, বংশপরিচয় এবং গায়ের রঙ পরেজিস্ট্রেসান করতে বলা হলো। এরা ‘বান্টু’ নামে সরকারী খাতায় অভিহিত হলো। ১৯৫০ সালের ২৬শে জুন।আফ্রিকান কংগ্রেসের দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হলো। ম্যাণ্ডেলা চিহ্নিত হলেন শ্বেতাঙ্গ সরকারের পয়লা নম্বরের শত্রু হিসেবে। নেলসন ম্যাণ্ডেলা ঘুরে ঘুরে সংঘবদ্ধ করলেন খনি এবং শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হলো পাঠচক্র । তৈরি হলো ন্যাশনাল অ্যাকশন কমিটি। ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসে আবার ম্যাণ্ডেলা বোথা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন । কারারুদ্ধ হলেন। বিচারের নামে চলল অনেকদিন ধরে প্রহসন । জেলের ভেতরে চলল মানসিক, শারীরিক অত্যাচার। প্রথমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রিটোরিয়া সেন্ট্রাল জেলে, পরে সেখান থেকে রোবন দ্বীপে । সেখান থেকে আবার প্রিটোরিয়া জেল ।
৪. মুক্তিকামী মানুষের প্রতিনিধি হলেন ম্যাণ্ডেলা: অবশেষে মুক্তি পেলেন নেলসন ম্যাণ্ডেলা । তাঁর মুক্তিলাভ শতাব্দীর এক স্মরণীয় ঘটনা হয়ে রইল । তাঁর মুক্তি বহন করে আনল মহান এক সংগ্রামের সার্থকতা। দক্ষিণ আফ্রিকায় আজ দীর্ঘকাল ধরে চলছে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের বর্বরোচিত অত্যাচার । দস্যু পায়ের কাঁটামারা জুতোর তলায় বীভৎস অপমানিত সে ইতিহাস । দীর্ঘকাল ধরে সেখানে চলেছে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর দমন-নীতি । কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য চালু হয়েছে একটি পরিচয়পত্র, এর জোরে কালোরা বাস-ট্রামে চলাফেরা করে । বাড়ী, দোকানও তাদের জন্য নির্দিষ্ট । নিষিদ্ধ হলো শ্বেতাঙ্গদের কামরায় কৃষ্ণাঙ্গদের ওঠা। শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের জন্যই চালু হলো রাতের কার্ফু। ম্যাণ্ডেলা ধীরে ধীরে কালোদের মধ্যে সঞ্চার করলেন নতুন চিন্তা-ভাবনা । আজ কৃষ্ণাঙ্গরা মুক্তির জন্য মরণপণ সংগ্রাম করছে । দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের কাছে তিনি এক জাগ্রত চেতনা ।
৫. উপসংহার: এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীকে ১৯৭৯ সালে জওহরলাল নেহরু শান্তি পুরস্কার দিয়ে ভারত-সরকার সম্মানিত করেছেন । কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দিয়েছেন ডি. লিট উপাধি । সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান তাঁকে জানিয়েছেন অভিনন্দন । পেলেন ১৯৯০-এর লেনিন শান্তি পুরস্কার । দীর্ঘ ২৭ বছর দক্ষিণ আমেরিকার নির্জন কারাগারে তিনি বন্দী ছিলেন । অবশেষে দেশ-বিদেশের জাগ্রত গণ-চেতনার চাপে তিনি মুক্তি পেলেন । কিন্তু অত্যাচারের অবসান হলো না । সেখানে শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবিদ্বেষ আসলে শোষণেরই ছদ্মবেশ । আজ দিকে দিকে কৃষ্ণাঙ্গদের যে জাগরণ, তাকে রোধ করার ক্ষমতা বোথা সরকারের নেই। কালো মানুষের দেশ আজ ঘুম থেকে জেগেছে । সেই জাগরণ ম্যাণ্ডেলা । আর ভয় নেই তাদের । ম্যাণ্ডেলা সেই ভয় ভাঙানোর শক্তি । অত্যাচারিত মানুষ আজ তাই কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছে, ‘মে আই বুই আফ্রিকা’ । অর্থাৎ আমাদের আফ্রিকা ফিরিয়ে দাও। আমাদের সঙ্গে আছেন মহান ম্যাণ্ডেলা ।
১. দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিসূর্য ম্যাণ্ডেলা
২. স্বাধীন পূজারী ম্যাণ্ডেলা
৩- নেলসন ম্যাণ্ডেলার জীবন-সংগ্রাম