রচনা–সংকেত : ১. ভূমিকা ; ২. র্যাগিং কি ও কেন ; ৩. পরিণতি ; ৪. উৎস ৫. উপসংহার।
র্যাগিং এখন এক সামাজিক অপরাধ
১. ভূমিকা: ১৯৯১-এর ২রা আগস্ট । খড়গপুর আই আই টি হস্টেল । সন্দীপ সিংহরায় সেখানে প্রথম বর্ষের ছাত্র । রাত হয়েছে। অনেকের সঙ্গে সন্দীপও শুয়ে পড়েছে। হঠাৎ উঁচু ক্লাসের কয়েকজন ছাত্র ঢুকল তার ঘরে । সন্দীপকে তারা ডেকে তুলল । তারপর শুরু হলো তার ওপর নির্যাতন । প্রথমে ভারী তালা দিয়ে নিজের মাথায় আঘাত করতে বলা হলো তাকে। এখানেই শেষ নয় । চলল আরও হেনস্থা, নিপীড়ন । রকমারি হয়রানি । এরপর তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হলো তিন তলায় । সেখানে কার্নিসের ওপর দিয়ে তাকে হাঁটতে বাধ্য করানো হলো । তার পা কাঁপছিল । শরীর টলছিল । তিনতলা থেকে সে পড়ে গেল । উৎপীড়করা চলে গেল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা হলো না। অজ্ঞান, রক্তাপ্লুত হয়ে ভোর পর্যন্ত সেখানেই পড়ে রইল সে। তারপর হাসপাতাল, চিকিৎসা, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই । সংবাদপত্র পরের দিন সেই নির্মম সংবাদ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিল । অভিভাবকরা স্তম্ভিত । শিক্ষকরা বেদনাস্তব্ধ, বিমূঢ়। ছাত্ররা ভীত হলো। কেন ওই নিরীহ ছাত্রের ওপর অযথা পীড়ন ? কেন এই মধ্যযুগীয় বর্বরোচিত আচরণ ? অথচ এ কোন ছাত্র বিরোধের অনিবার্য পরিণাম নয় । কোন রাজনীতির শত্রুতাও নয় । এ নিছকই ছিল খেলা । ছিল এক কদর্য প্রথার অনুবর্তন । দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতেই এর চলন বেশি । কমবেশি সব হস্টেলেই নবাগত ছাত্রকে অগ্রজের হাতে উপদ্রব, লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় । ওই একদিনের জন্যই এমন নির্মমতা। তারপরই বন্ধুত্ব। তিক্ততার অবসান ।
২. র্যাগিং কি ও কেন: র্যাগিং আসলে একধরনের অত্যাচার। অত্যাচার দৈহিক ও মানসিক। ইনস্টিটিউটে যে ছাত্রটি নবাগত তার ওপরই চলে এই নির্যাতন । এগুলো নাকি যোগ্য হয়ে ওঠার অগ্নি-পরীক্ষা । এই অত্যাচার নানা ধরনের। তার একটি নারকীয় নমুনা আই আই টি-র প্রথম বর্ষের ছাত্র সন্দীপ সিংহরায় । এর আগেও এখানে, দুর্গাপুরে, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এই কদর্য প্রথার অনুবর্তন হয়েছে। কাউকে শীত-রাতে ঠাণ্ডা জলে স্নান করতে বলা হয়েছে । কাউকে খালি গায়ে কনকনে শীতের কামড় সইতে হয়েছে সারারাত ধরে। কখনও হাজার পাওয়ারের আলোর সামনে সারারাত দাড় করিয়ে রেখেছে। কখনও কোন স্থূলকায় ছাত্রকে গাড়ির তলা দিয়ে এপার ওপার করতে বলা হয়েছে। কখনও অশ্লীল শব্দ বলতে বাধ্য করানো হয়েছে । কখনও উলঙ্গ থাকতে বলা হয়েছে । কখনও কমোটে বা বেসিনে মুখ গুঁজে দিয়ে ফ্লাস টেনেছে বা জলের কল খুলে দিয়েছে। শুধু পড়াশুনোয় ভাল ছাত্র হলে চলবে না । যে-কোন প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে । ওই একটা দিনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই সে সহপাঠী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে । এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন। অভিভাবক অসহায় ।
৩. পরিণতি: র্যাগিং-এর পরিণতি যে কী ভয়াবহ তা ২রা আগস্টের সন্দীপের ঘটনাই প্রমাণ করল । এ উপদ্রব সব হস্টেলেই নতুন আবাসিকদের সহ্য করতে হয় । অনেকে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার ভয়ে হস্টেল ও প্রযুক্তিবিদ্যার পঠন-পাঠন ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। কেউ কেউ আহত হয়েছে । হাসপাতালে গেছে। এমনকি অত্যাচারের বলিও হয়েছে কেউ কেউ। এ নিয়ে অনেক বাকবিতণ্ডা, তর্কবিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরেই আবার তা থিতিয়ে এসেছে । এ নিয়ে কোন জনরোষ নেই । নেই অপরাধীদের কোন প্রশাসনিক কঠোর শাস্তিদানের নজির স্থাপন । কিছু বিকৃত-বিলাসী ছাত্র, মুষ্টিমেয় শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের পরোক্ষ সমর্থনে এই বর্বরোচিত মানসিকতা লালিত হয় । লালিত হয়েছে । গত ২রা আগস্ট সন্দীপের ওপর যে আচরণ হলো তা কি তাকে শক্ত সমর্থ করে তোলার নিদর্শন ? না কি এক নারকীয় বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ ? যে মানসিকতা, যে আদিম জিঘাংসা প্রবৃত্তি একজন অনুজ ছাত্রকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে কুণ্ঠিত হয় না, তাকে কি সুস্থতা বলা যায় ? এর সমর্থনে যারা যুক্তির ফানুস উড়িয়ে দেয় তারাও মানসিক ব্যাধিকবলিত । সমাজে আর পাঁচটা অপরাধীদের সঙ্গে এদের কোন পার্থক্য নেই।
