ভাবসম্প্রসারণ
(Bhabsamprasaran)
ভাবসম্প্রসারণ | Vab Somprosaron in Bengali Grammar Notes to each chapter is provided in the list so that you can easily browse throughout different chapter ভাবসম্প্রসারণ | Vab Somprosaron in Bengali Grammar and select needs one.
ভাবের ঐবর্ষ’ সংহত ও নির্ভার হয়ে কবিতার বা গদ্যের মিত আয়তনে প্রচ্ছন্ন থাকতে পারে। রংপক, সংকেত বা নির্দেশক শব্দগুচ্ছের আবরণে অন্তলীন ভাবের স্বরূপটি ঢাকা থাকে বলে তাকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে অন্বেষণ করা জরুরী হয়ে ওঠে। প্রায়ই দেখা যায় মানবিক মহৎ কোনো আদর্শ বা আচরণ, উদার বা সংকীর্ণ বিশেষ চরিত্র-লক্ষণ, নীতি-বিরোধী ত্রুটি, উজ্জ্বল কোনো অনুপ্রাণনাকে কবি বা লেখকেরা তাঁদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ করেছেন । আর, প্রকাশের ক্ষেত্রে অননুসরণ করেছেন বিবৃতি বা তুলনার মাধ্যমে প্রগাঢ় গাম্ভীর্যে, বা প্রদীপ্ত পরিহাসের রীতিকে। এ সবকিছ, মনে রেখে ভাবের উন্মোচন ও বিস্তৃতি- করণ নামক যে-কাজটি করা হয় তাকে বলে ভাবসম্প্রসারণ (Amplification)।
তুলনীয় দৃষ্টিতে বিচার করলে বোঝা যাবে, ভাবের স্বয়ং-সম্পূর্ণ সংক্ষিপ্ত রূপায়ণই সংক্ষিপ্তসার, কিন্তু ভাবের সুসঙ্গত সার্থক প্রসারণই ভাবসম্প্রসারণ। উভয়ের লিখন-চর্চা সম্পর্ণে বিপরীতধর্মী। ভাবের প্রসারণটি সম্যক ও সম্পূর্ণ করতে কয়েকটি লিখন-বিধি মেনে চলতে হয়:
অ) উদ্ধৃত অংশের সার্থক শব্দগুচ্ছ থেকে ভাবটি নির্ণয় করে সেটি প্রকৃতপক্ষে কোন অর্থ নির্দেশ করছে তা বুঝে নিতে হয়। অর্থাৎ বক্তব্যের ভাবের সঙ্গে ভাবের অভিমুখিতাকে মিলিয়ে বিচার করলে পাওয়া যায় প্রকৃত ও যথার্থ ভাব ।
আ) রচনার যুক্তিসুত্রগুলি বিশেষ অবহিত হয়ে স্বচ্ছ-সহজ ভাষায় প্রসারিত করার রীতি গ্রহণ করতে হয় ৷
ই) প্রসারণের প্রয়োজনে তুলনীয় কিন্তু নির্বাচিত প্রসঙ্গের সংযোজনে লেখার গরত্বে বৃদ্ধি করে ; সে-সব প্রসঙ্গ ছড়ানো আছে মহৎ ব্যক্তিদের জীবনীতে, মানুষের প্রাত্যহিক বা আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া-কর্মে।
ঈ) প্রবাদ-প্রবচনের সঠিক ব্যবহার লেখার তীক্ষতা বৃদ্ধি করে বলে তা-ও গ্রহণযোগ্য ।
উ) কাজটি যেহেতু মূল ভাবের বিস্তার সেহেতু কবির বা লেখকের নামোল্লেখ একান্ত অনচিতের ব্যাপার ৷
ঊ) লেখার আয়তন হবে প্রদত্ত মাননির্ধারক সংখ্যা বা নম্বর অনুযায়ী । প্রসারণের ক্ষেত্রে যথেচ্ছ হওয়া বা পানরাবৃত্তি করা চলে না।
এই কথাগুলিকে বিশেষ মর্যাদা দিলে ভাবের গুটিপোকা আবরণ ছিন্ন করে প্রসারণের প্রজাপতি হতে পারে। ভাবসম্প্রসারণের কাজটি দৃষ্টান্ত ও যুক্তির সাহায্যে স্বাধীন বিন্যাসকর্ম’; তাই তাতে ব্যাখ্যার অনরূপে কবি বা লেখকের নাম বা প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যায় না। ‘ভাব-বিস্তার’, ‘ভাবার্থ-সম্প্রসারণ’, ‘মমার্থ’ বা মর্মসত্য প্রসারণ’ ইত্যাদি যে-নামই তাকে দেওয়া হোক না কেন, স্মরণ রাখতে হয় :
মুদ্রিতকে উন্মোচিত, সংকেতকে নির্ণীত করে তুলনীয় দৃষ্টান্ত ও প্রবাদ-প্রবচনের সাহায্যে স্বচ্ছ-সহজ ভাষায় ভাবের বিন্দুকে বিস্তার করাই ভাবসম্প্রসারণ ।
ভাবসম্প্রসারণ | Vab Somprosaron in Bengali Grammar
Here we have given detailed examples of ভাবসম্প্রসারণ | Vab Somprosaron in Bengali Grammar, You have to self-practice a lot to master the skill.
১॥ চেরাপুঞ্জির থেকে
একখানি মেঘ ধার দিতে পারো গোবি-সাহারার বুকে?
বিপরীতের চিত্রে ও চিহ্নে আকীর্ণ এই পৃথিবী। প্রাকৃতিক জগতে তাদের প্রত্যক্ষ বাস্তবতা অনস্বীকার্য’। প্রকৃতির কোনো শক্তিই এই বৈপরীত্যের সমন্বয় সাধন করতে পারে না। মৌসুমী বায়ুর গতি-প্রকৃতি পর্বত সন্নিহিত মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত ঘটায়। আবার তারই অভাব এশিয়ার গোবি ও আফ্রিকার সাহারাকে বৃষ্টিশন্যে অগ্নিতপ্ত মরুভূমি করে তোলে। মরভূমির নির্জল বালুকাময় রিক্ততা এবং পার্বত্য ভূখণ্ডের সজল মেঘ-প্রাচুর্য’ একান্তই প্রাকৃতিক ব্যাপার। নির্মম ঊষ্ণতা আর মমতাময় স্নিগ্ধতা নৈসর্গিক বিপরীত ও অসম প্রবণতার প্রতীক। একের প্রাচুর্যের একটি কণা দিয়ে অন্যের শূন্যতায় পূর্ণতার সামঞ্জস্য আনা অসম্ভব। কারণ, প্রকৃতি উদাসীন ; প্রকৃতি খেয়ালী ; প্রকৃতি চিন্তাশূন্যে ।
এই নিঃসম্পর্কের, এই নির্মম অসাম্যের দৃষ্টান্ত মানুষের জগতেও দুর্লভ নয়। বহু শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা মানব-সমাজে দেখা যায়, সংখ্যায় নগণ্য ব্যক্তির সঞ্চয়-ভাণ্ডার সম্পদে পরিপূর্ণ । এবং অবশিষ্ট অগণিতের নেই কোনো সঞ্চয়যোগ্য ভাণ্ডার ; তারা সম্পদহীন, রিক্তমাত্র। যারা প্রচুর্যের অধিকারী, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদশালী, তারা আরো অধিক সম্পদের পিছনে তৃষ্ণার হরিণকে নিত্য ধাবমান রাখে । সামাজিক সম্পদে সর্ব মানুষের সমানাধিকারকে অস্বীকার করে নিরন্তর শোষণের দ্বারা তাদের ঐশ্বর্য আকাশস্পর্শী হয়ে ওঠে। তারই অভাব অধিক মানষের চরম দারিদ্র্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই দারিদ্র্যের অগ্নিক্ষরা প্রসারিত ভূখণ্ডে প্রাচুর্যের করুণা বিন্দুমাত্র বর্ষিত হয় না । সাম্যের পথেই সমন্বয় অনসন্ধানযোগ্য হলেও সুকঠিন বৈপরিত্যকে মেলানো অসম্ভব হয়।
বৈপরিত্য তখন বৈষম্যের আকারে দেখা দেয়। এবং বৈষম্যের বিষবৃক্ষে যা ফলে তা অস্থিরতা ও অশান্তি, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ, সংঘর্ষ ও সংগ্রামের ফল। মানুষের ইতিহাস, তাই, রক্তের ইতিহাস, কান্নার ইতিহাস, মৃত্যুর ইতিহাস। শুধু ধনসম্পদে নয়, মানুষ যাকে সভ্যতা বলে, যা তার ক্রমবিকাশের নিদর্শন ও নির্ণায়ক, তার অনেক কিছুই অস্বস্তিকর বৈপরিত্যে আকীর্ণ। সমাজপ্রকৃতি, শিক্ষাদর্শ, স্বদেশচেতনা, সংস্কৃতিবোধ প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে বিপরীতের সন্ধান মেলে। সেই বিপরীতের আড়ালেও আছে শোষক-শোষিতের চিত্র। চিন্তা ও চেষ্টার উদ্ভাবিত আদর্শ দিয়ে তাদের সমন্বয় দেওয়া বারে বারে ব্যর্থ হয়। উত্তাপের ঘন আবরণের অতলে হারিয়ে যাওয়া স্বাদু জলের হ্রদ আর শস্যশ্যামল প্রান্তরকে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন জরুরী হতে পারে ; কিন্তু তার উত্তর নিহিত আছে ঘনবর্ষণের সম্ভাব্যতার। তাই, সমন্বয়ের স্পন্দিত আকাঙ্ক্ষা প্রশ্নের আকারেই থেকে যায় ৷
২॥ পুষ্প আপনার জন্য ফুটে না । পরের জন্য তোমার হৃদয়কুসুমকে প্রস্ফুটিত করিও ।
মানবিক সাফল্যের সার্থকতা একান্ত পারস্পরিক। বহু থেকে বিযুক্ত ব্যক্তির কর্ম যতই আশ্চর্য উজ্জ্বল হোক না কেন, লক্ষ্য ও অভিমূখিতার মানদণ্ডে তা নিষ্প্রভ হয়ে যায় । কেননা, প্রচেষ্টার সংচনা ও অর্জিত সাফল্য সেক্ষেত্রে সম্পর্কিত ব্যক্তির আত্মসীমায় আবদ্ধ থাকে মাত্র। বহুর সঙ্গে অভিন্ন হয়ে আদর্শ’ রূপে মল্যায়িত হওয়ার প্রসারিত লক্ষণ তার মধ্যে নেই।
মানুষের দুটি সত্তা আছে । একটিকে বলে ‘আমি’ অর্থাৎ ব্যক্তি নিজে ; অন্যটি ‘আমরা’ অর্থাৎ সমাজ। পৃথিবীতে মানুষের জন্য দৃশ্যেত একক। নবজাত নিঃসঙ্গ নগ্ন যে-শিশু একদিন ব্যক্তি হয়ে ওঠে, জন্মানোর অব্যবহিত কালপর্বে সে তার দেহের আবরণযোগ্য বস্ত্র আর ক্ষুধার নিবারণযোগ্য খাদ্য পায়। সে-বস্ত্র সমাজের হাতে বোনা ৷ সে-খাদ্য সমাজের হাতে বানানো। যে ভাষা ও সংস্কৃতির উপাদান নিয়ে সে তার জীবন গড়ে তোলে, সে সবই পরিবৃত বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী থেকে পাওয়া। সমাজের প্রসারিত ভূখণ্ডে তার ক্রমবিকাশ আমত্যু অব্যাহত থাকে । সমাজ থেকে গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের ঋণশোধের ব্যাপারটাও থাকে তার গুরত্বপূর্ণ দায়িত্বের আকারে । মানষের ক্রিয়াকর্মের সাফল্যকে সমাজ-সম্পর্কিত করে তোলাই ব্যক্তির বিস্তার, ব্যক্তির উত্তরণ। সমাজ-বিচ্ছিন্ন মানুষ নিঃসঙ্গ ও অযুক্ত, তার সাফল্যও আত্মমুখী, তার অভীপ্সাও স্বার্থ-সংকীর্ণ। সে একক, সে ক্ষুদ্র, সে খণ্ডিত। তার অবদানের সৌন্দর্য আবেদনের মূল্যায়ন-লাভে বঞ্চিত। নিজের স্বরূপ ও সাফল্যকে সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত করে অভিব্যক্তি দেওয়ার মধ্যে আছে মানবিক অস্তিত্বের পরম সার্থকতা। তাই, সমষ্টির সত্তায় ব্যক্তিসত্তার বিস্তৃতি কাম্য। দেশে-দেশে যুগে যুগে যে-সব মানষ তাঁদের কৃতিত্ব ও কীর্তি’র জন্য বন্দিত হয়েছেন, সে-সব মানষের সহজাত প্রতিভা, জ্ঞান, শিক্ষা প্রভৃতি তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থপূরণের সম্পদ ও উৎস হয়ে ওঠেনি। বৃহত্তর মানবসমাজের হাতে সেগুলি তাঁরা অর্পণ করে গেছেন । সমাজই হয়েছে তাদের উজ্জ্বল অংশীদার। দেশের অন্ধকারে আলো নেমেছে, শুকতা পেয়েছে স্রোত। দেশ এগিয়ে গেছে । ব্যক্তির মাটিতে বর্ধিত বৃক্ষের বিকাশ তখনই সার্থক, যখন তার পুষ্পিত পূর্ণতা সমাজের আকাশমুখী হয় ।
