রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা; ২. গঙ্গা দূষণ ও দূষণের কারণ ; ৩ দূষণের ফল ; ৪. দূষণ–মুক্তির কর্মসূচী ; ৫. উপসংহার ।
গঙ্গা দূষণ ও তার প্রতিকার
১. ভূমিকা: ভারত নদীমাতৃক দেশ। গঙ্গা তার প্রাণমন্ত্র । ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য । এর বিস্তীর্ণ এলাকায় গঙ্গা শ্রী ও সম্পদের সূত্র । সমগ্র দেশের এক-চতুর্থাংশ অঞ্চল এর জলধারায় সিক্ত। ভারতের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের আবাসভূমি এর অববাহিকা । এর তীরে অজস্র শহর, সমৃদ্ধ জনপদ আর মন্দিরময় তীর্থক্ষেত্র । ভক্তের কাছে পুণ্যতোয়া গঙ্গা পতিতপাবনী। মিশরে যেমন নীলনদ, রাশিয়ায় ভলগা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মিসিসিপি, ব্রাজিলে আমাজন, জার্মানীতে রাইন, ইংলন্ডে টেমস, চীনে ইয়াং-সি-কিয়াং, ভারতেও তেমনই গঙ্গা সভ্যতা-সংস্কৃতির অন্যতম উৎস।
২. গঙ্গা দূষণ ও দূষণের কারণ: কলুষনাশিনী গঙ্গা আজ নিজেই কলুষ-কবলিত । একদিন সে ছিল সর্বপাপহর । তার সেই উচ্ছল যৌবনের দিনগুলো আজ বিষণ্ণ এক স্মৃতিমাত্র। সেখানে আজ দূষণের অভিশাপ । ছড়িয়ে পড়েছে মৃত্যুর আতঙ্ক । তিনটি কারণে গঙ্গার জল দূষিত হচ্ছে । এক. গঙ্গার দুই তীরে অসংখ্য কলকারখানা । ফলে সেখানকার বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ নিয়মিত এসে জলে মিশছে। দুই. পৌরসভার পুরনো নর্দমা দিয়ে ক্রমান্বয়ে বহু আবর্জনা জলে এসে পড়ছে । তিন বন্দর-অঞ্চলে জাহাজে মাল ওঠানো-নামানোর সময় অনবধানতাবশতঃ জলে তেল মিশছে । বারাণসীতে এই দূষণ এক ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এক বছরেই বারাণসীর নালা-নর্দমা দিয়ে দশ কোটি লিটার দূষিত নোংরা জল গঙ্গায় মিশেছে । গঙ্গাতীরবর্তী মণিকর্ণিকা ও হরিশ্চন্দ্র শ্মশানঘাটে বত্রিশ হাজার মৃতদেহ দাহ হয়েছে । গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে দশ হাজার অর্ধদগ্ধ মৃতদেহ। ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে ষাট হাজার মৃত গবাদি পশু । একটি শহর থেকেই প্রতিবছর এভাবে দূষণের উপাদান গঙ্গায় মিশ্রিত হচ্ছে। এরপর আছে আরও অনেক ছোট-বড় অসংখ্য শহর । কানপুরে রয়েছে প্রচুর ট্যানারী কারখানা। সেখানকার বিষাক্ত বর্জ্য নিয়মিত গঙ্গাকে দূষিত করছে। পশ্চিমবঙ্গে দেড়শটি বড় ও বিভিন্ন ধরনের কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণে আবর্জনা প্রতিদিন গঙ্গায় মিশছে। সেই সঙ্গে এসে মিশছে ডি. ডি. টি., ডেলড্রিন, বি. এইচ. সি., আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম প্রভৃতি বিষাক্ত পদার্থ ।
৩. দূষণের ফল: অথচ গঙ্গা ছিল একদিন অমৃতদাত্রী। সেখানে আজ বিষ-প্রবাহ। সেই বিষাক্ত পদার্থ আমাদের শরীরের মধ্যে খাদ্য-শৃঙ্খলে নিয়ত প্রবেশ করছে। হ্রাস পেয়েছে গঙ্গার নাব্যতা । দ্রুত লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মৎস্য ও অসংখ্য জলজ প্রাণী। মুছে যাচ্ছে তার শ্যামল বিটপীঘন তটভূমি। গঙ্গার বুকে জাগছে অজস্র চর। সে আজ অবগাহনের অযোগ্য হয়ে উঠছে । শৈবাল-দামে ঘিরে ধরেছে । সেখানে রোগ-জীবাণুর আকর। তার বাণিজ্যিক ধমনী স্তব্ধপ্রায় ।
