সুনীতা উইলিয়ামস
Sunita Williams Rochona Bengali
একবিংশ শতাব্দীর এক বিস্ময়ের নাম সুনীতা উইলিয়ামস। স্বনামধন্য এই মহাকাশচারীর জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ওহাইও–র ইউক্লিডে। জন্মসূত্রে মার্কিন হলেও ভারতের সঙ্গে এক নিবিড় যোগ রয়েছে সুনীতার। তাঁর পিতা দীপক পাণ্ড্য একজন ভারতীয় আমেরিকান, মাতা হলেন উরসুলিন বনি পাণ্ড্য। পিতা ও মাতার নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর নাম হয় সুনীতা লিন পাণ্ড্য। ছেলেবেলা থেকেই মহাকাশের অজানা রহস্যময় জগতের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ ছিল সুনীতার, জীবনে সাধারণভাবে বাঁচতে চাননি তিনি। তাই, ১৯৮৩ সালে নিডহাম হাইস্কুল থেকে স্নাতক হওয়ার পরেই নেভাল অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন সুনীতা। ১৯৮৭–তে যোগদান করেন ইউ এস নেভি–তে। ১৯৮৯ সালে তিনি নৌ–বায়ু সেনার সম্মাননীয় পদ লাভ করেন। এরপর থেকেই অসীমকে ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু। ১৯৯৮ সালে নাসায় (NASA) নির্বাচিত হন সুনীতা উইলিয়ামস, প্রশিক্ষণ শুরু হয় তাঁর। আর মহাকাশযাত্রার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে পড়ে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই।
দিনটা ৯ ডিসেম্বর, ২০০৬। প্রথমবার মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি দিলেন বিস্ময়কন্যা সুনীতা উইলিয়ামস। এক্সপিডিশন–১৪‘-এর STS –১১৬ মিশনটি ছিল সুনীতার প্রথম মহাকাশ অভিযান। মহাকাশযান ‘ডিসকভারি’ ১১ ডিসেম্বর ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে (ISS) গিয়ে পৌঁছোয়। সেখানে পৌঁছে সুনীতা তাঁর চুলের কিছু অংশ কেটে পৃথিবীপৃষ্ঠে পাঠিয়ে দেন ‘লকস অফ লাভ‘ নামে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের চুল প্রতিস্থাপনে সাহায্যকারী একটি সংস্থায় দান করার জন্য। নিজের কাজের ক্ষেত্রকে কেবল পেশাগতভাবে নয়, মানবিকতা দিয়ে একজন যোগ্য নাগরিকের মতো সফলভাবে পরিচালনা করে চলেছেন সুনীতা উইলিয়ামস, গড়েছেন নানা নজির। মহাকাশযানের বাইরে অর্থাৎ মহাশূন্যে মোট ৯ বার পদচারণা (space walk) করে বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছেন সুনীতা, তাঁর স্পেসওয়াকের সর্বমোট সময়সীমা ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিট।
৫৯ বছর বয়সি এই মহাকাশচারীর সাফল্যের মুকুটে আরও একটি পালক যুক্ত হয়েছে সম্প্রতি। ৫ জুন, ২০২৪–এ স্টারলাইনার স্পেসক্রাফ্টে করে সফরসঙ্গী ব্যারি বুচ উইলমোরের সঙ্গে গবেষণার কাজে ১০ দিনের জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের উদ্দেশে পাড়ি দেন সুনীতা উইলিয়ামস। কিন্তু বোয়িং স্টারলাইনারের ২৮ টি প্রাস্টার ইঞ্জিনের মধ্যে ৫ টি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সুনীতাদের তৎপরতায় অকেজো ইঞ্জিন–সহই তাঁরা নিরাপদে স্পেস স্টেশনে পৌঁছে যান। সেখানে উপস্থিত আরও ৭ জন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে গবেষণার কাজ চালানোর সময়েই স্পেসক্রাফ্টটি সারানোর কাজে লেগে পড়েন সুনীতা এবং ব্যারি। কিন্তু, এই যান্ত্রিক গোলযোগের মোকাবিলা করতে অকৃতকার্য হন তাঁরা। ইতিমধ্যেই সুনীতা এবং ব্যারি ছাড়া বাকি ৭ জন মহাকাশচারীর পৃথিবীতে ফেরার সময় হয়ে এলে তাঁরা তাঁদের পূর্বনির্ধারিত মহাকাশযানে করে পৃথিবীর মাটিতে ফিরে আসেন। বোয়িং স্টারলাইনার মহাকাশযানটিকেও যাত্রীহীন অবস্থাতেই ফিরিয়ে আনা হয়। নির্জন, নিঃসঙ্গ মহাশূন্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য রয়ে যান সুনীতারা।
