রচনা সংকেত: ১. ভূমিকা; ২. গ্রীষ্ম; ৩. বর্ষা; ৪. শরৎ; ৫. হেমন্ত; ৬. শীত; ৭. বসন্ত; ৮. উপসংহার।
বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য
১. ভূমিকা: সূর্য ওঠে, সূর্য ডোবে। দিন ফুরোয়, রাত আসে। আবার দিন। এমনি করেই মাস। মাসের পর বছর। এরই মধ্যে ধরিত্রীর ভিন্ন ভিন্ন সাজ। আলো-হাওয়ায় কেবলই রূপ বদলের পালা। ঋতুর দল নেচে চলে। ফুলে আর ফলে ভরে ওঠে ডালি। কখনও গ্রীষ্মের খরতাপ। কখনও বর্ষার সজল ধারা স্পর্শ। কখনও শীতের ধূসর, রিক্ত, বিষন্ন-পান্ডুর চেহারা। কখনও বসন্তের পুষ্পবাসরে রাঙা যৌবনের মহোৎসব।
2. গ্রীষ্ম: ঋতুচক্রের শুরুতেই গ্রীষ্ম। বৈশাখ আর জ্যৈষ্ঠের মধ্যেই তার বিক্রম। প্রকৃতির মধ্যেও তার রুক্ষতা। কবির চোখে গ্রীষ্ম রুদ্র সন্ন্যাসী। তার অগ্নিবাণে পুড়ে ছাই হয় মাঠ প্রান্তর। সর্বত্রই আতঙ্ক পান্ডুর বিবর্ণতা। হাহাকার রিক্ত ধারার ভান্ডার। প্রাণ-চাঞ্চল্য স্তব্ধ। বন্ধ পাখির গান। মাঝে মাঝে বৈশাখী-সন্ধ্যার ঝঞ্ঝার দামামা। ধরিত্রীর আর্ত হাহাকার। শ্যামল সবুজের ওপর রুদ্র সন্ন্যাসীর রোষাগ্নি।
৩. বর্ষা: গ্রীষ্ম যায়। আসে বর্ষা। আষাঢ়-শ্রাবণেই বর্ষার শত বরণের কলাপবিস্তার। পৃথিবী সাজে নতুন বেশে। আকাশে জমে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। ‘ঘন গৌরবে আসে উন্মদ বরষা।’ শাখায় শাখায় খেলে প্রাণের শিহরণ। বনে-বনান্তরে, দগ্ধ প্রান্তরে ওঠে নবজীবনের গান। খাল বিল নদী নালায় আসে প্রবল প্রাণের জোয়ার। মেঘের ডাকে ময়ূর পাখা মেলে। মত্ত হয় দাদুরী। ডাহুকি ডাকে। দিকে-দিগন্তরে বেজে ওঠে মেঘের মৃদঙ্গ-মুরজ-মুরলীর ধ্বনি। তিমির মেদুর বনাঞ্চলে ছড়ায় কেতকী কদম্বের সুবাস। আষাঢ়ের মৃদঙ্গ ধ্বনিতে খুলে যায় বিশ্বের চির-বিরহ বেদনার বুদ্ধদুয়ার। কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয় বর্ষার বন্দনাগীতি।
8.শরৎ: এবার শরৎ। অনুপম রূপ বৈভব নিয়েই তার আবির্ভাব। আকাশ মেঘমুক্ত। নীলের ছড়াছড়ি। সুনীল গগনে জলহারা, লঘুভার শুভ্র মেঘের ভেলা। ধীর মন্থর ছন্দে তার কেবলই সৌন্দর্যের নিরুদ্দেশ যাত্রা। ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি। মাঠে শ্যাম শস্য হিল্লোল। প্রাঙ্গণে প্রাঙ্গণে শেফালী-সৌরভ। নদী সরসীর বুকে কুমুদ-কহ্লারের প্রসন্ন শোভা। কাশের বনে বাতাসের কাঁপন। প্রভাতের তৃণ পল্লবে নব শিশিরের ভীরু স্পর্শ। তার স্বর্ণ-বিগলিত মোহন কান্তি। জ্যোৎস্না রাতের মোহিনী হাতছানি। এসবই শরতের অনুপম রূপের পসরা। প্রকৃতির এমন উপচে-পড়া রূপের আঙিনাতেই আসন পাতা হয় শারদ লক্ষ্মীর। বাংলার গ্রাম-নগর শারদোৎসবে মেতে ওঠে। বাঙালীর মনে বাজে ছুটির বাঁশী। আকাশে-বাতাসে তার মুক্তির ডাক।
