রচনা-সংকেত: ১. ভূমিকা; ২. জন্ম ও বংশ-পরিচয়; ৩. বিদ্যাশিক্ষা; ৪. চাকরি জীবন; ৫- সমাজ-সংস্কারকের ভূমিকায়; ৬- সাহিত্য-কীর্তি; ৭. উপসংহার।
দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর
১. ভূমিকা: সংসারে এমন এক-একজন মানুষ আছেন যাঁদের বিরাটত্বের কোন পরিমাপ হয় না । বিদ্যাসাগর এমনই এক বিরাট মানুষ! আকাশের মতই তিনি বিশাল। হিমালয়ের মতই উন্নত-শীর্ষ। সমুদ্রের মতই গভীর। তিনি ‘বীরসিংহের সিংহশিশু’ই নন, তিনি ‘করুণার সিন্ধু’ বিদ্যাসাগর। তিনি ‘পান্ডিত্যে আসামান্য, বাক্যালাপে সুরসিক, ক্রোধে উদ্দীপ্ত, স্নেহরসে আর্দ্র, মতে নিৰ্ভীক, হৃদয়ভাবে অকপট এবং পরহিতৈষায় আত্মবিস্মৃত।”
২. জন্ম ও বংশ–পরিচয়: ১৮২০ সাল। ২৬ শে সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রাম। জন্ম নিলেন বীরসিংহের সিংহশাবক ঈশ্বরচন্দ্র। দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবার। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। মাতা করুণার প্রতিমূর্তি ভগবতী দেবী। পিতামহ বলিষ্ঠ, উন্নত-চরিত্র, অনন্য-সাধারণ রামজয় তর্কভূষণ। অজেয় পৌরুষ আর অক্ষয় মনুষ্যত্বের মহৎ উত্তরাধিকার নিয়েই নবজাতকের আবির্ভাব।
৩. বিদ্যাশিক্ষা: বিদ্যাসাগর ছিলেন খুবই মেধাবী ও প্রতিভাবান। আট বছর বয়সে পায়ে হেঁটে পিতার সঙ্গে তাঁর প্রথম কলকাতায় আগমন। পাঠশালায় ভর্তি। ন’বছর বয়সে ভর্তি হলেন সংস্কৃত কলেজে। পড়াশুনোয় কোন শৈথিল্য নেই। প্রতিকূলতাকে জয় করার দুর্জয় জেদ। দারিদ্র্য হলো তাঁর ভূষণ। প্রতি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার। বৃত্তিপ্রাপ্তি। অসামান্য কৃতিত্ব দেখালেন ‘হিন্দু-ল’ কমিটির পরীক্ষায়। ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে হলে অভিনন্দিত। শুধু সংস্কৃত নয়, ইংরেজীও শিখেছিলেন কঠোর অধ্যবসায়ে। শেষ হলো জীবনের প্রস্তুতি-পর্ব।
৪. চাকরি জীবন: শুরু হলো তাঁর চাকরি জীবন। প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত। পরে সংস্কৃত কলেজে যোগদান। সাহিত্যের অধ্যাপক। পরে ওই কলেজেরই অধ্যক্ষ-পদ গ্রহণ। সময় ১৮৫১ সাল। এখানেও তাঁর আপসহীন সংগ্রাম। সংস্কৃত কলেজে তখন ব্রাহ্মণ সন্তানেরই ছিল প্রবেশাধিকার। তিনি জাতিগত ও বর্ণগত বৈষম্য দূর করে সকলের প্রবেশাধিকারের পথ উন্মুক্ত করে দিলেন। সেই সঙ্গে কাঁধে নিলেন স্কুল-পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্বভার। আট বছর কাজ করেছিলেন সংস্কৃত কলেজে। শিক্ষাবিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে মনান্তর ঘটল। ১৮৫৮ সালে চাকরি ছাড়লেন। প্রবেশ করলেন বৃহত্তর কর্মজীবনে।
৫. সমাজ–সংস্কারকের ভূমিকায়: এবার জীবনের আরও বৃহত্তর ডাকে তিনি সাড়া দিলেন। তিনি ছিলেন ‘দয়ার সাগর’। সেই সাগরে উঠল করুণার ঢেউ। তাঁর দয়া তো প্রবৃত্তির ক্ষণ-উত্তেজনা মাত্রই ছিল না, ছিল বীর্য ও কঠিন অধ্যবসায়ে মেশানো। তাঁর কারুণ্য বলিষ্ঠ পুরুষোচিত। কৌলিন্য ও বহু বিবাহ প্রথা তখন এক সামাজিক ব্যাধি। সমাজের আনাচে কানাচে ব্যভিচারের মত্ততা। ঘরে ঘরে বৈধব্যের সকরুণ ছবি। তিনি অস্থির হলেন। খুঁজে বের করলেন বিধবা বিবাহের শাস্ত্রীয় সমর্থন। রক্ষণশীল সমাজ গর্জে উঠল। গড়ে তুলল প্রতিরোধ। চেষ্টা করল তাঁর প্রাণ-সংহারের। তিনি যুক্তিতে অবিচল। কর্তব্যে স্থিরসঙ্কল্প। অবশেষে বিধবা বিবাহ বিধিবদ্ধ হলো। সময় ১৮৫৬ সাল। বিধবা বিবাহ প্রবর্তন তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। বাল্যবিবাহ নিবারণও ছিল তাঁর জীবনের এক মহান ব্রত। শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রেও ছিলেন তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। শুধু পুরুষ-সমাজেই নয়, নারী-সমাজেও শিক্ষাবিস্তার ছিল তাঁর সমাজ-সংস্কারের অন্যতম প্রধান কীর্তি। বিদ্যাসাগরই ইংরেজী শিক্ষাকে এদেশে স্থায়ী করার জন্যে প্রথম ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৬. সাহিত্য–কীর্তি: বিদ্যাসাগরই প্রথম ‘বাংলা ভাষার যথার্থ শিল্পী’। ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘সীতার বনবাস’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘শকুন্তলা’, ‘বর্ণ পরিচয়’ প্রভৃতি গ্রন্থ ভাষা শিক্ষার ও আদর্শ গদ্যের নিদর্শন। তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি এক অসাধারণ প্রাণসমৃদ্ধ, শিল্প-সুষমায় ভরা। তিনিই বাংলা গদ্যকে প্রথম অনাবশ্যক সমাসাড়ম্বর থেকে মুক্তি দিয়েছেন। গদ্যকে করেছেন গতিময়। গদ্যের মধ্যে অলক্ষ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন এক ছন্দ-স্রোত। ‘সৌম্য ও সরল’ শব্দ দিয়ে সাজিয়েছেন বাংলা গদ্যকে ।
৭. উপসংহার: অবশেষে এলো সেই গভীর বিষাদের দিন। ১৮৯১ সালের ২৯ শে জুলাই। সেদিনও শ্রাবণ রাত্রির ঘন ঘোর অন্ধকার। সেই অনন্ত অন্ধকারের পথেই যাত্রা করলেন শতাব্দীর এক স্মরণীয় পুরুষ। নিবে গেল এক অনির্বাণ দীপশিখা। জাতি হারাল তার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। তিনিই একদিন বঙ্গভূমিতে রোপণ করে গিয়েছিলেন মহৎ চরিত্রের এক অক্ষয় বট। যথার্থই ‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’
📝 অনুসরণে লেখা যায়
১. করুণাসাগর বিদ্যাসাগর
২. সমাজ-সংস্কারক বিদ্যাসাগর
৩. তোমার আদর্শ মহাপুরুষের জীবনচরিত