যুদ্ধ নয় শান্তি চাই
Juddho Noy Shanti Chai Rochona Bengali
মানবসভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই যুদ্ধ, সংঘর্ষের সূত্রপাত। বিধাতাসৃষ্ট এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের লোভ-লালসা, অহংকার, স্বার্থের কারণে যুদ্ধের আবহ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে যুদ্ধের এই ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়ে অসহায় মানুষ এবার শান্তির সন্ধানে গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছে।
প্রবাদে আছে—জোর যার মুলুক তার। বর্তমানে মানবসভ্যতা যেন এই প্রবাদ অনুযায়ী নিজের জোর দেখাতে শুরু করেছে। মাৎস্যন্যায় প্রথার মতো ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা দুর্বলদের উপর অত্যাচার করছে। দিকে দিকে ক্রমশ হিংসা ছড়িয়ে পড়ছে। উন্নত দেশগুলি পারমাণবিক বোমা তৈরির মাধ্যমে যুদ্ধের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর যে-কোনো সময় তারা আঘাত হানতে পারে। সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত যুদ্ধের দামামা বেজে চলেছে। এইসকল যুদ্ধ মানুষ তার নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই ঘটিয়ে চলেছে।
সমগ্র বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের পরিসংখ্যান দেখে বলা যায়, যুদ্ধের কোনো হিসেবনিকেশ হয় না। যুদ্ধের ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাব, প্রাচীন কাল থেকেই যুদ্ধের প্রচলন ছিল। যেমন—মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ, অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ। এই যুদ্ধগুলিতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছে, কত বংশ নির্বংশ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা সমস্ত কিছুকে অতিক্রম করে গিয়েছে। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন প্রত্যেকটি দেশ কোনো-না-কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যু হয়েছে। কখনও মহামারি, দুর্ভিক্ষ দেখা গিয়েছে, যে কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিশ্বযুদ্ধে বোমারু বিমান, বিস্ফোরক বোমা ইত্যাদি মারণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে পঙ্গুত্ব বা অঙ্গহানি দেখা গিয়েছে। যুদ্ধের এই বিভীষিকা দেখে বিশ্ববাসী আর যুদ্ধ চায়নি, শান্তি চেয়েছে।
বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে যেসব মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল তার মধ্যে পারমাণবিক বোমা সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী বোমা। এই বোমা ব্যবহারের ফলে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর দুটি মারাত্মকভাবে ধ্বংস হয়েছিল। এই বিস্ফোরণের প্রভাবে বিকিরিত আলোককণার জন্য তৎক্ষণাৎ প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। এই বিস্ফোরণের পরোক্ষ প্রভাবেও শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ইত্যাদি নানা অসুখ আজও মানুষের মধ্যে দানা বাঁধে।
যুদ্ধ চলাকালীন ধ্বংসলীলার একটা ব্যাপক প্রভাব পড়ে যুদ্ধ পরবর্তী সময়তেও। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক সবদিক থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে। সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, যুদ্ধ কোনো দেশকে ১০০ বছরেরও বেশি সময় পিছিয়ে নিয়ে যায়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মানুষ মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। ফলে, সমস্ত দেশজুড়ে অশান্তি বিরাজ করে।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হয়নি। কার্গিল যুদ্ধ, আমেরিকা-আফগানিস্তানের যুদ্ধ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখনও দেশে দেশে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিগত বছরগুলিতে ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধলীলা চলেছে। অন্যদিকে ২০২৩-এ শুরু হওয়া ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন যুদ্ধের রেশ এখনও বর্তমান। আবার, ২০২৫-এ ভারতের কাশ্মীর মধ্যবর্তী পর্যটনকেন্দ্র পহেলগাঁও-তে জঙ্গি হামলার কারণে শুরু হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। ২০২৬-এর শুরুতেই ইরানের উপর আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ হামলার ভয়াবহতায় এখন ত্রস্ত গোটা বিশ্ব। তাই মানুষকে শান্তির উপায় ভাবতে হবে। কোনো সমস্যাই যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান হয় না, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ প্রশস্ত করতে হবে।
শান্তিস্থাপনে ভারত সর্বদা প্রয়াসী। শান্তিকামী দেশ ভারত তাই নিজেকে জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছে। ভারতবর্ষ বৃদ্ধ– কবীরের দেশ, মহাত্মা গান্ধির দেশ। ভারত সর্বদাই অহিংসার মন্ত্রে বিশ্বাসী। মৌর্য সম্রাট অশোকও যুদ্ধের পর বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাই যে-কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ভারত যুদ্ধের বদলে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে তা নির্মূল করতে চায়। এক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধির উক্তিটি সত্যিই প্রাসঙ্গিক—
“শান্তির কোনো পথ নেই,
কেবলমাত্র শান্তি আছে।”