সত্যি-মিথ্যের ধাঁধা
বুদ্ধির ধাঁধা উত্তর সহ | Buddhir Dhadha Uttor Soho | Bangla Funny Riddles with Answers | Bangla Dhadha With Answers
পৃথিবীতে বহু ধাঁধা শুধু সত্যি-মিথ্যের ধাঁধা নামেই পরিচিত হতে পারে। এর কিছু এত প্রাচীন যে, কবে প্রথম কোন্ দেশে এর উৎপত্তি, ঠিক বলা যাবে না। কিন্তু ধাঁধাগুলো যে জব্বর তাতে সন্দেহ নেই। মোটামুটিভাবে এগুলো বুদ্ধির ধাঁধা। অঙ্কের মতোই নির্ভুল একটা উত্তর রয়েছে, সেই উত্তরে পৌঁছতে হবে লজিকের হাত ধরে। দ্যাখো তো, পারো কি না। লজিক শুনে ভয় পাবার কিছু নেই, মাথা ঠান্ডা রেখে সম্ভাবনাগুলোকে যাচাই করে দেখা—এই মাত্র।
Buddhir Dhadha Uttor Soho
প্রথম ধাঁধা ॥ চারটি ছেলে। আলোক, বিজন, বিকাশ আর মৃদুল। এদের মধ্যে একজন বল খেলতে গিয়ে আলমারির কাঁচ ভেঙেছে। চারজনকে ডেকে প্রশ্ন করা হল, কে ভেঙেছে। তারা যে উত্তর দিল, তা এই রকম—
এর মধ্যে একজনের উত্তরই মাত্র সত্যি! এটা ধরে নিয়ে বলতে পারো, কে ভেঙেছে কাঁচ?
দ্বিতীয় ধাঁধা ॥ দুই ভাই। দু-জনকে দেখতে হুবহু একরকম। শুধু একজন সব সময় সত্যি কথা বলে, অন্যজন বলে সব সময় মিথ্যে কথা। কোনও আগন্তুকের পক্ষে বোঝা শক্ত, কে সত্যি বলে আর কে মিথ্যে।
এরা বসে থাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ দুই রাস্তার মোড়ে। খুব গোলমেলে মোড়, সেই মোড় থেকে একটি রাস্তা গিয়েছে শহরের দিকে, অন্যটি জঙ্গলের দিকে। নতুন লোকরা গাড়ি নিয়ে সেই মোড়ে আসে। কোন্ রাস্তা শহরে গিয়েছে জানতে চায়। প্রশ্ন করলে, কখনও উত্তর দেয় সত্যবাদী, কখনও মিথ্যেবাদী। ফলে কেউ ঠিক রাস্তা পেয়ে শহরে পৌঁছে যায়, কেউ বনের মধ্যে গিয়ে বিপদে পড়ে। অথচ একটি মাত্র প্রশ্নেরই উত্তর পাওয়া যায় সেই মোড়ে। একটির বেশি দুটি প্রশ্নের উত্তর দেবে না দুই ভাই।
এক বুদ্ধিমান ভদ্রলোক একদিন সেই মোড়ে এলেন তাঁর গাড়ি নিয়ে। তিনি আগেই জানতেন, এই মোড়ের ছেলে-দুটির একজন সত্যি বলে, একজন মিথ্যে। এও জানতেন যে, এরা একটি মাত্র প্রশ্নেরই জবাব দেয়। এ-কথাও তাঁর অজানা ছিল না যে, তিনি ধরতে পারবেন না—কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যেবাদী। তাই তৈরি হয়েই এসেছিলেন।
তিনি একটি মাত্র প্রশ্ন করলেন দু-ভাইয়ের একজনকে। এবং সেই উত্তরের ভিত্তিতে ঠিক-ঠিক বেছে নিলেন শহরে যাবার রাস্তা।
ভদ্রলোকের প্রশ্নটা কী ছিল, বলতে পারো?
তৃতীয় ধাঁধা ॥ এক দ্বীপে দু-ধরনের অধিবাসী থাকে। একদল গুহাবাসী, অন্য দল বৃক্ষবাসী। বৃক্ষবাসীরা সব সময় বলে সত্যি কথা, গৃহবাসীরা সব-সময় বলে মিথ্যে কথা। এদেরও কারও চেহারা কিংবা পোশাক দেখে নতুন লোক বুঝতে পারবে না যে, সে গুহাবাসী না বৃক্ষবাসী।
এক ভদ্রলোক সেই দ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে গল্প বললেন বন্ধুদের। বললেন, “আমার কোনও অসুবিধা হয়নি ওই দ্বীপে। নেমেই প্রথমে যার সঙ্গে দেখা হল, তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি ভাই গুহাবাসী, না বৃক্ষবাসী? উত্তরে সে বলল, ‘আমি গুহাবাসী’। সে-লোকটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করলাম। সেই আমাকে দ্বীপ ঘুরিয়ে দেখাল।”
বন্ধুরা গল্পটা শুনে বুঝতে পারল যে, ভদ্রলোক দারুণ একটা মিথ্যে বলেছেন। ওর কথা সত্যি হওয়া অসম্ভব।
কেন অসম্ভব বলতে পারো?
