সাধু ও চলিত রীতি
Sadhu Bhasha Cholit Bhasha-Sadhu Bhasha – Cholit Bhasha – Sadhu Bhasa – Cholit Bhasa – Chalita Bhasa – sadhu bhasa o chalet bhasa -sadhu-bhasha-cholit-bhasha-Sadhu Bhasha – Cholit Bhasha – Sadhu Bhasa – Cholit Bhasa – Chalita Bhasa – sadhu bhasa o chalet bhasa -sadhu-bhasha-cholit-bhasha-Sadhu Bhasha – Cholit Bhasha – Sadhu Bhasa – Cholit Bhasa – Chalita Bhasa – sadhu bhasa o chalet bhasa -sadhu-bhasha-cholit-bhasha-Sadhu Bhasha – Cholit Bhasha – Sadhu Bhasa – Cholit Bhasa – Chalita Bhasa – sadhu bhasa o chalet bhasa -sadhu-bhasha-cholit-bhasha
‘সাধু ভাষা মাজাঘষা, সংস্কৃত ব্যাকরণ অভিধান থেকে ধার করা অলংকারে সাজিয়ে তোলা। চলিত ভাষার আটপৌরে সাজ নিজের চরকায় কাটা সুতো দিয়ে বোনা।‘ —রবীন্দ্রনাথ
মনের ভাব প্রকাশ ও বিনিময়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন জাতির স্বতন্ত্র উচ্চারিত ধ্বনিকে বলে ভাষা। ‘সমুদ্রের মধ্যে হাজার হাজার প্রবাল আপন দেহের আবরণ মোচন করতে করতে কখন এক সময়ে দ্বীপ বানিয়ে তোলে। তেমনি বহুসংখ্যক মন আপনার অংশ দিয়ে দিয়ে গড়ে তুলেছে আপনার ভাষাদ্বীপ।’ এইভাবে বিশেষ জনগোষ্ঠী তার ভাষার বাক্-সমাজ (Speech Community) হিসেবে চিহ্নিত হয়। বাঙালী বাংলা ভাষার বাক্-সমাজ। বাঙালী জাতির ব্যবহৃত সার্থক ধ্বনিই বাংলাভাষা।
প্রাচীন ভারতে বহিরাগত প্রাচীন আর্যভাষা সাধারণভাবে সংস্কৃত ভাষা নামে পরিচিত। আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলি, বাংলা ভাষা যার অন্যতম, সংস্কৃত ভাষা থেকে জন্ম নিয়েছে। জন্মের ব্যাপারটা ঘটেছে ঠিক সোজাসুজি নয়, রূপান্তরশীল অনেক স্তরক্রমের মাধ্যমে। বাংলা ভাষার নিকট-উৎস মাগধী এবং জন্মকাল খ্রীস্টীয় দশম শতক। অঙ্কের হিসেবে তার আয়ু হাজার বছর। পরিবর্তনের বিশিষ্ট চিহ্নগুলি তার উত্তমায়ুর অঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে আছে। ভাষাবিদরা পরিবর্তনকে তিনটি পর্যায়ে বিভাজিত করেছেন : প্রাচীন বাংলা (৯৫০-১৩৫০ খ্রীস্টাব্দ), মধ্য বাংলা (১৩৫০-১৮০০ খ্রীস্টাব্দ), আধুনিক বাংলা (১৮০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে)।
বাংলা ভাষা: লৈখিক ও মৌখিক
অবিভক্ত বাংলা দেশের অঞ্চলভেদের ধ্বনির উচ্চারণ ভিন্ন। অনুসৃত ভিন্নতাই ভাষামণ্ডলকে সীমিত আঞ্চলিকতা দিয়ে উপভাষা (dialect) নামে চিহ্নিত করে। জীবন-যাপনের ছোট-বড় প্রসঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত এই ভাষা মাত্র মুখের ভাষা, সেজন্যে একে বলা হয় কথ্য বা মৌখিক ভাষা।
একটি বিশেষ ভূখণ্ডের অধিবাসী মানুষদের আঞ্চলিক ভাষাগুলির মধ্যে তুলনীয় দৃষ্টিতে প্রকৃতিগত ঐক্য দেখা যায়; যদিও রূপগত পার্থক্যে ও ধ্বনিগত বৈষম্যে তাদের পারস্পরিকতা দূরত্বের। তাই প্রয়োজন সামান্য লক্ষণযুক্ত এমন এক ‘ভাষাদর্শ’ যা একই বাক্-সমাজের ভিন্নআঞ্চলিক সব মানুষের কাছে সহজ বোধগম্যতা পেতে পারে। সেই ভাষাদর্শের কাঠামোটা সজীব ভাষার ধর্ম অনুযায়ী গড়ে উঠবে, বানানো হবে না। মৌখিক রূপের আয়োজন অভিব্যক্তির পথ ধরে অদ্বিষ্ট আদর্শ স্বাভাবিক বিকাশকে সম্ভব করবে। নির্মিত হল একটি সাবজনীন ভাষারূপ, যাকে বলে লৈখিক ভাষা।
লৈখিক বাংলা: সাধু ও চলিত
অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত বাংলা ভাষার লিখিত রূপ ছিল পদ্য। কবির ভাবানুভুতি উপযোগী ছন্দ ও কাব্যভাষা নিশ্চিন্ত নির্বাচন করতে বাধা পেত না। সীমিত প্রসঙ্গ ও প্রযুক্তির বৈচিত্র্যহীন পৌনঃপুনিকতা ভাষার নতুন দিগন্ত জয় করার তুলনায় নিবিষ্ট হত প্রধানুগত্যে। ভাষায় বিস্তৃত হবার প্রচেষ্টা আখ্যানমূলক পদ্যকে প্রান্তসীমা মেনে নিয়েছিল। মুখের ভাষা আর লেখার ভাষা পদ্যের প্রয়োজনে উপস্থিত হতে দ্বিধা করত না। উনিশ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ক্ষমতা সুদৃঢ় করার জন্যে উদ্দেশ্যমুখী ভাষাচর্চা জরুরি বিবেচিত হয়। মনের সূক্ষ্ম অনুভব ও কল্পনার পদ্যচর্চা নয়, প্রশাসন ও প্রাত্যহিক কাজের উপযোগী বিচিত্রগামী ছন্দোহীন ভাষাবিধির অনুশীলনই কাম্য। জন্ম নিল বাংলা গদ্য।
গদ্যের প্রচলন ছিল উনিশ শতকের পূর্বেও। দলিল-দস্তাবেজ, চিঠিপত্র, ব্যবহারিক জীবনের ভাববিনিময়ে তার অস্তিত্ব, সীমিত ও সাধারণ হলেও, অনস্বীকার্য। বাংলা গদ্য এই পুরোনো ধারার অনুশীলন করে নি। ইংরেজ কর্মচারীদের শিক্ষার্থে সংস্কৃত-জানা শিক্ষিত মানুষের হাতে আবির্ভূত হয়েছে নতুন প্রকৃতির গদ্য, পদ্যকে ছন্দমুক্ত ও বিভক্তিচ্যুত করেই তার অব্যাহত আগমন। বিলিতি মুদ্রণালয়ের চিহ্নবহ এই ভাষাই কালক্রমে অল্পবিস্তর রূপান্তরিত হয়ে নাম পেয়েছে সাধু ভাষা। মৌখিক রূপ থেকে সাধু গদ্যের আবির্ভাব হলেও ভাষার স্বাভাবিক অভিব্যক্তির পূর্ণাঙ্গতা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের চাপে ত্বরিত ও বিঘ্নিত হয়েছে। তাই সাধু ভাষা অনেকখানি বানানো।
কিন্তু বানানোর সত্যকে অস্বীকার করা যায় না। ‘সাধু ভাষা সমগ্র বঙ্গদেশের সম্পত্তি। ইহার চর্চা সর্বত্র প্রচলিত থাকাতে, বাঙালির পক্ষে ইহাতেই লেখা সহজ হইয়াছে। ইহার ভাষার ব্যাকরণের রূপগুলি (বিশেষতঃ ক্রিয়াপদের ও সর্বনামের) প্রাচীন বাংলার রূপ; এই সমস্ত রূপ সর্বত্র মৌখিক বা কথিত ভাষায় আর ব্যবহৃত হয় না। এই সাধু ভাষা মুখ্যতঃ পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন মৌখিক বা কথিত ভাষার উপর প্রতিষ্ঠিত; তাহা হইলেও, পূর্ববঙ্গের বহু রূপ ও বৈশিষ্ট্যের প্রভাব ইহার উপর পড়িয়াছে।’ (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়)
উনিশ শতকের লেখকেরা লেখার ভাষাকে ‘সাধু ভাষা’ নাম দিয়েছেন। রামমোহন রায়ের মতে, সাধুসমাজের লোকেরা যে-ভাষা ‘কহেন এবং শুনেন’ সেই ভাষাই সাধু ভাষা। বঙ্কিমচন্দ্র জানিয়েছেন, ‘কিছুকাল পূর্বে দুইটি পৃথক ভাষা বাঙ্গালায় প্রচলিত ছিল। একটির নাম সাধুভাষা, অপরটির নাম অপর ভাষা। একটি লিখিবার ভাষা, দ্বিতীয়টি কহিবার ভাষা’। আবার একটু বিস্তৃত করে বলেছেন, ‘একটির নাম সাধু ভাষা অর্থাৎ সাধুজনের ব্যবহার্য ভাষা। আর একটির নাম অপর ভাষা অর্থাৎ সাধু ভিন্ন অপর ব্যক্তিদিগের ব্যবহার্য ভাষা। এস্থলে সাধু অর্থে পণ্ডিত বুঝিতে হইবে।’
প্রথম যুগের বিশিষ্ট গদ্যলেখক মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার জানিয়েছিলেন, ‘অন্যান্য দেশীয় ভাষা হইতে গৌড় দেশীয় ভাষা উত্তম, সর্বোত্তমা সংস্কৃত ভাষা।’ তিনি সাধু ও মুখের ভাষায় গদ্য লিখেছেন। দুই ভাষার দুই পদ্ধতি তখন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে চর্চা করা হয়েছে। দুই ভাষার দৃষ্টান্ত পার্থক্যের প্রতিতুলনা জানিয়ে দেবে:
এক ॥ সাধু ভাষাঃ
ক. ‘তাঁহার ন্যায় ধার্মিক রাজা কখন কাহারও দৃষ্টিগোচর হয় নাই। তদানীনন্তন লোকেরা সেই কীর্তিমানের সদাচার ও সদ্ব্যবহার দর্শন করিয়া অর্থ ও কাম পরিত্যাগপূর্বক কেবল একমাত্র ধর্মোপাসনাব্রতে ব্রতী হইয়াছিলেন। নৃপগণ শান্তনুর লোকাতিশায়িনী ধার্মিকতা দেখিয়া তাঁহাকে সম্রাটপদে অভিষিক্ত করিলেন এবং তাঁহার দৃষ্টান্তের অনুগত হইয়া চলিতে লাগিলেন।’ — কালীপ্রসন্ন সিংহ : মহাভারত
খ. ‘এই বলিয়া রামচন্দ্র অবনত বদনে অশ্রুবিমোচন করিতে লাগিলেন। তাঁহারাও তিন জনে, জানকীর পরিত্যাগ বিষয়ে তাঁহাকে তদ্রূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখিয়া, আপত্তিকরণে বিরত হইয়া মৌনালম্বনপূর্বক, বাষ্পবারি বিসর্জন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে রাম সকলকে বিদায় দিয়া বিশ্রামভবনে গমন করিলেন। চারিজনেরই যার পর নাই অসুখে রজনী যাপন হইল।’ — ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : সীতার বনবাস
