রচনা–সংকেত: ১. ভূমিকা ২. বিজ্ঞান ও যন্ত্র ৩. যন্ত্র ও সভ্যতার সমৃদ্ধি, ৪.যন্ত্র সভ্যতার অভিশাপ: ৫. অভিশাপের কারণ ৬. উপসংহার।
বিজ্ঞান ও যন্ত্র
১. ভূমিকা: যন্ত্র-বন্দনা দিয়েই আধুনিক যুগের শুরু। ‘নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র। যন্ত্রই এযুগের শক্তি। যন্ত্রই এ যুগের বিভীষিকা। মানুষ একদিন চেয়েছিল অমিত শক্তির অধিকারী হতে। চেয়েছিল যন্ত্রসাধনার মধ্যে দিয়ে প্রাকৃতিক দৈব-শক্তিকে বশ করতে চেয়েছিল রূপকথার দৈত্যের মতন অনস্ত শক্তিকে বন্দী করে তাকে প্রয়োজনমত ব্যবহার করতে। যন্ত্রের নতুন নতুন আবিষ্কার মানুষের সেই শক্তি সাধনারই সিদ্ধি। এই সিদ্ধি মানুষকে দিশেহারা করল। যন্ত্রের পেছনে ধাওয়া করতে করতে মানুষই একদিন বন্দী হলো যন্ত্র- শৃঙ্খলে।
২. বিজ্ঞান ও যন্ত্র: জ্ঞানই হলো মানুষের অনস্ত শক্তির উৎস। তার সকল অহঙ্কার। আর বিশেষভাবে সত্তাকে জানাই তো বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞানই মানুষকে দিয়েছে ভূগর্ভের অফুরান সম্পদ-সম্বারের সন্ধান। বিজ্ঞান ও যন্ত্র-শক্তির ছোঁয়াতেই মানুষ পাষাণী ভূমির ঘুম ভাঙিয়েছে। দিকে-দিগন্তরে ছড়িয়ে দিয়েছে সবুজ প্রাণের হিল্লোল। বিহঙ্গের মত পাখা মেলে দিয়েছে নীল আকাশের বুকে। মুঠোয় পুরেছে আকাশের ক্ষণবিদ্যুৎ। উত্তাল সমুদ্র -নদী-তরঙ্গকে করেছে শৃঙ্খলিত। মানুষের প্রয়োজনেই বিজ্ঞানের আবিষ্কার। মানুষের কল্যাণেই তার ব্যবহার। আর যন্ত্রই হলো এ-সব অসাধ্য সাধনের নেপথ্য শক্তি।
৩. যন্ত্র ও সভ্যতার সমৃদ্ধি: যন্ত্রই আধুনিক সভ্যতাকে আরও গতিময় করেছে। করেছে বিপুল বৈভবের অধিকারী। সভ্যতার ক্রমাগ্রসরতার পথে পথে মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিকে বশ করার মন্ত্র শিখেছে। শিখেছে নিজের প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতে। এমনি করেই পুরনো যুগ পেছনে সভ্যতার সমৃদ্ধি ফেলে মানুষ নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। একের পর এক সে পেরিয়ে এসেছে প্রস্তাব, ব্রোঞ্জ, তাম্র ও লৌহ যুগ। এরই মধ্যে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেল। মানুষের বিজ্ঞান-বুদ্ধি তার সামনে উন্মোচিত করে দিল এক অনিঃশেষ রত্নখনি। ইংলন্ডের শিল্প-বিপ্লব মানুষের সামনে খুলে দিল সম্ভাবনাময় এক নতুন যুগের। বয়নশিল্প, পরিবহণ ব্যবস্থায় এলো বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বেড়ে গেল নতুন নতুন যন্ত্রের উদ্ভাবন ও তার ব্যবহার। সৃষ্টিপ্রাচুর্যে দেশ গেল ভরে। বিলাস-সম্ভারে জীবন-যাপনে এলো বৈচিত্র্য উৎপাদন-প্রাচুর্য মানুষকে কর্মচঞ্চল করল। গড়ে উঠল নতুন নতুন জনপদ, কলকারখানা। যন্ত্রই মানুষের জন্যে শহর বানাল। শহরকে তিলোত্তমা করে সাজাল। মানুষের হাতে দিল জলে-স্থলে-মহাশূন্যে প্রভুত্ব করার ছাড়পত্র। যন্ত্রই দেশে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে। দূরকে নিকট করেছে। যন্ত্রই পরকে আপন করেছে। আধুনিক জীবনকে নানা বৈভবে ভরিয়ে দিয়েছে যন্ত্রই। তাই যন্ত্রই হয়েছে আধুনিক জীবনের প্রাণ-ভোমরা।
