রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা; ২. নেশার উপাদান ৩. হেরোইনের সর্বনাশা দিক ৪. হেরোইনের দ্রুত প্রসারের কারণ ; ৫. আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ; ৬. প্রতিকার ; ৭. উপসংহার ।
ড্রাগঃ একটি অভিশাপ
১. ভূমিকা: ড্রাগ এখন রূপকথার ড্রাগন । ঘরে ঘরে তার হানা । সর্বত্র উদ্বেগ আর আতঙ্ক । আতঙ্ক পরিবারের। আতঙ্ক সমাজের । মায়ের বুকফাটা কান্নায় বাতাস ভারী হয় । বাপের দীর্ঘশ্বাসে রাত্রির অন্ধকার আরও বেদনার্ত। পরিবারে পরিবারে অকাল শোকের ছায়া । নেশার ছোবলে ধুঁকছে লক্ষ তরুণ তাজা প্রাণ । ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে । এই নেশার আগুনে পুড়ছে শহর, শহরতলি । পুড়ছে গ্রামগঞ্জ ।
২. নেশার উপাদান: অথচ নেশা মানুষের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে আছে নানা রকমের নেশা । যুগপ্রাচীন সময় থেকে মানুষ কৃত্রিমভাবে নিজের প্রকৃতিকে অপ্রকৃতিস্থ করেছে । রুক্ষ বাস্তবতা আর দারিদ্র্য-দহন থেকে সে পালাতে চেয়েছে । চেয়েছে উদ্দাম কল্পনা আর ভ্রান্তির বিলাসে বুঁদ হয়ে থাকতে । আজও নেশা কোন কোন সম্প্রদায়ের জীবনচর্যার অঙ্গ। যুগে যুগে নেশার জগতেও ঘটেছে নানা রূপান্তর । প্রাচীন ভারতের মুনি-ঋষিরা একদিন সোমরস পান করতেন । তন্ত্রাচারীরা আজও কারণবারি পান করেন । সিদ্ধি না হলে দেবাদিদেব মহাদেবের পুজো হয় না । স্বয়ং মহাদেবও নেশা করতেন । সিদ্ধি ভাঙই ছিল দেবতাদের নেশার উপকরণ । এরপর নানা নামে নানা বেশে এলো কোকেন, চণ্ডু, চরস, এল. এস. ডি., স্ম্যাক, মারিজুয়ানা, হাসিস ইত্যাদি । সব শেষে এলো হেরোইন । এর ছোবলে আজ ঘরে ঘরে হাহাকার । প্রত্যেক নেশার উপকরণ, ক্রিয়া-বিক্রিয়া ভিন্ন । ভিন্ন এদের স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের ক্ষমতা । আফিম হলো সবচেয়ে প্রাচীন নেশা । পোস্ত নির্যাস থেকে হয় কাঁচা আফিম । এর থেকেই বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় সর্বনাশা হেরোইন ।
৩. হেরোইনের সর্বনাশা দিক: হেরোইন আজ সব নেশাকেই ছাড়িয়ে গেছে । তার আকর্ষণ যেমন দুর্নিবার, তেমনি অকালে জীবন ছিনিয়ে নিতেও এর জুড়ি নেই। হেরোইনের ‘পুরিয়া’ আজ ড্রাগ নেশাড়ুদের হাতে হাতে ঘুরছে। ‘বাদামি’ আর ‘সাদা’ দুই রূপেই সে ছাত্র-যুবক-তরুণ সবাইকে পতঙ্গের মতন টানছে । এ নেশা ধীরে ধীরে স্নায়ুকে দুর্বল করে । নিঃশেষ করে দেয় শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা । ক্রমশঃ ভোতা, অসাড় হয় এদের মনন শক্তি । এদের খিদে পায় না । ঘুম আসে না চোখে । সময়ের বোধ কমে যায় । হাসিকান্নার বোধ থাকে না । ওজন কমে। যখন তখন ঘরে ফিরে আসে। ধীরে ধীরে এক অস্বাভাবিক জীবস্মৃত অবস্থায় পৌঁছে যায় । হঠাৎ ড্রাগ বন্ধ করলে তার ফল হয় মারাত্মক । শুরু হয় প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণা । এর নাম ‘উইথড্রয়াল সিমটম’ । এ অবস্থায় হৃদযন্ত্রও বন্ধ হয়ে যেতে পারে । ঠিক সময়ে নেশার ‘পুরিয়া না পেলে শুরু হয় ‘টার্কি পিরিয়ড’ । তখন হাত-পা কাঁপতে থাকে । পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়। চোখ নাক দিয়ে জল ঝরে তখন । হেরোইন আজ এক নতুন আতঙ্ক । নতুন বিভীষিকা । ভয়াবহ এর পরিণতি । পতঙ্গের মতন ছাত্র, যুবক ঝাঁপ দিচ্ছে এই মরণ আগুনে । কিন্তু কেন এই মৃত্যুসাধ ? এ নিছক মজা পাওয়ার ব্যাপার নয়। এর পেছনে আছে সামাজিক কারণ। আছে ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা, দারিদ্র্য-জ্বালা। আছে অক্ষম সাহসিকতা দেখানোর চপলতা। যৌথ পরিবার দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে। বিনষ্ট হচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ। রাজনৈতিক অস্থিরতা। বাড়ছে জনসংখ্যা। দ্রুত একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। ডুবে যাচ্ছে এক অস্তিত্বহীনতায়। বিপথগামী যুবকেরা সহজেই এর কবলে গিয়ে পড়ছে । এ নেশা আর ধনী সন্তানদের মধ্যেই সীমিত নয় । দারিদ্র্য, মধ্যবিত্ত সন্তানদের কাছেও এ নেশা দুর্নিবার। আমাদের দেশ এখন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার।