৩॥ সে লড়াই ঈশ্বরের বিরদ্ধে লড়াই,
যে যুদ্ধে ভাইকে মারে ভাই ।
প্রকৃতির মত চিত্রল বা পশুর মত পূর্বনির্ধারিত জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে পথিবীতে মানুষের আবির্ভাব ঘটেনি । নিরুত্তর অসহায়তা নিয়ে সে জন্মেছে। কিন্তু বিপন্ন অবস্থাকে সে মানলো না ৷ প্রকৃতির সমস্ত বৈধ নীতির বিরোধিতা করে চিহ্নিত করল তার বিদ্রোহ। যা অমানবিক, মানুষের প্রতিকূল, একান্ত জৈবিক তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের নাম মনুষ্যত্ব। মানুষ, তাই, আজন্ম সংগ্রামী। আত্মরক্ষা ও আত্মবিকাশের জন্য তার আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক যুদ্ধের বিরতি নেই। যুদ্ধ তাকে দিয়েছে উদ্ধাতনের যোগ্য মানবিক মহিমা। যাকে সভ্যতা বলা হয় তার ক্রমবিকাশমুখী যাত্রাও শীতল যদ্ধাবস্থা তৈরী করেছে। আকৃত সমাজের মধ্যে রক্তলোলুপ বৈষম্যের দৈত্য যখন পূষ্ট ও বর্ধিত হয়েছে, তখন সর্বজনীন কল্যাণের জন্য মানুষকে তুলে নিতে হয়েছে সংগ্রামের তীক্ষ হাতিয়ার। সংগ্রামই জীবন। সংগ্রামই অস্তিত্ব রক্ষা করে, অস্তিত্বের উজ্জীবন ঘটায়। একটি বৃহত্তর মানবিক আদর্শ রক্ষার জন্য সেই যুদ্ধে মানবিক পরিণতির সংকেত বহন করে । তবু পরবর্তী কালের এক শ্রেণীর মানুষের কাছে ইতিহাসের নজির ধ্বংস-বুদ্ধির অন্যপথ নির্বাচনের সহায়ক হয় । দেশপ্রেম ও জাতিপ্রেমের মুখোশ পরে তারা মানবিকতার প্রতিষ্ঠিত আদর্শগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় ৷ ধনলিপ্সা, ভূমিলোভ, প্রভুত্ব বিস্তার প্রভৃতি অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রেরণাগগুলি নির্বিচার মানবহত্যায় তাদের সক্রিয় করে। মানুষে-মানুষে গড়ে ওঠা সম্পর্কের পারষ্পরিকতা থেকে মননুষ্যত্বের যে অভিযান সূচিত হয়েছিল ঐতিহাসিক যুগের সূচনা থেকে, তার বহতা ধারা রক্তস্রোতে রূপান্তরিত হয় । ক্ষমতার দম্ভ ও নির্লজ্জ লোভ সম্মিলিত আকারে নির্মমভাবে হনন করে যুগ-যুগান্তর ধরে গড়ে ওঠা মানবিক দিব্য আদর্শগুলিকে, সত্যের অনলংকৃত স্বরূপকে। ঘৃণ্য ইচ্ছায় প্রমত্ত হয়ে নিরপরাধ মানুষেকে হত্যা তো ভ্রাতৃহত্যা ; আর ভ্রাতৃহত্যার দ্বারা ঐশী তুলনা-দীপ্ত মানবিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে সংগ্রামটাই চিহ্নিত হয়ে যায়। যে-সংগ্রামের মাধ্যমে একদিন মানুষে তার মনুষ্যত্বকে অর্জিত মর্যাদা দিয়েছিল, আজ তারই মৃত্যু নিশ্চিত করে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে পিছু ফেরার ভূমিকা নিতে মানুষ কত আগ্রহী ।
৪॥ শুধু পড়াশোনাতে কিছু হয় না। বাজনার বোল লোকে বেশ মুখস্থ বলতে পারে; হাতে আনা বড় শক্ত ৷৷
শিখন মানবজীবনের অঙ্গ, তার নিত্য ও নিয়ামক সঙ্গী। এক মানুষের শিখন অন্য মাননুষের মধ্যে সঞ্চালনের দ্বারা সভ্যতার অবারিত গতিশীলতা সম্ভব হয়েছে। ব্যক্তির সর্বাঙ্গীণ বিকাশের মুলেও অর্জিত বিদ্যার প্রয়োগ বা সঞ্চালনের প্রশ্নটি নিহিত। প্রতিষ্ঠান বা পরিবেশ থেকে শেখার যোগ্য যে বিদ্যা পাওয়া যায়, সে-বিদ্যা বৈচিত্র্যে দীপ্ত ও শারীরিক-মানসিক পুষ্টির শক্তিবহ হতে পারে। যে-টা পাওয়া যায় না তা হল হজম করার শক্তি। সেটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তি-সামর্থ্যের বিষয় । বিদ্যার স্বীকৃতিই নয়, সাঙ্গীকরণই শিক্ষার স্তরক্রমের প্রথম কথা। আরোপিত শিক্ষা একান্ত নির্জীব, বিশুষ্ক ও অনুৎপাদনধর্মী হতে বাধ্য। অপরিণত মনও সহজাত প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রিত বিকাশ ঘটায় না, বুন্ধিকে দেয় না আকাঙ্ক্ষিত স্ফূর্তি। সংগত শক্তি আর আরোহী ধারণার অভাব বিদ্যাকে প্রত্যয়ী উদ্ভাবনের অনুমিত পুষ্পায়ন দিতে ব্যর্থ হয় । তাছাড়া সামাজিক ও মানসিক ব্যবস্থায় সেই গ্রহণের শক্তি বাধা পেতে পারে। এইসব বিপ্রতীপ অবস্থাগুলি অতিক্রম করার পরও থাকে অন্য সমস্যা, যাকে প্রয়োগ-সমস্যা নামে অভিহিত করা যায়। মানবিক শক্তির বৃহৎ বৃহৎ উদ্যমশীলতাই বিদ্যাকে প্রবৃত্তির সঙ্গে অভিন্ন প্রাণতা দেয়। তার অভিসেচনক্রিয়ার আনুক্রমিকতা অমৃত বিদ্যার নিত্য- নীরস মরুময়তা নিয়ে আসে বৃক্ষায়নের শ্যামল সামর্থ্য। জীবনে চালনার অভাব পুঁথির বিদ্যাকে প্রাণে আয়ত্ত করতে দেয় না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তখন আদর্শ স্মৃতিশক্তির উৎকর্ষিত প্রতিরূপতায় দৃশ্য হয় মাত্র, কিন্তু প্রয়োগ-সাফল্যে তা প্রমাণিত হয় না। শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ককে বিদ্যার স্বর্ণ শস্যের ভাণ্ডার করে তোলাকে জীবন কখনো ক্ষমা করে না। তার জৈবিক বিস্তারের জরুরী প্রয়োজন অবশ্য মান্য । বিদ্যার শ্রেণী-বিভাগে শিক্ষার্থীর শেখা বিদ্যা যে কোনো বর্ণে পরিচিত হোক না কেন, পাওয়াটাকে গ্রহণ ও ব্যবহার করাই বড় কথা। স্বভাবের সঙ্গে জীবনের অন্তঃপ্রকৃতির সঙ্গে বহিঃপ্রকৃতির সামঞ্জস্য দিতে পারলে বোলের স্মৃতিচর্চার মোহ ভেঙে শিক্ষা লাভ করবে অঙ্কুরিত পল্লবিত ও ফলবান হওয়ার সামর্থ্য। সেই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা সেই বিদ্যাই প্রবর্তক বিদ্যা ৷
৫॥ দঃখ যে পাপের ফল তাহা কে বলিল, পূণ্যের ফলও হইতে পারে। কত ধর্মাত্মা আজীবন দুঃখে কাটাইয়া গিয়াছেন ।
একমাত্র মানুষের দুঃখবোধ আছে এবং মানুষমাত্রেরই দুঃখ আছে। সমস্ত প্রাকৃতিক ও জীবজগতে দুঃখ অনেকখানি নিষ্ক্রিয়, অস্পষ্ট, প্রমাণসাপেক্ষ। দুঃখের দীপ্তিতে মানুষের যথার্থ’ পরিচয় মেলে। দঃখের অন্য এক যমজ সহোদর আছে, তার নাম সুখ । সুখের স্বরূপগত বর্ণাঢ্যতা মানষের সত্য-পরিচয়কে আবৃত করে, প্রচ্ছন্নতার প্রবণতাকে দের প্রবর্তকের ভূমিকা । আচ্ছন্ন সত্যের নিবারণ মুক্তির ক্ষমতা দঃখের হাতে। দঃখে শুধু উন্মোচন ঘটায় না, তার বাস্তব মূল্যায়নও দেয় ।
প্রচলিত ধারণায়, পূর্বকৃত মানবিক অপকর্মের ফলশ্রুতিই দঃখ । সামাজিক অর্থে, মানবিক মানদণ্ডে যা অবৈধ বলে বিবেচিত, তারই অনুসরণে নেমে আসে পুঞ্জীভূত দুঃখের কালো ছায়া। প্রাত্যহিতকায় ধূসর মানুষ অভিশপ্ত সেই দঃখের যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়। আর্ত কান্নায় প্রতিকারের সংশোধনী পথ খোঁজে ; জীবনের সঙ্গে দুঃখের অভিযোজনে তারা সক্রিয় হয় না। দুঃখ সেখানে নিষ্ক্রিয় নয় অধিক দুঃখের প্রজক এবং সুখের বিপরীত মাত্র। কিন্তু সুখের অনবস্থায় প্রত্যয়ী যাঁরা, সুখের উত্তেজক ঐহিক শয্যায় তাঁরা দঃখকে নির্বাচিত সঙ্গীর মর্যাদা দেন, তাকেই বিশ্বস্ত নিরীক্ষকের অধিকারী সাথী করে সত্যানুসন্ধানে বহির্গত হন। এই স্বেচ্ছাবৃত দুঃখের মাধ্যমে জীবনের, জগতের, জগতাতীতের পরম সত্যরূপ তাঁদের কাছে ভাস্বর হয়ে ওঠে। অর্জিত জ্ঞান সর্বমানবিক কল্যাণে নিঃশেষে প্রদত্ত হয়। জীবনের সেই মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টান্ত আছে ইতিহাসে। বুদ্ধ, যিশু,চৈতন্য, মহম্মদ প্রভৃতি মনীষী, ব্যর্থতা, নৈরাশ্য ও ঐহিক যন্ত্রণাজাত দুঃখকে আদর্শটিরত উত্তরণ দিতে মানুষকে পরামর্শ দিয়েছেন; কেননা, মানবিক অবিকলতা তার দ্বারাই আকৃত হয় । দুঃখ থেকে পলায়ন নয়, দুঃখের সংশোধন নয়, দঃখের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, দুঃখ কে নির্ভীকভাবে বরণই এক আশ্চর্য আদর্শ’। দুঃখ এখানে সক্রিয়, সুখের সঙ্গে অভিন্ন এক দিব্য সুখের প্রজক। দুঃখকে, তাই, পাপের পরিণতি নয়, পূণ্যের ফলশ্রুতিও বলা যায় ॥
৬॥ তেলা মাথায় তেল দেওয়া মনুষ্যজাতির রোগ ।
জার্মান দার্শনিক সোপেনহাওয়ার যদিও আমাদের জানিয়েছিলেন যে মানুষে স্বার্থবুদ্ধিসম্পন্ন ও নীচ মনোবৃত্তির, তবু পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতাই মাননুষের এই অবচরিত্রের বিকল্প পরিচিত্র আমাদের কাছে তুলে ধরে না। জীবনের সমতল প্রাত্যহিকতায় সম্পর্কের রেখা ধরে, মানুষের সামাজিক স্বভাবের বৈচিত্র্য ধরা পড়ে। আর্থিক, শারীরিক, প্রতিপত্তিগত ক্ষমতায় যাঁরা ঈর্ষিত অধিকারী তাঁদের জীবনযাপনের ও গতিবিধির ভূমিকে ঘিরে কিছু আকাঙ্ক্ষী মানুষের স্তুতির মর্মর শোনা যাবে। স্তুতির যথৌচিত্য বা বিশেষ প্রয়োজনগত তাৎক্ষণিকতা নিয়ে স্তাবক সম্প্রদায় চিন্তিত নয়, ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য-সিদ্ধির সম্পূরক পথটি বিস্তৃত রাখাই তাদের কাছে প্রমিত প্রাসঙ্গিকতার ব্যাপার। সেইজন্য, পরিতুষ্টির আয়োজনে থাকে অহেতুক প্রাচুর্য, সীমাতিরেক অপচয়ের উপকরণ। ক্ষুধা, রোগ, আচ্ছাদন, আবাসন প্রভৃতি থেকে বঞ্চিত দঃখদীর্ণ’ সংখ্যাগুরু মানুষেরা, সেক্ষেত্রে, নিষ্প্রতিকার যন্ত্রণার দ্বৈপায়ন জীবনই বেছে নেয়। উচ্চ সঙ্গতিসম্পন্ন মানুষের উদারতার আকস্মিক সেচন বা বর্ষণ তাদের জীবনে কোনো সিক্ত শ্যামলিমা নিয়ে আসে না। বৈষম্যের জীবন অভিশপ্ত, মানুষের চারিত্রিক অবনয়নকে নিশ্চিত করে এবং দেশকে দেয় অনিষ্ট ও অপক্রিয়াশীল ছায়াম,র্তি’র সুদীর্ঘ এক মিছিল। এই বৈষম্যের জীবনই স্তুতি-নিবন্ধ মানুষদের আচরণগত নির্লজ্জতা, সুবিধাবাদ ও স্বার্থপরতার দৃষ্টান্ত করে তোলে এবং আদর্শহীন, বিভেদী ও সংকীর্ণ মানবঞ্জে দেশকে পূর্ণ করে। দরিদ্র ও স্তাবক দুজনেই জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন চিত্র প্রত্যক্ষ করায়। দরিদ্রের ক্ষেত্রে যেটি অভাবজাত, স্তাবকদের প্রসঙ্গে সেটি স্বভাবজাত। সমবণ্টন দারিদ্র্য ঘোচাতে পারে, স্তাবকতার লুপ্তি ঘটাতে পারে। আদর্শের সঞ্চালনের আশ্রয় নিতে হবে। যতদিন সমাজ মানসিকতার গভীর পরিবর্তন না আসবে, ততদিন ব্যক্তি তার তৈলভাণ্ডের একাংশ তেল তেলা মাথায় চর্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখবে এবং তুলনীয় প্রবাদগুলিও ভুলবে না : ধনীতে ধনীতে মেলা, নির্ধনের মর্তমান কলা, অথবা ধনীর মাথায় ধর ছাতি, নির্ধনের মাথায় মার লাখি ৷
