রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ; ২. ভালো লাগার কারণ ; ৩. অভিনয় দক্ষতা; ৪. পরিচালকের গুণ ও দোষ ; ৫. উপসংহার ।
আমার দেখা একটি চলচ্চিত্র
১. ভূমিকা: চলচ্চিত্র আধুনিক জীবনের অঙ্গ । কাজের ফাঁকে মানুষ যখন একটু অবসর খোঁজে, তখন চলচ্চিত্র হয়ে দাঁড়ায় তার কাছের সঙ্গী । একটানা কাজ কোন মানুষই করতে পারে না । কেননা মানুষ যন্ত্র নয় । কাজ করতে করতে শরীরে নেমে আসে ক্লান্তি । মন পাখির মত ডানা মেলে সবকিছু থেকে ছুটি পেতে চায় । আমাদের মত মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষদের অল্প পয়সায় অবসর বিনোদনের জন্যে চলচ্চিত্র একটা বড় ভূমিকা গ্রহণ করে । কাশ্মীর, দার্জিলিং বা আরও নয়নমনোহর জায়গায় যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই । তাই চলচ্চিত্রের মধ্যে আমাদের সেই অপূর্ণ সাধ মেটাতে হয়। তবে চলচ্চিত্রের মধ্যেও ভালোমন্দ আছে। চলচ্চিত্র আমাদের শিক্ষিত করে। সম্প্রতি পরিচালক গৌতম ঘোষের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ তেমনই একটি চলচ্চিত্র, যা দেখতে দেখতে আমি রীতিমত অভিভূত হয়েছি । এর বিষয়, বক্তব্য উপস্থাপনা আমাকে মুগ্ধ করেছে । দেখার সঙ্গে সঙ্গেই এর আবেদন শেষ হয়ে যায় না। এর পরেও আবার নতুন করে ভাবতে হয় ।
২. ভালো লাগার কারণ: ‘অন্তর্জলী যাত্রা’-র মূল বিষয় একটি সামাজিক কুপ্রথা । অষ্টাদশ শতক থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এই প্রথা মানুষের জীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছিল। তখনকার দিনে নারীদের মৃত স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যেতে হতো । মানুষ মারা গেলে তার সৎকার করা স্বীকৃত সত্য। কিন্তু জীবিত মানুষকে অন্ধ প্রথাচারের জোরে পুড়িয়ে মারা বা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে তাকে সতী বানানো আদপেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ তো গেল সামাজিক নিয়মের একটি ভয়ঙ্কর দিক। এ ছাড়াও তখনকার দিনে মৃত্যুপথযাত্রী কুলীন ব্রাহ্মণের সঙ্গে অবিবাহিত মেয়ের বিয়ে দেওয়া হতো। কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার কাছে, সপরিবারে ব্রাত্য হওয়ার নির্দয়তা থেকে রক্ষা পাওয়ার এই ছিল সকরুণ উপায় । ‘অন্তর্জলী যাত্রা’-য় এই ভণ্ড, সামাজিক নিয়মকে তুলে ধরেছেন পরিচালক। জ্যোতিষী থেকে শুরু করে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধটি যখন বিয়ের আনন্দে নেচে উঠেছে— তখন গ্রাম্য অশিক্ষিত বর্বর বৈজু চাড়ালকে দিয়ে প্রতিবাদ করিয়েছেন পরিচালক। বৈজু সমাজের এই নিষ্ঠুর প্রথাকে অস্বীকার করে বাঁচাতে চেয়েছে যশোমতীর মত রূপসী সরলা এক নারীকে । মৃত্যু নয়, জীবন কাম্য আমাদের । যে সমাজ নিয়মের ফাঁদে ফেলে, প্রথার জালে বন্দী করে মানুষকে জীবনের পরিবর্তে মৃত্যু উপহার দেয়, সেই অভিশপ্ত সমাজ ও প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে বৈজু । একটি নারী ফুল-ফল সম্ভারে পৃথিবী ভরিয়ে দিতে পারে, নারী থেকেই জননী হয় । জননী থেকেই সে হয়ে ওঠে মাতা বসুন্ধরা । নির্জন প্রথা তাকে ঠেলে দিয়েছে গঙ্গার পাড়ে। সেখানে জ্যোৎস্নাময়ী রাতে কেউ নেই তার সঙ্গে । আছে দোসর হিসেবে এক বৃদ্ধ, মৃত্যু পথের যাত্রী । এই বৃদ্ধকে আগলে যশোমতীর মত মেয়েদের কেন জীবনের সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হবে ? এই প্রশ্নটিই তুলে ধরেছে বৈজু। এই প্রশ্নটি দিয়েই আমাদের বিদ্ধ করেছেন গৌতম ঘোষ।
