নারীরূপেণ সংস্থিতা
Nari Rupena Samsthita Rochona Bengali
“জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য-লক্ষ্মী নারী,
সুষমা লক্ষ্মী, নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি।”
নারী—সর্বভূতেষু সংস্থিতা।’ সৃষ্টির অর্ধেক আকাশ। বিশ্বায়নে, সভ্যতার আলোকায়নে, প্রগতিতে, শিক্ষা-শিল্প-কর্ম-সাহিত্য-ক্রীড়া এমনকি অসুর শক্তির আগ্রাসনে সসাগরা পৃথিবী যখন অসহায় তখন রণাঙ্গনে — সর্বত্রই নরদেবতার সহযোগীরূপে, সহকারীরূপে নারীর অবস্থান। কিন্তু এ কী শুধু তত্ত্বকথা! আসলে সৃষ্টির আদিকাল থেকে বর্তমান সময়ে—নারীর অন্দরমহল কখনও থেকেছে আলোয়, কখনো-বা অন্ধকারে। প্রাচীন ভারতের সমাজব্যবস্থায় যখন পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা বা রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়নি তখন সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সমাজে নারী-পুরুষের ছিল সমান অধিকার। প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক যুগে প্রতিভাত গার্গী, লোপামুদ্রা, অপালাদের মতো প্রজ্ঞাবান নারীদের কথা। কিন্তু রাষ্ট্রের উৎপত্তি, ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা বৃদ্ধি মাতৃতান্ত্রিক সমাজকে রূপান্তরিত করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। নারীর স্বাধীন সত্তা অবদমিত করে তাঁকে রূপান্তরিত করা হয় অন্তঃপুরচারিণীতে। শাস্ত্রের ভয়, সমাজবিধির ভয়, নারীকে বিদ্যা-শিক্ষা- শিল্পকর্ম-প্রগতির প্রতিটি প্রান্ত থেকে সরিয়ে এনে অজ্ঞানতার অন্ধকূপে বন্দি করে ফ্যালে। কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে হারিয়ে যায় নারী পৃথিবী।
ফরাসি বিপ্লব আলো এনেছিল ইউরোপীয় নারীসমাজে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ নারীজাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। রামমোহন, বিদ্যাসাগরেরা গোঁড়ামির রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়েও রদ করলেন বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, সতীদাহের মতো কুপ্রথা। বিধবাবিবাহ প্রবর্তিত হল। নারীশিক্ষার স্বার্থে ইংরেজ শক্তির সহায়তায় অগ্রসর হলেন যুগমনীষীরা। শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্যে জন্মান্তর ঘটল নারীর। এখন নারীশিক্ষা বাধ্যতামূলক। শুরু হয়েছে বিবিধ সব নারী প্রকল্প ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ থেকে শুরু করে কন্যাশ্রী, স্বনির্ভরতার শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা— লক্ষ্মীর ভাণ্ডার—লক্ষ্য নারী প্রগতি।
অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে, পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সভ্যতার জয়যাত্রায় নারীর পদক্ষেপের প্রাথমিক পথটা মসৃণ ছিল না। প্রাচীনপন্থীদের বজ্রমুষ্টি, শ্লেষ, ব্যঙ্গ, দুরাচার –প্রতিমুহূর্তে বাধা দিতে লাগল মেয়েদের। আজ অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেও নারীর ক্ষমতায়নের শতসহস্র গৌরবোজ্জ্বল গাথা রচিত হওয়ার পরেও প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে সংবাদপত্রে, টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ-এ, সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজ ফিডে নারী নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে।
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নারীর সাফল্যের ইতিহাস আজ মর্ত্যপৃথিবী ছাড়িয়ে যাত্রা করেছে সুদূর মহাকাশেও। সূর্য-চন্দ্র বিজয়ে ছুটেছে যে রথচক্র, সেই রথের রশি ধরেছে মেয়েরাও। ভারতের কল্পনা চাওলা থেকে ঋতু কারিধাল শ্রীবাস্তব স্বপ্নভঙ্গ থেকে স্বপ্নজয়ের গল্পবুনন চলছেই।