চতুর্থ ধাঁধা ॥ সেই গুহাবাসী আর বৃক্ষবাসীদের নিয়েই আরেকটি ধাঁধা। মনে রাখতে হবে, গুহাবাসীরা সবসময় মিথ্যে কথা বলে, বৃক্ষবাসীরা সবসময় সত্যি কথা।
একজন নতুন লোক সেই দ্বীপে গিয়েছেন। তিনি দেখলেন তিনজন অধিবাসী একসঙ্গে আসছে। তিনি প্রথম লোকটিকে প্রশ্ন করলেন : তোমরা গুহাবাসী না বৃক্ষবাসী? প্রথম লোকটি জবাবে বলল : আমরা সবাই গুহাবাসী।
দ্বিতীয় লোকটি বলল : না, কথাটা সত্যি নয়। আমাদের মধ্যে দু-জন মাত্র গুহাবাসী ।
আগতুক তৃতীয় অধিবাসীর দিকে তাকালেন। তৃতীয় জন বলল, দু-জনের কারো কথাই সত্যি নয়।
তিনজনের তিনরকম কথা শুনে আগন্তুক বুঝতে পেরে গেলেন, এদের মধ্যে কজন বৃক্ষবাসী আর কজন গৃহবাসী। কী করে?
পঞ্চম ধাঁধা ॥ এ-ধাঁধাটিও আরেকটা দ্বীপের লোকজন নিয়ে। কিন্তু আরেকটু গোলমেলে।
ব্যাপার হল কী, এই দ্বীপের ছেলেরা সবসময় সত্যি কথা বলে। মেয়েরা পরপর দুটো সত্যি অথবা পরপর দুটো মিথ্যে বাক্য বলে না। তারা প্রথমে যদি সত্যি বাক্য বলে, তাহলে পরের বাক্য বলবে মিথ্যে। প্রথম বাক্য যদি মিথ্যে বলে, পরের বাক্যটা বলবে সত্যি। ছোট-বড় সকলেই এই নিয়মে চলে।
এই দ্বীপের এক দম্পতি আর তাদের সন্তান রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। পথে এক আগন্তুকের সঙ্গে দেখা।
আগন্তুক বাচ্চাটিকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি ছেলে না মেয়ে?’ বাচ্চাটি এমন জড়ানো ভাষায় জবাব দিল যে, লোকটি একবর্ণও বুঝতে পারলেন না। বাচ্চাটির নাম ধরা যাক, পম।
দম্পতির মধ্যে একজন তখন পরিষ্কার ভাষায় বললেন, “পম বলল যে, আমি ছেলে।”
অন্যজন বললেন আগন্তুককে, “পম মেয়ে। পম মিথ্যে বলেছে।”
আগন্তুক একটু হকচকিয়ে গেলেন। পরে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে লাগলেন।
অনেক ভেবে, বুঝতে পারলেন, পম ছেলে না মেয়ে। তিনি তো বুঝলেন। তোমরা বলতে পারো, পম ছেলে না মেয়ে? আর ওর বাবা-মার মধ্যে কে কী বলেছেন?
উত্তর
(১) যদি ধরা যায় অলোক ভেঙেছে, তাহলে বিকাশ এবং মৃদুলের উত্তর সত্যি হয়ে ওঠে। যদি ধরা যায় বিজন ভেঙেছে, তাহলে অলোক, বিকাশ এবং মৃদুল—এই তিনজনের কথাই সত্যি হয়ে যায়। মৃদুল যদি ভেঙে থাকে, তাহলে বিজন এবং বিকাশ দুজনেই সত্যি উত্তর দিয়েছে বুঝতে হবে। অথচ বলা হয়েছে যে, মাত্র একজনের উত্তরই সত্যি। সেদিক থেকে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, বিকাশ ভেঙেছে কাঁচ এবং সেক্ষেত্রে একমাত্র মৃদুলের উত্তরটিই সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে, বাকি তিনজনই মিথ্যে উত্তর দিয়েছে।
(২) ভদ্রলোক যে-কোনো একজনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করবেন যে—“তোমার ভাইকে যদি শহরে যাবার রাস্তা দেখাতে বলি, তাহলে সে কোন্ রাস্তাটা দেখাবে?” এর উত্তরে যে-রাস্তাটা দেখাবে উত্তরদাতা, তার উল্টো রাস্তাটাই হবে শহরের রাস্তা। কেন? ধরা যাক ভদ্রলোক মিথ্যাবাদী ভাইকে এ-প্রশ্নটা করলেন। মিথ্যাবাদী ভাই এর উত্তরে তাঁকে জঙ্গলে যাবার রাস্তাটা দেখাবে, কেননা সে জানে—সত্যবাদী ভাই ঠিক রাস্তাই বলবে, কিন্তু সে যেহেতু নিজে মিথ্যে বলে, তাই সত্যবাদী ভাইয়ের দেখানো রাস্তাটার উল্টোটার কথাই উচ্চারণ করবে। অর্থাৎ বনের রাস্তা দেখাবে।
