
বাস্তু দোষের প্রতিকার – Vastu Remedies
বাস্তুদোষ শোধনের নির্দেশ
বর্তমানে বাস্তু মেনে বাড়ি খুব কম পাওয়া যায়। তাই বাস্তুদোষ শোধনের জন্য কিছু ব্যবহারিক নির্দেশ বিচিত্র বস্তুর মাধ্যমে দেওয়া হল।
স্ফটিক গোলক বা ‘ক্রিস্টাল বল’
দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন ও প্রেম-পরিণয়ে নানা বিরূপ পরিস্থিতিতে ক্রিস্টাল বল খুব কাজে দেয় ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ পৃথিবীতত্ত্বের প্রতীক, প্রেম, স্নেহ, মাধুর্য ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কিত। শোওয়ার ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ক্রিস্টাল বল রাখা বা ঝোলানো এসব বিষয়ে ভালো ফল দেয়। ড্রইংরুমের উক্ত কোনায় রাখলে বাড়ির সবার পরস্পরের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক বজায় থাকে।
ছুঁচালো ক্রিস্টাল
ড্রইংরুমের মাঝখানে এটি রাখলে গৃহস্বামীর দিনযাপন শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুষম থাকে। পেপারওয়েট হিসাবে এই আকৃতির ক্রিস্টাল ব্যবহার করলে কর্মক্ষেত্রে তো বটেই, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অপ্রত্যাশিত উন্নতি ঘটে।
ক্রিস্টালের কচ্ছপ
এটি যদি ড্রইংরুমের উত্তরদিকে রাখা যায়, বাড়ির সবার পরস্পরের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়া তৈরি হয়। ফলে সকলেরই নানা দিক দিয়ে উন্নতি ঘটে। এতে সবরকম নঞর্থক প্রভাব নষ্ট হয়। কারণ, স্ফটিক-কচ্ছপ তার চারদিকের নঞর্থক শক্তিগুলিকে টেনে রাখার ব্যাপারে আশ্চর্য ক্ষমতা ধারণ করে। কোনও কক্ষ যদি অধিকাংশ সময়
বন্ধ থাকে, সে-ঘরে চিনামাটির একটা পাত্রে নুন ভরে রেখে দেওয়া উচিত হবে। শৌচালয়ে ঘুলঘুলির কোটরে নুন ভরে রেখে দেওয়া ভালো। নুন সবসময় ঢাকনাওয়ালা পাত্রে রাখা উচিত। নুনজলে মেঝে সাফ করাও কাজে দেয়।
মাছঘর বা অ্যাকোয়ারিয়াম
ছোট মাছঘরে কিছু সোনালি রঙের মাছ রাখলে তা সুলক্ষণযুক্ত। তাতে ভাগ্য শুভ হয়। তবে আটটি মাছ সোনালি হলে তার সঙ্গে একটি মাছ কালো হওয়া দরকার। কোনও সোনালি মাছ মারা গেলে সেটা বের করে নতুন মাছ রাখতে হবে। ধরা হয়, মৃত মাছটি বাড়ির কোনও অশুভ প্রভাব নিজে ধারণ করে মারা গেছে। মানে সেই মাছটির মৃত্যু কোনও অশুভ সংকেত নয়।
মাছঘর কখনওই শয়নকক্ষ, রান্নাঘর বা শৌচালয়ে রাখা ঠিক নয়। তা সবদিক দিয়েই ক্ষতিকারক। এটি রাখার সবচেয়ে ভালো স্থান ড্রইংরুমের পূর্ব, উত্তর বা উত্তর-পূর্ব কোণ।
