আধুনিক জীবন ও প্রযুক্তি
Adhunik Jiban o Projukti Rochona Bengali
বর্তমান যুগ যন্ত্রসভ্যতার যুগ। মানুষ আজ বিজ্ঞানকে আয়ত্ত করে জলে–স্থলে–অন্তরীক্ষে বিজয় অভিযান চালিয়েছে। প্রযুক্তিবিদ্যা মানুষের জীবনযাত্রা ও তার প্রগতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য জীব প্রকৃতির দানকে যেমনভাবে লাভ করেছে তেমনভাবেই গ্রহণ করেছে। মানুষের মধ্যে আছে অফুরন্ত মননশক্তি। আর তার জোরে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনানুসারে তাকে নানাভাবে রূপান্তরিত করেছে। প্রাচীন যুগেও মানুষ প্রযুক্তিবিদ্যাকে আয়ত্ত করেছিল। স্থূল পাথর ও লোহা দিয়ে আত্মরক্ষার হাতিয়ার তৈরি করেছিল । বর্তমানে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানের আবিষ্কারলব্ধ তত্ত্বের সঙ্গে প্রযুক্তিবিদ্যার ঘনিষ্ঠ সংযোগ সাধিত হয়েছে। আধুনিক যুগে যন্ত্রই প্রযুক্তিবিদ্যার বাহন। বিজ্ঞানের আবিষ্কারলব্ধ তত্ত্ব ও প্রযুক্তিবিদ্যা পরস্পরের উপর নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল। আধুনিক জীবনের নানা সমস্যার সমাধানে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগই প্রযুক্তিবিদ্যা। প্রযুক্তির ব্যবহারে আধুনিক জীবনের অশেষ কল্যাণ সাধিত হচ্ছে।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবন প্রযুক্তির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে আছে। প্রযুক্তির দান— বৈদ্যুতিক পাখা, আলো, দ্রুতগামী যানবাহন, টিভি, রেডিয়ো, রেফ্রিজারেটর, বৈদ্যুতিক হিটার, স্মার্টফোন প্রভৃতি ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন অচল। জনসংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা। সেই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে নানারকম অধিক ফলনশীল শস্য। শস্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ – ট্র্যাক্টর, বীজবপন ও ফসল কাটার মেশিন, ফসল ঝাড়াইয়ের মেশিন সবই বিজ্ঞানের তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তির অবদান। বর্তমানে প্রযুক্তিবিদ্যা ছাড়া আধুনিক সভ্যতা তথা আধুনিক জীবনের কথা ভাবাই যায় না।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অসাধারণ উন্নতি ঘটেছে। সংবাদপত্র, টিভি, রেডিয়ো, সিনেমা প্রভৃতি গণমাধ্যম প্রযুক্তিবিজ্ঞানেরই দান। বিজ্ঞানের নানা তত্ত্বের সাহায্যে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এইসব গণমাধ্যম বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। জনগণের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে সংবাদপত্র, টিভি, রেডিয়োকে আরও উন্নত করার চেষ্টা হচ্ছে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে। বর্তমান পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে টিভি, স্মার্টফোন, কম্পিউটার–এর মতো গণমাধ্যম। বর্তমান জীবনে কম্পিউটারের ব্যবহার আশ্চর্যভাবে বেড়েছে। প্রযুক্তির হাত ধরে কম্পিউটারের মাধ্যমে নানান খবর, প্রয়োজনীয় তথ্যভাণ্ডার পৃথিবীর সর্বত্র পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে। কম্পিউটারের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আদানপ্রদানের মতো সবরকম তথ্য গচ্ছিত রাখাও সম্ভব হয়েছে।
করোনাকালে প্রযুক্তিই অসংখ্য মানুষের জীবিকা, শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। লকডাউনের সময় বিশ্বব্যাপী মানুষ যখন দীর্ঘদিন ঘরবন্দি তখন প্রযুক্তির মাধ্যমেই ঘরে বসে অফিসের কাজ বা স্কুল ও প্রাইভেট টিউশনের ক্লাস করা সম্ভব হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতিতেই সে সময়ে ঘরে বসে আমরা হাতে পেয়েছি ওষুধ, জামাকাপড়, খাদ্য ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। এইসময় আমাদের বিনোদনের সঙ্গী হয়েছে প্রযুক্তির আধুনিকতম ফসল ওটিটি প্ল্যাটফর্ম।
গবেষণায় ভারত আজ যথেষ্ট এগিয়ে। শুধু পারমাণবিক অস্ত্র নয়, পরমাণু শক্তিকে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়েও পরমাণু পরমাণু গবেষণায় প্রযুক্তিবিজ্ঞান উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছে। পরমাণু শক্তিকে ভালো কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। পরমাণু গবেষণায় প্রযুক্তির ব্যবহার করেই সাফল্যলাভ সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে মহাকাশ গবেষণায় বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বেড়েছে। মহাকাশে স্থাপিত হয়েছে কৃত্রিম উপগ্রহ, মঙ্গলগ্রহে অভিযান চলছে, চলছে মহাকাশ বিষয়ক নানা গবেষণা–এসব প্রযুক্তিকে অবলম্বন করেই সম্ভব হচ্ছে।
প্রত্যেক জিনিসেরই ভালো ও মন্দ দুটি দিক আছে। প্রযুক্তিবিদ্যাও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রযুক্তি যেমন আধুনিক মানবজীবনের কল্যাণ সাধন করছে তেমনই সে প্রকারান্তরে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষতিসাধনেও উন্মুখ। ক্ষমতাগর্বী রাষ্ট্রনায়করা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নাশকতার ছক কষতে তৎপর। অত্যধিক প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের কর্মশক্তি ও স্মৃতিশক্তির হানি ঘটাচ্ছে। সামাজিক মানুষ হিসেবে প্রযুক্তির এইসকল ক্ষতিকর দিককে বর্জন করে ভালো দিককে গ্রহণ করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য।
প্রযুক্তি ও আধুনিক জীবন একে অপরের পরিপূরক। আধুনিক জীবনে প্রযুক্তির অপরিহার্যতা অস্বীকার করা যায় না। তবে এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ সময়ে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। প্রযুক্তির উদ্ভব মানবকল্যাণের জন্য। কিন্তু তাকে ধ্বংসকার্যে নিয়োজিত করলে তা হবে মানবজাতির পক্ষে অভিশাপস্বরূপ।