প্রশ্নটা যদি সত্যবাদী ভাইকে করা হয়, তাহলে সেও এ-প্রশ্নের উত্তরে জঙ্গলের রাস্তা দেখাবে। কেননা সে জানে—মিথ্যাবাদী ভাই এ-প্রশ্নের উত্তরে শহরের রাস্তা না দেখিয়ে জঙ্গলের রাস্তা দেখাত, তাই সে সত্যের খাতিরে সেই রাস্তাটাই দেখাবে। অর্থাৎ দু-ক্ষেত্রেই জঙ্গলে যাওয়ার রাস্তাটা দেখাবে যে-কোনো ভাই। তার উল্টো পথটাই হবে শহরের পথ।
(৩) ভদ্রলোক সত্যিই মিথ্যে বলেছেন। কেননা, ওই দ্বীপের সমস্ত অধিবাসীই নিজেদের ‘বৃক্ষবাসী’ বলবে। কারণ, বৃক্ষবাসীরা সত্যি কথা বলে, তাই তারা নিজেদের বৃক্ষবাসী বলবে।
আবার গুহাবাসীদের কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি বৃক্ষবাসী না গুহাবাসী? তাহলে মিথ্যেবাদী বলেই সে জবাবে বলবে, আমি বৃক্ষবাসী।
তাই ভদ্রলোক যে বললেন, ওই দ্বীপের একটি লোক তাকে বলল যে, ‘আমি গুহাবাসী’—তা সত্যি হতে পারে না। ভদ্রলোক বানিয়ে বলেছেন।
(৪) তিনজনই বৃক্ষবাসী নয়, প্রথমেই বোঝা যাচ্ছে, কেননা, বৃক্ষবাসীরা সত্যি বলে সবসময়, সেক্ষেত্রে তিনজন তিনরকম উত্তর দেবে না।
তিনজনই গুহাবাসী নয়। কেননা, তাহলে প্রথম জনের কথা সত্যি হয়, যা অসম্ভব। কেননা গুহাবাসীরা সত্যি বলবে না অতএব হয় দু-জন অথবা একজন বৃক্ষবাসী।
দু-জন বৃক্ষবাসী হলে—দ্বিতীয় ব্যক্তির কথা অসত্য, তৃতীয় ব্যক্তির কথা সত্য, আবার প্রথম জনের কথা ও অসত্য। এটা অসম্ভব। কেননা, দু-জনই সত্যি কথা বলবে, যদি দু-জন বৃক্ষবাসী থাকে।
তাহলে একজনই এদের মধ্যে বৃক্ষবাসী।
তাহলে দ্বিতীয় ব্যক্তির কথা সত্যি এবং সেই তাহলে বৃক্ষবাসী। আর দু-জন গুহাবাসী।
(৫) ধরা যাক, পম ছেলে। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় বক্তা তার মা, যিনি প্রথম বাক্যটি মিথ্যে বলেছেন। দ্বিতীয়টি বলেছেন সত্যি, যা বলতে বাধ্য সত্যি। কিন্তু ওই দ্বীপের ছেলেরা মিথ্যে বলে না। সুতরাং একটা অসংগতি থেকে যাচ্ছে দুটো বাক্যের মধ্যেই। সুতরাং পম ছেলে নয়।
ধরা যাক, পম মেয়ে। সেক্ষেত্রে প্রথম বক্তা যদি বাবা হন, দ্বিতীয় বক্তা হল মা। সেক্ষেত্রে মায়ের প্রথম বাক্যটি সত্যি, দ্বিতীয় বাক্যটি হবে মিথ্যে। কিন্তু এতেও অসুবিধা হয়। কেননা, পমকে তাহলে সত্যি বলতে হয়েছে, আমি মেয়ে নইলে মায়ের দ্বিতীয় বাক্যটি মিথ্যে প্রমাণিত হয় না। আবার পম যদি নিজেকে মেয়েই বলে থাকে তাহলে প্রথম বক্তা হিসেবে বাবার কথা মিথ্যে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ছেলেরা মিথ্যে বলে না। সুতরাং এর মধ্যেও অসংগতি রয়েছে।
সুতরাং প্রথম বক্তা মা, দ্বিতীয় বক্তা বাবা।
পম মিথ্যে বলেছে, বলেছে ‘আমি ছেলে।’ মা একটি বাক্য বলেছেন, এবং সেটি মিথ্যে।
বাবা পরের বক্তা। দুটো বাক্যই সত্যি বলেছেন!
পম মেয়ে।