ঘরে ঢোকার দরজার কাছে মাছঘর রাখা খারাপ। মাছঘরের নিয়মিত পরিচর্যা খুব দরকার। উপরাংশ খোলা থাকা উচিত, যদি ঢাকা দেওয়া হয়, তার ওপর কিছু রাখা চলবে না। মাছঘর মাটিতে রাখা ভালো নয়। ঘর থেকে বেরবার সময় রাস্তায় যেন মাছঘর বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
শুক্লপক্ষের সোমবার করে ঘরে মাছঘর প্রতিষ্ঠা করা উচিত। মাছ সর্বদা সতর্ক সচেতন রাখার প্রেরণা দেয়, তারা কখনও ঘুমোয় না। বাড়ির ছোটরা ঘুম থেকে উঠেই যদি সোনালি মাছ দর্শন করে, তাদের চিন্তা ও কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায়। ঘরে অ্যাকোয়ারিয়াম থাকলে পরিবারে সুখ-সমৃদ্ধি ঘটে।
আয়না
শক্তির (energy-অর্থে) স্রোত অর্থে আয়নাকে ধরা হয়। খাওয়ার জায়গায় যদি এমন জায়গায় আয়না থাকে, যাতে খেতে খেতে সেই দৃশ্য তাতে দেখা যায়, তাতে পারিবারিক সুখশান্তি বজায় থাকে। আয়না হল স্বচ্ছতার প্রতীক।
ফোয়ারা
ঘরের উত্তরদিকে ফোয়ারা রাখতে পারলে অনেক সুফল পাওয়া যায়। কর্মক্ষেত্রে জটিলতা, বেকারত্ব তো দূর হয়ই, আরও নানা সুফল পাওয়া যায়, উত্তরদিকের সদর্থক শক্তির প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, সেটি শুভ ফলদায়ক।
মূর্তি
ঘরে ফাটাফুটো, ভাঙা মূর্তি রাখা খুব অশুভ। কোনও মূর্তি মাটিতে বা বাক্স বা আলমারিতেও
রাখা চলবে না। কোনও দেব-দেবীর মূর্তি গৃহসজ্জা হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
মানিপ্ল্যান্ট
‘মানিপ্ল্যান্ট’ সমৃদ্ধিসূচক। এটির এক বৈশিষ্ট্য, তার জন্য মাটি লাগে না। কোনও বোতল বা কাচের পাত্রে জল ভরে এটি লাগানো যায়। মাটিতে জন্মানো মানিপ্ল্যান্ট কিন্তু অশুভ। সেটিকে কোনওভাবে ওপরে ওঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মানিপ্ল্যান্ট কিন্তু কোনওভাবেই উপড়ে ফেলতে নেই।
হলুদ ফুল
পরিবারে সুখশান্তি বজায় রাখতে এর জুড়ি নেই। ঘরের দক্ষিণ- পশ্চিম কোণে চিনামাটির ফুলদানিতে হলুদ ফুলের গুচ্ছ রাখা শুভ। তবে, তার একেবারে পাশাপাশি অন্য কোনও জিনিস না রাখাই উচিত। ফুলদানির নীচে একখানা স্বচ্ছ কাপড় রাখলে খুব ভালো।
সাদা ফুল
ঘরের উত্তর কোণে সাদা রঙের ফুলদানি খুবই শুভ ফলদায়ক। তা কৃত্রিম ফুল হলেও অসুবিধা নেই, ফুলগুলি সাদা হলেই হবে।
সুগন্ধী দ্রব্যাদি
সুগন্ধী যে কোনও জিনিস, তা সে ফুল, কাঠ, আতর যাই হোক না কেন ঘরে সদর্থক প্রভাব বিস্তার করে। শুকনো ফুল ঘরে রাখা উচিত নয়। সুগন্ধী দ্রব্যাদি হতাশা, চাপ, নিরুৎসাহভাব দূর করে। প্রাচীন ভারতের গন্ধ চিকিৎসা পদ্ধতি অনুযায়ী বিশেষ বিশেষ তেলের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে—
- ঈশান কোণে: স্যান্ডেলউড (চন্দন), ল্যাভেন্ডার, গোলাপ, জুই।
- পূর্ব কোণে: লেবু, কমলালেবু, ইউক্যালিপটাস, গোলাপ।
