রচনা–সংকেত: ১. ভূমিকা; ২. দুর্ঘটনা : ৩. দুর্ঘটনার ফল; ৪. দুর্ঘটনার সংবাদ; ৫. উদ্ধারের কাজ; ৬. অবশেষে উদ্ধার; ৭. উপসংহার।
একটি খনি দুর্ঘটনা
১. ভূমিকা: ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়েই জীবন। মানুষের জীবন-প্রবাহে এমনি কত দুর্ঘটনার ইতিহাসই না জমা হয়ে আছে। প্রকৃতির খেয়ালিপনায় বহু জীবন অসময়ে চিরতরে থেমে গেছে। আজও থেমে যায়। মানুষের উপেক্ষা, ঔদাসীন্যেও অনেক জীবন শেষ হয়। প্রতিদিনই জীবনমঞ্চে নতুন, বিচিত্র সব দুর্ঘটনার আসা-যাওয়া। তবু জীবন এক বহতা নদী। কোনো দুর্ঘটনাই তার পথকে রুদ্ধ করতে পারে না। শুধু কিছু দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার। দুর্ঘটনা জীবনেরই এক অনিবার্য নিয়তি। কখনও যাত্রীবাহী বিমান ভেঙে পড়ে মহাশূন্যে। যাত্রীরা নিশ্চিহ্ন হয়। কখনও চলন্ত ট্রেন লাইন থেকে ছিটকে পড়ে। ট্রেনে ট্রেনে সংঘর্ষ হয়। লোক মরে। পঙ্গু হয় অসংখ্য। কখনও বাস উল্টে খাদে পড়ে। হতাহতের সংখ্যা বাড়ে। বাড়ি ভেঙে পড়ে। খনির খাদে আটকে পড়ে মানুষ। সম্প্রতি রানিগঞ্জের মহাবীর কোলিয়ারিতে এরকমই এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
২. দুর্ঘটনা: ১৯৮৯ সালের ১৩ই ডিসেম্বর। রানিগঞ্জ। মহাবীর কোলিয়ারি। ৬০ বছরের পুরনো কোলিয়ারি। এটি ইস্টার্ন কোল ফিল্ড লিমিটেডের অন্তর্ভুক্ত। খনির ৩৫০ ফুট গভীরে কাজে নেমেছেন ৭১ জন শ্রমিক। খনিতে নামার লিফট থেকে আধ ঘন্টার হাঁটাপথ। ভোর ৪-৪৫ মিনিট। ওপর থেকে টেলিফোনে খবর এলো খাদে প্রচুর জল ঢুকছে। মুহূর্তে সবার মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫ জন শ্রমিক দৌড়তে শুরু করলেন। মাঝপথে ২৪ নম্বর ‘হলেজ’। শ্রমিকরা দাঁড়িয়ে পড়লেন। সামনে তুমুল জলের স্রোত। পালাবার পথ রুদ্ধ। টেলিফোনে নির্দেশ এলো ৩৩ নম্বর প্যানেলের কাছে যাওয়ার। সেখানে যাওয়ার একটাই সরু রাস্তা। খাদের ১০০ ফুট গভীরে শ্রমিকরা জলবন্দী হলেন।
৩. দুর্ঘটনার ফল: ভোরের আলো ফোটার আগেই দুর্ঘটনার সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ছুটে এলো বন্দী শ্রমিকের আত্মীয় পরিজন। এলো আরও অনেকে। তাদের চোখে ছিল আতঙ্ক। মুখে আর্তনাদ। বুকে উথালপাথাল। গোটা এলাকা জুড়েই উৎকণ্ঠা, ভয় ছড়িয়ে পড়েছে। খনির আশপাশের পুকুরের জল কমে গেছে। কোনো কোনো তেতলা বাড়ির একতলা বসে গেছে। রানিগঞ্জ অমৃতনগরের রাস্তায় ২০ ফুট, ৬০ ফুট ও ১০০ ফুটের খাদ তৈরি হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়েছে যোগাযোগ। কোলিয়ারি যাওয়ার রাস্তায় ধস নেমেছে। বাদামবাগান অঞ্চলে ওই সব রাস্তায় পুলিসের কাঁটাতার পড়েছে। পাশেই রেললাইন। সেখানেও ধস নামার আশঙ্কা। ভেতরের ট্রান্সফর্মার ও বিদ্যুতের লাইন ভেঙে চুরমার। খনি শ্রমিকদের ব্যাটারির আলোই ভরসা। ফুলকপি ও পালং শাকের খেতের জল শুকিয়ে গেছে। কুয়োর জল নেমে গেছে। কোনো কোনো কুয়ো থেকে ধোয়া উঠছিল।
৪. দুর্ঘটনার সংবাদ: ভোর সাড়ে চারটেয় দুর্ঘটনা ঘটল। সেই খবর কলকাতায় এসে পৌছল সকাল সাতটার পরে। অথচ সদর দপ্তরের সঙ্গে প্রত্যেকটি খনির রয়েছে ‘হটলাইন’। খবর গেল দিল্লীর কানেও। কেন্দ্রীয় খনিমন্ত্রী তখন বসন্ত শাঠে। তিনি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের কথা জানালেন। ছুটে এলেন কোল ইন্ডিয়ার পদস্থ অফিসারেরা। এলেন ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের কর্মীরা। এসেছেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ। খবর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল টি.ভি. রাজেশ্বর-এর কাছে। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কাছে। দুর্ঘটনার তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের। নির্দেশ গেছে জেলা শাসক, পুলিশ সুপার ও পুলিসের ডি. আই. জি-কে দুর্ঘটনাগুলে উপস্থিত হওয়ার। কোল ইণ্ডিয়ার সদর দপ্তর কলকাতা ও ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের সদর দপ্তর সাকতোরিয়ায়। খোলা হয়েছে দুটো বিশেষ কন্ট্রোল রুম। মহাকরণেও আর একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। বন্দী শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্যে চলছে নানা শলাপরামর্শ। গ্রহণ করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