৪. হেরোইনের দ্রুত প্রসারের কারণ: এ নেশা আজ দাবানলের মতনই ছড়িয়ে পড়ছে ভারতের বিভিন্ন শহরে, গ্রামে-গঞ্জে । এর পেছনে আছে এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ড্রাগচক্র । সরকারের যাবতীয় প্রতিরোধও ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে । এর ব্যবসা চলছে চোরা পথে । আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও ড্রাগ ৫. আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ব্যবসার মধ্যে রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ । আফগান বিপ্লবের শুরু থেকেই ভারতে ড্রাগ চোরা চালানের শুরু । অতীতে বার্মা, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ বা ‘স্বর্ণ ত্রিভুজ’ । এই ‘স্বর্ণ ত্রিভুজ’-ই ছিল একদিন আন্তর্জাতিক ড্রাগ চোরা কারবারের স্বর্গ । ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হলে ‘স্বর্গ ত্রিভুজ’-এর স্বর্গ গেল ভেঙে আসর জমল নতুন জায়গায় । ‘স্বর্গ ত্রিভুজ’-ই এবার হলো ‘গোল্ডেন ক্রেসেন্ট’ । ইরাক, পাকিস্তান আর আফগানিস্তান নিয়েই ‘গোল্ডেন ক্রেসেন্ট’ । ড্রাগ পাচারের নতুন স্বর্গ। ‘স্বর্গ ত্রিভুজ’-এ ‘সি. আই. এ.’-র গোপন ভূমিকা ছিল । ‘গোল্ডেন ক্রেসেন্ট’-এও তার ভূমিকা সক্রিয়। পাকিস্তানে বেড়ে চলেছে বে-আইনী আফিমের চাষ । সেখানে কুয়েটা, পেশোয়ার, রাওয়ালপিণ্ডি ও ইসলামাবাদে রয়েছে হেরোইন তৈরির কুড়িটি কারখানা । ওই সব কারখানায় কাজ করেন ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞরা । এশিয়া মহাদেশে এখন ড্রাগ পাচারের নতুন কেন্দ্রই হলো ভারত । পৃথিবীর সব দেশেই ছড়িয়ে রয়েছে এই ড্রাগ-চক্রের শাখা-প্রশাখা ।
৬. প্রতিকার: হেরোইন আজ এক দুরারোগ্য ব্যাধির মতনই দেশের তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে। দিন দিনই বাড়ছে নেশাড়ুদের সংখ্যা। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা থেকে জানা যায় কলকাতায় এখন হেরোইন নেশাড়ুদের মোট সংখ্যা আটষট্টি হাজার পাঁচশ আঠারো, অর্থাৎ কলকাতার মোট জনসংখ্যার শতকরা ১.৬ । আজ এর ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করে প্রশাসন বিচলিত। অভিভাবক শিহরিত। চিকিৎসকরা দিশেহারা। আসক্তদের জন্যে খোলা হয়েছে ‘অ্যান্টি ড্রাগ সেল’ । কলকাতায় রয়েছে ‘অ্যান্টি ডোপ থেরাপি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’, ‘সামারিটানস চিকিৎসাকেন্দ্র’ । বাঙ্গালোরে আছে ‘নিভান্স’ । ভারতের বিভিন্ন শহরে এরকম আরও কিছু কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র আছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই স্বল্প । নেশাড়ুদের সংখ্যা বাড়ছে । বাড়াতে হবে চিকিৎসাকেন্দ্র । প্রশাসনিক নিয়মকানুনও প্রয়োজনমত রদবদল করা হচ্ছে । প্রায় প্রতিদিন ধরা পড়ছে কেজি কেজি হেরোইন। পুলিশ অভিযানও চালানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে জনগণও এগিয়ে আসছে। সচেতনতা বাড়ছে । জোরদার হচ্ছে প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর।
৭. উপসংহার: ড্রাগ এখন প্রত্যেক পরিবারের কাছেই এক নতুন অভিশাপ । প্রত্যেকের কাছেই এক মহা সর্বনাশের সঙ্কেত । কেউ জানে না কখন কে এর ছোবলে ঢলে পড়বে । জানে না কাকে সে ছিনিয়ে নেবে । তাই পোস্টারে, হোর্ডিং-এ, বিজ্ঞাপনে চলছে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজ। অথচ বিজ্ঞাপন আর প্রশাসন এর সমাধান নয় । এর সমাধান প্রত্যেকের সহানুভূতিতে, ভালোবাসায় । পথভ্রান্তদের জন্যে কোন অবজ্ঞা নয়, উপেক্ষা নয়। বরং, সকলের দরদ অসীম মমত্ববোধই পারে অকালে মৃত্যু পথযাত্রীকে আবার সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে। নেশাড়দের বিরুদ্ধে আজ সব বিবেকবান, সহৃদয় মানুষকে এক হতে হবে । চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে হবে মানুষ খুনের ষড়যন্ত্র ।
১. ড্রাগের বিরুদ্ধে
২. ড্রাগের সর্বনাশা প্রভাব ও প্রতিকার
৩. নেশাযুদ্ধের আর এক নাম ড্রাগ