রচনা—সংকেত: ১. ভূমিকা ; ২. শরতের অনুপম রূপরাশি; ৩. শরতের উৎসব ; ৪. ছুটির ঋতু শরৎ; ৫. শরৎ ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য; ৬. শারদীয়া সাহিত্য; ৭. উপসংহার।
আমার প্রিয় ঋতু শরৎ
১. ভূমিকা: প্রতি ঋতুরই স্বতন্ত্র রূপ, স্বতন্ত্র মেজাজ। কারো রুদ্রমূর্তি, চোখে আগুন। কারো বিষণ্ণ শ্রী, চোখে বেদনাশ্রু। কারো মোহন কান্তি। কেউ বা শুভ্রবরণ, হিমপাণ্ডুর। আবার কেউ রক্তিম প্রগল্ভতায় যৌবন মদে মত্ত। গ্রীষ্মের অগ্নি দহন জ্বালা মুছে গেছে। বর্ষার বিষাদ-বিধূর নিঃসঙ্গতাও অন্তর্হিত। নিঃশব্দ চরণে এসেছে শরৎ। মুখে তার প্রসন্ন হাসি। উদার অবকাশের মধ্যেই সে আমাদের ডাক দেয়। তাই রৌদ্রবরণ শরৎই আমার প্রিয়।
২. শরতের অনুপম রূপরাশি: শরতের রূপের শেষ নেই। তার রূপে বর্ষার বিষণ্ণতা নেই। নেই বসন্তের যৌবন-বিলাস। বর্ষণ দিনের ছায়াবৃত প্রহরগুলো উধাও। রোদের রঙ তপ্ত কাঞ্চন। আকাশে গাঢ় নীলিমার অবারিত বিস্তার। নীল গগনে জলহারা লঘুভার সাদা মেঘের দল। ধীর মন্থর ছন্দে তার সৌন্দর্যের নিরুদ্দেশ যাত্রা। সরসীর বুকে কুমুদ কমলের সমারোহ। দিগন্ত বিস্তার সবুজ ধানের ক্ষেত। তার শ্যাম-শস্য হিল্লোলে আনন্দ গুঞ্জরণ। ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি। গাছে গাছে পত্র-পল্লবে সবুজের ছড়াছড়ি। প্রাঙ্গণে প্রাঙ্গণে শেফালী সৌরভ। আঙিনায় গুচ্ছ গুচ্ছ দোপাটির বর্ণ সাজ। প্রভাতের তৃণ পল্লবে নব শিশিরের ভীরু স্পর্শ। গাছ-গাছালিতে দোয়েল শ্যামার মন-মাতানো সুরের মুর্ছনা। নদীকূলে কাশের ঢেউ। রাতের আকাশে রুপোলী জ্যোৎস্নার উদাস করা হাতছানি। শরতের এই রূপ সাগরে মন কেবলই ডুবে যায়। চোখে নেশা ছড়ায়। এজন্যেই শরৎ আমার এত প্রিয়।
৩. শরতের-উৎসব: শরতেও শস্যবিচিত্রা ধরিত্রীর উৎসবের সাজ। এই ঋতুতে হয় বাঙালীর শ্রেষ্ঠ শারদ-উৎসব দুর্গাপুজো। মনে লাগে উৎসবের রঙ। দিকে দিকে তারই আনন্দ জোয়ার, কলোচ্ছ্বাস। গ্রাম নগর মেতে ওঠে সেই উৎসবে। দুর্গতিনাশিনী দুর্গা তো বাঙালীর কাছে পুরাণের মহামায়া বিদ্যা, বিত্ত ও শক্তির প্রতীকমাত্রই নন। তিনি বাঙালীর আরাধ্যা জননী। স্নেহের কন্যা। তিনিই আবার দেশমাতা। ধনী দরিদ্র সকলের স্পর্শেই মাতৃপুজোর মঙ্গল ঘট পবিত্র হয়। আকাশে বাতাসে বাজে আগমনী-বিজয়ার গান। দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে যায় চণ্ডীপাঠের উদাত্ত ধ্বনি। প্রবাসীরা ঘরে ফেরে। ঘরে ঘরে প্রিয় মিলনের সুখ-চিত্র। নতুন বসন ভূষণে মানুষ নিজেকে সাজায়। ভুলে যায় বিভেদ হিংসা। মিলন মন্ত্রে হয় উজ্জীবিত। নবমী রজনী শেষে আবার বিদায়-বিষণ্ণতা। বিসর্জনের পর উষ্ণ প্রীতি-মিলন। লক্ষ্মীপুজো, শ্যামাপুজো, ভাই দ্বিতীয়া শরতেরই উৎসব। শরৎ তাই আমার কাছে এত প্রিয়।
