শিশুশ্রম
Sheeshu shrom Rochona Bengali
“এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
আজ বসন্তের শূন্য হাত
ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”
কবির এই আকুতি যাদের জন্য, তারা অনেকেই কিন্তু স্বপ্নে থাকে না। মানুষের লোভ–লালসা, স্বার্থপরতা আর নিষ্ঠুরতার আঁধারপুরীতে হারিয়ে যায় তাদের শৈশব। পড়াশোনা, খেলাধুলো, মা–বাবার স্নেহ–ভালোবাসা, ভাই–বোন, বন্ধুবান্ধবের সান্নিধ্য থেকে দূরে এক নিরানন্দময়, কঠোর বাস্তব জগতে তাদের ধরে নিয়ে যায় শিশুশ্রমের রাক্ষস।
দেশের নড়বড়ে আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন অসাধু উপায়ে বিরাজ করে যেসব ন্যক্কারজনক রেওয়াজ, শিশুশ্রম তাদের মধ্যে একটি। শিশুশ্রম বলতে বোঝায় সেইসব কাজ, যা শিশুদেরকে তাদের শৈশব থেকে বঞ্চিত করে। যে কাজগুলি শিশুশ্রমের আওতায় পড়ে সেগুলি হল— ১। যে কাজ শিশুদের জন্য শারীরিক, সামাজিক বা নৈতিকভাবে বিপজ্জনক ও ক্ষতিকারক, ২। যে কাজ শিশুদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায়।
সবথেকে খারাপ প্রকৃতির শিশুশ্রম শিশুদের খুব কম বয়সেই তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ক্রীতদাসে পরিণত করে, তাদের গুরুতর বিপদ-আপদের ও অসুখবিসুখের ঝুঁকির মধ্যে টেনে নিয়ে যায় এবং বড়ো শহরের পথে-ঘাটে নিজেদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে।
ইনটারন্যাশনাল লেবর অর্গানাইজেশনের নির্দেশিকা অনুসারে নিকৃষ্টতম শিশুশ্রমগুলি হল : ১। সব ধরনের দাসত্ব, শিশুপাচার, ঋণ পরিশোধ করতে শিশুদের গোলাম হিসেবে রাখা, সশস্ত্র বিরোধে অংশ নেওয়ার জন্য শিশুদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ। ২। বেশ্যাবৃত্তি, পর্নোগ্রাফিতে শিশুদের ব্যবহার করা ও সেই কারণে তাদের আটক করে রাখা বা কারও হাতে সমর্পণ করা। ৩। মাদকপাচার জাতীয় অবৈধ কাজকর্মে শিশুদের নিয়োগ করা, সেই উদ্দেশ্যে তাদের ধরে রাখা বা অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। ৪। যেসব কাজের প্রকৃতি বা পরিবেশ শিশুদের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা বা নৈতিকতার ক্ষতিসাধন করে।
কোনো কাজ ‘শিশুশ্রম’-এর আওতায় পড়বে কি না তা নির্ভর করে বেশ কিছু বিষয়ের উপর। যেমন—শিশুর বয়স, কাজের প্রকৃতি ও সেটি সম্পাদন করার সময়সীমা, কাজের পরিবেশ এবং বিভিন্ন দেশের নিজ নিজ অভীষ্ট লক্ষ্য।
বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রমিকের সংখ্যা গত ১৫ বছরে যখন এক-তৃতীয়াংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, সেখানে ভারতের মতো দেশে কোটি কোটি শিশু এখনও এই দুরাচারের শিকার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে শিশুশ্রমে নিযুক্ত প্রায় ১২.৯ মিলিয়ন শিশু, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকসংখ্যক হল মেয়ে। ভারতে বহু শিশুশ্রমিক কাপড়ের মিলে, গালিচা বানানোর কাজে, চামড়া, অলংকার ও কাঁচা রেশম উৎপাদনের কারখানায় কাজ করে শুধুমাত্র খাদ্যের বিনিময়ে। এ ছাড়াও, অনেকে খাদানের বা ইটখোলার মজুর হিসেবে কাজ করে। এক বড়োসংখ্যক শিশুশ্রমিক বিড়ি তৈরি ও রাস্তায় রাস্তায় তা বিক্রি করার কাজে প্রায় সারাদিন ব্যয় করে। ভারতে প্রায় ১.২ মিলিয়ন শিশু বেশ্যাগিরির শ্রমে নিযুক্ত।
শিশুশ্রমের মতো নিকৃষ্ট ব্যাপারের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান হল —
১। দারিদ্র্য: ভারতে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিকাশ সত্ত্বেও এক-তৃতীয়াংশ ভারতীয় এখনও দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করে। দরিদ্র পরিবারগুলি তাদের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের কাজে নিয়োগ করতে বাধ্য হয় পেটের দায়ে।
২। অশিক্ষা: শিশুশ্রমের নেপথ্যে অশিক্ষাও এক বড়ো কারণ। অশিক্ষিত বাবা-মায়ের কাছে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা শূন্য। বরং কাজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন তাদের কাছে অনেক বেশি জরুরি।
৩। অসাধু ব্যবসায়ী ও মালিক শ্রেণি: অসাধু ব্যবসায়ী ও মালিকেরা কম বা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করিয়ে নেওয়ার অভিসন্ধিতে শিশুদের কাজে নিযুক্ত করে। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক কর্মচারীরা তাদের এই অসদাচরণ মেনে নেবে না।
শিশুশ্রমের অশুভ কবল থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে সরকারের সঙ্গে আমাদের সকলের মিলিতভাবে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে যে আইনগুলি আছে, সেগুলির যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে প্রশাসন-সহ অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন জনগণের সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার। বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক সংস্থা ও এনজিও-গুলির শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সকল স্তরে সচেতনতা বাড়ানোর কর্মসূচি নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাওয়া একান্ত আবশ্যক। গরিব পরিবারগুলিকে পরিবার পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করানোও শিশুশ্রম রোধের অন্যতম উপায়। শিশুশ্রম যে-কোনো সভ্য দেশের জন্য এক চূড়ান্ত লজ্জা। এক নিরতিশয় গ্লানি। একে মোচন করার গুরুদায়িত্ব আমাদের সবার।