দুই ॥ অপর ভাষাঃ
ক. ‘মোরা চাষ করিব ফসল পাব রাজার রাজস্ব দিয়া যা থাকে তাহাতেই বছরশুদ্ধ অন্ন করিয়া খাব ছেলেপিলাগুলি পুষিব। যে বছর শুকো হাজাতে কিছু খন্দ না হয় সে বছর বড় দুঃখে দিন কাটে কেবল উড়িধানের মুড়কী ও মটর মসুর শাক পাত শামুক গুগুলি সিজাইয়া খাইয়া বাঁচি খড়কুটা কাটা শুকনো পাতা কঞ্চি তুঁষ ও বিল খুঁটিয়া কুড়াইয়া জ্বালানি করি। কাপাস তুলি তুলা করি ফুড়ী পিঁজী পাঁইজ করি চরকাতে সূতা কাটি কাপড় বুনাইয়া পরি।’ — মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার : প্রবোধচন্দ্রিকা
খ. ‘অমাবস্যার রাত্তির—অন্ধকারে ঘুটঘুটি—গড় গড় করে মেঘ ডাকচে—থেকে থেকে বিদ্যুৎ নলপাচ্ছে—গাছের পাতাটি নড়চে না—মাটি থেকে যেন আগুনের তাপ বেরুচ্চে—পথিকেরা এক একবার আকাশ পানে চাচ্ছেন, আর হন্ হন্ করে চলেছেন। কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ কচ্চে—দোকানীরা ঝাঁপতাড়া বন্ধ করে ঘরে যাবার উজ্জুক কচ্চে; গুড়ুম করে নটার তোপ পড়ে গ্যালো।’ — কালীপ্রসন্ন সিংহ : হুতোম প্যাঁচার নকসা
দৃষ্টান্তগুচ্ছ জানিয়ে দেয়, দুই ভাষার মধ্যে পার্থক্য শব্দের প্রকৃতি ও বাক্যের রীতিতে নিহিত। এই পর্বে সংস্কৃত গদ্যের অনুকরণে এবং সংস্কৃত শব্দের উপকরণে সাধু গদ্য লেখা হত। সংস্কৃতের অনুরূপ যৌগিক শব্দ, প্রসারিত ক্রিয়াপদ, বাক্যের পদগত বিন্যাসরীতি তার ভাষাগত বৈশিষ্ট্য। এবং অপর ভাষার বৈশিষ্ট্য ছিল পরিবর্তিত-অপরিবর্তিত সংস্কৃত আর দেশী-বিদেশী শব্দের ঐচ্ছিক ব্যবহারে, সংক্ষিপ্ত ক্রিয়াপদের অস্বীকৃতিতে। তাদের মৌখিক ভাষা তৎকালীন কলকাতার পুরোনো বাসিন্দাদের উপভাষা মাত্র। ভাষার প্রবহমানতা অপর ভাষার সঙ্গে সাধুভাষা যুক্ত করে মুখের ভাষার বাস্তবানুগ প্রতিরূপ স্থাপিত করলেও, অপর ভাষাদর্শ স্বতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হতে পারেনি। পরের পর্বে বাংলা সাধুগদ্য লিখিত হয়েছে ইংরেজি বাক্যের অনুকরণে ও সংস্কৃত শব্দের উপকরণে। রীতিগত পার্থক্যই উভয় ভাষাকে পৃথক করে রেখেছে, তখন থেকে সাধু ভাষার এই পরিচয় দাঁড়িয়ে গেল, ‘যে-ভাষা সাধুসমাজের লোকেরা কহেনও না, শোনেনও না, কিন্তু লিখেন এবং পড়েন, সেই ভাষা সাধু ভাষা।’ — প্রমথ চৌধুরী
কিন্তু জীবন্ত ভাষা রূপান্তরধর্মী। মুদ্রিত ভাষা সাধু ভাষার সম্মান পেলেও কালক্রমে তার ‘বাবু-বাংলা’ (প্রমথ চৌধুরী) হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দেয়। সংস্কৃত ও ইংরেজি দুই পরভাষার অনুকরণে-উপকরণে লিখিত পুঁথিনির্ভর ভাষা অনেকাংশে নির্জীব। আবার সাধুভাষার সুমার্জিত রূপ চিন্তা-প্রকাশের উপযোগী হলেও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আকুলতা-ব্যাকুলতা, সংশয়-বিশ্বাস প্রভৃতি অনির্দিষ্ট ভাব প্রকাশে অনুপযোগী। মাতৃভাষা রূপ-যৌবনে সাধুভাষা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও পরিবর্তনশীল। নৈসর্গিক কারণে লিখিত ভাষা থেকে কথিত ভাষা দূরে সরে যেতে থাকে, ভিন্ন ভাষা হয়। তাছাড়া,‘লিখিত ভাষায় আর মুখের ভাষায় মূলে কোনো প্রভেদ নেই। ভাষা দুয়েরই এক, শুধু প্রকাশের উপায় ভিন্ন। একদিকে স্বরের সাহায্যে, অপর দিকে অক্ষরের সাহায্যে।’ (প্রমথ চৌধুরী)। এক ভাষাকে জোর করে দুভাগে বিভক্ত করা যায় না। ‘যেমন একটি প্রদীপ থেকে অপর একটি প্রদীপ ধরাতে হলে পরস্পরের স্পর্শ ব্যতিরেকে সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না, তেমনি লেখার ভাষাতেও প্রাণসঞ্চার করতে হলে মুখের ভাষার সম্পর্ক ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না’ (প্রমথ চৌধুরী)। বাংলা ভাষার বিবর্তনের তৃতীয় পর্বে অভিঘাত দেখা দিল মুখের ভাষার উপর, রবীন্দ্রনাথ যার নাম দিয়েছেন ‘প্রাকৃত বাংলা’।
