অরণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও মানবজীবন
Aranyaprani Sangrakshan o Manabjiban Rochona Bengali
পৃথিবীতে মানবসৃষ্টির বহু আগে থেকেই অরণ্যের আবির্ভাব হয়েছিল। আর অরণ্যপ্রাণী হল এই অরণ্যকুলের একমাত্র শোভাবর্ধক। প্রাচীন কালে মানুষের জীবনধারণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল এই অরণ্যপ্রাণীকুল। তাই জীবনচক্রের ক্রমবিকাশে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। বর্তমানে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত যথেচ্ছাচারে প্রকৃতির ভারসাম্য ক্রমশ ব্যাহত হচ্ছে। তাই এক্ষেত্রে যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন। সাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়–
“বন্যেরা বনে সুন্দর / শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।”
পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ খনিজ দ্রব্য, জল, বায়ু, মাটি, অরণ্য, অরণ্যপ্রাণী প্রভৃতির উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপচয় ও যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে মানুষ আজ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। জীবজগতের সার্বিক মঙ্গলের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধ, পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ, পুনরুদ্ধার এবং সীমিত ব্যবহারকে সংরক্ষণ বলা হয়।
জলচর, উভচর, স্তন্যপায়ী ইত্যাদি বহু প্রজাতির প্রাণ বর্তমানে চরম সংকটের মুখে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (WWF)-কৃত ২০১৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিগত ৪০ বছরের মধ্যে ৬০ শতাংশ জীবকুল সর্বকালের জন্য অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এ ছাড়াও এশিয়ার সিংহ, বাংলার বাঘ, কালো হরিণ, একশৃঙ্গ গন্ডার ইত্যাদি প্রাণীগুলির সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে।
সীমাহীন অর্থের লোভে অরণ্যপ্রাণী হত্যার ফলে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে। মানুষ নিজ উদ্দেশ্য পূরণ করার ফলে অরণ্যপ্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে। পরিবেশে কোনো প্রজাতির অবলুপ্তি ঘটলে অন্য প্রজাতির ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, তৃণভোজী প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটলে মাংসাশী প্রাণীদেরও অবলুপ্তি ঘটবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্যরক্ষা ছাড়াও পর্যটন শিল্পের উন্নতিকল্পে বিচরণশীল অরণ্যপ্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম। তাই সমস্ত কথা মাথায় রেখেই অনতিবিলম্বে অরণ্যপ্রাণের সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিদিন চোরাশিকারিদের উৎপাত, জীবনধারণের জন্য কিছু মানুষের অরণ্যপ্রাণী শিকার, মাংসের লোভবশত হরিণ–কচ্ছপ হত্যা, চামড়ার জন্য বাঘ–কুমির, বহুমূল্য খঙ্গের জন্য গন্ডার ও দাঁতের জন্য নির্বিচারে হাতিনিধন প্রভৃতি কারণে অরণ্যপ্রাণী সংরক্ষণে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে মানুষ ও পশুপক্ষীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে একে অপরের উপর পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এভাবেই জীবজগতের ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ থাকবে। অরণ্যপ্রাণীকুল পরোক্ষভাবে বাস্তুতান্ত্রিক খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া মানুষের প্রয়োজনে, তাদের জীবনধারায়, পরিবেশের শুদ্ধতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে মানুষ বহুলাংশে অরণ্যপ্রাণীদের থেকে তাদের জীবনযাত্রার রসদ সংগ্রহ করে। তাই পৃথিবীব্যাপী অরণ্যপ্রাণ সংরক্ষণের মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে।
নৈতিক, অর্থনৈতিক, নান্দনিক ও বৈজ্ঞানিক কারণে সংরক্ষণ প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারিভাবে অরণ্যপ্রাণ সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, যেমন— কুমির প্রকল্প ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রকার অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হচ্ছে। ১৯৫২ সালে World Wildlife Fund (WWF) গঠিত হয়েছে। ভারতে ১৯৭২ সালে অরণ্যপ্রাণীর জন্য আইন পাস হয়েছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বসুন্ধরা সম্মেলনে সংরক্ষণের শপথ নেওয়া হয়েছে। সেই সম্মেলনে ৪৩ রকমের অরণ্যপ্রাণী ও ১৮ রকমের পাখি ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পর্যটন শিল্পের উন্নতিসাধনে সরকারের আয় বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া, আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার জন্য বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আধুনিক জীবনে সভ্যতার নামে অসভ্যতা দূর করতে হবে। মানবসভ্যতার জন্য অরণ্যপ্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। শুধুমাত্র আইনপ্রণয়ন নয়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষকে অরণ্যপ্রাণ সংরক্ষণের জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সেই বন্ধুত্বের সহযোগিতায় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সুস্থ ও সুন্দর হয়ে উঠবে।