ভ্রমণের মূল্য
Bhromoner Mullo Rochona Bengali
অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার, অদেখাকে দেখার আকাঙ্ক্ষায় মানুষের মন সদাই ব্যাকুল। মুক্ত বিহঙ্গের মতো সে ছুটে যেতে চায় সংসারের সংকীর্ণ সীমানা ছাড়িয়ে অবাধ মুক্তির মাঝে। ক্ষুদ্র সীমানার মধ্যে বন্দি হয়ে থাকা মনুষ্যধর্ম নয়। বিরাট বিশ্বে অন্তহীন অসংখ্য বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে পাহাড়ে–পর্বতে, নদী–নির্ঝরে, অরণ্য–কান্তারে; বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের জীবনযাপনের বিচিত্র ধারায় আর সমাজ–সংস্কৃতিতে। সব কিছু জানার কৌতূহলই মানুষকে টেনে এনেছে অনন্ত পথের ধুলোয়। বিপুলা এই পৃথিবী প্রতিমুহূর্তে হাতছানি দিয়ে আহ্বান জানায় তাকে, আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েই মানুষ হয় চিরপথিক। তাই তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় বন্ধনমুক্তির গান— ‘প্রবাহিয়া চলে যাই সমস্ত দ্যুলোকে…।‘
মানুষের স্বভাবগত নেশাই হল ভ্রমণ। দেশদেশান্তরে ভ্রমণের মাধ্যমেই মানুষ চরিতার্থ করে তার মনের সৌন্দর্যপিপাসাকে। প্রকৃতি যে অন্তহীন সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছে, একমাত্র ভ্রমণের মাধ্যমেই তা পূর্ণভাবে উপভোগ করা সম্ভব। আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে অবাধ চলার সুযোগ করে দিয়েছে বলেই মানুষ আজ সহজেই পারে প্রকৃতিজগতের আনন্দলীলার বৈচিত্র্য উপভোগ করতে। অতীত যুগে মানুষ দেশ ভ্রমণ করত কখনও দুর্গম পথে পায়ে হেঁটে, কখনও পশুবাহন হয়ে অথবা পশুবাহিত মন্থর গতির যানবাহনে অথবা পালতোলা জলযানে চড়ে। নতুন নতুন জনপদ, মানবজীবন ও সভ্যতা–সংস্কৃতির আকর্ষণে এইভাবে সে অর্জন করেছে বিচিত্র এবং অমূল্য অভিজ্ঞতা।
ভ্রমণ আজ শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বাস্তব জ্ঞান এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে ভ্রমণের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশভ্রমণে যে শিক্ষালাভ হয়, সারাজীবন গ্রন্থকীট হয়েও তা অর্জন করা সম্ভব হয় না। বই পড়ে যে জ্ঞান লাভ করা যায়, তা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে ভ্রমণের মাধ্যমেই।
দেশভ্রমণ ছাড়া ইতিহাস ও ভূগোলের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমরা বইয়ে পড়ি হরপ্পা সভ্যতার কথা, দিল্লির লালকেল্লা, কুতুবমিনার, আগ্রার দুর্গ প্রভৃতির বর্ণনা। এইসব স্থান প্রত্যক্ষ না করলে ইতিহাস পড়ার মধ্যে অস্বচ্ছতা রয়ে যায়। ভূগোল বইয়ে জলপ্রপাত, ভঙ্গিল পর্বত, নদীর বাঁধ, মালভূমি ইত্যাদির ছবি দেখি কিন্তু ভ্রমণের মাধ্যমে এগুলিকে প্রত্যক্ষ না করলে এগুলির সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা হয় না।
ভ্রমণ অনাবিল আনন্দের উৎস। এই আনন্দই শিক্ষালাভের প্রক্রিয়াকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। শরীরে যেমন পুষ্টি জোগায় খাদ্য তেমনই মানুষের মানসিক ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটে দেশভ্রমণে। ভ্রমণ একই সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।
ভ্রমণের উদ্দেশ্য বহুবিধ। কেউ শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করে, কেউ–বা নিছক বিনোদনের জন্য, আবার কারও উদ্দেশ্য তীর্থ দর্শন – কেউ আবার জিজ্ঞাসু মনের ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হন। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে। তাই মানুষ একটু সুযোগ পেলে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে সেই ক্লান্তি দূর করার জন্য। এ ছাড়াও রয়েছে মানুষের চিরন্তন কৌতূহল। সেইসব কৌতূহল নিবৃত্তি কিংবা নিজ জ্ঞানের সীমিত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার জন্য ভ্রমণের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে মানুষের হৃদয় বিকশিত হয়ে ওঠে। অজানাকে জানার মধ্য দিয়েই এক অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্যক্তির বদলে সমষ্টির সঙ্গে একটা নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধন রচিত হয়; সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান, ভাবের বোঝাপড়া এবং হৃদয়ের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
পৃথিবীর সব দেশেই ভ্রমণের গুরুত্ব স্বীকৃত। আনন্দের উৎস হিসেবে এবং সেই সূত্রে শিক্ষার অঙ্গরূপেও ভ্রমণের জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি‘ —এই তৃয়ায় মানুষ পরিচিত পরিবেশ ও গণ্ডি ছেড়ে অচেনা–অজানা দেশে ভ্রমণে উন্মুখ। ভ্রমণের মধ্যে প্রাত্যহিকতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে ভ্রমণ আধুনিক জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।