৪. দূষণ–মুক্তির কর্মসূচী: ১৯৮৫-র ১৬ই ফেব্রুয়ারী । ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ঘোষণা করলেন ‘কেন্দ্রীয় গঙ্গা অথরিটি’ গঠনের কথা। এর সদস্য-সংখ্যা নয়। পরিবেশ দফতরের সচিবদ্বয় এর আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে রইলেন। পরিবেশ দফতরের সচিবের নেতৃত্বে গঠিত হলো একটি পরিচালন কমিটি । গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার কাজ সরাসরি ন্যস্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছয় সদস্যের একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার গঙ্গা দূষণ মুক্ত করার পরিচালনার নাম দিয়েছেন ‘গঙ্গা-অ্যাকশন প্ল্যান’ । এই দূষণ প্রতিরোধে প্রথমে আড়াইশ কোটি টাকার একটি পাঁচসালা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। সপ্তম যোজনায় পশ্চিমবঙ্গের জন্য প্রথমে একশ কোটি, উত্তরপ্রদেশের জন্য একশ কুড়ি কোটি এবং বিহারের জন্য তিরিশ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল । পরে কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের জন্য একশ চৌত্রিশ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন । ‘গঙ্গা-অ্যাকশন প্ল্যান’-এ প্রথম পাঁচ বছরের জন্য বেছে নেওয়া হলো ২৯টি শহর । প্রথমেই গঙ্গামুখী ময়লানিকাশী নর্দমা বন্ধ করার কথা হলো। নতুন করে গঙ্গার ধার বরাবর ৫৪টি ময়লানিকাশী নালা তৈরির প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে । পুরনো নালার ময়লা এসে পড়বে ওই নতুন নালায় । সেখানে থাকবে বৃহদাকারের গভীর পাকা কূপ । সেই কূপে জমা হবে ময়লা । কূপগুলো থেকে পাম্প করে ময়লা জল টেনে পাইপের ভেতর দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ৫৪টি ময়লা-শোধন কারখানায় । ঘনবসতি এলাকাগুলোর জন্য প্রত্যেক শহরে দুটো করে নালা-কূপ-পাইপ-কারখানা কমপ্লেক্স তৈরি হবে। সর্বশেষ স্তরে থাকবে কারখানার কাজ । কারখানার নামকরণ হয়েছে ‘রিসোর্স রিসাইক্লিং ইউনিট’। এর মধ্যে থাকবে চারটি করে আলাদা উৎপাদন ব্যবস্থা ।
৫. উপসংহার: হতে পারে গঙ্গা ভক্তের কাছে পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণ । পাপীর কাছে পাপস্খলনের উপায় । কিন্তু এই সব নয় । গঙ্গা ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির অন্যতম লীলাক্ষেত্র । এক সমৃদ্ধ জনপদের আদি জননী । গঙ্গা দূষণের প্রতিরোধে আজ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে ।শুধু সরকারী পরিকল্পনা ও তার বাস্তব রূপায়ণই যথেষ্ট নয় । এর জন্যে আজ সর্বাগ্রে প্রয়োজন গণচেতনার । প্রয়োজন গণ-উদ্যোগের বিকাশ । ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’ সেই অনাগত দিনেরই শুভ সূচনা। উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরই একটি বলিষ্ঠ অঙ্গীকার ।