ক্রিকেটে ভারতীয় নারীদের বিশ্বজয়
Crickete Bharatiya Narider Bishwajoy Rochona Bengali
২০২৩-এর অধরা স্বপ্নকে ছুঁয়ে ক্রিকেটে বিশ্বজয় ভারতের মেয়েদের। টিম ইন্ডিয়ার এই ঐতিহাসিক জয় আসলে ভারতীয় ক্রিকেটের উত্তরণ। ২০২৫ ওডিআই বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল নভি মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে। সমগ্র ভারতবাসীর রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা এবং অনাবিল উৎসাহ ফাইনালের দিন মাতিয়ে রেখেছিল মুম্বইয়ের মাঠ, যার সাক্ষী ছিলেন শচীন তেন্ডুলকার, রোহিত শর্মা, ঝুলন গোস্বামী, মিতালী রাজের মতো ক্রিকেট তারকারা।
ফাইনাল ম্যাচের শুরুতে টসে হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমেছিল ভারত। কিন্তু ওপেন করতে নেমেই শেফালি বর্মা ও স্মৃতি মন্ধনার জুটি ঝড়ের গতিতে তুলে ফেলে একশোটি রান, যা ম্যাচটিকে এক অনন্য মাত্রা দেয়। তবে বিপক্ষ দলের ডানহাতি বোলার আয়াবোঙ্গা খাকা দ্রুত আঘাত হানলে দক্ষিণ আফ্রিকা যেন খানিক ছন্দে ফেরে। শেফালি বর্মা এবং সেমিফাইনাল ম্যাচের অন্যতম কান্ডারি জেমিমা রড্রিগেজের মতো দুই দুর্দান্ত প্লেয়ার পিচে ধাতস্থ হওয়ার আগেই তাদের আউট করে ভারতীয় দলের খেলার ছন্দ হঠাৎ করে থমকে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। তারপর ভারতীয় টিমের রাশ ধরে ‘প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট‘ দীপ্তি শর্মা। দীপ্তির প্রহরায় বাংলার ঘরের মেয়ে রিচা ঘোষ ২৪ বলে ৩৪ রান ছিনিয়ে নিয়ে বাড়িয়ে দেয় বিপক্ষ টিমের রানের টার্গেট। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার নাদিন ডি ক্লার্কের বোলিং শেষ ওভারে ভারতকে দেয় মাত্র ছয় রান। দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে ২৯৯ রানের টার্গেট রেখে ভারতীয় টিম তাদের ব্যাটিং শেষ করে।
এরপর ওভার শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার। প্রথমে মাঠে নামেন দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ক্যাপটেন লরা উলভার্ট। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স বজায় রেখে তিনি ক্রিজে টিকেছিলেন বহুক্ষণ। দলের জন্য ৯৮ বলে ১০১ রান ছিনিয়ে নেন উলভার্ট। তবে তাজমিন ব্রিটস ও অ্যানিকবসকে মাঠের বাইরে পাঠাতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি ভারতীয় দলকে। এরপর সুন লুস এবং লরার যুগ্ম প্রচেষ্টায় উঠে আসে অর্ধশত রান। দক্ষিণ আফ্রিকার এই অভাবনীয় পারফরম্যান্স দেখে একটা সময়ে মনে হচ্ছিল তারাই হয়তো শেষ হাসিটা হাসবে। কিন্তু ঠিক এই টানটান উত্তেজনাপূর্ণ সময়েই ভারতীয় অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর আচমকা বল করতে নামান শেফালি বর্মাকে। গত বছর খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য দল থেকে বাদ পড়েছিলেন তিনি। হঠাৎই ভারতীয় ওপেনার প্রতীকা রাওয়াল পায়ে কঠিন চোট পাওয়ায় তাঁর জায়গায় মাঠে নামেন শেফালি তবে যেন শাপে বর হয়। দুরন্ত কামব্যাকে উলভার্ট এবং লুসের পার্টনারশিপ ভেঙে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন তিনি। তাঁর দুর্ধর্ষ পারফরম্যান্সে বাড়তে থাকল রান রেট। প্রথম ২০ ওভারে যেখানে অনায়াসেই ১১৪ রান তুলে ফেলেছিল সাউথ আফ্রিকা, সেখানে পরবর্তী ২০ ওভারে রান পৌঁছায় মাত্র ২০৯–এ। ফলে ক্রমশ চাপের মুখে পড়তে থাকে সাউথ আফ্রিকা। একসময় কার্যত থমকে যায় স্কোরবোর্ড, পরপর পড়তে থাকে উইকেট। তবে ভারতের সাফল্য নির্ধারিত হয়ে যায় যখন নাদিন ডি ক্লার্ক রান আউট হন দীপ্তি শর্মার কাছে। এরপর ভারতের দরকার ছিল আর মাত্র একটি উইকেট। মাঠে নামেন বিপক্ষীয় দলের আয়াবোঙ্গা খাকা। ম্যাচের অন্তিমতম পর্বে ক্যাপটেন হরমনপ্রীতের দুর্ধর্ষ ক্যাচে বিশ্বজয় সুনিশ্চিত হয় ভারতের।
ভারতের এটি চতুর্থ ওডিআই বিশ্বকাপ ফাইনাল। এর আগে তিনটি ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে ভারতকে মাঠ ছাড়তে হলেও ভারতীয় খেলোয়াড়দের দৃঢ় সংকল্প, অসাধারণ টিমওয়ার্কের জোরে অবশেষে 2025-এ বিশ্বজয়ের স্বাদ পেল ভারত। বলা বাহুল্য বাইশ গজের উজ্জ্বল নক্ষত্র বিরাট, রোহিতদের পাশাপাশি এরপর হরমনপ্রীত বা জেমিমারাও খুদে প্রতিভাদের উদ্বুদ্ধ করবেন। পরিশেষে, ফাইনাল জয়ের উচ্ছ্বাসে যখন ফেটে পড়ছিল গোটা স্টেডিয়াম, তখন মাঠে দেখা যায় এক আবেগঘন দৃশ্য। হুইলচেয়ারে করে মাঠে প্রবেশ করেন প্রতিকা রাওয়াল, ম্যাচ শেষে জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। আর কোনোদিন দেশের জার্সি গায়ে ক্রিজে কভার ড্রাইভ মারার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গিয়েছিল যে বেনামি বাঙালি ছেলেটার, সেই কোচ অমল মজুমদার–কে ঘিরে বিজয়িনীদের উল্লাসই ঘোষণা করে যে এই অভাবনীয় জয়ের কান্ডারি তিনিই। এই জয়ের প্রসঙ্গে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ঝুলন গোস্বামীকে বলতে শোনা যায়, “এটা আমার স্বপ্ন ছিল, আর তোমরা সেটা পূরণ করেছ। শেফালি বর্মার ৭০ রান ও দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট, দীপ্তি শর্মার হাফসেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেট… দুজনের অসাধারণ পারফরম্যান্স। ট্রফি এখন আমাদের কাছে।” অতএব, তাঁর কথার সূত্র ধরেই বলা যায়— এ বিশ্বজয় শুধু ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের নয়, এই বিশ্বজয় সেই প্রাক্তন ক্রিকেটারদের প্রতি উৎসর্গীকৃত, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে অদম্য প্রচেষ্টায় মহিলা ক্রিকেট দলের ভিত তৈরি করেছিলেন। তাই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অর্জিত এই সম্মান বহু ভারতীয় মেয়ের হাতে ব্যাট ধরার সাহস দিল, মেয়েদের এই বিশ্বজয় রচনা করল এক নতুন ইতিহাস।