শিক্ষায় ও চরিত্রগঠনে খেলাধুলো
Shikkhay o Choritro Gothone Kheladhulo Rochona Bengali
“চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু
সাহস বিস্তৃত বক্ষপট।” –রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। শরীরের সঙ্গে মনের যোগ গভীর। সুস্থ শরীর ছাড়া জ্ঞান, শিক্ষা, চরিত্রবল, আর্থিক সমৃদ্ধি সবই নিরর্থক। তাই তো উপনিষদে
বলা হয়েছে—‘শরীরম আদ্যম খলু ধর্মসাধনম্ ।
দেহ হল মন্দির। দেহের সুগঠনে, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে খেলাধুলো। নিয়মিত ও পরিমিত খেলা এবং ব্যায়াম দেহ ও মন সুগঠিত করে, মনে আসে প্রফুল্লতা। নিষ্ক্রিয়তা বা জড়তার অবসান ঘটে। মানসিক সচেতনতা ও উৎসাহ বৃদ্ধি পেলে মানুষের কর্মোদ্যম বেড়ে যায়। অফুরন্ত মানসিক উৎসাহ ও আনন্দ নিয়ে মানুষ খুঁজে পায় কাজের আনন্দ, পায় কর্মযজ্ঞে শামিল হওয়ার প্রেরণা।
দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তির আস্বাদ দেয় খেলাধুলো। কখনো–বা বিনোদন হয়ে উঠে তা মনকে সজীব করে তোলে। অতীত অলিম্পিকে পেশাদার খেলোয়াড়ের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সেখানে মানুষ খেলত আনন্দের জন্য। জয়পরাজয় ছিল সেখানে গৌণ।
খেলাধুলো মানবজীবনের সূচনালগ্ন থেকেই মানবচরিত্রের সদ্গুণের উদ্বোধক। খেলতে গেলে নিয়ম মানতে হয়। এই নিয়ম মানার অভ্যাস তাকে আগামীতে নিয়মানুবর্তী করে তোলে। আবার খেলা শেখায় দলবদ্ধ হতে, নেতৃত্ব দিতে ও নেতৃত্ব মানতে। খেলা হল শৃঙ্খলা–শৃঙ্খলময় মানবমনের বিকাশের উপযোগী অভ্যাস। খেলাধুলোয় মন থেকে ভীতি দূর হয়, সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হয়। হারজিতকে সহজভাবে গ্রহণ করতে শেখার শিক্ষা আগামী জীবনের ইঁদুরদৌড়ে অবসাদগ্রস্ততা থেকে বাঁচায়। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকেও সহজে মেনে নেওয়ার মনোবল গড়ে তুলতে পারে খেলাধুলো। বিদ্যালয় জীবন থেকেই খেলাধুলোর গুরুত্ব অসীম। পড়াশোনার পাশে খেলাধুলো আজ আর নিছক বিনোদন নয়। আধুনিক সভ্যতা ক্রীড়াকেও পাঠ্যসূচির অঙ্গ করে তুলেছে। বর্তমানে ক্রীড়া পেশা বা জীবিকার সন্ধান দিতে পারে। কেবল খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিভা প্রদর্শনই নয়, বর্তমান পাঠ্যসূচিতে খেলাধুলো নিয়ে পড়াশোনার বিশেষ বিশেষ ধারা এবং বিভাগও সংযোজিত হয়েছে। ক্রীড়াসাংবাদিক, ক্রীড়াবিশ্লেষক, ক্রীড়াগবেষক, ক্রীড়াচিকিৎসক, ক্রীড়া সংক্রান্ত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ধারাবিবরণী দানকারী ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিকল্প জীবিকার প্রস্তুতি ও সূত্রপাত ঘটেছে বর্তমানে।
মন ও মননচর্চার পাশাপাশি শরীরচর্চাও যে প্রয়োজনীয় তা মানুষ বুঝেছিল বহু যুগ আগেই। খেলার মাধ্যমে শারীরিক বিকাশ ও মানসিক আনন্দ দুই–ই মেলে বলে আদিকাল থেকেই দেহচর্চা মানুষের জীবনচর্যার অঙ্গ ছিল। কুস্তি, লাঠিখেলা, যুযুৎসু, নৌচালনা ইত্যাদি সামাজিক প্রথাবৎ হয়ে উঠেছিল। আধুনিক যুগের মানুষও জানে ‘All work and no play makes jack a dull boy.’ খেলা অবসন্নতা দূর করে মনকে সচেতন, সতেজ করে। একই সঙ্গে খেলা শেখায় ঐক্যবদ্ধতা, আত্মত্যাগ, সংঘবদ্ধ কাজের আনন্দ। পুথিকীট হয়ে ওঠা থেকে পরিত্রাণের উপায়ও খেলা। বিবেকানন্দ এ মর্মেই বলেছিলেন যে—গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভালো।
শরীর ও স্বাস্থ্য মানবজীবনের প্রধান সম্পদ। শৈশব থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলার অভ্যাস দেহকে রাখে সুস্থ; মনকে রাখে সতেজ, নির্মল। ‘অধ্যয়নং তপঃ’—ছাত্রধর্ম হলেও, রুগ্ণ শরীরে এবং নিরানন্দ মনে তপস্যার ফললাভ সম্ভব নয়। তার জন্য চাই সুস্থ দেহ, সবল মন। আর তা গড়ে তোলে খেলাধুলো ও শরীরচর্চা। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি শরীরচর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ— এ কথা ভুললে চলবে না।