৭॥ অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানষকে যথার্থ চেনা যায়। কারণ মানুষ ব্যয় করে বাঁধা নিয়ম অনুসারে, অপব্যয় করে নিজের খেয়ালে ।
মানুষের জীবনের ছোট অংশটাই প্রাত্যহিক চাহিদা পূরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। সামাজিক, পারিবারিক, এমন কি অংশত ব্যক্তিগত ভোগের বিচিত্র গতিবিধিকে সে সামর্থ্যের সেতুসংযোগ দেয়। এই নিয়ম তার অবশ্য মান্য । এই নিয়ম মেনে চলে বলে তার স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য হীনতার মধ্যে আনুগত্যের এক মসৃণতা, সুখ ও সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। বলা বাহুল্য যে, জীবনের এই পরিচয়টি মানষের আরোপিত প্রাত্যহিকতায় সহজ দৃশ্য। সামান্যতায় ব্যস্ততা অভ্যাসের চেনা অনবর্তন মাত্র। দিন থেকে রাত, রাত থেকে দিন জীবনযাপনের একই নাগরদোলায় আবর্তিত হওয়ার চর্বি চাব নিকতার মধ্যে আত্মরক্ষা, বংশরক্ষা ও প্রজননের পশ, সুলভ ক্রিয়াটি অনেকখানি আভাসিত হয়। মানুষের যথার্থ লাক্ষণিক পরিচয়, তার অন্তর্নিহিত সত্যরূপ, প্রচ্ছন্নই থেকে যায়। সেটা দ্বৈধ সত্তার মানষ মেনে নিতে পারে না।
তাই, স্বভাবের ব্যয় বা প্রকাশ নামক ব্যাপারটি মানুষ অন্যভাবে ঘটায়। প্রাণীজগতের যা নেই এবং যার অভাব তাদের কখনো বিপন্ন করে না, বিচ্ছিন্নতায় ছড়িয়ে দেয় না, সেই জিনিসটি মানুষের জীবনে সম্পদের আকারে আছে। তা হল মন। মনই মানুষকে ভাবায় ও ভাসায়, আবার মনই দেয় স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ ‘সেই অমিত-মানব সুখের কাঙাল নয়, দঃখ-ভীর, নয়। নিত্য প্রয়োজনের অবিচল কক্ষ থেকে মনই নিয়ে যায় প্রসারিত চৈতন্যের পরোভূমিতে। তার অভিগমনের পথ ব্যক্তির সহজাত স্বভাব ও মননের দ্বারা নির্ণিত হয়। ‘জোটে যদি মোট একটি পয়সা, খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি ; দুটি যদি জোটে তবে অর্ধেকে ফুল কিনে নিও, হে অনুরাগী”। –এই কবি-নির্দেশেই আছে মানুষের দুটি পরিচয়ের স্বীকৃতি । অতি- পার্থিবতার অচলায়তনে আবদ্ধদের চোখে এই ব্যয় অপব্যয়ের সীমায় ধরা পড়ে। কিন্তু খেয়ালি মানসতায় মনুষ্যত্ব নতুন মূল্যে পায়। বিশ্বের সমস্ত শিল্পসৃষ্টিই তো অকাজের কাজ, আলস্যের সহস্র সঞ্চয়। অপব্যয়ই মানষের উত্তরণশীল প্রতিরূপের নির্ণায়ক ও নির্মাতা ৷
৮॥ বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু ;
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শধু, দই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপর
একটি শিশির বিন্দু।
‘সৌন্দর্য -পিপাসা মনুষ্যত্বের অঙ্গ’। একমাত্র মানুষেরই চিত্তে আছে সেই আশ্চর্য তৃষ্ণা। প্রকৃতি তার দুর্গম গিরি আর দুস্তর পারবার দেখিয়ে ভয়ার্ত করেছে ; তার হিংস্র প্রাণীকুলের মাধ্যমে ভয়ঙ্করতা প্রকাশ করেছে, মাথার উপরে ঝড় ও বজ্রের খড়গ পায়ের নীচে মৃত্যুর কবরের সত্য জানিয়ে বিভ্রান্ত করেছে। তবু মানুষ প্রকৃতির এই দুর্বার আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছে, আবার তার অম্লান সৌন্দর্যকেও স্বীকৃতি জানিয়েছে । প্রতিবাদ ও স্বীকৃতি দুটিই তার মানবিকতার অভিন্ন সত্তা ।
তাই, স্বীকৃতির সৌন্দর্য’ অন্বেষণে তার নিরবিচ্ছিন্ন অভিযান অব্যাহত। প্রাকৃতিক যা-কিছু সুন্দর ও বিস্ময়াবহ, চিত্রিত ও চৈতালিক, বৃহৎ ও মহৎ তারই আকর্ষণে মানুষ সংকীর্ণ গৃহকোণ ক্ষণকালের জন্য ত্যাগ করে বহির্গত হয়। সমুদ্রের স্বাদ আর পর্বতের বিস্ময় চৈতন্যে বহন করে নিয়ে আসার বিনিময়ে মানুষ ব্যয় করে পুঞ্জীত অর্থ ও সঞ্চিত শক্তি। কিন্তু গৃহের কাছাকাছি ধানের শিষের উপর সূর্যেরশ্মি-প্রতিফলিত একটি শিশির বিন্দুর মধ্যে সৌন্দর্যের যে-নিটোল স্বরূপটি বিধৃত হয়, তা সেইসব দুরাভিমুখী সৌন্দর্য—অভীপ্সু মানুষদের চির-অচেনা থেকে যায় । সিন্ধুর স্বাদ পায় না, সিদ্ধতেই বিন্দর সহজ স্বাদ পেয়ে ধন্য হয় । আসলে, সৌন্দর্ষের সত্য বাহিরের বস্তুকেন্দ্রিক উপকরণে মাত্র নিহিত থাকে না, মানুষের হার্দ্য প্রাণ-চৈতন্যে উপলব্ধির সামর্থ্য আকারেও থাকে। বস্তুকে সুন্দর বলে বিশেষিত করার নেপথ্যে মনের মাধুরী মেশানোর প্রতোৎসারিক কারুকর্মে’র ভূমিকাই প্রাধান্য পায়। যাদের মনে সেই সহজাত সৌন্দর্য শক্তির বিস্তার নেই, সৌন্দর্য-স্পৃহাকে উৎকেন্দ্রিক দূরেযাত্রার সঙ্গে গ্রথিত করা তাদের কাম্য হয়। মুক্তির অন্বেষণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, গৃহজীবন পরিত্যাগ করে গুহাস্থিত নিঃসঙ্গ নির্জন জীবনকে যাঁরা সাধনার অব্যবহিত ভূমি ভেবেছেন তাঁদের দৃষ্টি পার্থিব জীবনের মাধ্যমে মুক্তির প্রসারিত পথটি এড়িয়ে গেছে। সৌন্দর্য বা ঈশ্বর উভয়কে অঙ্গীভূত করার প্রশ্নে ব্যক্তির উত্তরণযোগ্য মানসিক সামর্থ্যের সক্রিয়তাটি গুরত্বপূর্ণ। পরিবর্তিত পরিবেশে নেই তার যথার্থ প্রমাণ্য
৯॥ জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে সে জাতির নাম মানুষজাতি;
এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত ; একই রবি-শশী মোদের সাথী।
বিশাল পৃথিবীর অধিবাসী অসংখ্য মানুষ। তার সংখ্যাও দিনে দিনে ক্রমবর্ধমান। পাথিবীর প্রকৃতিও অন্য প্রাণীজগৎ থেকে মানুষ তার দেহ-মানসিক পার্থক্যের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দৃশ্যমান। মানুষে-মানুষে সাদৃশ্যের সামান্যতাই বিশাল মানবগোষ্ঠী মানবজাতিতে আকৃত। প্রকৃতির অভেদ্য নির্মমতা, অন্যপ্রাণীর উদ্ধত হিংস্রতা মানষকে নিয়মিত সংগ্রামী করেছে। মানবিক স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমিকতা বজায় রাখার জন্য বিরুদ্ধতার প্রতিরোধই মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্যকে অমেয় মহিমা দিয়েছে। পৃথিবীর অণু থেকে জাত ও উৎপাদিত খাদ্যে জীবিত বলে পৃথিবী তাদের পরমা মাতৃরূপা, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক’ সহোদর ভ্রাতৃত্বের। একই সূর্য’ থেকে তারা পেয়েছে উত্তাপের অগ্নিকণা, সৃষ্টির সামর্থ্য। আবার একই চন্দ্র তিমিরাচ্ছন্ন জীবনে দিয়েছে আলোর বন্যা, মধুক্ষরা আনন্দ। প্রতিরোধ-প্রাপ্তিতে, স্বাতন্ত্র্যে সামান্যতায় মানুষের জাতিগত পরিচয় দীপ্যমান ।
কিন্তু প্রামাণিকতার প্রকরণকে মানুষ অনবচ্ছেদ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিভাজিত ভূখণ্ড, ধর্ম, বর্ণ’, অর্থ’, বংশ ও সংস্কৃতির বাহুফলক তীক্ষাস্ত্র মানুষকে পরস্পরবিরোধী এবং নিম্নত আক্রমী শ্রেণীতে রূপান্তরিত করেছে। এই বৈষম্য নিয়ে এসেছে ঘৃণা ও অবিচার, পীড়ন ও প্রাধান্য, শোষণ ও সর্বনাশ। পৃথিবীতে প্রবাহিত হয়েছে কত কান্নার স্রোত, কত রক্তের নদী। উম্মত্ত অহংকার আর হিংস্র স্বার্থ মানবতার অলিখিত দিব্য মূল্যকে দলিত করে চলেছে। আজ মানবিক আদর্শে উদ্ভাসিত মানুষেরা বুঝে উঠতে পারছে না এর পরিণতি। কেননা রক্তের বিনিময়ে রক্ত আর প্রতিবাদ দিয়ে এই ধ্বংসমুখী প্রবণতার বিরতি ঘটাতে সভ্যতা পরাজিত হয়েছে। যে-বিসংগত জ্ঞান থেকে অনৈক্যের, বিচ্ছিন্নতার, প্রতিতুলনার মানসতা জন্ম নিয়েছে সেই জ্ঞানের উচ্ছেদই একান্ত জরুরী। সভ্যতার সূচনায় নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সূর্য চন্দ্র কৃতার্থ” যে-মানবগোষ্ঠী প্রতিরোধ ও প্রাপ্তির মাধ্যমে তাদের জাতি-ঐক্যের সংকল্প নিয়েছিল, সেই সংকল্পই প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজন। তাই নতুন করে আজ উচ্চারণের দিন এসেছে : ‘জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে সে জাতির নাম মানষে জাতি।’
১০॥ পরের মুখে শেখা বুলি পাখীর মত কেন বলিস ?
পরের ভঙ্গী নকল করে নটের মত কেন চলিস?
তোর নিজস্ব সর্বাঙ্গে তোর দিলেন ধাতা আপন হাতে,
মুছে সেটুকু বাজে হলি, গৌরব কি বাড়ল তাতে?
আপনার যে ভেঙে-চুরে গড়তে চায় পরের ছাঁচে,
অলীক, ফাঁকি, মেকি সে জন, নামটা তার কদিন বাঁচে?