দক্ষিণদেশী উপভাষার সহজ শ্রেষ্ঠত্ব সংস্কৃত শব্দ মিশ্রিত করে জন্ম দিয়েছিল সর্বজনবোধ্য সাধু ভাষাদর্শ। সেই উপভাষার মানচিত্র মোটামুটি এই : নদীয়া, শান্তিপুরের প্রভৃতি স্থান, ভাগীরথীর দুই কূল এবং বর্ধমান ও বীরভূম জেলার পূর্ব ও দক্ষিণাংশ। পরবর্তীকালে নবদ্বীপের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অধিকার করেছে কলকাতা। রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, সব দিক থেকে কলকাতার গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হবার যোগ্যতা। কলকাতায় আসতে হয় অবিভক্ত বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষদের, তাদের গতিবিধি অব্যাহত করতে প্রয়োজন তার ভাষা বোঝার ও বলার। বিবেকানন্দ ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে লিখেছিলেন, ‘বাঙ্গালা দেশের স্থানে স্থানে রকমারি ভাষা, কোন্টি গ্রহণ করব? প্রাকৃতিক নিয়মে যেটি বলবান হচ্ছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে, সেইটিই নিতে হবে। অর্থাৎ কলকাতার ভাষা। পূর্ব-পশ্চিম, যে দিক হতেই আসুক না, একবার কলকাতার হাওয়া খেলেই দেখছি সেই ভাষাই লোকে কয়। তখন প্রকৃতি আপনিই দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, কোন ভাষায় লিখতে হবে। যত রেল ও গতাগতির সুবিধা হবে, তত পূর্ব-পশ্চিমী ভেদ উঠে যাবে, এবং চট্টগ্রাম হতে বৈদ্যনাথ পর্যন্ত ঐ কলকাতার ভাষাই চলবে। যখন দেখতে পাচ্ছি যে, কলকাতার ভাষাই অল্প দিনে সমস্ত বাঙ্গালা দেশের ভাষা হয়ে যাবে, তখন যদি পুস্তকের ভাষা এবং ঘরে কথা-কওয়া ভাষা এক করতে হয় তবে বুদ্ধিমান অবশ্যই কলকাতার ভাষাকে ভিত্তিস্বরূপ গ্রহণ করবেন।’ প্রায় বারো বছর পরে প্রমথ চৌধুরী একই কথা উচ্চারণ করে অনুসরণযোগ্য কলকাতার মৌখিক ভাষাকে গুরুত্ব দিলেন, এবং বর্জনীয় মনে করলেন পুরনো কলকাতার বাসিন্দাদের উপভাষা, কেননা ‘খাস-কলকাতাই বুলি শুধু শহরের cockney ভাষা।’ তিনি লিখলেন, ‘ঐ দক্ষিণদেশী ভাষাই তার আকার এবং বিভক্তি নিয়ে এখন সাধুভাষা বলে পরিচিত। অথচ আমি তার বন্ধন থেকে সাহিত্যকে কতকটা পরিমাণে মুক্ত করে এ যুগের মৌখিক ভাষার অনুরূপ করে নিয়ে আসবার পক্ষপাতী এবং আমার মতে, খাস-কলকাতাই নয়, কিন্তু কলকাতার ভদ্র সমাজের মুখের ভাষা অনুসরণ করাই আমাদের চলা কর্তব্য।’ কলকাতার শিক্ষিত বাঙালির ভাষাই বাঙালী জাতির ভাষা সর্বাঙ্গীণ বঙ্গভাষা হয়ে উঠেছে। এই ভাষাই লেখার যোগ্য ভাষা ও ভাষাদর্শ। মৌখিক ভাষা-নির্ভর পরিবর্তিত লেখার ভাষার নাম হল চলিত ভাষা। লক্ষণীয় যে, মৌখিক ভাষা থেকে সাধু ও চলিত উভয় ভাষারূপই জন্ম নিয়েছে। ভাষার বিবর্তনে সাধু-ভাষার ভূমিকা ছিল কৃত্রিম, দ্রুতহাতে বানানো। সেটি বর্জন করে স্বীকৃতি দেওয়া হয় চলিত ভাষাকে, যেহেতু ভাষার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি চলিত ভাষার সঙ্গেই সংগতি রাখে। সাধুভাষা পূর্ববর্তী রূপ হিসেবে পরিচিত হয়ে থাকল। তাই রবীন্দ্রনাথের প্রবক্তাধর্মী উচ্চারণ স্মর্তব্য, ‘যে দক্ষিণী বাংলা লোকমুখে এবং সাহিত্যে চলে যাচ্ছে তাকেই আমরা বাংলা ভাষা বলে গণ্য করব। এবং আশা করব, সাধু ভাষা তাকেই আসন ছেড়ে দিয়ে ঐতিহাসিক কবরস্থানে বিশ্রাম লাভ করবে।’
বিশ শতকের দুই ভাষার দৃষ্টান্তের মাধ্যমে পরিবর্তিত দুটি ভাষারূপ জানা যাবে:
এক ॥ সাধু ভাষাঃ
