রচনা–সংকেতঃ ১. ভূমিকা; ২. উপজাতি কারা : ৩. উপজাতিদের ভাষা ; ৪. উপজাতিদের জীবিকা : ৫. ইংরেজ শাসনে উপজাতিদের সমস্যা; ৬. স্বাধীন ভারতে উপজাতি জীবন; ৭. উপসংহার।
ভারতের উপজাতি সমস্যা
১. ভূমিকা: সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতে নানা গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করছে । এখানে নানা জাতি ও উপজাতির মানুষ পরস্পরের প্রতিবেশী হয়েছে। তাদের নানা ভাষা । ধর্মবিশ্বাস ভিন্ন। জীবনযাপনের স্বকীয়তাও কিছু কম নয়। ইতিহাসের নানা পট পরিবর্তন । উপজাতি জীবনেও লেগেছে সেই পরিবর্তনের ঢেউ । এরা পাহাড়ে জঙ্গলে নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে জীবন ধারণের উপায় খুঁজেছে । প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করেছে । মানসিক ও আত্মিক দিক দিয়ে আত্মরক্ষার উপায় অনুসন্ধান করেছে। কেবল উদরপূরণ নয়, শিল্পকলা ও ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে বেঁচে থাকার শক্তি। প্রতিবেশী সমলতবাসীদের সঙ্গে স্মরণাতীত কাল থেকে তারা যোগাযোগ রক্ষা করেছে। অনাদ্যস্ত কাল ধরে এই যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ ছিল কখনও বৈরীতায়, কখনও মৈত্রীতে।
২. উপজাতি কারা: সামাজিক ব্যাপারে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে যারা স্বাতন্ত্র্য ও পৃথক সত্তা রক্ষা করে চলতে চায়, সেই স্বতন্ত্র গোষ্ঠীবর্গই হল উপজাতি । তারা নিজেদের মোড়ল বা দলপতির বিধান মেনে চলে। মেনে চলে বিবাহ বিষয়ে নিজেদের সামাজিক আইনকানুন, আচার-বিচার, রীতিনীতি । স্থানীয় গোষ্ঠীর সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় বিবাহ। এক উপজাতির সঙ্গে অন্য উপজাতির পার্থক্যও অনেক। ভারতের মূল জাতিগোষ্ঠীর ধারা থেকে এরা বিচ্ছিন্ন। ভারতে আনুমানিক তিন কোটি উপজাতির বাস। ওড়িশার কেওনঝড়, ঢেকানাল অঞ্চলের উপজাতি হল জুয়াং, শবরল ওরাওঁ, পেন্তিয়া, বীরহোড়। নাগাল্যান্ড, মিজোরামে অন্য উপজাতি গোষ্ঠী। বিহারে দুধখারিয়া উপজাতি । ত্রিপুরায় রিয়াং উপজাতি, বিহার-বাংলার উপজাতি হল সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাওঁ প্রভৃতি। মধ্যপ্রদেশের গোন্দ, আগাড়িয়া ; গুজরাতের রাবাড়ি ; হিমাচল প্রদেশের গদ্দী ; নীলগিরি অঞ্চলের টোডা ; মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশের বাঞ্জারা বা লাম্বাদি উপজাতি ; অরুণাচল প্রদেশের আপাতানি উপজাতি প্রধান ।
