কলকাতায় ভয়াবহ ভূমিকম্প
Kolkatay Bhayabah Bhumikampa Rochona Bengali
কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন “মাটির নিঃশেষ সত্য দিয়ে গড়া হয়েছিলো মানুষের শরীরের ধুলো” – অথচ সেই মানুষেরই অপরিসীম লোভে সোলায়িত আজ পৃথিবীর মাটি। একের পর এক ভূ–আলোড়নে সংকটে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব। এমনই এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে আশঙ্কার মেঘ খনিয়েছে এবার বাংলার আকাশেও। ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, শুক্রবার। ঘড়ির কাটায় দুপুর ১টা বেজে ২২ মিনিট। কলকাতা তখন শশব্যস্ত। হঠাৎই থরহরি কম্প। কেঁপে উঠল কলকাতা–সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গ, এমনকি উত্তরও। উৎসস্থল বাংলাদেশের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তের সাতক্ষীরা জেলা। ভারতীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রক বলছে রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৫ (ইউএসজিএস–এর মতে ৫.৩)। বাড়ি, আবাসন, অফিস থেকে শপিং মল — কম্পন টের পেতেই রাস্তার নেমে আসে বহু মানুষ। কলকাতা থেকে মাত্র ৯৮ কিমি দূরত্বে ভূপৃষ্ঠের ৯.৮ কিমি গভীরে সৃষ্ট এই কম্পনের স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ১১ সেকেন্ড। বিগত বছরগুলিতে এমনকি ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকেও এ রাজ্যে ভূমিকম্প টের পাওয়া গিয়েছে একাধিকবার। কিন্তু এইদিনের ভয়াবহতা ছাপিয়ে গিয়েছে অতীতের সেইসব স্মৃতিকে। কম্পাঙ্কের নিরিখে মাঝারি মানের হলেও নৈকট্য, গভীরতা এবং স্থায়িত্বকাল মিলিয়ে এদিনের ভূমিকম্পকে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়ংকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরাও। বড়ো কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর না থাকলেও কলকাতার বেহালা অঞ্চলের পর্ণশ্রীর সাগর মান্না রোডে ১৫–২০ ফুটের একটি বিরাট ফাটল দেখা গিয়েছে। গাইঘাটায় আহত হয়েছেন এক বৃদ্ধা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে হাসপাতালে ভরতি হয়েছে স্কুলের কিছু ছাত্রছাত্রী। এ ছাড়া হাতিশালা সরোজিনী হাই মাদ্রাসা, চক মরিচা অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ও ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে।
পূর্ব, উত্তর–পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশ–মায়ানমার অঞ্চলে আজকাল প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে একের পর এক ছোটো–বড়ো ভূমিকম্প। এমন অস্থিরতার ফলে উৎপন্ন হচ্ছে প্রবল চাপ ও শক্তি। আসলে বাংলাদেশ অবস্থান করছে তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে, যথা— ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট এবং বার্মা প্লেট। এদিকে কলকাতার মাটির তলাতেও রয়েছে একাধিক চ্যুতি এলাকা ‘ইয়োসিন হিঞ্চু’। এদিনের উৎপত্তিস্থলও তার আশেপাশে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রকের তৈরি সর্বশেষ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মানচিত্র অনুযায়ী কলকাতা প্রবেশ করেছে ‘জোন-4’-এ। ফলে আগাছার ন্যায় বহুতল, গগনচুম্বী অট্টালিকার ভিড়ে ঝুঁকে পড়া কলকাতা বা তার আশেপাশের শহরতলিগুলিতে বিপদ আসন্ন। কারণ প্রকৃতি বারবার সুযোগ দেবে না। বিধ্বংসী কোনো বিপর্যয় এখন সময়ের অপেক্ষামাত্র। শুধু কলকাতা শহর বা রাজ্যবাসী নয়, গোটা বিশ্ব এই বিষয়ে এখনই সচেতন না হলে অদূর ভবিষ্যতে মানবসভ্যতার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।