বারংবার বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের গ্রাসে শহর কলকাতা
Barombar Bidhdhongshi Ognikander Grase Shohor Kolkata Rochona Bengali
জনসংখ্যার চাপে ভারাক্রান্ত, উন্নয়নশীল একটি শহর হল কলকাতা। এই শহর দূরদূরান্ত থেকে আসা সমাজের নানা স্তরের মানুষকে রুটিরুজির জোগান দিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই শহরে দিনে দিনে বেড়ে চলেছে আকাশছোঁয়া বহুতল বাড়ি— পাশাপাশি বেআইনি বস্তির সংখ্যাও। শুধু অধিকসংখ্যক মানুষের স্থান সংকুলানই নয়— তাদের বিনোদনের জন্যও বেড়ে চলেছে শপিং মল, রেস্তোরাঁ, চিকিৎসার জন্য বড়োবড়ো হাসপাতালের সংখ্যা। এইসব বিল্ডিং–এর পাশাপাশি বস্তিগুলি বহু ক্ষেত্রেই কোনো বিল্ডিংকোড বা আইনিব্যবস্থা অনুসরণে তৈরি হয় না। এখানে থাকে না যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা আত্মরক্ষার সরঞ্জাম। ফলে মানুষের অসাবধানতার কারণেই দিনে দিনে বেড়ে চলেছে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা— যার অনিবার্য ফলাফল বহু মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যু।
অতিসম্প্রতি খিদিরপুরের অরফ্যানগঞ্জ বাজারে মধ্যরাত্রে এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে প্রায় তেরোশোটি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এলাকায় বিপুল আগুন ছড়িয়ে পড়ায় দমকলবাহিনীকেও বেগ পেতে হয় আগুন নেভাতে। বহুক্ষণের প্রচেষ্টায় আগুন নিভলেও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বহু ব্যবসায়ীর ব্যাবসায়িক সরঞ্জাম। কিছুদিন আগে পোদ্দার কোর্টের একটি ইলেকট্রিক সরঞ্জামের দোকানে আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড ঘটে বড়োবাজারের মেছুয়া ফুল মার্কেটের হোটেল ঋতুরাজে। পাইকারি ফলের বাজারের কাছে বহুতল এই হোটেলটিতে আগুন লেগে নিহত হয় প্রায় ১৪ জন, যার মধ্যে দু‘জন শিশু ও একজন মহিলাও ছিল। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরেই কলকাতা পৌর কর্পোরেশন (KMC) শহরের বহুতলের ছাদে বেআইনিভাবে গড়ে ওঠা রেস্তোরা ও অবৈধ বিনোদনক্ষেত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথা ঘোষণা করে।
এ ছাড়াও বিগত এক বছরে মহেশতলা থানার অন্তর্গত বজবজ ইএসআই হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড, সেক্টর ফাইভ–সহ জেমস লং সরণির বহুতলে অগ্নিকাণ্ড, শহরের ব্যস্ততম আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ে আগুন লাগা, মণিপাল হাসপাতাল ও চার্নক সিটির মাঝের বিল্ডিংয়ে আগুন লাগা, পার্ক সার্কাস স্টেশনসংলগ্ন বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি নানাবিধ দুর্ঘটনায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে বারংবার। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সাধারণ মানুষ।
আগুন দ্বারা ঘটিত দুর্ঘটনার কারণ থাকে মূলত দুটি—একটি প্রাকৃতিক কারণ, অন্যটি মনুষ্যসৃষ্ট। প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে বজ্রপাত, উল্কাপাত ইত্যাদি অন্যতম। অনেকসময় বাতাসের শক্তির কারণে গাছে গাছে ঘর্ষণে দাবানলের সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম বলা চলে। কিন্তু মানুষের কারণে সৃষ্টি হওয়া অগ্নিকাণ্ডের ফল মারাত্মক। নাগরিক জীবনে সাধারণত যেসব কারণে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে তার মধ্যে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, কেমিক্যাল পদার্থের সংমিশ্রণ হল অন্যতম। এসবের মূল কারণ হল মানুষের অসাবধানতা বা অসতর্কতা, বিপদের আশঙ্কা জেনেও অতিরিক্ত লোভের কারণে সেই আশঙ্কাকে উপেক্ষা করা। তা ছাড়া নিয়ম না মেনে বেআইনি বহুতল নির্মাণ, যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না নেওয়া, পরিকাঠামোগত ত্রুটি, অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ, বৈদ্যুতিক কাজে অনিয়ম, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং পুরোনো সামগ্রী ব্যবহার ইত্যাদি কারণেও এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
সকল প্রকারের সাবধানতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও বহু সময়ে অগ্নিকাণ্ড এড়ানো যায় না। তাই কখনও আগুন লাগতে দেখলে আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার কথা ভাবতে হবে। আশেপাশে থাকা সকলকে জানান দিতে হবে অগ্নিসংযোগের বিষয়ে। আতঙ্কিত হয়ে বহুতল থেকে ঝাঁপ দেওয়া, গায়ে আগুন লাগলে তা নিয়ে ছোটাছুটি করা ইত্যাদি বিপদের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আগুন লাগলে নিরাপদ ফাঁকা স্থানে গিয়ে বাঁচার চেষ্টা করা এবং অপরকে যথাসম্ভব সাহায্য করা উচিত।
অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হল সতর্কতা অবলম্বন। প্রতিটি বিল্ডিং–এ অগ্নি নির্বাপণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বহুতল নির্মাণের সময় ‘বিল্ডিং কোড‘ মেনে তা নির্মাণ করা বাঞ্ছনীয়। ফ্ল্যাট বা শপিংমলের প্রতিটি ফ্লোরে ফায়ার অ্যালার্ম থাকা আবশ্যক। উন্নত মানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। কেমিক্যাল ও বৈদ্যুতিক পণ্যের ব্যবহারে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অগ্নিনির্বাপণের জন্য আধুনিক ও উন্নত মানের যন্ত্র আমদানি করতে হবে। দমকলবাহিনীকে হতে হবে দক্ষ। তা ছাড়া বস্তি এলাকায় বিশেষত অগ্নিনির্বাপকরূপে অগ্নিনির্বাপক বল, শুকনো রাসায়নিক পাউডার ইত্যাদি মজুত রাখতে হবে।
শহরে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ঘটার ফলে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ, কোটি কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। যদিও এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হলেও অধিকাংশ সময়ই মানুষ উদাসীন থাকছে। ফলে পুনরাবৃত্তি ঘটছে এইসব দুর্ঘটনার। তাই এই বিপর্যয় আটকাতে সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। সকলের মধ্যে সচেতনতা এলে, তবেই এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।