এরপর প্রায় ন‘মাসের জন্য মহাকাশে আটকে পড়েন সুনীতা এবং ব্যারি। অক্সিজেন ও খাদ্যসংকটের চিন্তা সর্বদা মাথায় নিয়েও নিজেদের গবেষণার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন তাঁরা। ড্রাইফ্রুটস, টুনা মাছ আর রোস্টেড চিকেন ছিল তাঁদের একমাত্র খাদ্য। এই দীর্ঘ সময় জুড়ে সুনীতারা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করেছেন ৪৫৭৬ বার। দিনে ১৬ বার করে সূর্যোদয় সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। দূর থেকে বড়ো ‘কাছের‘ আপন নীলগ্রহটিকে দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁরা, তবু সেই পৃথিবীর মাটি ছিল অধরাই।
অবশেষে, ইলন মাস্কের অদম্য প্রচেষ্টায় ‘স্পেস এক্স‘-এর এক অত্যাধুনিক স্পেসক্রাফ্টে করে সুনীতা উইলিয়ামস ও ব্যারি, বুচ উইলমোরকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। ১৮ মার্চ, ২০২৫–এ আটলান্টিক মহাসাগরে অবতরণ করে সেই যান। মহাকাশযান থেকে বেরোনোর পর সুনীতার চলার শক্তি ছিল না ঠিকই, কিন্তু তিনি সেই চিরাচরিত হাসিমুখেই হাত নেড়ে নিজের ঘরে ফেরাকে উদযাপন করেন। পৃথিবীবাসীর উদ্দেশে সুনীতার প্রথম বাক্যটি ছিল—“ওয়েলকাম ব্যাক কিউ ৯! দ্য আর্থ মিসড ইউ।” উল্লেখ্য, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫–এ নাসা থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা করেছেন সুনীতা। তার কিছুদিন পরই ২০২৬–এর জানুয়ারি মাসে ভারত সফরে আসেন তিনি। ইউটিউবার রাজ শামানির সঙ্গে এক অভূতপূর্ব পডকাস্টে অংশগ্রহণ করেন সুনীতা। ভিনগ্রহের প্রাণী থেকে মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা—কিছুই বাদ পড়েনি সেই আলোচনায়। নয়াদিল্লির আমেরিকান সেন্টারে এক ইনটারেক্টিভ অধিবেশনেও যোগ দেন তিনি। আর সেখানেই এই ভারত সফরকে এক কথায় ‘ঘরে ফেরা” বলে আখ্যায়িত করেন সুনীতা। এরপর প্রয়াত মহাকাশচারী কল্পনা চাওলার মা ও বোনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর। ভারতের ভাবী নভোচারীরা সুনীতা উইলিয়ামসের ভারত সফর প্রত্যক্ষ করে যে মহাকাশে যাওয়ার নতুন উদ্যম পাবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে, কর্মবিরতি নিলেও নভোচারী সুনীতা উইলিয়ামসের অবদান কোনোদিন ক্ষীণ হবে না। অসম্ভব সাহসী এই মহাকাশচারী তাঁর জীবনীশক্তি খুঁজে পান গীতার শ্লোকে। জানা যায়, মহাকাশে যাত্রার সময় ভগবদ্গীতা ও উপনিষদের অনুলিপি সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন সুনীতা। গীতার সেই পবিত্রবাণীই তাকে মনোবল দিত কি না তা আমাদের জানা না থাকলেও সমগ্র বিশ্ববাসী সুনীতা উইলিয়ামসের দিকে তাকিয়ে থেমে না থাকার আশ্বাস পায়। তাঁর অপ্রতিরোধ্য জেদ আমাদের জীবনের লড়াইকে মাথা উঁচু করে লড়ে যাওয়ার পাঠ পড়ায় অনবরত। সেই অদম্য জেদের নামই সুনীতা ‘সুনি’ উইলিয়ামস।