পরের চুরি ছেড়ে দিয়ে আপন মাঝে ডুবে যা রে,
খাঁটি ধন যা সেথায় পাবি, আর কোথাও পাবি না রে।
অনুকরণ মাত্রেই পরানুকরণ । অনুকরণই জীব-জীবনের অঙ্গ। জীবনযাত্রাকে অবাধ করে তোলার জন্য তারই মাধ্যমে জীবনকে প্রস্তুতি দিতে হয়। তখন অনুকরণের প্রত্যক্ষ প্রসঙ্গ হিসেবে দেখা যায় পিতামাতাকে বা সগোত্রীয় । সন্নিহিত অন্যকে । অন্য প্রাণীরা যে-জীবন যাপন করে সেই মাত্র-জৈবিক জীবনের আবশ্যিক শিখন-বিদ্যা সংখ্যাগণ্য। অনুসরণেই তাদের পাঠের সমাপ্তি। ঠিক সেই পর্যায় থেকে নিষ্প্রয়োজনীয় অনুসরণের খোলস ফেলে নিঃসঙ্গ মানষকে বেরিয়ে আসতে হয়। পৃথিবীর বুকে, যে-পৃথিবী বিশাল ও বিভ্রমী, সহজ ও সর্পিল। নৈসর্গিক ও মানবিক দুস্তর ঢেউগুলো তাকে পার হতে হবে; স্বরূপের অবিকলতা নির্মাণে ব্যয় করতে হবে প্রতিটি সচেতন মুহূর্ত । এবার অনুকরণের সহজপাঠ নয়, স্বানুকরণের জটিল পাঠই জরুরী। কিন্তু ব্যক্তির ব্যক্তিতার ঐকাত্ম্য সম্পর্কে যে সচেতন সে অনুকরণের পারম্পর্যে’ই নিজের ছায়া-জীবন গড়ে তোলে। পরের ভাষা, পরের ভঙ্গী তার আচরণ ও উচ্চারণের জগৎকে নিয়ন্ত্রিত করে। এইসব প্রাতিভাসিক অসত্যের আড়ালে তার সহজাত শক্তি, সম্ভাবনা ও প্রতিভা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত লক্ষণ নিয়ে প্রচ্ছন্ন আছে, তাদের সে খুঁজে দেখে না। সে বোঝে না যে, নিজস্বের বিকাশে প্রকাশেই মানুষের আদর্শায়িত প্রতিষ্ঠা, নকলের বর্ণাঢ্যতায় তাৎক্ষণিকতার চমক থাকলেও, নেই চিরকালীনতা। বয়সের পরিণত পর্বে অনুকরণ গেয়ে যায় চৌর্যবৃত্তির অভিধা এবং শুধু, ব্যক্তি-জীবনের ক্ষেত্রে নয়, জাতীয় জীবনের ক্ষেত্রে এই সংক্রামক ব্যাধি স্বদেশের অবনয়নকে নিশ্চিত করে। আহারে-বিহারে, চিন্তায়-অনুধ্যানে, চর্চার-চর্যায় জাতির সংগঠিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিন্নভিন্ন হয়। পরানুকরণে উচ্চকণ্ঠ বেয়াব্রুতা ব্যক্তি ও সমাজ দলটিকেই বিচ্যুত আদর্শের অন্ধকারে ঠেলে দেয়। ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্যের সনিষ্ঠ অভিব্যক্তিকে গতিশীল করাই ব্যক্তির বাধ্য কাম্য। স্বানুকরণের আত্মনির্মিতি সফল করে তুলতে হলে নিজেকে সমাজ বা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, অভিন্ন করে ভাবতে হয় । সেই ভাবনার সঙ্গে ব্যক্তির স্বতন্ত্র শক্তিগুলো অভিযোজিত হলে ব্যক্তির যথার্থ অবিকলতা আকৃত হয়; এবং ঐকাত্ম্য, মাত্র ঐকাত্ম্যই, তার জীবনকে গৌরবদীপ্ত মহিমা দেয় । প্রহাসিক পরানুকরণ নয়, সচেতন স্বানুকরণে প্রণোদিত হয়ে এবার জীবনকে দেখার পালা। সেই দেখাই মনুষ্যত্ব । সেই জানাই মনুষ্যত্ব । এ মনুষ্যত্ব সক্রিয় উত্তরণের ।
১১॥ টিকি মুণ্ডে চড়ি উঠি কহে ডগা নাড়ি ;
‘হাত-পা প্রত্যেক কাজে ভুল করে ভারি।’
হাত-পা কহিল হাসি, ‘হে অভ্রান্ত চুল,
কাজ করি আমরা যে, তাই করি ভুল।’
পৃথিবীতে একদল লোক আছে যারা নিজেরা কোন কাজ না করেও অন্যের সমস্ত কাজের নিন্দা করে বেড়ায়। এইসব লোক পরনিন্দা, পরচর্চা করে অমূল্য সময়ের অপচয়ই করে না আনন্দ লাভ করে । মজার ব্যাপার এই, এরা কিন্তু নিজেরা কোন কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে রাজী হয় না। এই কারণেই বিশ্বে রাজনীতিকের চেয়ে রাজনীতি-সমালোচকের, শিল্পী সাহিত্যিকদের তুলনায় শিল্পসাহিত্য সমালোচকদের, বিজ্ঞানীর তুলনায় বিজ্ঞান-বিষয়ে সমালোচকের সংখ্যা বেশী ।
প্রকৃতপক্ষে কাজ করতে গেলেই কিছ, ভুল হওয়া অসম্ভব নয়। বিশ্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সে রাজনীতিতে হোক, অর্থনীতির ক্ষেত্রে হোক, ধর্মের ক্ষেত্রে হোক, বিজ্ঞান বা কারিগরী ক্ষেত্রে হোক যাঁরা কর্মী বলে পরিচিত, তাঁরা জীবনে কিছু না কিছ, ভুল করেছেন, হয়ত তাঁদের কাছে স্বল্পপরিমাণে মানবসমাজের ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু এই ক্ষতিটুকু না হলেও তাঁরা পরবর্তী সময়ে সংশোধনজনিত-অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মহৎ কাজ করতে পারতেন না।
নিষ্কর্মা অলস ব্যক্তিরা চিন্তা করে না যে কাজ করতে গেলেই কিছ, ভুল হতে পারে। তাঁরা সমস্ত জীবন কর্মী মানুষের কাজের সমালোচনা করে সময় কাটিয়ে দেয়। কিন্তু প্রকৃত কর্মী ঐ নিন্দার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না, সুদৃঢ় চিত্তে নিজ নিজ কর্তব্য সম্পাদন করে যায়। কাজে তাঁরা ভুলত্রুটি করলেও সমাজে তাঁরা আদরণীয়। সাধারণ মানুষ তাদের সম্মান দেয়, ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে। আর পরনিন্দাকারী নিষ্কর্মা অপদার্থের দল সমাজের কাছে ঘৃণ্য। মানষ তাদের জানায় শুধু ধিক্কার।
১২॥ নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস,
ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।
নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে—
কহে, যাহা-কিছু সুখ সকলই ওপারে ॥
নদীর এপার বিষণ্ণ শ্বাস ফেলে। সে জানায়, সমস্ত সুখ আছে ওপারে। আবার, এপারকে সর্ব সুখের বাসভূমি বলে ভেবে নেয় ওপার এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দূরের প্রতি মোহ উভয়ের অন্তরে বিষাদের ছায়া বিস্তার করে। উভয়ে আকাঙ্ক্ষা-প্রবণ, কিন্তু নিশ্চেষ্ট।
মানুষ সুখ-পিপাসু । মানুষ সুখান্বেষী। সে সুখ রাজসিক বা তামসিক যা-হোক না কেন, তা একন্তভাবে বস্তুগত, পার্থিব, ক্ষুন্দ্র । আবিষ্ট সুখই মানষের আশা-আকাঙ্ক্ষা অন্তহীন করে তোলে। এক আশার পরিপূর্ণতা তাকে তৃপ্তির স্বাদ দেয় না, বরং অন্য আশার নতুন তৃষ্ণা তার চিত্তকে প্রজ্বলিত করে। যে পারিপার্শ্বিকতা ও ক্ষমতা আশার সফলতাকে সংস্থির সমগ্রতা দিতে পারে, ছায়াস্নিগ্ধ শান্তির পূর্ণতায় দীক্ষিত করতে পারে, তা সে মেনে নেয় না। অন্তহীন আশার স্বপ্নে সে বিভোর। আত্মকল্পনার মাপকাঠিতে সে অন্যকে সুখী ভাবে। সম্পুর্ণতা ও সফলতার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। বাস্তব সম্পর্কহীন জীবনদাষ্টির প্রতিনিয়ত আক্রমণ তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আকাঙ্ক্ষা পরিণত হয় দুরাকাঙ্ক্ষায়। অপ্রাপ্তির ঈর্ষিত যন্ত্রণায় সে নিষেধের সতর্ক সুভাষণ শুনতে চায় না, সর্ব সুখের স্বর্ণমৃগের পেছনে নিত্য ধাবমান হওয়াই তার কাম্য হয় ; ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।” এইভাবে উধাও হওয়ার প্রবণতার কারণে অতৃপ্ত মানুষের বাস্তব লক্ষ্য হারিয়ে যায় বা লক্ষ্যের বদল ঘটে এবং জীবনে নেমে আসে অতৃপ্তি ও ব্যর্থ তার পাঞ্জীভূত অন্ধকার। চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে সংগতির অভাবই এই পরিণতি ঘটায় । ‘আশা হি পরমং দুঃখং’। ‘নাল্পে সুখম, অস্তি’-র যে আদর্শায়িত দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে “চির অতৃপ্তির মহৎ যন্ত্রণার দ্বারা ঊর্ধায়িত করে, অন্ধকার থেকে আলোকে নিয়ে যায়, সেই মহৎ অতৃপ্তি নেই মানষের বস্তুচেতন সুখের আকাঙ্ক্ষায়। সংকীর্ণ ও সীমিত, অবাস্তব ও অসম্ভব থেকে সে পরম সত্য বলে ভাবে। ‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ’ই তার বাঁচার ধর্ম। দূরবর্তী কল্পিত সুখের মোহের জালে জড়িয়ে আজীবন অশান্তির মুগ্ধ ভৃত্য হয় সে, কিন্তু; শান্তির প্রসন্ন প্রভু হতে পারে না। তবু মোহের ছলনায় প্রতারিত ব্যক্তির অন্বেষণ বিরাম মানে না, দুরাকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থতা তার নিত্যসঙ্গী হয়।
তাছাড়া, যে-মানুষ সুখের আশা করে মাত্র কিন্তু, নিষ্ক্রিয় থাকে, সেও ব্যর্থ হয়। তার আশায় সেই গতিশক্তি যা লক্ষ্যের দিকে চালিত করতে পারে। ‘কনের আশা হবে বিয়ে, তিথির লাগি থাক গে শুয়ে’- প্রবাদবাক্যে আছে সেই নিশ্চেষ্ট আশার কথা। গতিহীন আশার চোখে সাফল্যের দিগন্ত অদৃশ্যে থাকে।
১৩॥ ‘কে লইবে মোর কার্য?’ কহে সন্ধ্যারবি,
শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল ‘স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।’
সমস্ত দিন সূর্য তার সপ্তবর্ণ’ কিরণধারায় পৃথিবীকে উদ্ভাসিত করে । দিন শেষ হয়। ছড়ানো কিরণজাল সংহত করে নেয় বিদায়ী অস্তায়মান সূর্য । ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে পৃথিবীর নিমজ্জনের মুহূর্তকাল আসন্ন। রাত্রিব্যাপী ঘনান্ধকার দূর করার জন্য এই সন্ধি-পর্বে কোনো বৃহৎ শক্তির আবির্ভাব দেখা যায় না। শুধু মানুষের ঘরে-ঘরে মাটির প্রদীপগুলি জ্বলে ওঠে। সে আলোকে পৃথিবীর সমগ্র অন্ধকার দূরীভূত হয় না । তবু সে চেষ্টা আন্তরিক ।
সভ্যতা এগিয়ে চলে ঝাঁপতালে, লাফিয়ে লাফিয়ে । আর, সেই এগিয়ে যাওয়ার পেছনে থাকে আবির্ভূত মহাপুরষদের গতিশীল সক্রিয়তা। বাধাগ্রস্ত মানবতার কান্না যখন আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, মানবপ্রাণতা যখন অসহ্য যন্ত্রণায় মাথা কুটে মরে, তখন সেই নিভন্ত আলোককে উজ্জ্বল করে তুলতে মহাপরষদের বাণী বর্ষিত হয়। তাঁদের বাণীই বিষাক্ত বায়ুমণ্ডলকে স্বচ্ছ ও মানববাসযোগ্য করে তোলে। বেদনা ও নৈরাশ্য, ক্ষদ্রতা ও স্থবিরতা, দুর্গতি ও দুর্বলতার অন্ধকার দূর করে মানবসমাজ তখন সভ্যতার নীল-নির্জন আকাশটার ঠিকানা পেয়ে যায়। কিন্তু তাঁদের পার্থিব অস্তিত্বের বিলপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বাণীগুচ্ছের উজ্জ্বল মূল্য অবসিত হতে শুরু করে । তাঁদের আরব্ধ কর্ম ও অসমাপ্ত থেকে যায়। সভ্যতার এই সংকট-মুহূর্তে তাদের সাধারণ অননুগামীরা আলো-জ্বালানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কর্তব্যটাকু সুসম্পন্ন করার মতো শক্তি ও যোগ্যতা তাঁদের মধ্যে সমান থাকতে পারে না। ভিন্ন মাপের সামর্থ্য কাজের ফলশ্রুতিকে সমান সুচারু করে তুলতে ব্যর্থও হয়। তবু নম্র প্রচেষ্টার দ্বারা বৃহৎ মানবসমাজের প্রতি মহৎ কর্তব্য করা একান্ত উচিত বলে বিবেচিত হয় ৷ এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মীর সার্থকতা সেইখানে যেখানে তাঁরা প্রসন্ন নিষ্ঠায় বিশাল কর্মের মুখোমুখি হন; ক্ষুদ্র সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করেন : বৃহতের ডাকে প্রেরণাকে মহৎ ইচ্ছাকে আদর্শায়িত করতে প্রতিশ্রুতি দেন। ধর্মের সমাজসেবার, শিক্ষাবিস্তারের, স্বদেশকর্মে’র ইতিহাসে প্রবক্তাদের প্রস্থানের পর অনুগামীদের বিচিত্র কর্মধারার পরিচয় লিখিত আছে। সভ্যতার ইতিহাস, তাই, এক প্রদীপ থেকে অন্য প্রদীপ জালিয়ে নেবার ইতিহাস। উত্তরপুরুষদের এই প্রচেষ্টার কালপর্বে মাতৃভূমির ঘাসে ঘাসে হয়তো রোমাঞ্চ দেখা দেবে না, বেজে উঠবে না কোনো শঙ্খ, উচ্চারিত হবে না কোনো স্তবগান, কিন্তু, আত্মনিবেদিত কর্মের ক্ষীণ দ্যূতি সীমিত ব্যাপ্তির কথা অবহিত হয়েও পৃথিবীর অন্ধকার মুছে ফেলতে বিরত হবে না ।
১৪॥ পাষ্পের মাকুল
নিয়ে আসে অরণ্যের
আশ্বাস বিপুল।