৫.হেমন্ত: বিষন্ন, উদাস সে মূর্তি। ললাটের চন্দ্রলেখা অযত্নে মলিন। হিমের ধূমল রঙে আঁকা মুখের গুণ্ঠন। বর্ষার যৌবন মদির রূপের বিলাস হেমন্তের নেই। নেই শরতের প্রসন্ন বর্ণ বৈভব। আছে প্রশান্তি। আছে সুদূর ব্যাপ্ত বৈরাগ্যের বিষণ্ণতা। এসময়ই পল্লীর পথে পথে ‘আঁটি আঁটি ধান চলে ভারে ভার। হেমন্তলক্ষ্মী যেন ‘মমতাময়ী’ জননীর কল্যাণী বিগ্রহ। সে ‘ক্ষুধার্ত-জন শরণ্য। হেমন্তের পুষ্প বাহার নেই। আছে ফসলের প্রাচুর্য। ‘ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।
৬.শীত: হেমন্তের পরই শীত। প্রৌঢ়ত্ব তখন ধূসর বার্ধক্যে রূপান্তরিত। গাছে গাছে পাতা ঝরার ডাক। পাণ্ডুর বিবর্ণ বনবীথি। সর্বত্রই রিক্ততা, কাঠিন্য। মাঠে প্রান্তরে সীমাহীন শূন্যতার হাহাকার। কুয়াশার ঘন আবরণ। উত্তর বায়ুতে একতারার বিষণ্ণ সুর। শীত যেন সর্বরিক্ত এক উদাসী সন্ন্যাসী। ত্যাগের মহিমা তাঁর সর্বাঙ্গে।
৭. বসন্ত: কিন্তু রিক্ততাই শেষ কথা নয়। এবার নবযৌবনের অগ্রদূত বসন্ত ঋতু। ধূসর বিবর্ণতা মুছে গেছে। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে বন বনান্তর। রিক্ত, নিঃস্ব গাছে গাছে উঁকি মারে কচি পাতার দল। দক্ষিণের মৃদু মন্দ বাতাস রচনা করে স্বপ্নের মায়াজাল। কোকিলের কুহু ডাকে মন হয় আবিষ্ট। পলাশে পলাশে রক্তের আগুন। ‘অকারণ আন্দোলনে চঞ্চলিছে অশোক মঞ্জরী।’ শিমূল, কৃষ্ণচূড়ায় তার রক্তিম বিহ্বলতা। চারদিকেই রূপের মাতামাতি। আবার শেষ বসন্তে এই বর্ণবিলাস, প্রাণ প্রাচুর্যের জোয়ারে আসে ভাঁটা।
৮. উপসংহার: বাংলার ঋতুলীলা শুধু নিসর্গকেই ঘিরে নয়। বাঙালীর মনের মধ্যেও তার দীর্ঘ-বিস্তার প্রভাব। প্রভাব তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অধ্যাত্ম জীবন জিজ্ঞাসায়। রূপসী বাংলার এই অফুরান রূপ-রঙ-রসের মেলায় বাঙালীর মনপ্রাণ বারে বারে সঞ্জীবিত হয়েছে। এরই মধ্যে আছে তার শত-শতাব্দীর সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কত ভাঙা-গড়ার জীবন-ইতিহাস। বাঙালীর ভাবে, তার পালা-পার্বণে, সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠানে, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ঋতু রঙ্গেরই দূর-প্রসারী, সুগভীর প্রভাব।