রচনা-সংকেত: ১. ভূমিকা; ২. মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞান: ৩. মানুষের ধ্বংস-সাধনে বিজ্ঞান: ৪. যান্ত্রিকতার অভিশাপ; ৫. উপসংহার।
বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ
১. ভূমিকা: সৃষ্টির আদি থেকেই জলে স্থলে মহাশূন্যে জমা হয়ে আছে অন্তহীন রহস্য। মানুষ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়েছে সেই রহস্যের দিকে। চেয়েছে প্রকৃত সত্যকে উদ্ঘাটন করতে। বিজ্ঞানী মগ্ন হয়েছেন সেই রহস্য ভেদ করার সাধনায়। ভেদ করেছেন রহস্যের আবরণ। বিজ্ঞানবুদ্ধিই হয়েছে মানুষের পরম সুহৃদ, সহায়। বিজ্ঞানসাধনা কল্যাণের সাধনা। বিজ্ঞান তাই মানুষের হাতে এনে দিয়েছে বিপুল ঐশ্বর্য সম্ভার। বিজ্ঞানই জীবনযাপনকে সমৃদ্ধ করেছে উপকরণ বৈচিত্র্যে। যুগে যুগে মানুষের ওপর ঝরেছে বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। কিন্তু সেই আশীর্বাদই একদিন রূপান্তরিত হলো অভিশাপে। কল্যাণ নিল অকল্যাণের চেহারা। বিজ্ঞান হলো বিভীষিকার বিষয়।
২. মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞান: বিজ্ঞানই একদিন মানুষের স্বপ্নকে সার্থক করে তুলল। মানুষ চেয়েছিল পাখির মতন নীল আকাশের বুকে পাখা মেলে উড়তে। উড়ল। চেয়েছিল পাতাল ফুঁড়ে মণিমাণিক্য তুলে আনতে। আনল। চেয়েছিল নদী-সমুদ্রের বুকে ভাসতে। ভাসল। মেঘের কোল থেকে ছিনিয়ে আনল বিদ্যুৎ। বন্দী করল উচ্ছ্বসিত জলপ্রবাহকে। বশে আনল প্রাকৃতিক শক্তিকে। ঊষর ভূমিকে ভরিয়ে দিল শ্যামল সবুজে। বিজ্ঞানই ধরণীকে শস্যময়ী করেছে। মরুভূমির ঘুম ভাঙিয়েছে। বানিয়েছে নতুন শহর বন্দর। ধরিত্রীকে সাজাল তিলোত্তমা সাজে। জীবনযাপনে এলো বৈচিত্র্য। কলে-কারখানায় বাড়ল উৎপাদন। মাঠে-প্রান্তরে লাগল সবুজের শিহরণ। নতুন নতুন যানবাহন সভ্যতাকে গতিময় করল। বিজ্ঞানই দূর-দূরান্তের খবর নিয়ে এলো মানুষের কাছে। জ্ঞানভাণ্ডারে জমল নানা মনীষীর সাধনার ধন। বিজ্ঞানের মন্ত্রেই বশ মেনেছে রোগ মহামারী। বিজ্ঞানই প্রতিদিনের জীবনকে ভরিয়ে দিয়েছে নানা সার্থকতায়।
৩.মানুষের ধ্বংস সাধনে বিজ্ঞান: বিজ্ঞান মানুষকে দিল অমিত শক্তির সন্ধান। বিজ্ঞানী বসলেন সেই মহাশক্তির সাধনায়। সেই শক্তি-আরাধনায় বিজ্ঞান-তাপস পেলেন আরো বিস্ময়কর এক মহাশক্তির উৎস। নাম তার পরমাণু শক্তি। বিজ্ঞানী চেয়েছেন এই মহাশক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে। কিন্তু মানুষের দুর্বুদ্ধি একে ধ্বংসের কাজে লাগাল পরমাণু শক্তিকে পরিণত করল আধুনিক সমরাস্ত্রে। জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমার ওপর প্রথম বিস্ফোরণ ঘটল পরমাণু বোমার। এর ধ্বংসের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ স্তম্ভিত হলো। দিকে দিকে উচ্চারিত হলো ধিকার বাণী। আর স্বার্থপর, যুদ্ধবাজ ও মানবতাবিরোধী মানুষ হলো উল্লসিত। এই বোমার বিধ্বংসী অগ্ন্যুৎসবে হাজার হাজার মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। লক্ষ লক্ষ মানুষ হলো অর্ধমৃত, পঙ্গু। প্রাণচঞ্চল শহর হলো মহাশ্মশান। ক্ষমতালিশ নিষ্ঠুর মানুষ বিজ্ঞানকে আজ সমর-উপকরণে সজ্জিত করেছে। হিটলারের গ্যাস চেম্বারে নিহত হয়েছিল অজস্র ইহুদী। আজও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে নিহত হচ্ছে কত শত নিরীহ প্রাণ। চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আরব ও বিশ্বের বিভিন্ন রণাঙ্গনে চলছে আধুনিক সমরোপকরণের নির্বাধ ব্যবহার। শোনা যাচ্ছে মহাকাশ যুদ্ধের হুঙ্কার। আজ মুহুর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে গোটা দুনিয়া। আকাশে-বাতাসে-জলে-স্থলে ক্রমেই বিষের পরিমাণ বাড়ছে। বিজ্ঞানকে তাই কখনও কখনও মনে হয় এক মহাধ্বংসের আতঙ্ক।
৪.যান্ত্রিকতার অভিশাপ: বিজ্ঞানই যন্ত্রের স্রষ্টা। যন্ত্র হলো ঠিক আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্যের মতন। আদেশ করলেই মুহুর্তের মধ্যে সেই যন্ত্রদানব অসাধ্য সাধন করতে পারে। আকাশ-বাতাস-মর্তে তার অবাধ আধিপত্য। যন্ত্র মানুষের কাছে এনে দিয়েছে ভোগবিলাসের নানা উপকরণ। যন্ত্রকে মানুষ ব্যবহার করেছে নিজের প্রয়োজনে। দিনদিনই সেই প্রয়োজনের মাত্রা বেড়েছে। বেড়েছে যন্ত্রের প্রাধান্য। যন্ত্র ধীরে ধীরে মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে শাসনের অধিকার। নিষ্প্রাণ যান্ত্রিকতা তাকে গ্রাস করেছে। হৃদয়বৃত্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। হিংসা- স্বার্থপরতা- পরশ্রীকাতরতা সেই জায়গা দখল করছে। আচ্ছন্ন করছে কৃত্রিমতা। যান্ত্রিকতাও বিজ্ঞানের আর এক অভিশাপ।
৫. উপসংহার: কিছু স্বার্থপর, ক্ষমতালোভী মানুষ বিজ্ঞানের সাধনাকে করেছে প্রভুত্ব বিস্তারের হাতিয়ার। তাদের হাতে পড়ে বিজ্ঞান হয়েছে সংহারের প্রতিমূর্তি। মানুষের ওপর নেমে এসেছে এক সর্বগ্রাসী যান্ত্রিকতার অভিশাপ। বিজ্ঞান হলো কলঙ্কিত। রণমদে মত্ত মানুষ দুনিয়াকে মুঠোয় পুরতে চাইল। তার জন্যে চলল নতুন নতুন মারণাস্ত্রের প্রস্তুতি। ধ্বংসের কাজে লাগাল পরমাণু শক্তিকে। পরমাণু যুদ্ধই হবে পৃথিবীর শেষ যুদ্ধ। মানুষের বিকৃত বিলাসেই কল্যাণপ্রস্ বিজ্ঞান হয়েছে মহাবিশ্বের মহাত্রাস। মানুষের মধ্যে চলছে শুভ-অশুভ, সু-কু-এর নিরন্তর লড়াই। সেই প্রয়োগ-পদ্ধতিই নির্ধারণ করে বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ। মানুষের অন্তরে পাতা আছে মঙ্গলের দেবতার আসন। একদিন সেই দেবতারই হবে জয়।