রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ;২. বর্ষায় কলকাতার রাস্তার দৃশ্য ; ৩. বর্ষা ও কলকাতার নাগরিক জীবন ৪. কলকাতার বর্ষার আরও এক করুণ দৃশ্য ; ৫. উপসংহার।
কলকাতার বর্ষা
১. ভূমিকা: ঋতুচক্রের হাত ধরে শহরেও বর্ষা আসে । কিন্তু কলকাতার মানুষ প্রয়োজনের কারাগারে বন্দী । যানজট, কলকোলাহলে মুখর এই কলকাতা । এখানে আকাশ সঙ্কুচিত । দিগন্ত কুণ্ঠিত । এখানে নেই কোন বনভূমি। নেই খাল, বিল, নদী, দিগন্ত-বিস্তার মাঠ-প্রান্তর । বর্ষার সমারোহ এখানে অনুপস্থিত । কিন্তু বর্ষাকে এখানে স্বাগত জানাবার কোন প্রস্তুতি নেই । ইট-কাঠ-পাথরে শুধু শোনা যায় প্রকৃতির সকরুণ দীর্ঘশ্বাস । ‘শহরের বাড়িগুলি তাহার রুদ্ধ বাতায়ন ও ছাদ লইয়া, পথিক তাহার ছাতা লইয়া, ট্রামগাড়ি তাহার পর্দা লইয়া, বর্ষাকে কেবল নিষেধ করিবার চেষ্টায় ক্লেদাক্ত পঙ্কিল হইয়া উঠিতেছে।’
২. বর্ষায় কলকাতার রাস্তার দৃশ্য: তবু কলকাতার বর্ষা একেবারে বৈচিত্র্যহীন নয় । কলকাতার আকাশেও ধেয়ে আসে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ । শহুরে জীবনেও বর্ষা বয়ে আনে এক আবেগ-বিহ্বলতা। প্রবল বর্ষণে নাগরিক-জীবন বিপর্যস্ত হয় । নালা-নর্দমা জলে ভরে ওঠে । রাস্তা জলের তলায় ডুব দেয়। বাড়িগুলো দ্বীপের মত নিঃসঙ্গ। যানবাহন সমস্যা তখন চরমে। পথিক চলে জলে ভিজতে ভিজতে। কেউ বা গাড়ি-বারান্দার নিচে আশ্রয় নেয়। জলের ওপর দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে চলে বাস, মিনিবাস । নোংরা জল ছিটোয় । দাঁড়িয়ে থাকে সারি সারি ট্রাম। ট্রামের লোক লাল সংকেত নিয়ে ছাতা মাথায় খোলা ম্যানহোলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে । রাস্তায় জল কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও কোমর পর্যন্ত । নোংরা, ঘিনঘিনে জলের ওপর দিয়েই চলেছে লোকজন । রিঙ্গার ঠুং ঠুং আওয়াজ । কোথাও জলের ওপর দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে মোটরগাড়ি । কোথাও মাঝপথেই অকেজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নানান গাড়ি । কোথাও ঠেলাগাড়ি চেপে রাস্তা পার হয় লোক । সব এলোমেলো, বিপর্যস্ত । বর্ষা এখানে অস্বস্তি বাড়ায়। বিরক্তি বয়ে আনে । রাস্তার গর্ত বোঝা যায় না। পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙে ।
৩. বর্ষা ও কলকাতার নাগরিক জীবন: শহরেও বাদলের ক্লান্তিহীন ধারাবর্ষণ । এরই মধ্যে শহুরে মানুষ প্রতিদিনের বাজার সারে । বর্ষাতি নিয়ে ছেলেমেয়েরা যায় স্কুল-কলেজে । অফিসযাত্রীরা বেরোয় কাজে । বর্ষা উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়ে কাজের মানুষ । ছাত্রছাত্রীদের ফিরতে দেরি হয়ে যায় । অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা বাড়ে। ফিরতে দেরি হয় কাজের মানুষের । উদ্বেগ নিয়ে প্রহর গোণে ঘরের লোক। কেউ বা ছুটির আনন্দে মেতে ওঠে । জমজমাট আসর বসে তাস-দাবা, হাসি-তামাসার । স্কুলে ‘রেনি-ডে’-র ছুটি। ছেলেদের কেউ ছোটে খেলার মাঠে, কেউ যায় সিনেমায়। ঘরে ঘরে চলে খিচুড়ি ভোজন । তেলেভাজার দোকানে ভিড় । ঘন ঘন চা-কফির আয়োজন । শহুরে মানুষ আজ কর্মের জগৎ থেকে মুক্তি পেয়েছে । মনের জগতে তাই তার মুক্তির আনন্দ । ঘরে ঘরে অলস আড্ডা । চায়ের দোকানে গল্প-গুজবের জমাট আসর। ঘরে ভিজে জামা-কাপড়ের ভ্যাপসা গন্ধ । একটু রোদের জন্যে অপেক্ষা করে থাকা ।
৪. কলকাতার বর্ষার আরও এক করুণ দৃশ্য: প্রদীপের তলায় অন্ধকার । প্রাসাদময়ী রূপসী কলকাতার জীবনেও আছে কিছু কলঙ্কের ছাপ । কলঙ্ক তার বস্তিগুলো । বর্ষা এসে সেই বস্তির জীবনকে আরও করুণ, বেদনাময় করে তোলে । কষ্ট অবর্ণনীয়। ভাঙা টালি দিয়ে ঘরে জল পড়ে। রাস্তার নোংরা জল ঘরে ঢোকে । সব বিপর্যস্ত, লণ্ডভণ্ড । পরিবেশ দূষিত হয় । মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ে । দুর্গন্ধ ছড়ায় । মাছের কানকো, মরা বেড়ালের ছানা, ছাইপাশ আরও কত কি ছড়ানো ছিটানো । জীবনযাপন দুর্বিষহ । এছাড়াও শহর কলকাতার এমন কত মানুষ আছে যারা ফুটপাতে জীবন কাটায় । নর্দমার ধারে ঝুপড়ির মধ্যে কত মানুষের জীবন ফুরিয়ে গেল । যারা ফেরিঅলা, যারা দিন-আনা, দিন-খাওয়ার মজুর, বর্ষা তাদের জীবনে এক অভিশাপ । তাদের রুজি-রোজগারের পথ তখন বন্ধ । এও কলকাতার বর্ষার আর এক রূপ—আর এক ইতিবৃত্ত ।
৫. উপসংহার: কলকাতায় বর্ষার নয়ন-মুগ্ধ রূপের বৈভব নেই। নেই দূরবিস্তারী মেঘের ঘনঘটা। নেই পুষ্পবাহার । মেঘের গর্জনে এখানে ময়ূর নাচে না । ডাহুকও ডাকে না । এখানে তমালকুঞ্জের আধার নেই । মত্ত দাদুরি-ডাকও থাকে অশ্রুত । নেই ঝিল্লীরব । ভেসে আসে না যূথী পরিমল । পাষাণকায়া কলকাতায় প্রকৃতির অনায়াস প্রবেশের ছাড়পত্র নেই । ‘বর্ষা ঋতুটা মোটের ওপর শহুরে মনুষ্যসমাজের পক্ষে তেমন সুখকর নহে ; ওটা অরণ্য-প্রকৃতিরই বিশেষ উপযোগী।’ কথাটা রবীন্দ্রনাথের । এবং যথার্থ।