‘স্বল্পপরিমাণে দুঃখ ও পীড়ন আমাদের চেতনার উপর যে আঘাত করে তাহাতে আমাদের সুখ হইতেও পারে। প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে বিনা কষ্টে আমরা পাচকের প্রস্তুত অন্ন খাইয়া থাকি, তাহাকে আমরা আমোদ বলি না ; কিন্তু যেদিন চড়িভাতি করা যায় সেদিন নিয়ম ভঙ্গ করিয়া, কষ্ট স্বীকার করিয়া অসময়ে সম্ভবত অখাদ্য আহার করি, কিন্তু তাহাকে বলি আমোদ। আমোদের জন্য আমরা ইচ্ছাপূর্বক যে পরিমাণে কষ্ট ও অশান্তি জাগ্রত করিয়া তুলি তাহাতে আমাদের চেতন শক্তিকে উত্তেজিত করিয়া দেয়’ । — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : পঞ্চভূত
দুই ॥ চলিত ভাষাঃ
‘আরও অনেকে যারা রেজাল্ট জানতে এসেছিল, ছাত্রছাত্রী এবং তাদের আত্মীয়স্বজন, তাদেরও কারো মুখে যেন উল্লাসের ছাপ পড়েনি। নীরেনের মতো যে কজন সুখবর জেনেছে তাদের সকলের সঙ্গেই যে বিমলের মতো ফেলকরা বন্ধু আছে তা নয় কিন্তু এত বেশী মুখে ক্ষোভ ও বেদনা ফুটেছে যে দু-চারটি মুখের আনন্দের জ্যোতি হারিয়ে গেছে তার আড়ালে। পাস যারা করেছে তারাও এত ফেল করা ছেলেমেয়ের মধ্যে অস্বস্তি বোধ করছে বৈ কি’! — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: পাশ ফেল
দৃষ্টান্তের সাধুভাষার সংস্কৃত শব্দ আড়ম্বর ত্যাগ করেছে; সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ প্রসারিত আকারে আছে; বাক্যের ধ্বনিতরঙ্গ কিছুটা মন্থর। চলিত ভাষায় সংস্কৃত শব্দের পাশাপাশি তদ্ভব ও বিদেশী শব্দ স্বীকৃতি পেয়েছে; সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ সংক্ষিপ্ত আকার নিয়েছে; বাক্যের প্রবহমানতা দ্রুত। পার্থক্য প্রধানত নির্ভর করে আছে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের উপর। সাধুভাষা যেন চলিতর দিকে এগিয়ে চলেছে।
দুই ভাষার প্রকাশ–বৈচিত্র্য জানার জন্য কয়েকটি দৃষ্টান্ত বিচার্য।
এক ॥ সাধুভাষাঃ
ক. সাধুভাষায় তৎসম-প্রাধান্য: আকাশে মেঘাড়ম্বরকারণে রাত্রি প্রদোষকালেই ঘনান্ধকারময়ী হইল। গ্রাম, গৃহ, প্রান্তর, পথ, নদী, কিছুই লক্ষ্য হয় না। কেবল বনবিটপাসকল, সহস্র সহস্র খদ্যোতমালাপরিমণ্ডিত হইয়া হীরকখচিত কৃত্রিম বৃক্ষের ন্যায় শোভা পাইতেছিল। কেবলমাত্র গর্জনারত শ্বেতকৃষ্ণাভ মেঘমালার মধ্যে হ্রস্বদীপ্ত সৌদামিনী মধ্যে মধ্যে চমকিতেছিল—স্ত্রীলোকের ক্রোধ একেবারে হ্রাস প্রাপ্ত হয় না। কেবলমাত্র নববারিস-মাগমপ্রফুল্ল ভেকেরা উৎসব করিতেছিল। — বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : বিষবৃক্ষ
খ. সাধুভাষায় অ-তৎসম প্রাধান্য : শেষে দেখা গেল সেটা নড়েও না চড়েও না। একটু একটু করিয়া কাছে গিয়া দেখা গেল, সেটা একটা কাশের খুপরি। আবার ঘোড়া ছুটাইয়া দিলাম। মাঠ-ঘাট, বন, ধুধু-জ্যোৎস্নভরা বিশ্ব—কী একটা সঙ্গীহারা পাখি আকাশের গায়ে কি বনের মধ্যে কোথায় ডাকিতেছে টি-টি-টি-টি—ঘোড়ার খুরে বড়ো বালি উঠিতেছে, ঘোড়া এক মুহূর্ত থামাইবার উপায় নাই—উড়াও, উড়াও—। — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় : আরণ্যক
দুই ॥ চলিত ভাষা:
ক. চলিত ভাষায় তৎসম প্রাধান্য : ‘ধর্মের অর্থ সমাজহিতকর বিধি, ধর্মপালনের অর্থ সামাজিক কর্তব্যপালন। এই ধর্মবোধ লুপ্ত হওয়ায় সমাজ ব্যাধিগ্রস্ত হয়েছে, অসংখ্য বীভৎস লক্ষণ সমাজদেহে ফুটে উঠেছে। ধনপতির তোষণ, দরিদ্রের শোষণ, কালোবাজারের প্রসার, সরকারী অর্থের অপব্যয়, উচ্চস্তরের কলঙ্ক চেপে রাখা, ইত্যাদি বড় বড় অপকীর্তির কথা অনেক পত্রিকায় থাকে, লোকের মুখে মুখেও রটনা হয়’। — রাজশেখর বসু: বিচিন্তা
খ. চলিত ভাষায় অ-তৎসম প্রাধান্য:
‘শুনে তারা যেন একটু চমকে যায়। পানখোর ছোকরা আবার প্যাচ করে খানিকটা পিক ফ্যালে। গতকালের হাঙ্গামায় প্লাটফর্মের কাঁকরে খানিক রক্তপাত ঘটেছিল, ছোঁড়া যেন পানের পিক দিয়েই তার জের টেনে প্লাটফর্মটা রাঙা করে দিতে চায়। দিবাকরও পান ভালবাসে, রাস্তায় পুরো পাঁচ পয়সার তৈরী পান কিনেছে। কাগজের ঠোঙাটা বার করে সেও একটা পান মুখে পুরে দেয়’। — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ছোট বকুলপুরের যাত্রী
আলোচনা ও দৃষ্টান্ত জানিয়ে দেয়, গ্রন্থে ব্যবহৃত বাংলা ভাষার দুটি রূপ : এক, সাধু ভাষা (Standard Literary Bengali); দুই, চলিত ভাষা (Standard colloquial Bengali) । তাদের সংজ্ঞা এইভাবে নির্ণীত হতে পারে :
॥ সাধু ও চলিত ভাষার প্রতিতুলনা ॥
ক. সাধু ভাষায় উচ্চারণভঙ্গি মন্থর বলে প্রধানত ক্রিয়া ও সর্বনামপদগুলির রূপ প্রসারিত ও পূর্ণ; রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘এলানো’ শব্দ (যাইতেছে, করিবে, চলিতেছিল, খেলিয়াছে; আমাদিগকে, তাহাদের, তাঁহারা, ইহারা)। বর্ণলোপ, স্বরসঙ্গতি, অভিশ্রুতি প্রভৃতি ধ্বনি-পরিবর্তনধর্মী উচ্চারণ ভঙ্গির দ্রুততা চলিত ভাষাকে দেয় সংক্ষিপ্ততা; রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘পিণ্ড’ বা ‘তাল’ পাকানো (যাচ্ছে, করবে, চলছিল, খেলেছে, আমাদের, তাদের, তাঁরা, এরা)।
খ. তৎসম শব্দের প্রাধান্য থাকে সাধুভাষায়; চলিত ভাষায় তৎসম শব্দের তুলনায় অ-তৎসম শব্দের অবাধ প্রবেশ প্রাধান্য পায়। যথা: কৃষ্ণ(তৎসম) > কানু, কানাই (তদ্ভব) , অষ্টপ্রহরীয়(তৎসম) >আটপৌরে (তদ্ভব) , সংবরণ(তৎসম) >সামলানো (তদ্ভব), গৃহিণী(তৎসম) > গিন্নি (অর্ধ-তৎসম), নিমন্ত্রণ(তৎসম) > নেমন্তন্ন (অর্ধ-তৎসম) ,চর্মকার(তৎসম) > চামার (দেশী), রাজবিধি(তৎসম)=আইন (ফারসী), মন্দ(তৎসম)=খারাপ (আরবী)
গ. সাধু ভাষায় সমাস ও সন্ধিবদ্ধ পদ থাকে, ভাষায় দেখা দেয় আড়ম্বর ও গাম্ভীর্যের মহিমা; চলিত ভাষায় কথনভঙ্গির অনুকূলে সাধারণত সেগুলি ভেঙে দেওয়া হয় অথবা অর্থানুযায়ী সহজ শব্দের দ্বারা স্থানবদল ঘটানো হয়। যথা :দারুনির্মিত > কাঠের তৈরি , নানাভরণভূষিত > নানা রকম গয়না-পরা , গাত্রোত্থান > ওঠা , মুষ্টিবদ্ধহস্ত > মুঠো-করা হাত , কৃষ্ণবিন্দুনিচয়তুল্য > কালো , ফোঁটাগুলোর মত ; অন্নাভাব > অন্নের অভাব ; দারিদ্র্যাবস্থা > দরিদ্রের অবস্থা ; স্থানচ্যুত > স্থান থেকে চ্যুত।
ঘ. অনুর্গ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধুভাষা থেকে চলিত ভাষাকে দ্রুততার জন্য সংক্ষিপ্ত বা পরিবর্তিত হতে হয়। যথা : হইতে > চাইতে, হতে, থেকে ; দ্বারা, দিয়া > দিয়ে ; জন্য > জন্যে ; অপেক্ষা > চেয়ে, চাইতে, হতে, থেকে ; বলিয়া > বলে ; ধরিয়া > ধরে।
ঙ. বিশেষ্যকে বিশেষণ বা ক্রিয়াপদে পরিণত করার সহজ উপায় চলিতে নেই। সংস্কৃতে নতুন শব্দ বানানো হয় কাজের স্বতন্ত্রহীন কিছু টুকরো শব্দের পূর্বে ‘উপসর্গ’ যোগ করে। ‘গত’ শব্দের পূর্বে ‘অনু’, ‘আ’, ‘নির্’, ‘সম্’, ‘দূর’, উপসর্গ যুক্ত হলে পৃথক অর্থের নতুন শব্দ তৈরি হয় সাধুতে : আগত, অনুগত, নির্গত ইত্যাদি। বাংলা উপসর্গ সীমিত, বিশেষ্য বা বিশেষণের পূর্বে বসে চলিতে অল্প কিছু শব্দ গঠন করে মাত্র : ‘কাজ’ শব্দের পূর্বে ‘অ’, ‘কু’, ‘সু’ বসিয়ে পাওয়া যায় ‘অকাজ’, ‘কুকাজ’, ‘সুকাজ’। সেজন্য শব্দগঠনের কাজে চলিত ভাষাকে নির্ভর করতে হয় প্রয়োগ-সংকীর্ণ, নিয়ম-না-মানা কিছু প্রত্যয়ের উপর। যথা : অন— চলন, গড়ন, ভাঙন ; আ— চলা, গড়া, ভাঙা ; তি— চলতি, কাটতি, ঘাটতি ; উনে— কাঁদুনে, নাচুনে। সংস্কৃত প্রত্যয় নিয়ম মেনে চলে, শব্দ-গঠনে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
চ. সাধু ভাষার মত চলিত ভাষায় সর্বনামে লিঙ্গভেদ নেই। সাধু ভাষার অনুকরণে চলিতে সর্বত্র লিঙ্গান্তর হয় না। সিংহ > সিংহিনী, ব্যাঘ্র > বাঘিনী হয়, কিন্তু এভাবে উট, মোষ, হাতির লিঙ্গ-পরিবর্তন করা যায় না। চলিত বাংলায় স্বেচ্ছাচারের প্রকৃতি আছে।