৩. উপজাতিদের ভাষা: ভারতের সংবিধানে হিন্দি, বাংলা, ওড়িয়া, গুজরাতি, তামিল, তেলেগু প্রভৃতি ষোলটি ভাষাকে মুখ্য ভাষারূপে স্বীকার করা হয়েছে। এতে মুখ্য ভাষাভাষীর সংখ্যাগরিষ্ঠরা পেয়েছে অনেক সুযোগ-সুবিধে। কিন্তু ভারতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ভাষা রয়েছে অসংখ্য। এগুলো মোটামুটি চারটে ভাগে বিভক্ত । হিন্দু-আর্য ভাষাবলী, দ্রাবিড় ভাষাবলী, ভোট-বর্মী ভাষাবলী আর অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা নিষাদ ভাষাবলী । এছাড়া আছে আন্দামানের ওঙ্গে বা যারারাদের ভাষা । মুণ্ডা ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় দশ লাখের কাছাকাছি । সাঁওতালী ভাষাভাষীদের সংখ্যা বত্রিশ লক্ষ সাড়ে সাতচল্লিশ হাজারের মত । ত্রিপুরী ভাষায় কথা বলে প্রায় তিন লক্ষের মত উপজাতি। টোডা ভাষায় কথা চলে আটশ’র মত উপজাতি । বীরহোড় ভাষাভাষীদের সংখ্যা ছ’শর মত। হো ভাষায় কথা বলা উপজাতির সংখ্যা সাড়ে ছ’ লক্ষের মত। এছাড়া আছে গোণ্ডি, কোন্ধ, ভিলি প্রভৃতি ভাষাভাষীর উপজাতি । তাদের সংখ্যাও প্রচুর।
৪. উপজাতিদের জীবিকা: একাধিক উপজাতি গোষ্ঠী গাছপালা লতাগুল্মে ভরা পাহাড়-পর্বতে, বনে-জঙ্গলে বসবাস করে। এরা মূলতঃ কৃষিজীবী। কেউ কেউ জঙ্গল পুড়িয়ে মাটি খুঁড়ে ‘ঝুম’ চাষ করে । উপজাতীয় কৃষকরা নিজেদের ভিটে ছেড়ে সচরাচর অন্যত্র যায় না । ‘জুয়াং’ গ্রামে জমির মালিক গ্রামসমাজ। দক্ষিণ ওড়িশার ‘শবর’ উপজাতি সমবায়-প্রথায় চাষ করে। মিজোরামের উপজাতির মধ্যে আমেরিকার খ্রীষ্টান মিশনারিদের প্রভাব বেশি। সাক্ষরতার হারও এদের মধ্যে অধিক । ওড়িশার কেওনঝড় অঞ্চলের ‘জুয়াং-দের অবস্থা খুব শোচনীয়। খাদ্যাভাব প্রচণ্ড। খাদ্যাভাবের তাড়নায় ‘জুয়াং’-রা দেশান্তরী হয় । উপজাতিরা খাদ্যশস্য ও শিল্পসম্ভার উৎপাদনে অনগ্রসর । ওড়িশায় ‘জুয়াং’, মধ্যপ্রদেশের ‘গোন্দ’, বিহার-বাংলার ‘সাঁওতাল’ প্রভৃতি উপজাতি অধিকতর সংখ্যায় হিন্দু সমাজের কৃষি-সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ছে। ১৯৬১ সালের আদমশুমার অনুসারে খেটে-খাওয়া উপজাতিদের শতকরা ১৯.৫১ জন মালিক-চাষী । এদের নিজেদের কিছু চাষের জমি আছে । শতকরা ১০.৫৮ জন মজুর-চাষী । এরা অন্যের ক্ষেতে জন খাটে। শতকরা ১১-০৮ জন খনি-মজুর, পাথরকাটা মজুর, বন-বিভাগের মজুর, বাগানের মালী, জেলে বা পশুপালন শ্রেণীর শ্রমিক। কোন কোন উপজাতিগোষ্ঠী কোন কারিগরী বৃত্তি গ্রহণ করে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়ায়। এদের মধ্যে আছে বিহার-ওড়িশায় ‘বীরহোড়’ উপজাতি । বর্তমানে বীরহোড়দের জীবিকার প্রধান উপায় পশুশিকার । উপার্জনের অন্য একটি উপায় ‘চোপ’ বা ‘শিয়ালি’ লতার ছালের আশ থেকে দড়ি তৈরি করা । দড়ির বিনিময়ে পায় ধান বা ভুট্টা । এছাড়া খরগোশ, বনমোরগ, বনের ওষুধি, জড়িবুটি গাছগাছড়া বিক্রি করে পায় পয়সা । তাই দিয়ে তেল, নুন, কাপড়-চোপড় কেনে। বীরহোড়দের বেশ কিছু গোষ্ঠী ছাগল পোষে। ওড়িশার পেন্তিয়া (ভোই) উপজাতির লোকেরা পেশায় কামার। ওড়িশা বা পশ্চিমবঙ্গের পিতলের কাজ জানা ‘ঢোকরা কামার’ নিঃসন্দেহে কোন উপজাতি বংশোদ্ভূত। রাজস্থান, গুজরাত ও মধ্যপ্রদেশের ‘গাড়িয়া লোহার কামারও একসময় যাযাবর গোষ্ঠীর উপজাতীয় কারিগর ছিল । মধ্যপ্রদেশের ‘আগাড়িয়া’ উপজাতিও পেশায় কামার। পশুপালন ও পশুচারণের কাজে নিযুক্ত উপজাতির মধ্যে রয়েছে গুজরাতের ‘রাবাড়ি’, হিমাচল প্রদেশের ‘গদ্দী’ । ‘বাঞ্জারা’, ‘লাম্বাদি’ উপজাতীয় গোষ্ঠী বণিকের পণ্য বয়ে নিয়ে যেত ভারবাহী পশুর পিঠে চাপিয়ে । যানবাহনের উন্নতি হল । বাঞ্জারাদের রুজি-রোজগারের উপায় বন্ধ হল । বেঁচে থাকার প্রয়োজনে এরপর তারা সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়। ব্রিটিশ সরকার ‘বাঞ্জারা’, ‘সানসি’, ‘লোধা’-দের অপরাধপ্রবণ উপজাতি বলে ঘোষণা করে । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এসব নিয়ম উঠিয়ে দেওয়া হয়।।
৫. ইংরেজ শাসনে উপজাতিদের সমস্যা: এরপর একদিন ইংরেজ বণিক ভারতে রাজ্যেশ্বর হয়ে বসল । ইংরেজদের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তারের সঙ্গে চাষীরাও খাদ্যশস্যের চাষ কমিয়ে দিল । কার্পাস, আখ, চা, পাট ইত্যাদি নগদি ফসলের চাষে মন দিল। ইংল্যান্ড থেকে এলো কারখানাজাত প্রচুর দ্রব্যসামগ্রী। এতে স্বদেশী শিল্পবাণিজ্য বিপর্যস্ত হলো। দেশময় একই ধরনের শিক্ষা ও শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হলো । নতুন শাসনে উপজাতি জীবনযাত্রাও নতুন মোড় নিল । সরকারী শাসনব্যবস্থা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ হলো। যাতায়াতের পথ সুগম হলো। জনবহুল সমতলভূমি থেকে কিছু কিছু লোক প্রতিবেশী অরণ্য-পর্বতে অনুপ্রবেশ করতে লাগল । শুধু চাষীরাই চাষের জমির সন্ধানে অরণ্যে পর্বতে গেল না, সেই সঙ্গে গেল লোভী ব্যাপারী ও সুদখোর মহাজন । এক সময় এসব অরণ্যভূমির আদি মালিক ছিলেন হিন্দু রাজারা। তাঁদের কেউ কেউ ছিলেন উপজাতিসম্ভূত । ইংরেজ সরকারের খাজাঞ্চিখানায় নিয়মিত কর দেবার জন্যে রাজাদের ওপর চাপ পড়ল । এবং সেই ‘কর’ দিতে হবে নগদে । ধীরে ধীরে সরকার সেই করের পরিমাণ বাড়িয়ে চলল । নিরুপায় হয়ে তাঁরা প্রজাদের ওপর চাপ দিলেন। শুধু জনখাটা নয়, তাদেরও নগদ খাজনা দিতে হবে। ব্যাপারী সুযোগ বুঝে মহাজন হয়ে বসল । চড়া সুদে টাকা ধার দিতে লাগল । গরিব চাষী ও সরল-স্বভাব উপজাতিগোষ্ঠী চক্রবৃদ্ধি সুদের নিষ্পেষণ-যন্ত্রে মৃতপ্রায় হলো। ইংরেজের ছত্রছায়ায় লালিত এই সুদখোর মহাজনেরা ছলনা করে উপজাতিগোষ্ঠীর হাত থেকে বংশানুক্রমিকভাবে ভোগদখলের জমি কেড়ে নিল । এভাবেই উপজাতি অঞ্চলে শ্রেণীসংঘর্ষের বীজ বোনা হলো। উপজাতিসমাজে জমির মালিকানা ছিল গোষ্ঠীর । সমাজ ছিল সহানুভোজী। এখন সেখানে এলো ব্যক্তিগত মালিকানা। বিদ্রোহ দানা বাঁধল। সরকার একদিকে শক্ত হাতে উপজাতি আন্দোলন দমন করছে অন্যদিকে শোষক বা