বইমেলায় একটি সন্ধ্যা
Boimelay Ekti Shondhya Rochona Bengali
‘বই ডাকছে বই….’
বইপাগল প্রত্যেক কলকাতাবাসী এই বিশেষ গানটির সঙ্গে সুপরিচিত। শীতকাল বললেই যেমন বড়োদিন, নববর্ষ, কমলালেবু কিংবা নলেনগুড়ের মিষ্টির কথা মনে পড়ে; তেমনই শীতকালের আর–এক সমার্থক হল কলকাতা বইমেলা। বইমেলা জাতি–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে– বিদ্যানুরাগী মানুষের চিত্ততৃপ্তির সহায়ক। বইমেলা বলতে শুধু বই নয়; পুস্তক প্রদর্শনীর সূত্রে লেখক, পাঠক, প্রকাশক, মুদ্রক প্রভৃতি আধুনিক জগতের গ্রন্থপ্রিয় মানুষের মিলনক্ষেত্রকে বোঝায়। রবীন্দ্রনাথ বই সম্পর্কে বলেছেন—“মানুষ বই দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে।”
প্রতিবছর শীতকাল এলেই বইমেলার দিন গোনা শুরু হয়ে যায়। তারপর দেখতে দেখতে এসে যায় মেলা উদবোধনের দিন। দিনটি ছিল ২৮ জানুয়ারি, ২০২৫। সল্টলেক করুণাময়ী প্রাঙ্গণে আয়োজিত ৪৮ তম এই আন্তর্জাতিক বইমেলার থিম দেশ ছিল জার্মানি। আমরা বন্ধুরা মিলে মেলায় যাওয়ার দিনক্ষণ, কী কী বই কেনা হবে সব পরিকল্পনা করে ফেলি। মেলার প্রথম রবিবার সবাই মিলে বিকালের পড়ন্ত রোদ্দুর গায়ে মেখে, হিমেল হাওয়ার স্পর্শ সঙ্গে নিয়ে বাসে উঠে পড়ি। আমাদের গন্তব্য— ‘বইমেলা প্রাঙ্গণ‘।
বইমেলার প্রবেশদ্বারে যখন পৌঁছোলাম, শীতের সূর্য তখন অস্ত গিয়েছে। আমরা ক–জন বন্ধু মিলে আলোকোজ্জ্বল পথ ধরে প্রবেশ করলাম বইয়ের সাম্রাজ্যে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মিশে গেলাম অগণিত মানুষের ভিড়ের মধ্যে। একটার পর একটা স্টল ঘুরতে লাগলাম। দেখলাম রাশি রাশি বই সর্বত্র। তারা বিষয়বস্তুতে, আকারে, রং–রূপে একে অপরের থেকে কত আলাদা। আর কত রকমের মানুষ চারদিকে। এই জ্ঞানের হাটে ভাবের বিকিকিনিতে মেতে রয়েছে সবাই। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় একটি লেখা চোখে পড়ল – “পৃথিবীতে বইয়ের বিকল্প একমাত্র বই–ই।”
ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েকটি বই কিনে ফেলেছি। একটি স্টলে ঢুকে একমনে দেখছিলাম ‘কালবেলা‘। কিনব মনস্থির করে ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে আমি হতবাক। দেখি লেখক সমরেশ মজুমদার স্বয়ং উপস্থিত সেখানে। তাঁর বইতে সই করে দিচ্ছেন। প্রিয় ঔপন্যাসিক ‘কালবেলা‘-র রচয়িতার সই নেওয়ার লোভ আর সামলাতে পারলাম না। তাড়াতাড়ি বই কিনে সই করিয়ে নিলাম। বন্ধুরাও আমার মতোই আনন্দিত। ফরমায়েশ হল আমার বইটা তাদের পড়তে দিতে হবে। আমিও রাজি হলাম। তারপর একে একে আরও অনেক স্টল ঘুরতে লাগলাম। মেলায় ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা খাবার স্টলগুলি থেকে আমরা খেলাম ‘স্যান্ডউইচ আর নলেনগুড়ের আইসক্রিম। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলাম। দেখতে পেলাম মাটিতে পসার সাজিয়ে বসেছে হস্তশিল্পীদের দল, নানা রকমের ছোটো–বড়ো মাটির, ডোকরার সামগ্রী, কোথাও বা হাতে আঁকা পটচিত্র, জলছবি সংস্কৃতির উজ্জ্বল রঙিন সম্ভার। দেখলাম – ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া‘র স্টল, দেখলাম বাংলাদেশের স্টল ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। দেখতে দেখতে দু–ঘণ্টা কেটে গেল। ক্লান্ত হয়ে আমরা গিয়ে বসলাম বইমেলার সংগীতমঞ্চের কাছে। লোকসংগীত শুনতে শুনতে কেটে গেল আরও কিছুটা সময়। রাত বাড়তে লাগল ।
অবশেষে বইমেলার সন্ধ্যার আবেশমুগ্ধতা কাটিয়ে দিল এক বন্ধু পিঠে খোঁচা দিয়ে, ধীরে ধীরে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম একরাশ বই নিয়ে। আজ সারা সন্ধে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করা, বই কেনা, প্রিয় সাহিত্যিককে কাছ থেকে দেখা, কত অজানা বইয়ের সন্ধান পাওয়া ইত্যাদি অনেক স্মৃতি ক্যামেরাবন্দি করার পাশাপাশি বন্দি করে রাখলাম মনের মধ্যেও; যা ভোলা যাবে না কোনোদিন। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বইমেলা থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে হল এ বছরের মতো একটি আনন্দ মুহূর্তের অবসান হল এবং নতুন করে শুরু হল এক প্রতীক্ষা—আগামী বছরের বইমেলার।