বাংলার উৎসব
Banglar Utsab Rochona Bengali
‘উৎসব‘ বাঙালির প্রাণশক্তির বিকাশগর কল্যাণী ইচ্ছা তখনই জেগে ওঠে—এ ইচ্ছের প্রকাশ উৎসব। কথায় আছে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এক–একটা উপলক্ষ্যকে আশ্রয় করে বাঙালি আয়োজন করেছে বিভিন্ন উৎসবের। জাতীয় উৎসব, সামাজিক ও পারিবারিক উৎসব, ধর্মীয় উৎসব, ঋতু উৎসব ইত্যাদির সঙ্গে বাঙালির চিত্ত আধুনিক সময়ের কিছু উৎসবকেও একাত্ম করে নিয়েছে। পারিবারিক উৎসব সেখানে সামাজিকতা পেয়েছে, রাষ্ট্রীয় উৎসব হয়ে উঠেছে জাতীয় উৎসব।
জাতীয় উৎসবে বাঙালি মুখরিত হয় ২৩ জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন, ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস থেকে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে, ১৪ নভেম্বরের শিশু দিবস, ২ অক্টোবর মহাত্মা স্মরণে। ১২ জানুয়ারি বিবেকানন্দের প্রতি শ্রদ্ধায় যুব দিবস, ৫ সেপ্টেম্বর রাধাকৃয়ন স্মরণে শিক্ষক দিবস, ১৪ এপ্রিল আম্বেদকর দিবস বর্তমানে সংযোজিত হয়েছে এ ধারায়। বাঙালি প্রাণের ঐতিহ্য রবীন্দ্র জন্মোৎসবকেও জাতীয় উৎসবের মাহাত্ম্য দান করেছে। এইসকল উৎসবপালনে তার জাতীয়তাবাদী চেতনাই প্রকাশিত হয়।
বছরের শুরুতে পয়লা বৈশাখের পুণ্যবাসরে বাঙালির হালখাতা। নববর্ষ পালনের পর ক্রমে দোলযাত্রা, রথযাত্রা, মনসা, শীতলা, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী–লক্ষ্মী, শিবরাত্রি, মহরম, সবেবরাত, নবী উৎসব, ইদ, সবেমিরাত ইত্যাদি সারাবছর চলতে থাকে। ধর্মীয় উৎসবগুলির সঙ্গে এসে মিলে যায় আদি–অকৃত্রিম লৌকিক উৎসবগুলিও। কখনও পুণ্যিপুকুর পুষ্পমালা, কখনও ইতুর ঘট, কখনও ভাদু–টুসু উৎসব, কখনও পাতা পরব, করম পরব ইত্যাদি। বাঙালি নারীর কণ্ঠে আবৃত্ত হয়—
“পুণ্যিপুকুর পুষ্পমালা
কে পূজেরে দুপুরবেলা
আমি সতী গুণবতী
ভায়ের বোন ভাগ্যবতী।”
বাসন্তী পুজো, রটন্তী পুজো, অন্নপূর্ণা পুজো, মঙ্গলচণ্ডী, বিপত্তারিণী ইত্যাদি নানারূপে মাতৃ–আরাধনা করলেও অকালবোধিতা দেবী দুর্গার উৎসবই বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। আনন্দময়ীর আগমনবার্তায় শরৎ ঋতু মুখরিত হয়ে ওঠে। আকুল–প্রাণ বাঙালি ঘরের বিবাহিতা কন্যাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাড়ি আনতে সারাবছরের অপেক্ষা নিয়ে উদ্গ্রীব থাকে। মহালয়ায় পিতৃতর্পণ করে বাঙালি মহিষাসুরমর্দিনীর বন্দনায় মেতে ওঠে। ‘রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি…. কতশত প্রার্থনা আকুল প্রাণের। আলো ঝলমলে দিনরাত, শিউলি মধুর বাতাস, ঢাকের বাদ্যি, নতুন জামা দশভুজার আগমনে বাঙালি জাতি পায় নবপ্রাণ। কিন্তু উৎসব শুরুর মাঝেই