- দক্ষিণ-পূর্ব বা অগ্নি কোণে: পুদিনা, দেওদার।
- দক্ষিণ-পশ্চিম বা নৈঋত কোণে: জুনিপার
- পশ্চিম কোণে: তুলসী।
- উত্তর-পশ্চিম বা বায়ুকোণে: লেবু।
শুভ প্রতীক
ভারতীয় শাস্ত্রে ১০৮টি মঙ্গল প্রতীকের কথা বলা আছে। তার মধ্যে অষ্টমঙ্গল বিশেষ শুভ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে যে কোনও শুভকর্মে মঙ্গলসূচক প্রতীক ব্যবহার করার রীতি প্রাচীনকাল থেকেই চালু। ওঁ (ওম) বা স্বস্তিক চিহ্ন যেমন। বহু উল্লেখ করা যায়।
ঢোকবার, বেরবার দরজায় দু-দিকে মঙ্গলসূচক চিহ্ন ও লিপি আঁকা সৌভাগ্যবর্ধক। মুখ্য প্রবেশদ্বারের দু’দিকে স্বস্তিক চিহ্ন, লক্ষ্মী- গণেশের ছবি, শুভলাভ ইত্যাদি লেখা বাড়ির লোকেদের দুর্ভাগ্য থেকে দূরে রাখে। অশুভ সব শক্তিকে দূর করে।
মহাদেব বা শিবের প্রতীক সংহারক শক্তির প্রতীক। এজন্য অনেকে সুরক্ষা চিহ্নের প্রতীক
হিসাবে ত্রিশূলের চিহ্নও ঘরের চৌকাঠে রেখে দেন। বাস্তুশাস্ত্রীদের মতে, যদি ত্রিশূল, স্বস্তিক এবং ওঁ চিহ্ন একসঙ্গে কোনও ধাতুতে উৎকীর্ণ করে প্রধান দরজায় লাগিয়ে রাখা হয়, সে ঘরে কোনও অশুভ শক্তি ঢুকতে পারবে না।
দরজা ও দেওয়ালে ওঁ, মীন, পদ্ম, পঞ্চগোলক, ফলাদিসহ গাছ, লতাপাতাযুক্ত ফুলগাছ, দেবী সরস্বতী, নবনিধিসহ মালক্ষ্মী, পূর্ণকলস, স্বস্তিক, শঙ্খ ইত্যাদি মাঙ্গলিক প্রতীক
চিহ্ন টাঙিয়ে রাখা শুভ।
মানসার গ্রন্থে বাৎসল্য ও শৃঙ্গার রসের চিত্রাঙ্কন বা প্রতীক গৃহে থাকা দরকার সুস্থ মানসিক প্রচারের জন্য, কিন্তু রৌদ্র ও বীভৎস রস নৈব নৈব চঃ।
অশুভ প্রতীক ঘরের কোথাও যেন অঙ্কিত, উৎকীর্ণ বা তার ফোটোগ্রাফ টাঙানো না থাকে— কাক, সাপ, শকুন, বাদুড়, পশুশিকারের ছবি, যুদ্ধকর পশুর ছবি, এ সবই অশুভ। বিষাদ, রুক্ষতা, শোক ইত্যাদি ফুটে ওঠে, এমন সব ছবিও অশুভ।
জ্বলন্ত মোমবাতি
ঘরের দক্ষিণ দিকে জ্বলন্ত মোমবাতি রাখলে মান, প্রতিষ্ঠা বৃদ্ধি পায়। সন্ধ্যায় এভাবে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তা ঘরের উত্তরকোণে রাখা শুভ নয়।
ড্রইংরুমে ঝাড়বাতি
বিবাহ ও বৈবাহিক সম্পর্ক শুভ হয়, যদি ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে স্ফটিক নির্মিত ঝাড়বাতি টাঙানো হয়। ড্রইংরুমের দক্ষিণ- পশ্চিম কোণে ঝাড়লণ্ঠন টাঙিয়ে রাখাও শুভ। কিন্তু সন্ধ্যা থেকে তা জ্বালিয়ে রাখতে হবে। এতে দাম্পত্য জীবনও সুখের হয়।
ড্রইংরুমে উদ্ভিদ
ড্রইংরুমে তাজা উদ্ভিদ একটা বড় গামলায় রাখলে ভালো হয়।ফুলদানিতে তাজা ফুল রাখতে হয়। গামলায় কাঁটাওলা ক্যাকটাস ও দুধ বেরয় এমন উদ্ভিদ রাখা উচিত নয়। রং-বেরঙের পাতাওলা ক্রোটন, মানিপ্ল্যান্ট জাতীয় লতাগুলি বেশি বাঁচে, ওগুলিও শুভ।
ঘোড়ার ক্ষুরের নাল