দুর্ধর্ষ ইংরেজ শক্তির বন্দুকের সামনে একদিন বুক পেতে দিয়েছিল ঝাঁসির রানি থেকে মাতঙ্গিনী হাজরা বা প্রীতিলতারা। তাদের রক্তবিন্দুতে যে ভারতবর্ষ অধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়েছিল, সে দেশের প্রথম নাগরিক, রাষ্ট্রনিয়ন্তাও আজ একজন নারী। ভারতীয় সভ্যতার সনাতন ঐতিহ্যরক্ষায়, আপামর ভারতবাসীর অতন্দ্রপ্রহরায় অগ্নিকুণ্ড থেকে উত্থিত যেন এক যাজ্ঞসেনী – দ্রৌপদী মুর্মু, সীমান্তের প্রহরীরূপেও বিরাজিত আজ শত শত নারী।
দিনের আলো ফুটতেই ‘ব্যাটন’ হাতে তার দৌড় শুরু। সুখীগৃহকোণ হতে দৌড় দৌড় দৌড়। দৌড় থামছে যখন finishing point-এ, তখন হয়তো রচিত হচ্ছে বিশ্বক্রীড়াঙ্গনে অন্য এক রেকর্ড। খাবার প্লেটে ঠিক সময়ের খাবারটা থেকে ব্যাডমিন্টনের কোর্টে শাটলকক সার্ভ—নারীর পদকপ্রাপ্তি অপ্রতিরোধ্য। জ্যোতির্ময়ী শিকদার, বুলা চৌধুরীদের সেকাল থেকে শুরু করে আজকের ঝুলন গোস্বামী, পিভি সিন্ধু, মেরি কম কিংবা সাম্প্রতিকতম অলিম্পিকে সদ্য পদকপ্রাপ্ত মনু ভাকার—’ফাইট’ ঘর থেকে ক্রীড়াক্ষেত্রে।
দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতশৃঙ্গ থেকে অনতিক্রম্য মহাসমুদ্র কিংবা আকাশগাং বাচেন্দ্রি পাল থেকে আরতি সাহা কিংবা প্রথম বাঙালি মহিলা পাইলট দুর্বা ব্যানার্জি— জল-স্থল-অন্তরীক্ষে নারী অপ্রতিরোধ্য। দুর্গম রেলপথে যাত্রী নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন সুরেখা যাদব।
রাসসুন্দরী দেবী, স্বর্ণকুমারী দেবী, আশাপূর্ণা-মহাশ্বেতার ভুবন থেকে আজকের তিলোত্তমা মজুমদার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, মল্লিকা বা মন্দাক্রান্তারা সাহিত্যের অঙিনায় সময়ের সার্থক কথাকার হয়ে উঠেছেন। সুরের মূর্ছনায় বিশ্বমনের দরবারে কড়া নেড়েছেন লতা মঙ্গেশকর, শ্রেয়া ঘোষালদের সর্বভারতীয় ক্ষেত্র থেকে শুরু করে বাংলার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা, কণিকা, সুচিত্রা মিত্র-এর সময় পেরিয়ে কৌশিকী, শ্রাবণী সেনের মতো বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞরা। চলচ্চিত্রের রূপোলি পর্দায় যেমন বাঙালির মহানায়িকা সুচিত্রা সেন পেরিয়ে এসেছেন কালের গণ্ডি, কালজয়ী মধুবালা, নার্গিশ থেকে বিদ্যা, দীপিকা কিংবা বাংলার ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তরা। তেমনই রুপোলি পর্দায় রুপোলি গল্প সাজিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন বাংলার অপর্ণা সেন কিংবা নন্দিতা রায় কিংবা অস্কারজয়ী ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ভানু আথাইয়া। সাবিত্রী জিন্দাল থেকে ফাল্গুনী নায়ার কিংবা গজলে আলাঘ-বাণিজ্যেও শীর্ষস্থানে নারী।
স্বয়ং মনু যে নারীকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন কেবল পরের গলগ্রহরূপে, আজ স্বনির্ভর সেই নারী কেবল গর্ভেই নয় বিদ্যায়, বুদ্ধিতে, শক্তিতে ধারণ করেছে গোটা মানবসভ্যতাকে। তুলসীতলায় সাঁঝবাতি প্রজ্বলন থেকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োগে নিভে যাওয়া জীবনদীপ জ্বালিয়েছেন নারীরাও। পরনের শাড়ির কুচি থেকে কারুকাজপূর্ণ শাড়ির নকশা তৈরি, হেঁশেলের আলো-আঁধারিতে ডালের ফোড়ন থেকে মাস্টার শেফ, হাতা-খুস্তি থেকে গাড়ির স্টিয়ারিং কিংবা এ কে ফটিসেভেন-কন্যাভ্রুণ থেকে দশভুজা নারী-অশুভ দমনে, শিষ্টের পালনে, সৃষ্টির লালনে নারীই শক্তি। তাই তার দিকে চেয়ে আজ গোটা বিশ্ব বলছে-“অগ্নিপথে, যুদ্ধজয়ে, লিঙ্গসাম্যে, শ্রেণিসাম্যে, দাঙ্গাক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্রে মা তুঝে সালাম।”