বাজে সমাপ্তি সংগীত। বিজয়ার ব্যথা ভুলে যাওয়ার আগেই আসে লক্ষ্মীদেবীর পূর্ণিমা তিথি। তারপর ভূতচতুর্দশী। চোদ্দো শাক, চোদ্দো প্রদীপে পূর্বজকে স্মরণ করে বাঙালি মত্ত হয় শ্যামামায়ের রাঙা চরণে রক্তজবার আহুতি দিতে। একই সঙ্গে চলে আসে ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার শুভদিন। একে একে আসে ইদ, পৌষপার্বণ, নবান্ন, বাগদেবীর আরাধনা, বসন্ত উৎসবের বর্ণময়তা। বৈশাখের প্রথম দিনে গণেশের কাছে প্রার্থনায় যে উৎসবের সূচনা চৈত্রের শেষ দিনে চড়কের মেলায় ভোলানাথের কাছে প্রার্থনায় সে বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়।
পারিবারিক উৎসব বিবাহ, আদ্যকৃত্য, জন্মদিন, উপনয়ন, নামকরণ, সাধভক্ষণ ইত্যাদির সঙ্গে সংযুক্তি ঘটে সামাজিক উৎসবগুলিরও। রাখিবন্ধন, রবীন্দ্র জন্মোৎসব, মাতৃভাষা দিবস আজ বাঙালিরই নয় বিশ্বের মৈত্রী ও মাতৃভাষার দ্যোতক।
বাঙালির ঋতু উৎসবগুলি আজ আর তেমন ভিন্ন ভিন্ন আকারে নেই। তাই বৈশাখী পূর্ণিমা থেকে মাঘী পূর্ণিমা, বীজবপনের বর্ষামঙ্গল, রথযাত্রা, কার্তিকের শস্যদেবতার উদ্দেশে নবান্ন, ভাদ্রের জন্মাষ্টমী, শ্রাবণ–ভাদ্রের ঝুলন, ফাল্গুন–চৈত্রের দোল, চৈতন্য জন্মোৎসব, কার্তিক–অঘ্রানের রাসযাত্রা আজ তুলনায় ক্ষীণাকার হলেও বাঙালির উৎসবের বহুমাত্রিকতার প্রামাণ্য উদাহরণ এগুলি। ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ দু–রকম উৎসবেই বাঙালির প্রাণপ্রবাহের তীব্রতা সুবিদিত। আধুনিক জীবনযাত্রার অতি গতিতে, নগরায়ণের প্রাবল্যে বদল ঘটেছে বাঙালির উৎসবেও! সূর্যোৎসব, ধরিত্রীপুজা, আওনি বাওনি আচার, ক্ষেত্রঠাকুর, কাউয়াপির, গঙ্গাপুজো, নদীপুজো, সর্প উৎসব নাগপঞ্চমী, বনবিবি–দক্ষিণ রায়, সহরুল–বিন্দা–সোহরাই করম ইত্যাদি বহু উৎসবই আজ বিস্মৃত বা বিস্মৃতির পথে। এই বিস্মৃতি বাঙালির জীবনের ইতিহাসকেও পালটে দিচ্ছে ক্রমে ক্রমে। অন্তরের সহৃদয়তা, ঔদার্য, প্রেম–প্রীতি–ভালোবাসার প্রকাশক বাঙালির উৎসব। উৎসব জাতি–ধর্ম–বর্ণ–সম্প্রদায়–শ্রেণিভেদ ভুলে মিলতে শেখায়। তাই তো বাঙালি দুর্গাপুজো–ইদ–বড়োদিনে সমানভাবে মেতে ওঠে। বাঙালির উৎসব নানা উপলক্ষ্যকে মূর্ত করে তোলে। এ উৎসব লোক– সমাজ–জাতি–ধর্ম–জীবনচর্চার নানা দিককে জানতে–বুঝতে–শিখতে শেখায়। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন থেকে বাৎসল্যের মাধুর্য, শস্য ফলনের গুরুত্ব থেকে পিতৃপুরুষের মর্যাদা— এ উৎসবগুলি থেকেই বাঙালি শিখে নেয় ছোটো থেকে বড়ো হতে হতে। বর্তমান উৎসবে অবশ্য বহিরঙ্গ আচার–উৎসবের মূলধারাটিকে ক্ষীণ করছে। কিন্তু বাঙালি তার এই আচারসর্বস্বতা ভুলে উৎসবের লাবণ্যকেই ফিরিয়ে আনবে—বাঙালি হিসেবে এটাই আমাদের চাহিদা।