ঘোড়ার নাল পুরনো হয়ে যখন খুলে যায়, তখন সেই নাল সুখ- সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে ওঠে। বাস্তুদোষ থাকলে, অর্থের অপচয় ও স্বাস্থ্যহানি ঘটতে থাকলে নাল (বিশেষ করে কালো ঘোড়ার) ঘরের দক্ষিণ কোণে দেওয়ালে ঠুকে লাগালে খুব ভালো হয়। নালের দুটি মুখ যেন নীচের দিকে থাকে। শুক্লপক্ষের শনিবার সন্ধ্যার সময় এটা করা উচিত। প্রধান দরজায় যদি সূর্যের আলো সরাসরি পড়ে, তাহলে নালের ওপর একটা আবরণের দ্বারা বা অন্য কোনওভাবে ছায়ার মধ্যে রাখতে হবে।
সঙ্গীত
ধ্বনি একটা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। নাদব্রহ্ম, শব্দব্রহ্ম ও সঙ্গীতের রূপে তা মানুষের উন্নতির পথ প্রশস্ত করে। ঋষিগণ এজন্য গভীর সাধনায় বিভিন্ন স্বরের সমুচয় হিসাবে সঙ্গীতের রাগগুলি তৈরি করেছিলেন। এই রাগসমূহ প্রয়োগ করে বিভিন্ন রোগ উৎপাদনকারী বাস্তুসম্মত শক্তির ভারসাম্য হীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
- বাতদোষ: জৌনপুরি, আশাবরি, দরবারি ইমনকল্যাণ, পারমঞ্জরি, কাফি, হিন্দোল, মধুবন্তি,
নায়কী, কানাড়া, ভৈস,কল্যাণ, কল্যাণমাখা মুলতানি।
- পিত্তদোষ: ভৈরবী, জয়জয়ন্তী, সুরমল্লার, সিন্ধুভৈরবী, শ্রীনায়কী, ভৈরব, কল্যাণ, মালকোষ, শিবরঞ্জনী, ইমন, মারুবেহাগ, তোড়ি, আশাবরী, গুর্জরী। এছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্য, অস্ত্র ও মূত্রনালীর রোগ, পেটব্যথায় জৌনপুরি; উচ্চরক্তচাপ, ফোবিয়া ও হৃদয় বিকারে পুরিয়া, মাথাব্যথা, মস্তিষ্কের অস্থিরতা, অবসাদ, মানসিক আঘাতে দরবারি চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, শ্বেতপ্রদর, কষ্টদায়ক মাসিক স্রাব, ও উদরশূলে পুরিয়া ও কল্যাণ, অনিদ্রা, মানসিক দুর্বলতা, স্মৃতি হ্রাস, টনসিল, সর্দি ও নাক দিয়ে জল পড়ার জন্য কেদার।
ক্রিস্টাল অর্থাৎ স্ফটিক
এর প্রয়োগ ও উপকারিতার কথা আগেই বলা হয়েছে। স্ফটিক পাথরের উল্লেখযোগ্য বিশেষত্ব হল এর জ্যামিতিক রূপ। বহু দোষত্রুটি ক্রিস্টালের সাহায্যে নিবারণ করা যায়। বিভিন্ন ধরনের ক্রিস্টাল বিভিন্নরকম কাজ করে, যেমন টেবিলে বা ডেস্কে একখণ্ড ধোয়া রঙের ক্রিস্টাল রাখলে মানসিক চাপ, হতাশা ইত্যাদি দূরীভূত হয়। বিদ্যুৎ চৌম্বকত্ব থেকে রেহাই পেতে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, মাইক্রোওয়েভ আভেন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, আইপ্যাড, ইত্যাদির পাশে রাখতে হয় লেপি-ডোলাইট, কোয়ার্জ বা ফ্লুওরাইট। ‘আয়রন পাইরাইট’ স্ফটিক।
স্বস্তিক যন্ত্র