পরিণত বৃক্ষ পাষ্পের মকুলের আবির্ভাব নিশ্চিত করে। বৃক্ষের আয়তনের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষদ্র মুকুল সহজ-দৃশ্যে না-হতে পারে। কিন্তু মুকুলের পুস্পিত বিকাশ ফলের জন্ম দেয় । ফলের কঠিন আবরণে আবৃত বীজ থেকেই বৃক্ষের জন্ম ও বিকাশ ঘটে। জীব-চক্রের প্রাকৃতিক আবর্তনের বিশেষ পর্বে বৃক্ষের আবির্ভাব ও প্রসারিত অরণ্যে রপান্তর বিস্ময়কর। এই পরিণতির উৎসে বীজের ভূমিকা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ।
উপেক্ষণীয় ক্ষদ্রই বরণীয় বৃহতের সংহত রূপ । মানবিক সমস্ত কর্মে’র প্রাথমিক রূপে স্বল্পায়তনিক । তা সমাজের নজরে আসে না। এলেও তা নিয়ে আসে উদাসীনতার দৃষ্টি বা অবিশ্বাসের উপহাস। কর্মী মানষের নিষ্ঠা, পারিবেশিক সহযোগিতা ও অভিমুখী দৃষ্টির পারস্পরিক সংশ্লেষ আরদ্ধ ক্ষুদ্র কর্ম টিকে একদিন বৃহতে পরিণত করে। আজ যা আকাঙ্ক্ষার বীজ, আগামী দিনে তা সাফল্যের বনষ্পতি হয়ে দেখা দেয়। ক্ষুদ্রের মধ্যে প্রচ্ছন্ন বহুৎ-কে পাওয়া যায়। অন্য দিকে, সাফল্যের পরিণতি সার্বিক অনুপ্রেণনার উৎস হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার সমাহার গড়ে তোলে প্রসারণশীল বৃহৎ-কে । ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র বালুকণার মিলন সম্ভব করে বিরাট মরুভূমি। বিন্দু বিন্দু জলকণার মিলন সম্ভব করে বিশাল সমুদ্র। সনিষ্ট একক প্রচেষ্টার পরিণতি ও পুর্ণতা যখন সদৃশ নানা মানুষের সাফল্যকে উজ্জ্বল রূপায়ণ দেবার উৎস হয়ে যায়, তখন পরিপূর্ণতার প্রাণবান সামগ্রিক রূপ সহজ দৃশ্য হবার সংকেত বহন করে আনে। দেশের মাক্তি, দেশের উন্নতির কথা বলা হয়, সে মুক্তি বা উন্নতির নেপথ্যে যে মিলিত প্রচেষ্টা থাকে তা অনস্বীকার্য। তা সাচিত হয় একক বা সাধারণ প্রচেষ্টা দিয়ে অর্থাৎ নেপথ্যেরও নেপথ্য থাকে। যেমন অরণ্যের নেপথ্যে শুধু বনস্পতি থাকে না, থাকে তার নেপথ্যলোকের বীজের প্রসঙ্গ। তাই ক্ষুদ্র আর অবহেলার যোগ্য নয়, উপেক্ষার বা উপহাসের পাত্র নয়। বীজের মধ্যে আছে অজাত অরণ্যের কম্পমান মর্মরধ্বনি। এককের পরিমিত প্রয়াসে আছে অনাগত সাফল্যের নীলাকাশের প্রতিফলন । অরন্যকে নির্ভুলভাবে খুজে পাওয়া যায় ক্ষুদ্র বীজে, সিদ্ধুকে বিন্দুতে, মানবিক মহৎ সাফল্যকে নগণ্য প্রচেষ্টায় ।
১৫॥ রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধূমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,
মূর্তি ভাবে আমি দেব-হাসে অন্তর্যামী।
মানুষের সমস্ত মহৎ প্রয়াস নির্ভুল নয়। সত্যকে ক্ষণে ক্ষণে স্পর্শ করার চিন্তা ও সংকল্প নিয়ে সে তার মানবধর্ম’কে চিহ্নিত করে বটে, কিন্তু প্রকাশের ক্ষেত্রে তার অনুসৃত প্রয়াস কখনো-কখনো ভুল করে বসে। আদর্শে’র অভিমুখে মানবাত্মার যাত্রা যথার্থ সত্য। এই আদর্শে’র আলোকেই সত্যকে বিচার করে দেখা যায় মানুষ কতখানি ভ্রষ্ট, কতখানি সম্পূর্ণ।
লক্ষ্য ও উপলক্ষের মধ্যে পার্থক্য আছে এবং লক্ষ্যই প্রধান, অনুগামী মাত্র ; অনেক মানুষ এই বিষয়টি বিচার করে দেখে না। সংসারে, তার আচার ও আচরণের জগতে, বিচিত্র অঘটন ঘটে। দৈহিক ব্যবস্থার যথাযোগ্যতাকে অস্বীকার না-করে মানষ তার স্বাতন্ত্র্যকে সমুজ্জ্বল করতে, ব্যক্তিগত অভিরুচির ঊর্ধ্বে উঠতে চায় । আদর্শ রূপে যিনি বড় এবং যার সঙ্গে মানষ চিরসম্বন্ধযুক্ত এমন কোনো সত্তার স্বরূপকে মনের মধ্যে গ্রহণ করার চেষ্টা করে চলে সে । এই আদর্শ বিষয়কল্পনায় অন্ধবুদ্ধি, শ্রেয়োনীতির অভাব ও ভাবাতিশয্য তার বাধা হয়। লক্ষ্যভ্রষ্ট প্রয়াস উপলক্ষের উপাসনাকে যথার্থ ভাবে। ভক্তি-নিবেদনের আনষ্ঠোনিক রীতি অনুসরণের ক্ষেত্রে উপলক্ষের আড়ালে লক্ষ্যের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি রথযাত্রা উৎসবে সহজদৃশ্যে । সেখানে সহজ প্রত্যক্ষের কারুকার্যময় বৰ্ণময় বৈচিত্র্যই বিগ্রহের রূপ গ্রহণ করে। ভক্তির কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনি, রথের চাকার শব্দ প্রবল ও প্রধান হয়ে ওঠে। ফেনিল উচ্ছাস, ভক্তি প্রকাশের ভাবাতিরেক বিহ্বলতায় আরাধ্য দেবতা ভেসে যায়। ভক্ত জনতা তখন পথ, রথ, বা মূর্তিকে দেবতার মল্যে দিয়ে বসে। কিন্তু তারা দেবতা নয়, দেবভক্তির প্রতীকী উপকরণ ও উপলক্ষ মাত্র । দেবতাই লক্ষ্য ; প্রত্যক্ষের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে, জীবসমার ঊর্ধ্বে মানবিক ত্যাগ ও তপস্যার প্রসারিত বিশ্বে তাঁর অবস্থান। কলরবমুখরিত সমারোহের সীমিত প্রাঙ্গণে আনত-নম্র ভক্তের পক্ষে সেই প্রতীকী দেবতার পরিপূর্ণ তার দর্শন সম্ভব নয় । দেবতার সত্যকে জানার জন্য প্রয়োজন নিবিড় অনুসন্ধান, নিবিষ্ট অনধান এবং বিশ্বের পটভূমিতে তাঁকে স্থাপন করে তাঁর সৃষ্টিশীল মহিমার মূল্যায়ন । সেই পথেই তিনি সঙ্গতভাবে গ্রহণীয়, সকৃতজ্ঞ স্মরণীয়। উপলক্ষ যখন আসলকে অতিক্রম করে প্রধান ও প্রণম্য হয়ে ওঠে, তখন নিবেদিত ভক্তি বাইরের অলঙ্কৃত আচরণকে শেষ কথা ভাবে।সে-ভক্তি হৃদয়কে অভিষিক্ত করে না, পূর্ণতার স্বাদ দেয় না। তাই, দেবতার রথ আজও ধাববান । জনসমাবেশ ঘটছে, বাজনা বাজছে, ভক্তরা প্রস্তুত। কিন্তু তিনি এখনো আসেননি। তাঁকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য দূর্গেম সংকটসংকুল পথে যাত্রা করা দরকার । এই পথেই আসে সিদ্ধি, যার অন্য নাম দেবদর্শন ৷
১৬॥ স্বার্থ মগ্ন যে জন বিমূখ
বহৎ জগৎ হতে, সে কখনো শেখেনি বাঁচিতে।
স্বরচিত সংকীর্ণ বৃত্তে কান্নাহাসি-জড়ানো ব্যক্তি-জীবন-যাপন একান্ত মূল্যেহীন । সে-জীবন মাননুষকে মানবিক পূর্ণতার বাদ দিতে পারে না। আত্মকেন্দ্রিকতার অন্ধকার পেরিয়ে জনাকীর্ণ প্রসারিত জগতের সঙ্গে নিজের জীবনকে সম্পর্কিত করা এবং তার আঘাত-সংঘাত মুখের প্রাণলীলায় নিজের অস্তিত্বের অভিন্নতাকে নিশ্চিত করে তোলার মধ্যেই আছে মানুষের মানবিক সার্থকতা ।
মানুষের মূল পরিচয় তার জীব-প্রকৃতিতে নিহিত। সে স্বপ্ন দেখে, সাফল্য ও সমদ্ধি খোঁজে, সুখের জন্য চিন্তিত হয় ; এবং তার এই দর্শন-চিন্তন-অনুসন্ধানের কাজগুলি সেই সব মানষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় যারা তার নিকট-সম্পর্কিত ও সংখ্যায় নগণ্য । জীবনযাত্রা নির্বাহের প্রাত্যহিক প্রয়োজনের দাবি মেটাতে তার জ্ঞান ও কর্ম— নিষক্ত থাকে ৷ আর, সে-নিযুক্তি অবিরাম ও অবিচ্ছিন্ন। সম্পদের মাধ্যমে সুখান্বেষণের নির্বাচিত প্রয়াসগুলি নিয়ন্ত্রণ করে তার আত্মস্বার্থ। বিষয়বুদ্ধি নিয়ে আত্মসিদ্ধি খোঁজার ব্যাপারটি মানুষের কাজের মধ্যে গণ্য হলেও তা মানুষের ধর্ম বা মনুষ্যত্ব বলে বিবেচিত হয় না। ব্যক্তি-সত্তার পাশাপাশি মানুষের সামাজিক সত্তা আছে । এই দ্বিতীয় সত্তাই ব্যক্তিকে এক বৃহত্তর জগতে বিস্তৃত করে, মনষ্যত্বের জগতে উন্নয়ন ঘটায় । অগণ্য মানুষের চিন্তা ও কাজ, সফলতা ও বিফলতা, আনন্দ ও বেদনা, সমস্যা ও সংকট নিয়ে সেই জগৎ প্রতিনিয়ত স্পন্দিত হচ্ছে।
তার প্রাণবান বৈচিত্র্য অন্তহীন। তার প্রবাহের কল্লোল ধ্বনিময়। বৃহতের স্পন্দিত চিৎ-প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ মিশিয়ে দেওয়াই বাঁচার মানবিক সার্থকতা। কর্ম চঞ্চল পৃথিবীর সঙ্গে নিজের চিন্তা ও কর্ম’কে সঙ্গত সামঞ্জস্য দিয়ে লাভ করা যায় পরিপূর্ণ জীবনের স্বাদ। সেই জীবন-স্রোতে ডুব দেওয়া ও ঘট ভরে নেওয়াই ব্যক্তির যথার্থ কৃত্য। এখানে সংকীর্ণ জীবনাদর্শের দৃষ্টিতে বিবেচিত ক্ষতিই লাভ হয়ে যায়, ব্যর্থতা নিয়ে আসে সাফল্যের পরিচয় । ছোট মাপের স্বতন্ত্র ব্যক্তিজীবনের চেয়ে সেই বড় জীবনে মৃত্যু মূল্যে পায় অমরতার । ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে, জীবসীমা অতিক্রম করে আত্মত্যাগ ও উদারতার দ্বারা যে-মানুষ প্রসারিত আত্মার মানবসীমায় নিজেকে উত্তীর্ণ করতে পারে না, সে বাঁচতে জানে না। মানুষকে শিখতে হয় বাঁচার শিক্ষা। আত্মপ্রকাশের প্রত্যাশায় ও প্রয়াসে সীমাকে স্বীকার না-করাই সেই অভিষ্ট শিক্ষা ।
১৭॥ শর ভাবে, ছুটে চলি, আমি তো স্বাধীন,
ধনুকটা এক ঠাঁই বন্ধ চিরদিন।
ধনু, হেসে বলে, শর, জান না সে কথা
আমারি অধীন জেনো তব স্বাধীনতা।
অধীনতা বা পরাধীনতার বিপরীত অর্থে স্বাধীনতাকে মূল্যায়িত করা অনুচিত। অধীনতাও নয় স্বাধীনতার অভাব। প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার আড়ালে পরোক্ষ অধীনতার সক্রিয়তা আছে। যথেচ্ছাচার কখনো স্বাধীনতা অর্থে গণ্য হয় না। স্বাধীনতা মানুষের বিশিষ্ট ও সহজাত সম্পদ। প্রকৃতির অপার দাক্ষিণ্যলব্ধ বলে অন্য প্রাণীও সেই সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয় নি। আচরণের জগতে পশু ও মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার অর্থ— পৃথক হয়ে দেখা দিয়েছে। পশু অন্য প্রাণীকে হত্যা করে বাঁচে । আহারের জন্য হত্যা করাটা তার জীবধর্ম। পশুর স্বাধীনতা তার পাশবিকতায় । মানুষের ক্ষেত্রে এ-অর্থ— খাটে না। স্বতন্ত্র বা স্ববশগত হওয়াই স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতাকে এক প্রকার সামাজিক চুক্তি বলা যায় এবং সেখানে ব্যক্তিগত ব্যাপারটা কিছটা সীমিত অর্থে গ্রহণীয় । ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার না করে সভ্যজীবনের আর সামাজিক আচরণের পালনীয় নিয়মগুলির অনুসরণই স্বাধীনতা। তাই, অন্যদের স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থের সহানভূতিপর্ণে সামঞ্জস্যের প্রয়োজন হয়। এই অবশ্য কৃত্যটিতে ব্যক্তি-স্বাধীনতার সীমায়ন বা সংকোচন ঘটলেও তা নেতিবাচক অধীনতা নয়, ইতিবাচক অধীনতা। কিন্তু যথার্থ স্বাধীনতা-বোধের অভাবের ফলে যুগে-যুগে দেখা দিয়েছে যথেচ্ছাচারিতা আর স্বৈরাচারিতা। ইতিহাসে স্বৈরাচারী অনেক রাজার শাসন-কাহিনী আছে। তাঁরা নিজেদের জনপ্রতিনিধি ভাবতেন না, নিজেদের ঈশ্বর- তুল্য বিবেচনা করতেন। তাঁদের শাসন দেখা দিয়েছে শোষণ-রূপে। কান্না ও রক্তের স্রোত, মৃত্যুর স্তূপই তাঁদের রাজকীয় স্বাধীনতার ব্যঙ্গাত্মক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তি-মানুষের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা হয়েছে সমাজ-বিচ্ছিন্ন আত্মকেন্দ্রিকতা অথবা সমাজ- বিরোধী যথেচ্ছাচারিতা। সম্রাট বা সাধারণ এইসব বিপরীত পথের মানুষেরা পৃথিবীর সভ্যতার আলো নেভাতে, বাতাস বিষাক্ত করতে চেয়েছে। ক্ষমতার আর দম্ভের বিজয়পতাকা তারা উড়িয়েছে। আর তখনি দেখা দিয়েছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ, সংঘর্ষ ও সংগ্রাম। স্বাধীনতা অর্জনের প্রয়োজনেই এই বিপ্লবের অনিবার্য সূচনা । তাই, যথার্থ স্বাধীনতা সেখানেই দৃশ্যে হয় যেখানে ব্যক্তি তার আচরণের প্রকৃতিকে সামাজিক বা দেশগত নিয়ম-বিধির সঙ্গে সম্পর্কিত করে, সামঞ্জস্য দেয়। লক্ষ্যে ও কর্মে— নিয়ন্ত্রণই কাম্য। যে-পাখী আকাশে ডানা মেলে অফুরন্ত মক্তির স্বাদ নেয়, সেও ফিরে আসে নীড়ে ; যে-গাছ পল্লব ও পুষ্পের বৈচিত্র্য আকাশের দিকে তুলে ধরার মুক্তি খোঁজে, সেও ভূমিখণ্ডে তার শিকড়ের বিস্তার মেনে নেয় ; যে-নদী পর্বত থেকে প্রবাহিত হয়ে সমদ্রে মিলনের মক্তি পায়, সেও তার স্রোতের গতিপথে তীরের বন্ধন স্বীকার করে। আত্ম-ঐচ্ছিকতার সঙ্গে এই নিয়ন্ত্রণের সুসঙ্গতিই স্বাধীনতা ।
