সবুজায়ন বনাম নগরায়ণ
Shobujayon bonam Nogorayon Rochona Bengali
উদ্ভিদ ও প্রাণীর পারস্পরিক নির্ভরতা নিয়েই গড়ে উঠেছে এই প্রকৃতিজগৎ। এই পৃথিবীতে প্রথমে এসেছে উদ্ভিদ। সেই উদ্ভিদজগৎকে নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে এই প্রাণীজগৎ। প্রাণীজগতে সর্বশেষে এসেছে মানুষ, যারা নিজেদের বুদ্ধির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিতেও উন্নতি করেছে, ফলে বিকাশ ঘটেছে মানবসভ্যতার। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মানুষের প্রয়োজন হয়েছে বাসভূমির। এই জনবিস্ফোরণের ফলেই বিনষ্ট হচ্ছে প্রকৃতির সুস্থতা। অবাধে সবুজ ধ্বংস করে, জলাশয় বুজিয়ে গড়ে উঠছে উপনগরী। বিশাল বিশাল অট্টালিকায় ঢাকা পড়ছে আকাশের মুখ। যুগের চাহিদা, আধুনিকতার অগ্রগতি এবং মানুষের প্রযুক্তিবিদ্যার সাফল্যের পাশাপাশি জনসংখ্যাবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্বার্থই নগরায়ণের কারণ। এর ফলে, সবুজ আজ আক্রান্ত এবং পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও। কিন্তু বাস্তুবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে সচেতন নন।
মানবসভ্যতার গতিশীলতার রথ পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলেছে। সমস্ত জীবের অগ্রগামী আদি প্রাণ যে উদ্ভিদ সে জীবজগৎকে সুধা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চায় কিন্তু মানুষ নির্বিচারে ধ্বংস করে চলেছে সবুজের সেই উৎসকে। নগরায়ণের গতি যত বাড়বে ততই সবুজ ধ্বংস হবে। সুজলা, সুফলা দেশ ভরে যাবে ইট–কাঠ–পাথরের স্তূপে। সবুজ পাতা–ঘাস মাটিকে উর্বরাশক্তি দেয়, আকাশে সজল মেঘের সঞ্চার ঘটায় গাছ, মাটির ক্ষয় রোধ করে, প্রকৃতিকে শীতল রাখে। সবুজ ধ্বংসের ফলে মাটির উর্বরাশক্তি কমে যাচ্ছে, বিশ্বপরিবেশ তীব্র থেকে তীব্রতর উন্নায়নের মুখে। বনভূমির অভাবে বৃষ্টিপাত কমছে। সবুজ মানুষের দৃষ্টিকে নন্দিত করে। অতিরিক্ত সবুজ ধ্বংসের ফলে ধূসর জগৎ মানুষের মনেও আনছে পরিবর্তন। পারস্পরিক সহমর্মিতা, মূল্যবোধ ভুলে মানুষ আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠছে। হারিয়ে যাচ্ছে রূপ–রস–গন্ধে ভরা এই পৃথিবীর সৌন্দর্য।এই পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম অস্তিত্ব এনেছে উদ্ভিদ। ‘মৃত্তিকার বীর সন্তান‘ গাছই মানুষকে দিয়েছে নির্মল বিশুদ্ধ বাতাস, খাদ্য। আদিম মানুষ একদিন গাছকে, বৃদ্ধতাকে দেবতাজ্ঞানে পুজো করেছে। পরিবেশরক্ষায় গাছের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে বলা হয়েছে ‘একটি গাছ একটি প্রাণ‘। গাছ কার্বন ডাইঅক্সাইড শুষে নিয়ে পরিবেশকে ফিরিয়ে দেয় প্রাণধারণের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন। শুধু তাই নয়, বন্যা–ভাঙনকে রোধ করতে প্রয়োজন গাছের। প্রকৃতপক্ষে, বাস্তুরীতির ভারসাম্যটি ধরে রেখেছে গাছ। গাছ থাকলে তবেই পৃথিবী থাকবে সবুজ। এই দেশে ধীরে ধীরে অরণ্যভূমি শতাংশের হারে কমে আসছে। ফলে, ইতিমধ্যেই আমরা লক্ষ করছি ‘ইকোলজিক্যাল‘ ভারসাম্যের অভাব। মাটি ক্রমশই রুক্ষ ও ঊষর হয়ে উঠেছে। একমাত্র গাছই পারে সমগ্র পৃথিবীকে মরুভূমি হওয়া থেকে বাঁচাতে। সৃষ্টির যে মহা ঐকতান সংগীত তাতে রয়েছে অরণ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফলে, সবুজের অর্থাৎ বৃক্ষের ধ্বংস হল আসলে সভ্যতার মহাধ্বংসের নিষ্ঠুর আয়োজন ।
ভারতে ইংরেজ শক্তির অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই নাগরিক জীবন সংগঠনের সূচনা। ক্রমে তা কালোপযোগী হয়ে উঠছে। প্রকৃতির বিচারে আধুনিক নগরায়ণ প্রাচীন কালের থেকে অনেক স্বতন্ত্র। ইউরোপীয় ধাঁচে যে নগরমুখী জীবনচেতনার শুরু তার প্রথমেই ছিল বনভূমি ধ্বংসের মহাযজ্ঞ। তারপর দিকে দিকে কলকারখানা প্রতিষ্ঠায় ব্যাবসায়িক স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কথাটি মানুষ ভুলেই গেল। অনিয়ন্ত্রিত, অসংযত বাণিজ্যবৃদ্ধি এবং জনবিস্ফোরণ মানুষকে ক্রমে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অবাঞ্ছিত ও অশুভ পরিণতির দিকে। মানুষ ভুলে যাচ্ছে যে, এই মানবজীবন বিচ্ছিন্ন কোনো সৃষ্টি নয়—পরিবেশের সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরতায় তা গঠিত। যুগের প্রয়োজনে নগরায়ণ অবশ্যম্ভাবী হলেও তা সবুজ রক্ষা করেই করা উচিত। প্রকৃতিতে প্রচুর পরিমাণে গাছ থাকা প্রয়োজন, তা না হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে এই পৃথিবী মৃত গ্রহে পরিণত হবে। বিষাক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ইত্যাদিতে ভরে যাচ্ছে পরিবেশ, দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাঁধছে মানবশরীরে। সবুজ নিধনের ফলে কীটপতঙ্গ, জীবজন্তুর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ভয়ংকর প্রভাব। প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে এদের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই নগরায়ণের পাশাপাশি দরকার গাছ বাঁচানো এবং নতুন গাছ লাগিয়ে নগরায়ণকে দূষণমুক্ত করা। প্রকৃতির সহায়তা নিয়েই আমাদের বাসস্থান গড়তে হবে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যদি বিজ্ঞান–বিদ্যার অহংকার প্রকাশ করা হয় তবে প্রকৃতির প্রতিশোধ নেমে আসবেই। শ্যামলা বনলক্ষ্মী প্রকৃতিতে তাঁর আশীর্বাদ উজাড় করে দিয়েছিলেন কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে মানুষ তাঁর আশীর্বাদকে অভিসম্পাতের দিকে নিয়ে চলেছে।