‘স্বস্তি’ মানে শুভ। এতে প্রকৃতির সৃষ্টিশীল গতির সমাবেশ বোঝায়। শুভ ও লাভ— দুটোই এই প্রতীক চিহ্নে সমাবিষ্ট। মঙ্গলমূর্তি গণপতির প্রতীক চিহ্ন হিসাবেও ধরা হয় এটিকে।বৃহদাকার স্বস্তিক যন্ত্র সকালবেলা শুভ কিরণসমূহ প্রক্ষেপণ করে। তাম্রপত্রে খোদিত স্বস্তিক যন্ত্র দামিও নয়।
ফ্ল্যাটবাড়ির জন্য নির্দেশ
বর্তমানে নিজেদের বড় বা ছোট বাড়ি বড়-বড় শহরে আর্থিক কারণে অনেক ধনী ব্যক্তিও তৈরি করে উঠতে পারে না। নানা কারণে, যেমন, জমির দাম, জমির অবস্থান, এলাকা ইত্যাদি। ওই একই দামে কিন্তু পছন্দমতো অবস্থানে পছন্দমতো ফ্ল্যাট কেনা যায়। তাই বাস্তুশাস্ত্রীগণ ফ্ল্যাটের জন্যও কিছু শাস্ত্রসম্মত কথা বলেছেন—
১. ফ্ল্যাটবাড়ি ও নিজস্ব ফ্ল্যাটের মধ্যে নিয়মিত অগ্নিহোত্র করা বা তেলের প্রদীপ জ্বালানো।
২. টাটকা ফুল ও পাত্রস্থিত সবুজ ছোট গাছ।
৩. কাঠের আসবাবপত্রকে অগ্রাধিকার।
৪. উত্তল (Convex )আয়না ব্যবহার।
৫. শুকনো চামড়ার জিনিসপত্র অর্থাৎ, কাঁচা চামড়া নয়।
৬. পলতোলা চকমকি কাচ (cut-glass), প্রাকৃতিক ক্রিস্টালের ব্যবহার।
৭. সকাল-সন্ধ্যা শাঁখ বাজানো।
৮. কাঁকন, পায়ের তোড়া ব্যবহার, যাতে মধুর ধ্বনি ওঠে।
যে কোনও জমিতে নির্মাণ স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী হয়ে থাকে। কর্পোরেশন, মিউনিসিপ্যালিটি ইত্যাদির বিধিবিধানানুযায়ী নির্মাণ কাজ করতে হয়। সেগুলি সবসময় বাস্তুশাস্ত্রসম্মত হয়ে ওঠে না।
৯. মৃত ব্যক্তিদের ফোটো বা ছবি ড্রইংরুম ও প্রধান দরজায় কখনও লাগিয়ে রাখবেন না।
১০. সকালে উঠে প্রথমে প্রধান দরজার পাশে এক গ্লাস জল ঢালা উচিত। তাতে ঘরে সম্পন্নভাব আসে।
১১. রোজ সকালে চানটান করে সুগন্ধী ধূপ জ্বালাবেন, হালকা সুগন্ধী স্প্রে করবেন সর্বত্র।
ঘরের অলংঙ্করণ ও সাজসজ্জা যেন কৃত্রিম মনে না হয়, তা যেন চোখের পক্ষে আরামদায়ক হয়। বাবা-মা বা অন্যান্য কারও ফোটো ঘরে প্রকাশ্যে রাখলে সেগুলি যেন প্রসন্নভাব সম্পন্ন হয়। তা না হলে দেখতে হবে কোনওভাবেই যেন দুঃখীভাব না ফুটে ওঠে। ড্রইংরুমে নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি লাগিয়ে রখা খুব শুভ।
পরিবারের সকলে যদি ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন হয়, অর্থাৎ সকালে উঠে ঠাকুর প্রণাম করে, আপদে-বিপদে দেবদেবীর শরণাপন্ন হয় তবে সব বাস্তুদোষও কেটে যায়।
স্থাপত্যবেদকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়— ১. অভ্যন্তরীণ সজ্জা (inner-glorification)-ব্যক্তিচেতনা, স্কুল অর্থে ‘Interior decoration”।