ছ. চলিত বাংলায় বিশেষ্যপদে বহুবচনের প্রভাব অল্প। প্রায় ক্ষেত্রে ‘সব’, ‘গুলি’, ‘সকল’, ‘রা’, শব্দ দিয়ে কাজ চালানো হয়। যথা : মানুষগুলি, মানুষেরা, পাখিসব পাখিসকল, ইত্যাদি।
জ. শব্দ-দ্বিত্ব করার রীতি চলিত ভাষার নিজস্ব ; অর্থের চেয়ে ধ্বনি মনে সহজে প্রবেশ করে ও প্রাধান্য পায়। যথা : আইঢাই, উসখুস, কাঁচুমাচু, ফ্যালফ্যাল, উঠি উঠি, ইত্যাদি।
ঝ. সাধু ভাষার বাক্যরীতি নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে চলে ; প্রথমে উদ্দেশ্য ও শেষে বিধেয় নিয়ে বাক্যের বিন্যাস-ক্রম আকৃতি হয়। বাক্যের প্রথমে বিশেষণ যুক্ত বা বিযুক্ত কর্তা, মধ্যে কারক-চিহ্নিত ক্রিয়াবিশেষণ প্রভৃতি পদ, শেষে ক্রিয়াপদ থাকে। যথা : নিঃসঙ্গ পশুপতি আম্রকাননে দ্রুত প্রবেশ করিলেন > নিঃসঙ্গ (বিশেষণ) + পশুপতি (কর্তা) + আম্রকাননে (অধিকরণ) দ্রুত (ক্রিয়াবিশেষণ) + প্রবেশ করিলেন (ক্রিয়া)। চলিত ভাষায় পদবিন্যাসে সুনির্দিষ্ট রীতি নেই, বাক্যের পদ যে-ক্রম অনুসরণ করে তাকে বলা যায় নম্য ও ঐচ্ছিক : কথা বলছে আমার মেয়ে, আমার মেয়ে কথা বলছে, বলছে কথা আমার মেয়ে, মেয়ে আমার বলছে কথা, কথা বলছে মেয়ে আমার, ইত্যাদি একাধিক বাক্য গঠন করা চলে শব্দের উপর ঝোঁকের স্থানান্তর ঘটিয়ে।
ঞ. ধ্বন্যাত্মক শব্দের প্রাধান্য চলিত ভাষায় সহজদৃশ্য। যথা : শনশন, ফুরফুর, ঠ্যাঙস ঠ্যাঙস, খাঁ খাঁ, থৈ থৈ, ছম্ছম্, খিলখিল।
ট. চলিত ভাষায় বাগধারা, প্রবাদ ও প্রবচনমূলক বাক্য যথাযথ ব্যবহৃত হতে পারে ; এই বাক্-ভঙ্গিমাকে সাধুভাষা মেনে নেয় না।
ঠ. কতগুলি অব্যয় সাধু ও চলিত উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। যথা : কি, বা, তথাপি, তবু, নতুবা, কারণ। কিন্তু এমন কিছু অব্যয় আছে যা কেবল চলিত ভাষায় ব্যবহৃত হয়। যথা : তো, তা বলে, নাহলে, হলে পরে, মতন।
॥ সাধু ও চলিতের রূপান্তর (Transformation between Sadhu and Chalit)॥
লেখক তাঁর প্রয়োজন ও প্রবণতার অনুসরণে সাধু বা চলিত যে-কোনো ভাষারীতির আশ্রয় নিতে পারেন। সেই দৃশ্য ভাষারীতির রূপান্তর ঘটানো যায়। তারই কিছু বিশিষ্ট নিয়ম :
অ. সাধু থেকে চলিত ভাষায় (From Sadhu to Chalit)
আ. চলিত থেকে সাধু ভাষায় (From Chalit to Sadhu)
সাম্প্রতিক ভাষারীতির ক্ষেত্রে সাধু ও চলিতের পার্থক্য সীমিত হয়ে এসেছে।
রূপান্তরের ক্ষেত্রে ক্রিয়া, সর্বনাম ও কয়েকটি অনুসর্গের পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
॥ রূপান্তরের নিদর্শন ॥
অ. সাধু থেকে চলিত ভাষায়
১. যাঁহারা পূর্বদিন কুশ ও লবকে দেখিয়াছিলেন, তাঁহারা অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া স্বসমীপে উপবিষ্ট ব্যক্তিদিগকে তাহাদের দুই সহোদরকে দেখাইতে লাগিলেন। বাল্মীকি সভামণ্ডপে প্রবেশ করিবামাত্র সভাস্থ সমস্ত লোক এককালে গাত্রোত্থান করিয়া তাঁহার সংবর্ধনা করিলেন। — ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : সীতার বনবাস
চলিত রূপ: যাঁরা আগের দিন কুশ ও লবকে দেখেছিলেন, তাঁরা আঙুল দেখিয়ে নিজেদের কাছে উপবিষ্ট লোকদের তাদের দুই-সহোদরকে দেখাতে লাগলেন। বাল্মীকি সভায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সভার সব লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানালেন।
২. এমনি করিয়া ধনের প্রকাণ্ড জালের মধ্যে আটকা পড়িয়া লোকসাধারণ ছটফট করিয়া উঠিয়াছে। ধনের চাপটা যদি এত জোরের সঙ্গে তাহাদের উপর না পড়িত তবে তাহারা জমাট বাঁধিত না— এবং তাহারা যে কেহ বা কিছু তাহা কাহারও খবরে আসিত না। — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : লোকহিত