৩– অভিনয়–দক্ষতা: বৃদ্ধের ভূমিকায় প্রমোদ গঙ্গোপাধ্যায় নিষ্ঠার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। তিনি যখন যশোমতীকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘নতুন বৌ, আমি সুন্দর ?—তখন আমরা বুঝতেই পারি না যে আমরা অভিনয় দেখছি। সামাজিক কুপ্রথাটির অসাড় দিকগুলো তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করা যায়। বৈজু চাড়ালের প্রতিবাদী মানসিকতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রূপায়িত করেছেন শত্রুঘ্ন সিনহা। যশোমতীকে বারবার অনুপ্রাণিত করবার সময় তিনি যখন বলেন, ‘নতুন বৌ, পালাও, পালাও’, তখন আমরা কতৃজ্ঞ হয়ে পড়ি তাঁর কাছে । মনে হয়, এই কথা তো আমিও বলছি মনে মনে । মানুষকে মরতে দিতে চাইব কেন ? চাই—এই জীবন, এই জ্যোৎস্না, এই গঙ্গার অফুরন্ত সৌন্দর্য, এই চোখ-আকা নৌকোর দেশে সবাই বেঁচে থাক সম্মান নিয়ে, মাথা উঁচু করে, মনুষ্যত্বের মহিমা নিয়ে। যশোমতীর ভূমিকায় শম্পা ঘোষকে কিছুটা আড়ষ্ট লেগেছে। তাঁর অভিনয় আমার মনে তেমন দাগ কাটেনি । কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার ভূমিকায় বসন্ত চৌধুরী, কবিরাজের ভূমিকায় মোহন আগাসে এবং জ্যোতিষীর ভূমিকায় রবি ঘোষ শুধু মানানসই-ই নন, অভিনয়ে স্বাভাবিক এবং সতেজ।
৪. পরিচালকের গুণ ও দোষ: কমলকুমার মজুমদার রচিত ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ বিশেষ। তাঁর বর্ণনা-পদ্ধতি, ভাষা-ব্যবহার, চিত্রকল্প-রচনা অত্যন্ত দুরূহ এবং কঠিন । এই কঠিন সাহিত্য কর্মটিকে সহজ করে তুলেছেন পরিচালক । গঙ্গার দৃশ্য এবং জ্যোৎস্নার রাতে মোহময় বিশ্বের রূপ গৌতম ঘোষের ক্যামেরার মাধ্যমে অসাধারণ ভাষা পেয়েছে। গঙ্গায় বান আসার মুহূর্তে জলের যে দাপট তা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। কাদার মধ্যে যশোমতী এবং বৈজুর মিলনযন্ত্রণা সজীবতা পেয়েছে । তবে শেষ দৃশ্যটিতে যশোমতীকে মা দুর্গার মত জলের মধ্যে—কাঠামোতে স্থির হয়ে যেতে দেখে ভালো লাগে না । কারণ যশোমতী তো সতী বা দেবীলক্ষ্মী হতে চাননি । সে মানবী। পরিচালক তাকে শেষ দৃশ্যে মানবীর মর্যাদা দিলেই পারতেন।
৫. উপসংহার: তবু, সব মিলিয়ে ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ সাম্প্রতিক কালের এক গম্ভীর তাৎপর্যময় চলচ্চিত্র । এক নিপুণ শিল্পকর্ম হয়ে উঠেছে তাঁর এই ছবি । সিনেমার ভাষাতেও যে উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম রচনা করা যায়, পরিচালক গৌতম ঘোষ আর একবার তা প্রমাণ করলেন । ‘অন্তর্জলী যাত্ৰা’ নিছক প্রমোদ-বিলাসের কাহিনী নয় । ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ এক সামাজিক হীন প্রথাকে আঘাত করার কাহিনী । ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ অন্ধ প্রথাচারের কাছে বলিপ্রদত্ত এক মানবীর প্রতিবাদের কাহিনী । ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ মানুষ-চাড়ালের বিদ্রোহের কাহিনী । স্মরণীয় এই ছবিটি আমাকে মনের দিক থেকে আরও বেশি পরিণত, শিক্ষিত এবং উদার করে তুলেছে ।
📝 অনুসরণে লেখা যায়
১. একটি চলচ্চিত্রের ভালোমন্দ আলোচনা
২. ভালো চলচ্চিত্রের ধারণা
৩. চলচ্চিত্র যখন ভাবায়