২. বাহ্য সজ্জা (সমষ্টি) (Outer glorification) (বিশ্ব)-গৃহ, অট্টালিকা, নানা ভবন। অভ্যন্তরীণ সজ্জা-চেতনার পর্যায়— এর তাৎপর্য আত্মচেতনা, সেটি ব্যক্তিবিশেষের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটি একটি মানসিক অবস্থা, তার চিন্তাভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত, তার মস্তিষ্ক-উদ্ভূত তরঙ্গসমূহের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যক্তির মনের স্থিতি নির্দেশক সেটি।
বাহ্য সজ্জা (বাস্তুশাস্ত্র): এটির তাৎপর্য ব্যক্তির শরীর বাদে বাইরের দিকগুলি। বস্তুগ্রন্থে বর্ণিত আছে সেসব। জগতের ক্ষেত্র সেগুলি। ব্যক্তির জীবনে চতুষ্পার্শ্বের বাতাবরণ, বাড়িঘর ইত্যাদির কারণ হওয়ায় এসবের প্রভাবের অধ্যয়ন বাহ্যিক সজ্জার অন্তর্গত করা হয়।
শুভ বাস্তুর প্রভাব
সুখ, সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য, মসৃণ জীবন, লক্ষপ্রাপ্তি, উন্নতির সুযোগ, প্রগতির জন্য প্রকৃতির সহযোগিতা, বন্ধুতা, সৌভ্রাতৃত্ব, সুচারু জীবন, সুখশান্তির ক্রমবৃদ্ধি, ধর্ম-অর্থ-কাম ও মোক্ষপ্রাপ্তি।
অশুভ বাস্তুর প্রভাব
অশান্তি, নানা সমস্যা, শত্রুতা, জীবনসংকট, উন্নতিতে বাধা, দুঃখকষ্ট, বিঘ্ন, ব্যাধি, অস্থিরতা ইত্যাদি।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপায়
গৃহ মেলাপক
পাত্র-পাত্রীর বিবাহের আগে যোটক বিচারের রীতি আমাদের জানা। বিবাহের পর তাদের দাম্পত্য সুখ ও সেই সঙ্গে বিবাহ পরবর্তী জীবন কী হবে তা জেনে নেওয়ার এক জ্যোতিষ পদ্ধতি হল এই যোটক বিচার। ঠিক সেইমতো বাস্তুশাস্ত্রে গৃহের সঙ্গে গৃহীর, গৃহশালী ও গৃহিণী পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ সহাবস্থান হবে তা জেনে নেওয়ার পদ্ধতি হল গৃহ মেলাপক।
আয়াদি গণনা
মানসার অর্থ হল মান অর্থাৎ অনুপাত আর সার হল ফল। আনুপাতিক ফল। যে কোনও ঘরের ক্ষেত্রে তার পরিসরই হল তার বাস্তু। পরিসরের ভিত্তিতে নির্মাণ যেখানে উচ্চতা, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ এই তিনের আনুপাতিক ফলই হল বাস্তুর আয়াদি গণনার মূল ভিত্তি। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও
উচ্চতার একক হল আঙুল ও হস্ত। প্রাচীনকালে ৯টি যশস্য দিয়ে একটি আঙুল সমান দৈর্ঘ্য স্থির করা হতো। কিন্তু হাতের পরিমাপ বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের হাতের দৈর্ঘ্য সমান হওয়া সম্ভব নয়। তাই খুব বেঁটে কিংবা খুব লম্বা মানুষের হাতের পরিমাপকে অন্যতম একক হিসাবে ধরলে আয়াদি গণনায় নির্ভুল হতে পারে না। তাই মধ্যম উচ্চতাসম্পন্ন মানুষের হাতের ও আঙুলের দৈর্ঘ্যকেই পরিমাপের একক ধরা হয়। সেক্ষেত্রে এক আঙুল ৩/৪”- র সমান। আর এক হাত মানে হস্তমান (১৮ ইঞ্চি)। লম্বা ও চওড়া পেরিমিটারের সাহায্যে আয়াদির গণনা করা হয়। গৃহকর্তা ও গৃহিণী উভয়ের হস্ত বিচারযোগ্য।