১৮॥ যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে,
সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে;
যে জাতি জীবনহারা অচল অসার,
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার
নদীর প্রকৃতি চিহ্নিত হয় তার প্রবহমানতার দ্বারা। বহতা-শক্তির অভাবই নদীর মৃত্যু। যে নদী নিরন্তর প্রবাহিত হয়, উৎস থেকে সমদ্রসংগম পর্যন্ত সদাচগুল স্রোত- ধারার দুই পার্শ্বে নতুন নতুন সভ্যতার বিকাশ সম্ভব করে, সে-নদী কোনো বাধা স্বীকার করে না। তার জল কল্লোলে দুর্জয় প্রাণের ঝংকার, তার তরঙ্গধারায় যুক্ত জীবনের ছন্দোময়তা, তার গতিচাঞ্চল্য বিঘ্নজয়ী দুর্বার বলিষ্ঠতা দৃশ্য হয়ে ওঠে। তাই নদী ‘চলার বেগে পাগল-পারা, পথে পথে বাহির হয়ে আপন-হারা।’ কিন্তু স্তিমিত জলস্রোত নদীর গতিকে মন্থর করে, তার অঙ্গে অঙ্গে সমাচ্ছন্ন হয় শৈবাল, তার প্রাণধর্মে’র অবলুপ্তি ঘটে। নদীর প্রকৃতি ও জাতির ধর্ম সাদৃশ্যের সূত্রেই বিবেচ্য।
প্রাণসমৃদ্ধ বাক্তির জীবন ও জাতির জীবনে প্রচ্ছন্ন থাকে গতিধর্ম । গতিচঞ্চল জীবনই জাতিকে দেয় শোধন ও সৃজনের ক্ষমতা। স্বাধীন বুদ্ধি, নিরপেক্ষ বিচারবোধ, সংস্কারমুক্ত মানসিকতা ও বলিষ্ঠ কর্মশক্তি জীবনপ্রবাহকে গতিশীল করে রাখে। জাতি সঠিক পথে এগিয়ে চলে । তার স্বাভাবিক বিকাশ ও স্পন্দনের পথ ধরে নির্মিত হয় জাতির উজ্জ্বল স্বাতন্ত্র্য। চিত্তের মহৎ সম্পদে পুস্পিত সেই বৰ্ণিল স্বাতন্ত্র্য ক্রমোন্নত সভ্যতার অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু জাতির প্রবহমানতা কাল থেকে কালান্তরে অভিন্নতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হতে পারে। তবে ক্লান্ত মন্থরতায় তখন পূঞ্জীভূত হয় জীবন-বিরোধী সংকীর্ণ সংস্কার, নিষ্প্রয়োজন প্রথাগচ্ছে । নির্ভয় চিত্ত ও অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি, মক্ত জ্ঞান ও হৃদয়নিষ্ঠ উচ্চারণ জীবন থেকে প্রস্থান করে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যায় বিচিত্র প্রকৃতির বহুমুখী কর্মধারা ও প্রাত্যহিক তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে উত্তরণের বীর্য, অবিভক্ত পৌরষ ও সংগ্রামী শক্তি । আচারে আবৃত বিবেক স্বচ্ছ-শুভ্র মানবতার মুখের কণ্ঠকে মৌন করে দেয় । দুর্বার প্লাবনের দূরাভিসারী ক্ষমতা হারিয়ে জাতি নিষ্ক্রিয়তার দুষণকে নিশ্চিত করে। নিষ্প্রাণতায় আস্তীর্ণ— অক্ষম অধীন এই রূপান্তরই জানিয়ে দেয়, জাতির মৃত্যুকাল আসন্ন। ইতিহাসের পাতায় লিখিত আছে জড়তা-জর্জর সে-সব জাতির কথা, যারা পৃথিবীর নানা কালপর্বে’ তিমিরাচ্ছন্ন জীবন- সংকটের নজির হয়ে ছিল। তখন কোনো জাতীয় নায়কের আবির্ভাবে জাতি নতুন প্রাণ- ধর্মে গতিশীল হয়েছে, নতুবা মৃত্যুর অন্ধকারে চিরকালের মতো অদশ্যে হয়ে গেছে।
১৯॥ আম্র কহে, এক দিন, হে মাকাল ভাই,
আছিনু বনের মধ্যে সমান সবাই
মানুষ লইয়া এল আপনার রূচি,
মূল্যভেদ সুর হল, সাম্য গেল ঘুচি।
মানুষের অনুরোগ একান্ত নির্বাচনধর্মী। অনুরোগ নামক সহজাত প্রবৃত্তিটিকে আশ্রয় করে তার আচরণের ব্যাপারটা প্রয়োজনের সংকীর্ণ পথে এগিয়ে চলে এবং পারি- পার্শ্বিক জগতে সৃষ্টি করে বিভাজনের বিন্যাস। যে-ঐক্য অবিসংবাদিত প্রাকৃতিক ও বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যে আকীর্ণ, সে-ঐক্য তখন অবনত হয় বিচ্ছিন্নতায় ও বিভিন্নতায়। অভেদ হারিয়ে যায় নিঃসম্পর্ক’ বিভেদে। বোঝা যায়, মানবিক মূল্যায়ণের উৎসে নেই স্বতোৎসারিত প্রেরণার উদারতা। নেই নিবিড় অন্তরানুভূতির দীপ্যমানতা। মানুষিক স্পৃহা অসমদর্শী’ ও বিভেদাশ্রয়ী।
ব্যক্তিগত বৈষয়িকতার বাইরে মানষের যে-পরিচয় পরম আদর্শ’ বলে বিবেচিত হয়, যেখানে মানুষ ঐক্যের প্রবক্তা ও অভেদের উপাসক, সে-পরিচয় মানবসমাজে বিরল। অধিকাংশ মানষের মূল পরিচয় তাদের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা নির্বাহের মধ্যে সীমিত। তারা বিষয়বুদ্ধি দিয়ে সিদ্ধির পথ খোঁজে। জীবপ্রকৃতির কারণে তারা জ্ঞানকে উপস্থিত-প্রয়োজনের সীমায় বেঁধে রাখে, কর্মকে স্বার্থের প্রবর্তনায় স্বীকৃতি জানায়। এই দৃষ্টিই প্রাচীন কালে ভারতীয় মানবসমাজকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছে এবং বিভাগকে দিয়েছে ঐশ্বরিক উৎস। সমকালীন মানুষের বিশেষ বিশেষ দক্ষতার পরিচয় হিন্দু সমাজে জাত-নামক অপরিবর্তনীয় ইস্পাত কঠিন গঠন নির্মাণ করতে সহায়ক হয়েছে। বংশানুক্রমতার সঙ্গে জাতকে যক্ত করার ফলে ব্যক্তর বৃত্তি পরিবর্তনের স্বাধীনতা থাকল না; দেখা দিল উচ্চ-নীচ ভেদ, স্পৃশ্য অস্পৃশ্য বৈপরীত্য। ইউরোপীয় জগতে শ্বেত-কৃষ্ণের মধ্যে বর্ণগত বিভাজন মানুষের স্বার্থচেতন বৈষম্যবুদ্ধির সক্রিয়তার পরিচয় চিহ্নিত করে। জাত ও বর্ণ-কেন্দ্রিক অসাম্যের পাশাপাশি দেখা দেয় ধর্মগত ভেদ, অর্থগত ভেদ। ধর্মাচরণের পার্থক্য মানষকে দিল নানা ধর্মাবলম্বী মানুষের দৃশ্যমানতা। অর্থের প্রাধান্য ধনী-নির্ধনের মধ্যে ভেদ-চিহ্ন টানতে দ্বিধা করলে না। অসাম্যের রেখায়-রেখায় আকীর্ণ মানব- সমাজ আজ ছিন্নভিন্ন। তারই অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসাবে জন্ম নিল দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব, সংশয় ও সংগ্রাম। যাকে সভ্যতা বলা হয়, তা মানুষে-মানুষে এই বৈষম্যনির্ভর অসাম্যের সভ্যতা, ভোগবাদী মূল্যায়নের সভ্যতা। এই সভ্যতা এক-শ্রেণীকে আকাশ- স্পর্শী সংযোগ দিয়েছে, অন্য শ্রেণীকে দিয়েছে বঞ্চনার কান্না। আজ তাই প্রয়োজন, মানুষের সম্পর্ক ও আচরণের জগত থেকে স্বার্থসংকীর্ণ’ বিভেদী মানদণ্ডের চিরনিরসন। যে-দাষ্টি জৈবপ্রকৃতিকে, বিচ্ছিন্নতাকে, বৈষম্যকে অতিক্রম করে সর্ব মানুষের ভূমিকায় মানুষকে উপলব্ধি করে, সেই দৃষ্টিই কাম্য ।
২০॥ আলো বলে, অন্ধকার, তুই বড় কালো,
অন্ধকার বলে, ভাই, তাই তুমি আলো।
এই বিশ্বে সুখদঃখ, আনন্দ-বেদনা, সুন্দর-কুৎসিতের সহাবস্থান। শুধু এই বিশ্বেই নয়, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে একথা সত্য। আমরা সকলেই সুখের সন্ধান করি। কিন্তু সুখলাভের প্রয়াস করলেই দঃখের স্পর্শ জীবনে অনুভূত হয়, ফুল তুলতে গেলে কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হতে হয় ; তখনই যন্ত্রনায় আর্তনাদ করে উঠি। নিজ দূর্ভাগ্য নিয়ে আক্ষেপ করি, ভগবানের কাছে অভিযোগ জানাই।
কিন্তু, আমাদের মনে রাখা দরকার, দঃখের উপস্থিতির জন্যই কি সুখ আদরণীয় নয়? বেদনার জন্যই কি আনন্দ আকাঙ্ক্ষিত নয়। কুৎসিত আছে বলেই না সুন্দরের আরাধনা করি । যদি পৃথিবীতে কখনো সূর্য অস্ত না যায়, দিনরাত সূর্যের আলোতে চারিদিক প্লাবিত থাকে, তাহলে আলোর কি মূল্য থাকে ? অন্ধকার দিনের আলোকে গ্রাস করে বলেই পরদিনের সূর্যোদয় এমন করে আমাদের কাছে আকর্ষণীয় বোধ হয়। সেই রকমই অভাববোধ না থাকলে মানুষের প্রগতি রুদ্ধ হয়ে যেত, অতৃপ্তি না থাকলে জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎকর্ষও বিচিত্র বিকাশ সম্ভবপর হত না। মহৎ বেদনার অনুপস্থিতিতে মহৎ কাব্য সৃষ্টি হওয়া সম্ভব ছিলনা, মৃত্যু না থাকলে জীবনের এত তাৎপর্যও অনভূত হত না।
আলোর রূপ ও সৌন্দর্যের প্রকাশের জন্য যেমন অন্ধকার প্রয়োজন, সেইরকম দঃখবেদনার উপস্থিতির জন্যই জীবনের সুখ-আনন্দ এত কাম্য । সমস্ত জীবন যদি অটুট সুখ-আনন্দ পূর্ণ হয় তাহলে সুখ-আনন্দের অনভূতিই থাকে না। অসুন্দরের জন্যই সন্দরকে, অভাব-অতৃপ্তির জন্য প্রাপ্তিকে আমাদের ভাল লাগে।প্রকৃতপক্ষে জগতে যদি বৈচিত্র্য না থাকত তাহলে জীবন তাৎপর্যহীন হয়ে যেত। অন্ধকারের কারণে আলো সত্য হয়ে ওঠে।
২১॥ নাহি চাহিতেই ঘোড়া দেয় যেই
ফুঁকে দেয় ঝুলি থলি।
লোকে তার পরে মহারাগ করে
হাতি দেয় নাই বলি ।
বহু সাধনায় যার কাছে পায়
কালো বিড়ালের ছানা,
লোকে তারে বলে নয়নের জলে,
দাতা বটে ষোল আনা ।
জীবনের পক্ষে একান্ত জরুরী যে বস্তু বা সম্পদ মানুষের নেই এবং যা পূরণের অপেক্ষায় আছে, তাই মানুষের অভাব। আদর্শ মানুষের জীবনে যে সব অভাবগুলো দৃশ্য হয়ে ওঠে তার প্রকৃতি উচ্চাঙ্গের, আত্মশক্তির বলে তাঁরা তাদের পরণ ঘটান। সাধারণ মানুষের জীবনে অভাব নিছক দিন-যাপনের আর প্রাণধারণের। এই জৈবিক অভাব পূরণের ক্ষমতা সেই দরিদ্র ব্যক্তির থাকে না বা থাকলেও সিদ্ধির সঙ্গে সক্রিয় প্রচেষ্টার সংযোগ ঘটানোও আলস্যে বাধা পায়। দাতা নামে তখন দ্বিতীয় ব্যক্তির প্রয়োজন দেখা দেয় । প্রাকৃতিক জগতে রৌদ্র, বৃষ্টি, শস্যের আকারে প্রাপ্ত দানগুলি সব সময়ে যথামাত্রিক নয়, তার যথামাত্রিকতাও কাকতালীয় তবু সেই উদাসীন নৈসর্গিক ক্রিয়া-বিধিতে প্রসারিত ঔদার্যে’র চারিত্র্য লক্ষণটি দৃষ্টিগোচর হয়। পৃথিবীতে আদর্শ মানুষের দানের বৈশিষ্ট্যে আছে সেই নৈসর্গিক সাদৃশ্যে; তার উজ্জলতা ও ব্যঞ্জনা কালাতিক্রমণও মুছে ফেলতে পারে না। তখন দান পেয়ে যায় অর্ঘের মহিমা। গ্রহীতা সেই দান অনায়াসে লাভ করে বলে তার প্রাপ্তিতে নেই প্রচেষ্টার পারম্পর্য, আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা, হার্দ্য মানসতা। অব্যবহিত কৃতজ্ঞতাবোধকে ব্যতিক্রমী এক বিচারী পোষাক পরিয়ে এবং দানের ঔদার্যকে কাঠগোড়ায় তুলে বিচার করতে বসে সে, দানের ঔদার্য বা গ্রহীতার আলস্য বিচার্য নয়। প্রদত্ত বস্তুর আয়তনিক মূল্যায়ণে অসদৃশ বস্তুর প্রতিতুলনা দিয়ে দানটিকে দেওয়া হয় ঐতরিক অবনমন । জগতে এই ধরনের কৃতঘ্ন ও অহমিকাগ্রস্ত, ক্ষুদ্রচেতা ও উচ্চকণ্ঠ মানষে বিরল নয়। আবার অভাবের তাড়নায় দীর্ঘ সাধনার ফলে কৃপণ ব্যক্তির অপ্রয়োজনীয় তুচ্ছতম দানকে সদৃশ গ্রহীতা পূর্ণ প্রাপ্তির কৃতজ্ঞ মর্যাদা দেয়। দাতার অনুদারতা, গ্রহীতার বহু প্রতিক্ষিত প্রচেষ্টা ও বিচারী বোধ, প্রদত্ত বস্তুর হাস্যকর তুচ্ছতা প্রভৃতি দ্রবীভূত কৃতজ্ঞতায় একাকার হয়ে যায়। স্বভাবের সংকীর্ণ চিত্ততাও ভিক্ষুক-মনোবৃত্তি অনুগ্রহসিক্ত অনুচ্চকণ্ঠতা তাদের সেই শ্রেণীভুক্ত মানষেরূপে চিহ্নিত করে যাদের দারিদ্র্য দ্বিমুখী—অভাবে ও স্বভাবে। অভাবের দারিদ্র্য ঘোচানো যায়, কিন্তু স্বভাবের দারিদ্র্য ঘোচানোর ক্ষমতা শিক্ষা ও মনোবিদ্যার হাতে। আচরণের জগতে এই সব বিচ্ছিন্ন মানুষের অবাধ উপস্থিতি পারিবেশিক জগৎকে বিষাক্ত করে, মানবিক ভারসাম্যের জগতে সংকট নামিয়ে আনে। তারা চিরকাল অন্ধকারের অধিবাসী হয়ে থেকে যায় ৷
২২॥ পেঁচা রাষ্ট্র করে দেয় পেলে কোনো ছুতা–
জান না আমার সঙ্গে সূর্যের শত্রুতা?