৪. যন্ত্র সভ্যতা অভিশাপ: সেই যন্ত্রই অতিব্যবহারে আজ মানুষের কাছে আতঙ্কের বিষয়। যে বিজ্ঞান একদিন মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিল এক যন্ত্রশিশু, সেই শিশুই আজ যৌবনের দুর্বার বিক্রমে, শাসন-অসংযমে, নিষ্ঠুর ত্রাসসঞ্চারে পরিণত হয়েছে যন্ত্রদানবে। মানুষের হাত থেকে আজ চলে গেছে যন্ত্র-শাসনের অধিকার। হৃদয়হীন যন্ত্রের হাতে মানুষ আজ খেলার পুতুল। যন্ত্র ধীরে ধীরে মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে আকাশের নীলিমা। মাঠ-প্রান্তরের শ্যামল সবুজ গেল হারিয়ে। বিশাল অরণ্যভূমি হলো উৎসাদিত। দূষিত হলো জল-মাটি-বায়ু। প্রকৃতির ভারসাম্যে আসন্ন ধ্বংসের ছায়াপাত। মানুষ আজ একান্তই যন্ত্র-নির্ভর। অতিমাত্রায় যন্ত্রানুগত্যে মানুষ আজ অলস, কর্মবিমুখ। যন্ত্র-নির্ভরতায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। যন্ত্র কুটির-শিল্পকে গ্রাস করেছে। হরণ করেছে শিল্পসৃষ্টির অবকাশ। মানবিক সম্পর্ক পরিণত হয়েছে নিষ্প্রাণ যান্ত্রিকতায়। যন্ত্র হাজার হাজার মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে। তৈরি করছে লক্ষ লক্ষ বেকার। শ্রমশক্তির চাহিদা কমছে। বাড়ছে সামাজিক সংকট, জীবনের রুক্ষতা।
৫. অভিশাপের কারণ: যন্ত্র ছিল একদিন মানুষের পরম সুহৃদ। ছিল সমুন্নত সভ্যতার অগ্রদূত। সেই যন্ত্রই আজ মানুষের চরম শত্রু, দানব-শক্তিতে রূপান্তরিত। এক শ্রেণীর মানুষই যন্ত্রকে দানবে পরিণত করেছে। তারা লোভী, স্বার্থপর। তারা পররাজ্যগ্রাসী, যুদ্ধবাজ। এরাই যন্ত্রকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। করেছে শোষণের হাতিয়ার। বিজ্ঞানী চেয়েছিলেন যন্ত্রকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে। মানবতাবিরোধী, অশুভ-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চেয়েছে তাকে ধ্বংসের কাজে লাগাতে। বিজ্ঞানী আজ যন্ত্রের হাতে বন্দী।
৬. উপসংহার: কিন্তু বিজ্ঞানীর আবিষ্কার থেমে থাকে না। যন্ত্রকে বাদ দিয়ে বর্তমান সভ্যতা অচল। আ নগর-জীবনের মোহ কাটিয়ে সেই আদি অরণ্য জীবনে ফিরে যাওয়া যায় না। যন্ত্রযুগের প্রভাব কাটানোও অসম্ভব। যন্ত্র যদি আজ মানুষের হৃদয়বৃত্তিকে গ্রাস করে, রুদ্ধ করে প্রাণের স্বভাবিক বিকাশের পথকে, তবে সেই দোষ মানুষের। একদিন মানুষের নিষ্প্রাণ যান্ত্রিকতার মোহমুক্তি ঘটবে। জাগ্রত হবে তার শুভবুদ্ধি সেদিনই মানুষ যন্ত্রকে নিজের বশে আনবে। ধ্বনিত হবে প্রাণের মহিমা। যন্ত্র সেদিন হবে শান্তি ও মৈত্রীর মৃত। বৃহত্তর মানবকল্যাণে হবে তার নতুন অভিযেক।