সৌজন্য ও শিষ্টাচার
Shoujonno o Shishtachar Rochona Bengali
“বাঁচতে হবে বাঁচার মতন, বাঁচতে বাঁচতে
এই জীবনটা গোটা একটা জীবন হয়ে
জীবন্ত হোক।”—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সৃষ্টির উষালগ্নে মানুষ ছিল অরণ্যচারী, হিংস্র ও বর্বর, বনবাসী। সেদিন মানুষ সামাজিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে সচেতন ছিল না। কিন্তু ক্রমে নিজেদের প্রয়োজনে একদিন মানুষ সমাজবদ্ধ হল, গড়ে তুলল প্রীতির বন্ধন, সৌজন্যপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক। তার পাশবিক আচরণ হয়ে উঠল মানবিক। এভাবেই মানুষের অন্তরের মাধুর্য দিয়ে, মানুষে মানুষে সৌজন্যবোধ গড়ে উঠল। শিষ্টাচার তারই মার্জিত বহিঃপ্রকাশ। সমাজজীবন ও ছাত্রজীবন তথা মানবজীবনে এই সৌজন্য ও শিষ্টাচারের গুরুত্ব অপরিসীম। এর অভাবে মানুষ উদ্ধত, দাম্ভিক ও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
সৌজন্য হল মানুষের মানসিক ভাব আর শিষ্টাচার হল সেই ভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ সৌজন্য ও শিষ্টাচার হল মানুষের বিনম্র অহংকারশূন্য সুকোমল মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। সৌজন্য বলতে বাইরে মার্জিত ব্যবহারই শুধু নয় বা ভদ্রতার সামাজিক রীতি অনুসরণ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে মহৎ হৃদয়ের গভীর উম্ন স্পর্শ। আর পরিচিত–অপরিচিত, আত্মীয়–অনাত্মীয় সকলের সঙ্গে প্রীতিপূর্ণ, রুচিসম্মত ব্যবহারই হল শিষ্টাচার। মানুষের মনের সুন্দর পবিত্রতাপূর্ণ, গভীর নির্মল অভিব্যক্তি সৌজন্য ও শিষ্টাচারের প্রকৃতিকে বাড়িয়ে তোলে। আসলে সৌজন্য ও শিষ্টাচারের প্রভাবে মানুষের মধ্যে অচ্ছেদ্য সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে ওঠে। একজন ব্যক্তি মনুষ্যত্ববোধে, মূল্যবোধে, সত্যবাদিতায়, মানবতাবোধে, প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ততায় এবং হৃদয়ের অমলিন বিকাশে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। মানবজীবনের এক দুর্লভ সম্পদ হল সৌজন্য ও শিষ্টাচার। বহু যত্নে অর্জিত এই ঐশ্বর্য মানুষের গর্ব, অহংকার। একজন সৌজন্য ও শিষ্টাচারী ব্যক্তি মিষ্টভাষী, সত্যাশ্রয়ী ও বিনয়ী হয়ে ওঠে। আর এই দুর্লভ গুণাবলি দ্বারা সমাজকে মিলনের তীর্থভূমিতে পরিণত করতে পারে। সুতরাং, সমাজ গঠনে সৌজন্য ও শিষ্টাচারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার্য।
ছাত্রজীবন হল মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতিপর্ব, চরিত্রগঠনের উপযুক্ত সময়। ছাত্রজীবনে তাই পুথিগত বিদ্যার পাশাপাশি তাদেরকে বিনয়ী, নম্র ও ভদ্র হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার ছাত্রজীবনের সুন্দর বৃত্তিগুলিকে লালন করে। তাকে অন্তরের ঐশ্বর্যে আলোকিত করে। সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচারের অভাব শিক্ষার্থীকে অভদ্র, অসংযমী, আত্মসর্বস্ব, নিষ্ঠুর, বিবেকহীন মানুষে পরিণত করে। বিনাশ করে সত্য, সুন্দর, দয়া, প্রেম, স্নেহ–মায়া–মমতার কোমল বৃত্তিগুলিকে। ফলে, তারা দীপ্তিহীন ও কীর্তিহীন হয়ে সূচিভেদ্য অন্ধকারের গভীরে হারিয়ে যায়। ছাত্রজীবনে সৌজন্য ও শিষ্টাচারের শিক্ষা শিক্ষার্থীকে বহু সদ্গুণাবলির অধিকারী করে তোলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে সকলের প্রিয়পাত্রে পরিণত করে।
সুব্যবহারই মানুষের আসল পরিচয়। এটি প্রথম গড়ে ওঠে পরিবারের মধ্যে। পরিবারের সকল সদস্যের বিনয়, সততা, সৌজন্য, শিষ্টাচার, নম্রতা, ভদ্রতা ইত্যাদির নির্যাসে পারিবারিক শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। পিতা–মাতা বা অন্যান্য গুরুজনের আচরণের নিষ্ঠুরতা বা অসৌজন্য অনিবার্যভাবে সন্তানসন্ততিদের মধ্যে সংক্রামিত হয়। অপরপক্ষে, আদর্শ পরিবারে সম্প্রীতি, সৌজন্য এবং শিষ্ট আচরণ সবাইকে বিনি সুতোয় গেঁথে রাখে। মানুষের মানসপ্রবণতার প্রথম ধাপ হল শিষ্টাচার। সৌজন্য ও শিষ্টাচারহীনতার প্রতিকার করতে হবে মানুষকে। পরিবারে ছোটোবেলা থেকেই যাতে ছেলেমেয়েরা সদাচারের শিক্ষা পায়, সে বিষয়ে বাবা, মা এবং অন্যান্য অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা যাতে সৌজন্য ও শিষ্টাচারের শিক্ষা পায় তার ব্যবস্থা করা দরকার। আন্তর্জাতিক সংহতি, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচারের মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। বিভিন্ন ক্লাব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে এককথায় ঘরে–বাইরে সমাজের সর্বস্তরে সৌজন্য ও শিষ্টাচারকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
সৌজন্য ও শিষ্টাচার মানবচরিত্রের ভূষণ। এই গুণাবলি মানবচরিত্রে যত বেশি বিস্তার লাভ করবে সমাজ তত বেশি সুখী ও সম্পদশালী হয়ে উঠবে। বাহা আড়ম্বর ও ঐশ্বর্য অপেক্ষা চরিত্রের এই মাধুর্যই মনুষ্যত্বের গৌরবরূপে চিহ্নিত হয়। তাই তা সকলেরই কাঙ্ক্ষিত বিষয় ।