চলিত রূপ: এমনি করে ধনের বড় জালের ভেতর আটকে পড়ে লোকসাধারণ ছটফট করে উঠেছে। ধনের চাপটা যদি এত জোরের সঙ্গে তাদের ওপর না পড়ত তবে তারা জমাট বাঁধত না— এবং তারা-যে কেউ বা কিছু তা কারো খবরে আসত না।
৩. তাঁহাকে গরু চরাইতে দেখিয়া প্রথমটা আশ্চর্য হইয়াছিলাম বটে কিন্তু পরে ভাবিয়া দেখিলাম ভারতবর্ষের ইতিহাসে রাজা দোবরু পান্নার অপেক্ষা অনেক বড় রাজা অবস্থা বৈগুণ্যে গোচারণ অপেক্ষাও হীনতর বৃত্তি অবলম্বন করিয়াছিলেন। — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় : আরণ্যক
চলিত রূপ: তাঁকে গরু চরাতে দেখে প্রথমটা চমকে গিয়েছিলাম বটে কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম ভারতের ইতিহাসে রাজা দোবরু পান্নার চেয়ে অনেক বড় রাজা অবস্থা বৈগুণ্যে গরু চরানোর চেয়েও হীনতর বৃত্তি নিয়েছিলেন।
আ. চলিত থেকে সাধু ভাষায়
১. বিচার করলে দেখা যায়, মানুষের সাহিত্যরচনা তার দুটো পদার্থ নিয়ে। এক হচ্ছে যা তার চোখে অত্যন্ত করে পড়েছে, বিশেষ করে মনে ছাপ দিয়েছে। তা হাস্যকর হতে পারে, অদ্ভুত হতে পারে, সাংসারিক আবশ্যকতা অনুসারে অকিঞ্চিৎকর হতে পারে। — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বাংলা ভাষা-পরিচয়
সাধু রূপ: বিচার করিলে দেখা যায়, মানুষের সাহিত্যরচনা তাহার দুইটি পদার্থ লইয়া। এক হইতেছে যাহা তাহার চক্ষুতে অত্যন্ত করিয়া পড়িয়াছে, বিশেষ করিয়া মনে ছাপ তাহা হাস্যকর হইতে পারে, অদ্ভুত হইতে পারে, সাংসারিক আবশ্যকতা অনুসারে অকিঞ্চিৎকর হইতে পারে।
২. দেশের পল্লীতে পল্লীতে, গ্রামে গ্রামে আমি অনেকদিন ধরে অনেক ঘুরেছি। ছোট বড় উঁচু নিচু, ধনী নির্ধন, পণ্ডিত মূর্খ বহু লোকের সঙ্গে মিশে মিশে, অনেক তত্ত্ব সংগ্রহ করে রেখেছি। জনরব কে রটিয়েছে খুঁজে পাওয়া শক্ত এবং এর মধ্যে যত অত্যুক্তি আছে, তার জন্য আমাকেও দায়ী করা চলে না। — শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : স্বরাজ সাধনায় নারী
সাধু রূপ: দেশের পল্লীতে পল্লীতে, গ্রামে গ্রামে আমি অনেকদিন ধরিয়া অনেক ঘুরিয়াছি। ছোট বড়, উচ্চ নীচ, ধনী নির্ধন, পণ্ডিত মূর্খ, বহু মানুষের সঙ্গে মিশিয়া মিশিয়া, অনেক তত্ত্ব সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছি। জনরব কে রটিয়াছে খুঁজিয়া পাওয়া শক্ত এবং ইহার মধ্যে যত অত্যুক্তি আছে, তাহার জন্য আমাকেও দায়ী করা চলে না।
৩. জার্মান দেশে আজও এমন-সব পণ্ডিত আছেন, যাঁদের পাণ্ডিত্য ল্যাটিন ভাষাতেই লিপিবদ্ধ হয়, কিন্তু তার কারণ স্বতন্ত্র। শুনতে পাই সে জাতির কোনো কোনো পণ্ডিত স্বভাষায় লিখলে সে লেখা এত জড়ানো হয় যে, তাঁরা নিজেই তা পড়তে পারেন না, অন্যের পরে কা কথা। — প্রমথ চৌধুরী : বাংলার ভবিষ্যৎ
সাধু রূপ: জার্মান দেশে অদ্যাপিও এমন-সব পণ্ডিত আছেন, যাঁহাদের পাণ্ডিত্য লাটিন ভাষাতেই লিপিবদ্ধ হয়, কিন্তু তাহার কারণ স্বতন্ত্র। শুনিতে পাই সেই জাতির কোনো কোনো পণ্ডিত স্বভাষায় লিখিলে সেই লেখা এত জড়ানো হয় যে, তাঁহারা নিজেই তাহা পড়িতে পারেন না, অন্যের পরে কা কথা।
Sadhu Bhasha Cholit Bhasha-Sadhu Bhasha – Cholit Bhasha – Sadhu Bhasa – Cholit Bhasa – Chalita Bhasa – sadhu bhasa o chalet bhasa -sadhu-bhasha-cholit-bhasha-Sadhu Bhasha – Cholit Bhasha – Sadhu Bhasa – Cholit Bhasa – Chalita Bhasa – sadhu bhasa o chalet bhasa -sadhu-bhasha-cholit-bhasha-Sadhu Bhasha – Cholit Bhasha – Sadhu Bhasa – Cholit Bhasa – Chalita Bhasa – sadhu bhasa o chalet bhasa -sadhu-bhasha-cholit-bhasha-Sadhu Bhasha – Cholit Bhasha – Sadhu Bhasa – Cholit Bhasa – Chalita Bhasa – sadhu bhasa o chalet bhasa -sadhu-bhasha-cholit-bhasha