৪. ছুটির ঋতু শরৎ: শরতের মোহন রূপ বাঙালীকে উতলা করে। ঘরের বাঁধন তখন তুচ্ছ হয়ে যায়। মন ভেসে চলে এক সৌন্দর্য নিকেতনে। তার শিউলি সুবাসে, শিশির-ভেজা ঘাসের ডগায়, আকাশের ঘন নীলিমায়, দোয়েল পাপিয়ার গানে, ভোমরার গুনগুনানিতে উদাস হাতছানি। শরতের সোনাবরণ রোদের দিকে চেয়ে মন কেবলই চলি চলি করে। সে আসে ছুটির নিমন্ত্রণ নিয়ে। একে উপেক্ষা করে কার সাধ্য। ক্লান্তি তার পথ আটকায় না। গৃহবন্দী মানুষ বেরিয়ে পড়ে সৌন্দর্যের তীর্থে তীর্থে। শরৎ ছুটির ঋতু। মুক্তির ঋতু। তাই তো শরৎ আমার হৃদয়ের ঋতু।
৫. শরৎ ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য: শুধু অনুপম রূপের ডালি নিয়েই শরৎ আমাদের সামনে হাজির হয় না। শরৎ আমাদের অর্থনৈতিক জীবনেও আনে স্বাচ্ছন্দ্য। আনে দুঃখ জয়ের প্রয়োজনীয় উপকরণ। শরৎ ফসলের ঋতু নয়। কিন্তু আগামী ফসলের কথাটা সে কানে কানে জানিয়ে যায়। বর্ষায় বীজ বোনা, হেমন্তে পাকা ফসলের প্রতিশ্রুতি, আর শরতে তারই পরিচর্যা। এরই ওপর রচিত হয় কৃষি-নির্ভর গ্রাম বাংলার আয়-ব্যয়ের হিসাব। বাঙালীর ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনা-বেচার সঙ্গে শারদ উৎসবগুলির সম্পর্ক গভীর ও ব্যাপক। আমাদের অর্থপ্রবাহে শরতেরও এক অপরিহার্য ভূমিকা। শরৎ তাই আমার কাছে এক ভাল লাগার ঋতু।
৬. শারদীয়া সাহিত্য: শরতে মনের ফসলেরও বিস্তর আয়োজন। এ সময়ই আত্মপ্রকাশ ঘটে অজস্র শারদীয়া সংখ্যার। বাঙালী কবি-সাহিত্যিকের দল তাদের বরণীয় রচনাসম্ভারে ভরে তোলেন অসংখ্য শারদীয় পত্র-পত্রিকা। তাঁদের নতুন নতুন ভাবনা-চিন্তার সমৃদ্ধ ফসলে তৃপ্ত হয় পাঠক মন। রূপে-রসে-রঙে-বৈচিত্র্যে মাখামাখি হয়ে শারদ সংখ্যাগুলো হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। এগুলোও শারদ উৎসবের এক অনন্য সম্পদ। তাই শরৎ আমার কাছে এক ভালবাসার ঋতু। এমন সৃষ্টি প্রাচুর্যে আর কোন ঋতুই মানুষকে মাতিয়ে রাখে না।
৭. উপসংহার: জগতে কোন প্রিয়ই চিরদিনের নয়। সবই চলে যায়। শরতের প্রসন্ন শোভাও একদিন মিলিয়ে যায়। থেমে যায় উৎসবের আনন্দ। শরৎও একদিন শিশির-বিছানো, শিউলি-ঝরা পথের ওপর দিয়ে কখন নিঃশব্দে চলে গেছে। পথে পথে রেখে গেছে ঝরা শেফালির কান্না, বিষণ্ণ কাশের গুচ্ছ, আর মাঠভরা নতুন ধানের মঞ্জুরী। ক জলভরা চোখে চেয়ে থাকে এই বাংলার মাঠ-প্রান্তর, পশু-পাখি, মানুষ-তরুলতা।মনের কোণে জমে থাকে বিদায়ের বেদনা। সর্বত্রই উৎসব-শেষের অশ্রুবিধুর আকুলতা। শরৎ যে আমাদের প্রাণের ঋতু। আমার প্রিয় ঋতু ।
📝 অনুসরণে লেখা যায়
১. শরৎকালে বাংলাদেশ
২. তোমার প্রিয় ঋতু