রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ;২. বাংলা দেশেই নবজাগরণের শুরু ; ৩. বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ; ৪. সন্ত্রাসবাদ ; ৫. ১৯৩০ থেকে ১৯৪২–৪৩– এর মুক্তি সংগ্রামে বাঙালী ; ৬. উপসংহার ।
স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালী
১. ভূমিকা: বাঙালীর সুদীর্ঘকালের ইতিহাস থেকে জানা যায় সে চিরকালই বন্ধন-অসহিষ্ণু । বাঙালীর প্রাকৃতিক পরিবেশেই আছে তার প্রতিবাদের ভাষা । পরের বশ্যতা সে চিরকাল মেনে নিতে পারে না । বারবার এখানে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে । সেই আগুনে তার শৌর্য-বীর্য দীপ্ত হয়ে উঠেছে। অথচ বাঙালীর কপালে ভীরুতার কলঙ্ক-তিলক । ভারতের মুক্তি-সংগ্রামে বাঙালীর সেই অগ্নিমূর্তি বারবার ফুটে উঠেছে। বাঙালীই ভারতের মুক্তি-সংগ্রামের প্রথম শহীদ । বাঙালীর হাতেই ছিল সেদিন স্বাধীনতার জ্বলন্ত মশাল ।বাঙলার মাটিতেই ইংরেজ শাসনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়। বাঙালী প্রথম ইংরেজী শিক্ষা-সংস্কৃতিকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল । বাঙলাতেই শুরু হয়েছিল ভারতের নবজাগরণ ।
২. বাংলা দেশেই নবজাগরণের শুরু: মহাত্মা রামমোহন নবচেতনার উদ্বোধন করেছেন । বিদ্যাসাগর ইংরেজী শিক্ষার ভিতকে দৃঢ় করেছিলেন। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ‘বন্দেমাতরম্’ মন্ত্র দিয়ে দেশকে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ ‘ভারতসভা’ প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে স্বদেশ চেতনার ধারাকে বিস্তৃতি দিয়েছিলেন । এর মধ্যে সিপাহী বিদ্রোহ, নীলচাষ বিদ্রোহ স্বাধীনতার আকৃতিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল । প্রতিবাদ, বিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে বাঙালী সেদিন পরাধীনতার জ্বালাকে প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে এসেছিলেন আরও অনেক মনীষী । বাঙলার আবহাওয়ায় সেদিন শোনা গিয়েছিল মহাবিদ্রোহের অশ্রুত ধ্বনি ।
৩. বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন: ১৯০৫ সাল । লর্ড কার্জন বাঙলাকে ভাগ করতে চাইলেন । বাঙালী এর প্রতিবাদ করল । সভা-সমিতি-মিছিল-মিটিং-এ তা প্রতিবাদমুখর হলো । এখান থেকেই বাঙলার মুক্তি-সংগ্রাম, ইংরেজ-বিদ্বেষের শুরু। বিদেশী পণ্যের বহু্যুৎসবে, বিলাতী পণ্যের বর্জনে এবং স্বদেশীয় পণ্যের গ্রহণে উন্মাদনা, উত্তেজনা থাকলেও এখান থেকেই এক সংগ্রামী চেতনার যাত্রারম্ভ । কবিরা রচনা করলেন দেশাত্মবোধক গান । নাট্যকার লিখলেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাশ্রয়ী নাটক । কেশবচন্দ্র, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখেরা শক্তিসাধনার ভেতর দিয়ে জাতিকে নতুন করে উজ্জীবিত করলেন । বিদ্রোহী কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হল, ‘উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’
৪. সন্ত্রাসবাদ: ধীরে ধীরে স্বাধীনতার আগুনের ফুলকি সারা ভারতবর্ষে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল । বাঙলার দামাল তরুণের দল সেদিন ভারতের মুক্তি-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল । ইংরেজ বিতাড়নের চেষ্টায় মাতৃমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিল । ১৯০৮ সাল । ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী হলেন বাঙলার প্রথম শহীদ । অরবিন্দ ঘোষ ও বারীন ঘোষ প্রমুখেরা সহিংস আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেন । ক্ষুদিরাম ‘বন্দেমাতরম্’ ধ্বনি দিতে দিতে ফাঁসির মঞ্চে আত্মাহুতি দিলেন। দেশের তরুণ প্রাণ উদ্বেলিত হলো। ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিপ্লবী বাংলা গর্জে উঠল । ভারত-মুক্তির আন্দোলন তখন গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে । বাঙলার তরুণ বিপ্লবী দল তখন ইংরেজের মনে ভয়ের সঞ্চার করেছে । মৃত্যুর হোলি-উৎসবে বাঙলার মাটি তখন রক্তাক্ত । মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয়েছে অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলন । অহিংস ও সহিংস আন্দোলনের যুগ্ম প্রেক্ষাপট হলো বাংলা । তামাম ভারতবর্ষ জুড়ে তখন ভারতের মুক্তি-সংগ্রামের জোয়ার বইছে ।
৫. ১৯৩০ থেকে ১৯৪২–৪৩–এর মুক্তি–সংগ্রামে বাঙালী: ১৯৩০ থেকে ১৯৪২-৪৩ হলো বাঙালীর মুক্তি-আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব । মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ, লবণ সত্যাগ্রহ বাঙালী দেশপ্রেমিকের সহযোগিতায় নতুন রূপে উদ্ভাসিত হলো । মেদিনীপুর ও ২৪ পরগনায় তরুণ দেশপ্রেমিকের দল দুর্জয় সাহসিকতার পরিচয় দিলেন । ১৯৩০ সালেই অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে শুরু হলো সশস্ত্র সংগ্রাম । প্রতিষ্ঠিত হলো প্রথম স্বদেশী সরকার । অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, অম্বিকা চক্রবর্তী, লোকনাথ বল, টেগরা বল, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সেদিন বিপ্লবের আগুনকে অনির্বাণ রেখেছিলেন । ১৯৩৯-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু । মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে নেতাজীর মতের অমিল হওয়ায় নেতাজী ভারত ছাড়লেন । ছাড়লেন কংগ্রেস । ১৯৪২-এর ৯ই আগস্ট মহাত্মা গান্ধী ইংরেজের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের ডাক দিলেন । ১০ই আগস্ট মহাত্মা গান্ধীসহ ভারতের নেতারা কারারুদ্ধ হলেন । শুরু হলো ভারত জুড়ে গণবিপ্লব । ইতিহাসে ‘আগস্ট বিপ্লব’ নামে তার পরিচয় ।মেদিনীপুরের তমলুকে সতীশ সামন্ত, অজয় মুখোপাধ্যায় প্রমুখ দেশপ্রেমিকের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় সরকার। তমলুকে মাতঙ্গিনী হাজরা সত্যাগ্রহ আন্দোলনে প্রাণ দিলেন । ভারতের পূর্ব সীমান্তে তখন নেতাজী সুভাষচন্দ্রের আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান। কিন্তু ইংরেজের চাতুরিতে নেতাজীর আগমনবার্তা জনসাধারণের কাছে থাকে অজ্ঞাত ।
৬. উপসংহার: এলো ১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্ট। অগণিত ভারতবাসীর প্রত্যাশিত দিন। এই দিনটির জন্যেই বিনয়, বাদল, দীনেশ প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন । এই দিনটির জন্যেই মানবেন্দ্র রায়, বাঘা যতীন, চিত্তপ্রিয়, রাসবিহারী বসু প্রমুখ বিপ্লবীরা মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখে গেছেন। এরই জন্যে সুশীলকুমার সেনগুপ্ত, কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, চারুচন্দ্র বসু, বসন্ত বিশ্বাস, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত, নীরেন্দ্র দাশগুপ্ত এমনি আরও কত বিপ্লবী বাঙালী সেদিন প্রাণ আহুতি দিয়েছিলেন। আজ কে তার হিসেব রাখে ! হাজারো হাজারো বাঙালী তরুণ সেদিন আন্দামানের জেলে প্রাণ দিয়েছিলেন। ইংরেজের চণ্ডনীতিতে কত তরুণ প্রাণ উন্মাদ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ইতিহাস এসব, অজ্ঞাত, অখ্যাত তরুণ বাঙালী বিপ্লবীর কথা মনে রাখেনি। অথচ ভারতের স্বাধীনতা-আন্দোলনের অন্যতম দুই প্রধান শরিক, দুই প্রধান রাজ্য বাংলা ও পাঞ্জাবের ওপর নেমে এলো এক নিদারুণ অভিশাপ। পাঞ্জাব ও বাংলা হলো বিভক্ত। এ মনুষ্যত্বের এক নজিরবিহীন অপমানিত ইতিহাস ।