৫. উদ্ধারের কাজ: খনির ভেতরে ১ কোটি গ্যালন জল ঢুকেছে। রাঁচি ও ধানবাদ থেকে জল সরাবার পাম্প আনা হয়েছে। পাম্প সেট বসানো হয়েছে। ৭টি পাম্পে তখন জল সরাবার কাজ চলছে। তখনও জলের গভীরতা ৩৮ ফুটেরও বেশী। খনিতে জলস্তরের উচ্চতা বাড়ছে। এরই মধ্যে চলছে সঙ্কেতের আদান-প্রদান। কিন্তু তখনও কাউকে উদ্ধার করা যায়নি। দিন-রাত ধরে চলেছে উদ্ধার-কর্মীদের ব্যস্ততা। জলে সমুদ্র-গর্জন। শুধু উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ। খনি-মুখের কাছে ৬ ইঞ্চি ব্যাসের সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছে। সেই সুড়ঙ্গপথে জলবন্দী শ্রমিকদের জন্যে পাঠানো হয়েছে শুকনো খাবার। চা। পানীয় জল। তরল অক্সিজেন। ততক্ষণে দুর্ঘটনার ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেছে। শ্রমিকদের বের করে আনার জন্যে ২৪ ইঞ্চি চওড়া ব্যাসের আর একটি সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ চলছে। কাজ চলছে ১০০ ফুট চওড়া সুড়ঙ্গ তৈরির। শ্রমিকদের সঙ্গে চলছে কথার বিনিময়। তাঁরা ওপরে আসার প্রতীক্ষায় রয়েছেন।
৬. অবশেষে উদ্ধার: এমনি করেই কেটে গেল দুর্ঘটনার পর আরও ৪৮ ঘন্টা। ৭২ ঘণ্টা। ভয়, আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় ঠাসা প্রতিটি মুহূর্ত। আশা-নিরাশার হাতছানি। জলের গর্জন তাঁদের কাছে মনে হয় মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি। সেই ঘণ্টাধ্বনি যেন ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ভেতরে পচা গন্ধ। নিদারুণ নৈরাশ্য বন্দী শ্রমিকদের গ্রাস করছে। শ্রমিকরা পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। ক্রমশ তাঁরা নিস্তেজ হয়ে পড়েছেন। জীবনমৃত্যুর টানাপোড়েন। অন্ধকার এগিয়ে আসে। সেদিনের খাদ্য তাঁরা নিলেন না। বন্দী শ্রমিকদের কাছে একসময় খবর আসে উদ্ধারের কাজ সম্পূর্ণ। এবার উদ্ধারকার্যের শেষ পর্ব। শ্রমিকরা চাঙ্গা হয়ে ওঠেন। আবার ওপরের আলো তাঁদের হাতছানি দেয়। এর মধ্যে কেটে গেছে আরও অনেকগুলো উৎকণ্ঠিত প্রহর। অবশেষে বুধবার রাত ১২টা। ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শেষ হয়। শেষ হয় ৪০ ফুট গভীর ‘আয়রণ কেসিং’-এর কাজ। এদিকে জনসমুদ্র তখন উত্তাল। ১টা ২০ মিনিট। খনির ভেতরে নামানো হলো নয় ফুট উঁচু লোহার ‘ক্যাপসুল’। আবার ওপরে তুলে আনা হলো। উদ্ধারকারী দলের নেতা অ্যাডিশনাল চিফ মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার জি- এস. গিল। রাত তখন ২টা ২০ মিনিট। ‘ক্যাপসুল’ নিয়ে জি. এস. গিল নামলেন খনির ভেতরে। ২ টা ৩০ মিনিট। ক্যাপসুল নামল খনির তলায়। সামান্য বিরতি। অধীর উৎকণ্ঠা। নাটকের অন্তিম মুহূর্ত। ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এলো ক্যাপসুল। প্রথমে বাইরে এলেন বন্দী শ্রমিক শালগ্রাম সিংহ। তারপর একে একে ওপরে উঠে এলেন ৬৫ জন শ্রমিক। ফিরলেন না শুধু দু’জন।
৭. উপসংহার: খনি-মুখে তখন জয়ের উচ্ছ্বাস। সেই আনন্দের মুহূর্তে শুধু কয়েক জনের চোখে জল। তারা আর ফিরে পেল না তাদের প্রিয়জনদের। এর মধ্যে তাদের মৃতদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। আপাতত কোলিয়ারি বন্ধ ঘোষিত হয়েছে। এবার তদন্তের পালা। কোলিয়ারির দুর্ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠবে। উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্যে কে বা কারা দায়ী — সেই রহস্যও হয়ত একদিন বেরোবে। এই দুর্ঘটনার কবল থেকে যারা বেঁচে এলেন তাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এই অভিজ্ঞতা। শুধু জীবিত ফিরলেন না বিশু হাজাম, অগনু নুলিয়ারা।