বিশ্বের সমগ্র মানষকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায়। এক ক্ষুদ্র নীচ, দই মহৎ। নিজ স্বার্থচিন্তা ত্যাগ করে মহৎ ব্যক্তিগণ যুগে যুগে পৃথিবীর মানবসমাজের কল্যাণ করে চলেছেন। আজ মানব সমাজের অগ্রগতির জন্য এই মহৎ ব্যক্তিগণ দায়ী।
অন্যদিকে নীচ ব্যক্তিরা যুগে যুগে মহৎ ব্যক্তিদের কার্যকলাপের নিন্দা করে এসেছে। এর ফলে শুধু, তারাই আত্মপ্রসাদ লাভ করেনি পরন্তু মহতের কাজে পদে পদে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য পৃথিবীর সমগ্র মানব সমাজের অগ্রগতিও ব্যাহত হয়েছে ।
নীচমনা ব্যক্তির মহতের প্রতি ঈর্ষার শেষ নেই। শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে নিন্দা করে সে নিজের নিকৃষ্টতাকে লুকিয়ে রাখতে চায়। যার কাছে সাহস ভরে দাঁড়াবার সাহস নেই, সেই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে নিজের শত্রু, বলে রটনা করে আত্মপ্রসাদ লাভ করে। ক্ষুদ্র ব্যক্তিরা এই বলে নিজ সম্মান বৃদ্ধির চেষ্টা করে যে শক্তিমান মহৎ ব্যক্তির তুলনায় সে শক্তির দিক দিয়ে হীন নয়। বৈরিতাবশত শক্তিমান মহৎ ব্যক্তিকে সে এড়িয়ে চলে, তাকে আদৌ ভয় পায় না ; অনেকটা সেই নিশাচর পেঁচার মতো, যে সূর্যের সঙ্গে কল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা উল্লেখ করে নিজ সম্মান বৃদ্ধি করতে চায়। যদিও তাতে পেঁচার গৌরব বিন্দুমাত্র বৃদ্ধি পায় না অথবা সূর্যের গৌরব সামান্যতম হ্রাস পায় না। শুধু পেঁচাই সকলের কাছে হাস্যাস্পদ হয়ে ওঠে।
২৩॥ রাখি যাহা তাহা বোঝা
কাঁধে চেপে রহে।
দিই যাহা তার ভার
চরাচর বহে।
সমস্ত উৎপাদনই শ্রম-নির্ভর। শ্রমের সাফল্যে কর্মীর আগ্রহী ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদিত সামগ্রী যে প্রকারের হোক না কেন সৃষ্টির কর্মীর কাছে তা মমতাময়, অসামান্য, অভিপ্রায়ী। সৃষ্টিকে সঞ্চয় ছাড়া কোনো বিকল্প প্রয়োগ দিতে তার একান্ত অনীহা। সৃষ্টি ও সঞ্চয়ের মূলে যার ঘনিষ্ঠ সক্রিয়তা দীপ্যমান তাকে বলা যায় স্রষ্টার অস্মিতা। সৃজনশীল সহজাত প্রবৃত্তি অস্মিতার দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, সৃষ্টি থেকে তার বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ অভাবনীয়। সৃষ্টির ও সঞ্চয়ের ধারাবাহিকতা শস্যকে পুঞ্জীভূত করে চলে, বিশ্বমানুষের প্রয়োজনে সঙ্গে তার সংযোগ ঘটানো হয় না এবং আকস্মিক উন্মেষিত অন্তর্ভৃষ্টি সঞ্চয়কে বোঝার সাদৃশ্যে ভাবিত করে। কৃতকর্মের ফসলকে সঞ্চয়ের সীমারেখা টেনে দেওয়ার পিছনে ব্যক্তির জৈব-অস্মিতা কাজ করে। কিন্তু মানুষের পরিচয় জীবজগতের সাদৃশ্যে মাত্র-জৈবিকতায় সীমিত নয়, সে জৈবিকতা পার হওয়ার শক্তি রাখে। সঞ্চয়ের জৈব-প্রবৃত্তি তার মানবিক পরিচয় ভাস্বর করে না, তার ব্যক্তিতাকে অবিকলতা দেয় না, তার ঐকাত্ম্যকে অনাবৃত করে না। দুর্বহ বোঝার জীবন থেকে মুক্তির প্রয়োজন। সৃষ্ট শস্যকে ব্যক্তি-সঞ্চয়ের বৃত্ত ছিন্ন করে বিশ্ব-সম্পদে উন্নয়ন দিলেই সেই মুক্তি প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। তাই প্রয়োজন অন্তরায়িত দৃষ্টির, স্বতোদহনের। সভ্যতার অবিচ্ছিন্ন অভিমুখী বিকাশ সংখ্যাতীত মানুষের সৃষ্ট সম্পদের সমাহার মাত্র। কৌতূহলী ব্যক্তি-প্রচেষ্টা যখন প্রথম আগুন জ্বালায়, অথবা প্রথম অস্ত্রনির্মাণ করে তখন সেই আবিষ্কারের কালে আবিষ্কারকের মুখে সাফল্যের যে উজ্জ্বলতা উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল তা ব্যক্তিগতকে বিশ্বগত করার উজ্জ্বলতা। সেই আদর্শর ব্যক্তি অজ্ঞাতনাম বা উপন্যাসের আড়ালে ঢাকা থেকে যান, শারীরিক মৃত্যু তাঁকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, থেকে যায় তাঁর অম্লান আকৃতি আদর্শ। সৃষ্ট দৃষ্টান্তের মধ্যে তিনি দৃশ্য হন। সেই সৃষ্টির সংরক্ষণের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় বৃহত্তর মানবসমাজের হাতে, কালাতিক্রমণও তাকে বিনষ্ট করতে পারে না। বিশ্বের হাতে কৃতকর্মকে তুলে দেবার সাফল্য বা প্রবণতাই মানুষের কাছে কাম্য। বৃহত্তর অস্মিতাকে স্রষ্টা যদি সেই দায়িত্ব দেয়, পৃথিবী সুন্দর হয়ে ওঠে। তারই অনুপ্রেরণা ব্যক্তিমানসতাকে সমাজমানসতায় পরিণতি দেয়। মানুষ অধিবাসী হয় এক আদর্শ-দীপ্ত বিশ্বের।
২৪॥ তোমার কাছে আরাম চেয়ে পেলেম শুধু লজ্জা,
এবার সকল অঙ্গ ছেয়ে পরাও রণসজ্জা।
ব্যাঘাত আসুক নব নব আঘাত খেয়ে অচল রব,
বৃথা আমার দুঃখে তব বাজবে জয়ডংক,
দেবো সকল শক্তি, লবো অভয় তব শংখ।
সাধারণ মানুষ সর্বদা নিরবিচ্ছিন্ন সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আঘাতহীন ভোগপূর্ণ জীবন কামনা করে। নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করে ক্ষুদ্র স্বপ্নের কাঙাল হয়ে তারা জীবন যাপন করতে চায়। কিন্তু এইভাবে প্রকৃত জীবনের স্বাদ, সুখ আনদের মর্মোপলব্ধি করা যায় না। শুধু, ভোগ-বিলাস-আরাম মানুষকে একদিকে যেমন, ক্ষুদ্র ও স্বার্থপর করে অন্যদিকে উচ্চতর মানবসত্তার সম্পূর্ণ বিকাশ থেকে বঞ্চিত করে। দুঃখ বেদনার মধ্য দিয়ে পথ চলতে চলতে প্রকৃত জীবনের স্বাদ লাভ করা যায়, প্রকৃত সুখআনন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ হয় । পরিপূর্ণ জীবনের সত্যকে উপলব্ধি করতে হলে দঃখভীরু হলে চলবে না, তার জন্য বরণ করে নিতে হবে দুঃসহ তপস্যাকে কঠোর কর্তব্যকর্ম সম্পন্ন করতে হবে, ঈশ্বরের ভয়ঙ্কর রূপের আবির্ভাবকে স্বীকার করে নিতে হবে।সকল শক্তি দিয়ে আমরা যদি আমাদের আঘাত, বেদনা, বিপদাপদ জয় করতে পারি, তবে লাভ করা যাবে জীবনের প্রকৃত আনন্দকে । যারা সারা জীবন শুধু, সুখকে চায়, স্বার্থপর সেইসব মানুষকে সুখই ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করে। আঘাত-বেদনাই প্রকৃত আনন্দ, প্রকৃত মনুষ্যত্বের উপলব্ধির সহায়ক। বিলাসজীবন ত্যাগ করে কঠিন কর্তব্য উদযাপনের মধ্য দিয়ে মানুষের মহত্ত্ব প্রকাশিত হয়। দুঃখ, আঘাতকে এড়িয়ে নয়, অতিক্রম করেই আমাদের সুখশান্তি আনন্দের সঙ্গে গভীরতর পরিচয় সাধন করতে হবে।
২৫॥ হাউই কহিল, মোর কি সাহস ভাই,
তারকার মুখে আমি দিয়ে আসি ছাই।
কবি কহে, তার গায়ে লাগে নাক কিছু
সে ছাই ফিরিয়া আসে তোর পিছু পিছু।
ক্ষুদ্র ও নীচব্যক্তিদের স্পর্ধার সীমা নেই। যুগে যুগে এই পৃথিবীতে শাশ্বত কীর্তি’র অধিকারী মহৎ ব্যক্তিদের এইসব হীন ব্যক্তিরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। তারা নিজেদের ওপর আস্থা স্থাপন করে এমন কাজ করে যাতে তাদের আত্মগরিমা চরিতার্থ হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে। মহৎ ব্যক্তিদের কীর্তি’র ওপর কালিমা লিপ্ত করতে তারা পিছপা হয় না। এই কাজকে সমগ্র পৃথিবীতে প্রচার করে জনসাধারণের কাছ থেকে বাহবা নিতে চায়। যদিও মহৎ ব্যক্তি বা তার কীর্তির তাতে ক্ষতি হয় না ; বরং মহৎ ব্যক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নিজের আত্মঘাতী পরিচয় পরিস্ফুট করে জীবনে পরাজয় বরণ করে।
সমগ্র আকাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নক্ষত্র, মাটির কত ওপরে তাদের অবস্থান। আর ক্ষুদ্র হাউই নক্ষত্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রয়াসী হয় নক্ষত্রের মুখে ছাই মাখিয়ে দিতে চায়। ক্ষণিক আলোকের উজ্জ্বল্যে হাউয়ের দম্ভের সীমা নেই। সে মনে করে উজ্জ্বল নক্ষত্রের তুলনায় সে শক্তিমান। সেই শক্তির অভিমানে আকাশে উঠে চায় সমস্ত নক্ষত্রের উজ্জ্বলতাকে ম্লান করে দিতে। কিন্তু তা দূরাশামাত্র। নক্ষত্র এত বিশাল এবং যে দূরত্বে তার অবস্থান হাউই-এর কলঙ্কলেপনে তার কিছু যায় আসে না। নক্ষত্রের প্রতি যে ছাই নিক্ষেপ করা হয়েছিল তা নিমেষে ফিরে হাউইকেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়। মহৎ ব্যক্তিদের প্রতি, তার কীর্তির প্রতি ক্ষুদ্র, নীচমনা ব্যক্তির যে অবহেলা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যে দুঃসাহস, তা তাকে জনসাধারণের কাছে হাস্যাস্পদ করে না, নিজের ধ্বংসও ডেকে আনে।
২৬॥ ছাগল ছানা লাফিয়ে চলে
পড়লো তবু কাটা।
ঢাকের বাদ্যি বাজিয়ে দিলে
হলো বলির পাঁঠা।
আচরণের জগতে মানুষের কাছে ধর্মের বিশেষ মূল্য আছে। তার আয়ুও মানবজাতির আয়ুর অনুরূপ। জীবনের মধ্যেই সত্যকে প্রত্যক্ষ করে দেখাই ধর্ম। ধর্মের স্বরূপ সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘অনন্তবোধের আলোকে সমস্তকে দেখা এবং অনন্তবোধের প্রেরণায় সমস্ত কাজ করা, ইহাই মনুষ্যত্বের সর্বোচ্চ সিদ্ধি, ইহাই মানুষের সত্যধর্ম’। সত্যকে যথাযথরূপে গ্রহণ করার জন্য ইচ্ছা ও অভ্যাসকে মানবপ্রকৃতিতে সুদৃঢ় করে তোলার দ্বারা মনুষ্যত্বলাভই প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজন। ধর্মের দুর্লভ্য প্রার্থনীয়তা এবং অমূল্যকে বিনামূল্যে লাভ করার স্বভাব ধর্ম-চর্চাকে সেই মূল্য দিতে নারাজ। জীবনযাপনের অসারল্য, ভোগের অহংকার ও অয়োজন প্রাচুর্য, বৈষয়িকতার প্রবল মূর্তি এবং অর্থের পারমার্থিকতা এখন ধর্মকে করেছে সামাজিক জীবনযাত্রার অঙ্গ। তাই প্রচলিত ধর্ম হয়েছে কৃত্রিম আচার-অভ্যাস-পদ্ধতি নির্ভর এবং বাহ্যিক প্রক্রিয়াসর্বস্ব বহুলাঙ্গ সাম্প্রদায়িক ধর্ম। প্রাকৃতিক প্রাণোচ্ছল প্রাণীর মস্তক ছিন্ন করার দিব্য সংক্ষিপ্ততাতেই মানুষের পুণ্যসিদ্ধি। বিষয়কেন্দ্রিক ব্যক্তির সস্তা ধর্ম-ধারণা থেকে, ত্যাগ করে ভোগ করার, মুক্তবুদ্ধি উৎসাহিত হয়েছে। প্রকৃতির এক প্রাণদীপ্ত প্রতিরূপকে হত্যার দ্বারা সেই অন্তরতম পথটি রক্তাক্ত করা হল যে-পথে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মানবপ্রকৃতির মিলন ঘটিয়ে চিত্তের বোধকে সর্বানুভূত করে তোলা যেত। অনন্ত ও মঙ্গল শুধু ক্ষুদ্র বা আবৃত হল না, হারিয়ে গেল অজ্ঞানতায়, বাহ্য অভ্যাসকে সত্যের সঙ্গে অভিন্ন করে ধর্ম-চেতন মানুষ পেল হিংসা ও নৈসর্গিক দূরত্ব, ভোগবুদ্ধি ও শঠতা। এই ধর্ম রূপকল্পনা ও বাহ্যিক প্রক্রিয়ার দ্বারা ত্যাগ ও মঙ্গলের নিয়ত প্রকাশকে প্রতিরুদ্ধ করে মানবিক বুদ্ধি ও চরিত্রের অবনয়ন ঘটায়; মুক্তিকামী মানুষের হাতে দেয় অনায়াস-লভ্য ছাড়পত্র। অন্তরের বিকাশ কৃত্রিম প্রণালীতে ক্ষীণ প্রবাহমানতা পেয়ে মানুষিকতাকে মানবতায় দীক্ষিত রূপান্তরিত দিতে ব্যর্থ হয়। ধর্ম ও সত্যের বিপরীত মেরুত্বই আজকের মানুষের মধ্যে সংকীর্ণ এক ব্যবসায়ী ধর্মাদর্শের জন্ম দিয়েছে। এই মিথ্যাচার যতদিন চলবে ততদিন ঢাকের বাজনা বাজতে থাকবে এবং মুক্তিকামী মানুষ বলির ছাগমাংসকে দেবে ঔদারিক আতিথ্য ॥