৪. উৎস: সেকালের গোপন সমাজের নিয়মকানুনের সঙ্গে আজকের র্যাগিং-এর অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় । এ মানুষের এক আদিম প্রবৃত্তি । এই প্রবৃত্তির বশেই কিছু মানুষ গোপন সমাজের নিয়মকানুন রচনা করেছিল । সেই রহস্যময় সমাজের সভ্য হতে হলে তাকে নানারকম দৈহিক ও মানসিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতো । পরীক্ষা দিতে হতো ধৈর্যের । পৃথিবীর সর্বত্রই এই গোপন সমাজের সন্ধান পাওয়া যায়। এমন কি আজকের অপরাধ জগতেও এ ধরনের নানা নিয়মকানুন প্রচলিত আছে । সেই গোপন সমাজের সামিল হতে হলে আজও মানুষকে অনেক কঠোর পরীক্ষা দিতে হয় । ধীরে ধীরে মুছে ফেলতে হয় মনের কোমলতা । মানুষের মন থেকে আজও এই বিকৃত প্রবৃত্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি । হয়তো যায় না । সভ্য মানুষের মনের গভীরে তা ঘুমিয়ে থাকে । সময়-সুযোগে আবার তা জেগে ওঠে। র্যাগিং সেই নিষ্ঠুর প্রবৃত্তিরই অনুসরণ। মধ্যযুগীয় গোপন সমাজপ্রথার আধুনিক রূপান্তর । সময় সময় এর নিষ্ঠুরতায় শিউরে ওঠে মানুষ ।
৫. উপসংহার: অধিকাংশ ছাত্রই এই র্যাগিং প্রথার বিরুদ্ধে। সন্দীপের ঘটনা নিয়ে ইনস্টিটিউটে অনেক তোলপাড় হয়েছে । তোলপাড় এর আগেও অনেকবার হয়েছে । এবার সেখানে পুলিশ প্রবেশ করেছে । অপরাধী ছাত্রদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই বর্বরতার বিরুদ্ধে আজ অধিকাংশ ছাত্রই সোচ্চার। অভিভাবক-শিক্ষকরাও এর বিরুদ্ধে সরব। লোকসভায় এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছাত্ররা ধর্মঘট করেছে । কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন । সন্দীপের জন্যে কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করেছেন। র্যাগিং-এর বিরুদ্ধে খড়গপুর আই আই টি-র ইউনাইটেড স্টুডেন্টস ফোরাম কনভেনশনের ডাক দিয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় র্যাগিং-বিরোধী ছাত্রদের বিরুদ্ধেই কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এর আগেও কর্তৃপক্ষ কতিপয় ছাত্রের বিরুদ্ধে এরকম আচরণ করেছিলেন। সেই ছাত্রদের অপরাধ ছিল, তারা এই অমানবিক প্রথার বিরোধিতা করেছিল । ইনস্টিটিউটের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপরাধে তারা কলেজ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। আদালতের রায় নিয়ে তারা আবার ইনস্টিটিউটে ফিরে এসেছিল। অথচ প্রযুক্তিবিদ্যায় জাপান, চীন, ইউরোপ, আমেরিকার মতন স্বাধীন ভারতও এগিয়ে যাবে, এই স্বপ্ন নিয়েই তৈরি হয়েছিল কয়েকটি আই আই টি। খড়গপুর তার অন্যতম। বিশাল এলাকা। সুদৃশ্য সব ভবন। যত্নে কেয়ারি করা গাছের সারি । যানবাহনের তীব্র ঝঙ্কার নেই । জনগণের গর্জনও সেখানে পৌঁছোয় না । শান্ত নির্জন পরিবেশ । সেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয় । তৈরি হয় স্বপ্নের ভারত গঠনের সব রূপকার । এদের অনেকেই আত্মকেন্দ্রিক, উদাসীন। অনেকেই স্বার্থপর, পারিবারিক বোধহীন, ভালবাসাশূন্য । এরা র্যাগিং-এর নাম করে আদিম, নিষ্ঠুর প্রবৃত্তির বিলাসে মেতে ওঠে । ছোট ভাইয়ের রক্ত ঝরায় । প্রাণ হরণের খেলা চলে । আজ বিবেকবান ছাত্রসমাজ গর্জে উঠুক । দরদী শিক্ষকরা সমস্বরে এর বিরোধিতা করুন। সংবেদনশীল সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদী ভূমিকায় এগিয়ে আসুন । সকলের সহযোগিতায় চিরতরে বন্ধ হোক এই উৎকট উল্লাসের । স্তব্ধ হোক এই অবাঞ্ছিত নিগ্রহের বিলাস । সন্দীপের ঘটনাই যেন হয় এই অনপনেয় কলঙ্কের শেষ ঘটনা ।\