প্রবঞ্চকদের কবল থেকে এদের রক্ষা করার জন্য নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণ করছে । এরই মধ্যে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা হিমালয়ের পাদদেশে ও দক্ষিণের নীলগিরি অঞ্চলে চা ও কফি চাষের উপযুক্ত ভূমির খোজ পেল। উপজাতি অঞ্চলে চাষের জমি কমল। গ্রাসাচ্ছাদনের সমস্যা তীব্রতর হলো। বিহার-ওড়িশা-মধ্যপ্রদেশ থেকে দলে দলে কুলি চালান গেল আসাম ও উত্তর ভারতের চা-বাগানে । এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুণ্ডা ও খারিয়া উপজাতিগোষ্ঠীর লোক ।
৬– স্বাধীন ভারতে উপজাতি জীবন: দেশ স্বাধীন হলো । পরিকল্পিতরূপে শ্রমশিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটল। বয়স্কদের ভোটাধিকার স্বীকৃতি পেল । উপজাতিদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উদয় হলো । পথঘাট সম্প্রসারিত হয়েছে। যানবাহন সুগম হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কলকারখানা গড়ে উঠেছে। দলে দলে মজুর এসেছে। সরকারী বনবিভাগের সঙ্গে উপজাতিদের অসন্তোষ, উত্তেজনা বেড়েছে। বনজঙ্গলের ওপর তাদের পুরুষানুক্রমে অধিকার । বন-সংরক্ষণের প্রয়োজন তারা বোঝে না। তাদের এলাকায় অন্যেরা বহিরাগত । তারা মনে করে উপজাতি হিসেবে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন। তাদের নিজেদের মধ্যে এক ধরনের উপজাতীয় একতা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে । ভাষার ভিত্তিতে ভারতকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করা উপজাতিদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে । সংবিধানে উপজাতি ও অনুন্নত সম্প্রদায়ের জন্যে কিছু কিছু আর্থিক সুযোগ-সুবিধে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে। পেশাগত বা আঞ্চলিক ভিত্তিতে ভাগ করলে বোধহয় অসন্তোষ তত তীব্র হত না।
৭. উপসংহার: ভারত কোন বিশেষ গোষ্ঠীর নয়। কোন বিশেষ জাতির নয়, বিশেষ ধর্মের বা ভাষারও নয়। ভারত সকল ভাষাভাষীর । সকল জাতি-উপজাতির। সকল ধর্মের, সকল বর্ণের । এখানে সকলেই পারস্পরিক মানবিক উষ্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ। সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এক উন্নত ভারতীয় সংস্কৃতি। এখানে শবর, পুলিন্দ, কোল, ভিল, সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুণ্ডা কেউ পর নয় । সবাই সবার আত্মীয় । এক অখণ্ড ভারতীয় ঐতিহ্যে যুক্ত। আজ যারা পিছিয়ে আছে অর্থ-জীবিকা-শিক্ষায়, তাদের জন্যেও সেই অধিকার আর সবাকার সমান । মূল ধারার সঙ্গে তাদেরও যুক্ত করতে হবে সবকিছু দিয়ে । ভারতের সংবিধানে তারই ঘোষণা।
অনুসরণে লেখা যায়:
১. ভারতের উপজাতি-জীবন
২- উপজাতি-জীবনের সমস্যা
৩. উপজাতি-সমস্যা সমাধানের উপায়