প্রাচীন বাস্তুশাস্ত্র অনুসারে যদি কোনও বাস্তুর (জমি, বাড়ির ইত্যাদি) ক্ষেত্রফলকে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে গুণ করে অপর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে ওই গুণফলকে ভাগ করলে যে সংখ্যা অবশিষ্ট থাকবে সেই সংখ্যা যদি বিজোড় হয় তবে যে বিষয়ে গণনা করা হচ্ছে সেই বিষয়ে শুভফল হবে। আর যদি সেই অবশিষ্ট সংখ্যা জোড় হয় তাহলে বিপরীত ফল হবে।
বাস্তুর ঋণ গণনা
বাস্তুর ক্ষেত্রফলকে ৩ দিয়ে গুণ করে গুণফলকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে অবশিষ্ট যদি বিজোড় হয় তাহলে শুভ। অর্থাৎ ওই গৃহে ঋণ থাকবে না বা ঋণ থাকলেও তা সহজে মেটানো যাবে। কিন্তু অবশিষ্ট জোড় হলে ফল উল্টো। তাহলে ঋণের দায়ে বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যেতে পারে।
ভগবান বিশ্বকর্মার উক্তি ও লক্ষ্মীদেবীর অবস্থান
১. দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও সমাদর পূর্বক তাঁদের আবাহন ও বিসর্জন।
২. অতিথিদের যথাযথ সমাদর।
৩. ছোটরা হাসিখুশি থাকবে, খোলামেলা থাকবে।
৪. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার উত্তম ব্যবস্থা।
৫. কারও সঙ্গে ভেদভাব থাকবে না।
৬. ছোট ও বড়দের প্রতি যথাযথ সমাদর।
৭. ন্যূনতম প্রয়োজন মিটলেই যথেষ্ট, তুচ্ছ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আনন্দিত থাকা।
৮. ভেদভাব না রেখে অসুস্থে সেবা।
৯. বাড়ির অন্যান্য কর্মী ও পশুদের যথাযথ বিশ্রাম দেওয়া জরুরি।
১০. জন্মদাত্রী মা ও বাবা-র প্রতি অনুরক্ত থাকতে হবে।
১১. নতুন বাড়ির সর্বাঙ্গ পরিপূর্ণতা।
১২. প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঘর বা দরজা থাকলে চলবে না।
১৩. শাস্ত্রসম্মত বেধাদি দোষমুক্ত হতে হবে।
এই ১৩টি লক্ষণ সমৃদ্ধ গৃহে লক্ষ্মীদেবী সর্বদা বিরাজ করেন।
যোগবশিষ্টতে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব বলেছেন যে, ভাগ্য অদৃশ্য। এই বিশ্ব কর্মপ্রধান। সঠিক কর্ম ও লক্ষ্যপ্রাপ্তির সাহায্যে ভাগ্যকে জয় করা সম্ভব। ঘরের শ্রী ফেরাতে গেলে যে
তেরোটি দিশা দেখানো হয়েছে তা কিন্তু কৃচ্ছ্রসাধনা নয়। সেটি হল এক সাংসারিক ও ব্যবহারিক নিরন্তর চেষ্টা ও অভ্যাসের ফলশ্রুতি। তাই বাস্তুর শ্রীবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সুসংহত জীবনযাপনের এক উৎকৃষ্ট লক্ষণ। ভাগ্য নয়, সঠিক জীবনচর্চাই সমস্ত বাধাবিঘ্নকে অতিক্রম করে নিয়ে যেতে পারে। আর সেভাবেই মানুষ পৌঁছয় তার ঈন্সিত লক্ষ্যে। এই জন্যেই বলা হয় বাস্তুর জোরে বরাত ফেরে।