জগন্নাথের প্রাণ প্রতিষ্ঠায় আলোকিত দিঘা
Jagannather Pran Pratishthay Alokito Digha Rochona Bengali
“হে মোর চিত্ত, পুণ্যতীর্থে জাগো রে ধীরে”— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেশটার নাম শুধু ভারতবর্ষ বললে হয়তো তার স্বরূপ চেনা যায় না। তাই গুরুদেব এই দেশকে বলেছিলেন ‘ভারততীর্থ‘। যে তীর্থে পূজিত হন মূর্তিমাত্র নয়, স্বয়ং নরদেবতা, তাই ‘দেবতারে প্রিয় করি‘ নানা ভাষা, নানা জাতির এই ভারতে গড়ে উঠেছে শত সহস্র ধাম। দেবতার আলয়ে বৈষম্য নয়, এ দেশ শিখিয়েছে মিলনের প্রেমগাথা। তাই তো দরগায় চিরাগ জ্বলেছে আবার মা দুর্গার চালচিত্রে মিলেমিশে গিয়েছে সমগ্র ভারতবর্ষ। মন্দির–মসজিদ–গীর্জার স্থাপত্যে জাতি–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে সকল শিল্পীর কারিগরি ফুটে উঠেছে। পুণ্যভূমি এই ভারততীর্থের মানচিত্রে গত ৩০ এপ্রিল, ২০২৫ আনুষ্ঠানিকভাবে সংযোজিত হয়েছে আরও এক ধাম—অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যলগ্নে পশ্চিমবঙ্গের সৈকতশহর দিঘায় দ্বারোদ্ঘাটন হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত জগন্নাথ মন্দিরের। পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই স্বপ্নের প্রকল্পটি প্রথম ঘোষিত হয় ২০১৮ সালে। পরিকল্পনা ছিল দীঘায় অবস্থিত পুরোনো জগন্নাথ মন্দিরের স্থানটিতেই পুরীর মন্দিরের আদলে নতুন এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হবে। যদিও পরবর্তীকালে দিঘা স্টেশনের পাশে দিঘা–শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদ মন্দিরের জন্য ২০ একর জমি প্রদান করে। এই জগন্নাথ মন্দিরটি নির্মাণকার্যের দায়িত্বে ছিল হিডকো।
দিঘায় নবনির্মিত এই জগন্নাথধামের চারটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। সিংহদ্বারে রয়েছে কালো রঙের ৩৪ ফুট দীর্ঘ ও ১৮ মুখী অরুণ স্তম্ভ। মন্দিরের উত্তর দিকে রয়েছে হস্তিদ্বার আর দক্ষিণে রয়েছে অশ্বদ্বার। সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে দর্শন পাওয়া যাবে জগন্নাথ মহাপ্রভুর। এ ছাড়া রয়েছে তিনটি দ্বীপস্তম্ভ। ভোগমণ্ডপে রয়েছে মোট চারটি দরজা। নাটমন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে চারটি স্তম্ভের উপর। আর নাটমন্দিরের সেই চারটি স্তম্ভের উপর দণ্ডায়মান আছেন জগমোহন আর গর্ভগৃহের সিংহাসনে বিরাজ করছেন নিমকাষ্ঠনির্মিত বলভদ্রদেব, ভগিনী সুভদ্রা এবং স্বয়ং জগন্নাথ। এদিকে ভোগমণ্ডপ এবং নাটমন্দিরের মাঝে রয়েছে গরুড় স্তম্ভ। নাটমন্দিরের দেওয়ালে কালো পাথর দ্বারা তৈরি হয়েছে দশাবতার।
অন্যদিকে মহাপ্রভুর ভোগ রান্নার জন্য তৈরি হয়েছে বিরাট ভোগশালা। পুরীর মতোই এখানেও রয়েছে ৫৬ ভোগের আয়োজন এবং সুক্কা ও পাক্কা— দু‘ধরনের ভোগ অর্পিত হবে। তবে খাজার পরিবর্তে দিঘার জগন্নাথধামে থাকবে প্যাড়া ও গজার সম্ভার। মন্দিরের নিত্যপুজোর ভার থাকছে ইসকনের হাতে।
এবার আসা যাক মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর প্রসঙ্গে। কলিঙ্গ স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত দিঘার এই জগন্নাথ মন্দিরের উচ্চতা ৬৫ মিটার। মন্দিরটিতে রয়েছে একটি বিশাল মিনারও। রাজস্থানের বংশী পাহাড়ের বিখ্যাত বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত হয়েছে মন্দিরটি। মন্দিরগাত্রের নকশা, ভাস্কর্যেও প্রতিফলিত হয়েছে ভারতবর্ষের একাধিক রাজ্যের নানাবিধ কারুকলার সমন্বয়ের রূপটি।
৩০ এপ্রিল (২০২৫) মন্দিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও মন্দিরে যজ্ঞানুষ্ঠান শুরু হয়েছিল ২৪ এপ্রিল থেকে। ২৯ এপ্রিল মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় ‘মহাযজ্ঞ’। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অন্যতম প্রধান সেবায়েত রাজেশ দয়িতাপতির নেতৃত্বে পুরোহিতেরা নিমকাষ্ঠনির্মিত জগন্নাথের বিগ্রহতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন। আর পাথরের তৈরি জগন্নাথ মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন ইসকনের সেবায়েতরা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে (দুপুর ৩টে থেকে ৩টে ১৫ মিনিট) এরপর দ্বারোদ্ঘাটন হয় এই পবিত্র ধামের
ওড়িশার শ্রীক্ষেত্র পুরীর জগন্নাথ ধামের টানে বছরভর বহু পুণ্যার্থী ছুটে আসে সারা পৃথিবীপ্রান্ত থেকে। পশ্চিমবঙ্গে কিছু বছর পূর্বেই পর্যটন মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে নবনীলাচল মাহেশ, যার ইতিহাসও শতাব্দী প্রাচীন। এবার সেই মানচিত্রে আরও একটি নতুন সংযোজন— যে তীর্থ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নয়, বরং সকলকে আহ্বান জানায় এইভাবে—
“এসো হে আৰ্য, এসো অনার্য, হিন্দু–মুসলমান।
এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খৃস্টান।”
হ্যা, ‘সবারে–পরশে–পবিত্র–করা তীর্থনীরে‘-ই পবিত্র দিঘার জগন্নাথ ভূমি; এ কেবল মন্দিরমাত্র নয়, এই তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠুক মানবতার বাসভূমি।