২৭॥ জীবনে যত পূজা হল না সারা,
জানি হে জানি, তাও হয়নি হারা।
যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে,
যে নদী মরুপথে হারালো ধারা,
জানি হে জানি তাও হয়নি হারা ॥
বিশাল এবং বৈচিত্রময় এই নিখিল বিশ্ব। প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণীর জন্মমৃত্যু হচ্ছে, অবিরত বস্তুর সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়ে চলেছে। জীবজগতের সৃষ্টি-ধ্বংস যদি একটি বিশেষ সময়ের ব্যবধানে ঘটে তাহলে তাকে আমরা স্বাভাবিক বলে মনে করি।
কিন্তু যদি কোন প্রাণের অকালমৃত্যু হয়, কোন বস্তু সৃষ্টিমাত্র ধ্বংস হয়, যদি কোন মানুষের ইচ্ছা জীবনে পূরণ না হয়, তাহলে আমাদের কাছে তা অস্বাভাবিক মনে হয়, আমরা হাহাকার করে উঠি।
প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে মানুষ কত স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নগুলি বাস্তব জীবনে রূপায়িত করে সাফল্য চায়। কিন্তু সমস্ত মানুষের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা সফল হয় না। কত কবি মহৎ চিরায়ত শিক্ষা-সৃষ্টি করা থেকে বঞ্চিত হন। বিজ্ঞানী সুযোগের অভাবে মহৎ আবিষ্কার করতে পারেন না। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য জনগণের কল্যাণ করতে অপারগ হন। তখনই তাদের মধ্যে হাহাকার দেখা যায়। তখন তারা হতাশার শিকার হয়ে চিন্তা করেন যে তাদের জীবন ব্যর্থ হল।
কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে পৃথিবীতে কোন কিছুর ধ্বংস নেই, বিনাশ নেই। আপাত দৃষ্টিতে যা ধ্বংস, বিনাশ বা মৃত্যু তা অন্য বস্তুতে রূপান্তর মাত্র। কোন ব্যক্তির মহৎ প্রয়াস যদি ব্যর্থ হয়, তা প্রকৃত ব্যর্থ নয়। তা সার্থকতা দিকে একটি পদক্ষেপ মাত্র। পরবর্তীকালে সেই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে এ বিষয়ে অন্য কোন ব্যক্তিজীবনে সাফল্য লাভ করতে পারেন।
২৮॥ প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন।
ফুটিয়াছে ছোটফুল অতিশয় দীন।
ধিক্ ধিক্ বলে তারে কাননে সবাই,
সূর্য উঠি বলে তারে ‘ভাল আছ, ভাই?’
মহৎ ব্যক্তির কাছে উচ্চ-নীচ ভেদ নেই। তিনি অর্থ বিত্ত শিক্ষা আভিজাত্য বংশমর্যাদা ইত্যাদি বিচার করে মানুষের মূল্য নির্ণয় করেন না। তাঁর কাছে ধনী-নির্ধন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের সমস্ত মানুষই সমান। উদার এবং মহৎ ব্যক্তিরা সকলকে ভালবাসেন, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেন।
পঙক্তি কয়টিতে রূপকচ্ছলে এই সত্যই প্রকাশ করা হয়েছে। ফুলের বাগান-সংলগ্ন প্রাচীরে একটি বনফুল ফুটেছে। বহু পরিচিত ফুলগুলির মতো তার রূপ-রঙ-গন্ধ কিছুই নেই। তাই স্বজাতি হওয়া সত্ত্বেও অপরাপর ফুলগুলি বনফুলের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইছে না। তার ক্ষুদ্রতা ও দীনতাকে ধিক্কার দিচ্ছে। কিন্তু উদার এবং মহতের প্রতীক সূর্য পূর্ব দিগন্তে উদিত হয়ে সেই ক্ষুদ্র বনফুলটিকে অবজ্ঞা না করে সাদর সম্ভাষণ করলেন।
ক্ষুদ্র ও নীচ ব্যক্তিরা অর্থ, বিত্ত ও প্রতিষ্ঠার মানদণ্ডে সকলকে বিচার করে। দরিদ্র, অশিক্ষিত আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক স্বীকার করতে চায় না। তারা চিন্তা করে না যে দরিদ্র ব্যক্তিটি তার আত্মীয়, ঘটনাচক্রে আজ সে দরিদ্র। ঘৃণা করার চাইতে, অবহেলা অপমান করার চাইতে তাকে সাহায্য করা উচিত।
মহৎ ব্যক্তিদের সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যক্তিদের এইখানে পার্থক্য। তাঁদের প্রীতি ও শুভেচ্ছা সূর্যের আলোর মতো সমস্ত মানুষের উপর বর্ষিত হয়। মহৎ এবং উদার ব্যক্তি মানবতার মাপকাঠিতে সমস্ত মানুষকে বিচার করেন—অর্থ, প্রতিষ্ঠাদির ভিত্তিতে নয়। কেননা তিনি জানেন মানুষ ভাগ্যচক্রে দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে। এজন্য সে নিজে দায়ী নয়।
২৯॥ উদরে যার অন্ন নাই
কটিতে নাই বস্ত্র,
বাহুতে যার বাহিতে নাই
প্রাণ বাঁচানো অস্ত্র,
স্বাধীন হোক অধীন হোক
কী তার তাহে আসে যায়?
স্বাধীনতা তো মাদুলি নহে
গলায় বেঁধে ধুয়ে খায়।
স্বাধীনতা মানুষের চির-আকাঙ্ক্ষার বিষয়। তার রক্তের কথা। অন্য মানুষ, অন্য শাসনের কাছে আনুগত্য জানিয়ে বছরের পর বছর সে পরাধীনতার অন্ধকার জীবন স্বীকার করে নিতে পারে না। প্রতিবাদ থেকে বিক্ষোভ, বিক্ষোভ থেকে বিদ্রোহ অনিবার্য হয়। বিদ্রোহের অগ্নিকাণ্ড শাসকের শক্তির দুর্গ ছারখার করে দেয়। উন্মোচিত, আন্দোলিত হয় স্বাধীনতার পতাকা। ফ্রান্সের বাস্তিল দুর্গে যার সূচনা হয়েছিল তারই অগ্নিস্ফুলিংগ ছড়িয়েছে পরাধীন ও শোষিত দেশে-দেশে । অবস্থা, কারণ, তাৎক্ষণিক ঘটনার বৈচিত্র্য যতই থাক, স্বাধীনতাই সবদেশের লক্ষ্যবস্তু। এ স্বাধীনতার অর্থ বিশেষ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমিকতা লাভ। মানুষের ইচ্ছা-স্বাতন্ত্র্য্যই দেশ-মানুষ থেকে গণতান্ত্রিক শাসক নির্বাচিত করবে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার এই উপভোগ্য দিকটা স্বাধীনোত্তর পর্বে অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি তার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অনর্জিত থাকে। মানুষের মধ্যে অর্থ-বৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রের শ্রেণীভাগে আর্থিক প্রশ্ন, দেশোন্নয়নে অন্য দেশের নিকট ভিক্ষাবৃত্তি, প্রভৃতি দেশের অর্থনৈতিক দৈন্যের চিত্র প্রদর্শিত করে। সাধারণ মানুষ যারা, শ্রমিক ও কৃষক নামে যারা চিহ্নিত হয়, বেদ ও রক্তের বিনিময়ে যারা প্রাত্যহিক জীবননির্বাহ করে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তাদের কাছে অর্থহীন, নিষ্প্রাণ, নিরর্থক সম্পদ মাত্র। মানুষের সভ্যতার ইতিহাস অব্যাহত গতিশীলতা পেয়েছে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের দ্বারা। রাজা হারিয়ে যায় মৃত্যুর অন্ধকারে, সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, আকাশ-ঝলসানো যুদ্ধে ক্ষমতার পরাজয় আনে, কিন্তু মাটি-ঘেঁষা কর্মী মানুষের কর্তব্যে বিরতি আসে না। আর তারাই প্রতিরোধহীন প্রায় নগ্ন নিরন্ন জীবন নিয়ে প্রাণটুকু টিকিয়ে রাখে মাত্র। সে-স্বাধীনতা নিছক জৈবিক জীবনকে মর্যাদা দিতে পারে না, অন্তরায়িত সত্য নয়, তার বহিরঙ্গীয় বাস্তবতা শূন্যগর্ভ এক আলোক-বত্ত মাত্র। তার ব্যবহার্যতায় অন্ধকুসংস্কারগত মূল্যও নেই। সেই স্বাধীনতাই প্রয়োজন যা সাধারণ মানষের জীবনকে দেবে প্রতিসাম্য, বিকাশ ও মানবিক ঐকাত্ম্য। নিষ্ক্রিয় প্রতিভাস নয়, সক্রিয় বাস্তবেই তার তন্নিষ্ঠ মূল্য। স্বনির্ভর ও আদর্শ জীবনযাপনের সামর্থ্যই স্বাধীনতাকে জীবনের সত্য করে তোলার ক্ষমতা রাখে ।
৩০॥ বন্ধু তোমার বুকভরা লোভ, দুচোখে স্বার্থ ঠুলি
নতুবা দেখিতে তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে ‘কুলি‘।
আমাদের দেশের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমাজব্যবস্থায় অসাম্য বিরাজ করছে। এই সুযোগে সমাজের উপরতলার একদল লোক নীচতলার লোকদের নিপীড়ন, নির্যাতন, শোষণ করে চলেছে। কলকারখানার মালিক শ্রমিককে, ব্যবসায়ীরা দরিদ্র জনগণকে, জোতদার সাধারণ চাষীকে নির্যাতন করছে। কোটি কোটি টাকা মুনাফা সংগ্রহ করে নিজে এবং নিজের স্বজনদের জন্য অবাধ ভোগসুখের ব্যবস্থা করছে। যাদের নির্যাতন করে তার এত স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম, সেইসব দরিদ্রশ্রমজীবী জনগণের কথা একবার চিন্তাও করছে না। এইসব শ্রমজীবী জনগণ শীতগ্রীষ্মবর্ষা অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে জীবন যাপন করে চলেছে।
এই সমাজব্যবস্থার মূলভিত্তিই হল দরিদ্র, শোষিত, বঞ্চিত, শ্রমজীবী জনগণ । কারখানায় কাজ করছে শ্রমিক, মাঠে মাঠে কর্মরত চাষী। তারা কাজ বন্ধ করে দিলে সমস্ত সমাজব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। আজ বিশ্বের মানবসভ্যতার অগ্রগতি হয়েছে তা সবই এই শ্রমজীবী জনগণের দান। তারাই প্রকৃত কর্মী, তাদের ‘দেবতা’ বলে অভিহিত করতে হয়। কেননা ‘দেবতা’ যে নিজেও সৃষ্টিকর্মে ব্যাপৃত। ধর্ম—মানবসমাজের কল্যাণ করে; ঈশ্বরের তারই কাছাকাছি অবস্থান করেন।
কিন্তু সমাজের ওপরতলার অর্থগৃধ্নু লোভী ব্যবসায়ী শিল্পপতি জোতদাররা সেকথা স্বীকার করে না। তারা শ্রমজীবী জনগণকে—যাদের জন্য তারা ভোগময় জীবন যাপন করছে—‘কুলি’ মুটে-মজুর বলে অভিহিত করে। প্রকৃতপক্ষে নিজেদের এই ভোগময় জীবন অব্যাহত রাখার জন্য শ্রমজীবী জনগণকে এরা প্রাপ্য অর্থনৈতিক অধিকার বা মর্যাদা দিতে চায় না।
কিন্তু নিপীড়িত লাঞ্ছিত শ্রমজীবী জনগণ তাদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অধিকার মর্যাদা ও সম্মান, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অবিলম্বে অর্জন করবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
৩১॥ ‘বসুমতি কেন তুমিই এতই কৃপণা?
কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।
দিতে যদি হয় দে, মা, প্রসন্ন সহাস।
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস?
বিনা চাষে শস্য দিলে কী তাহাতে ক্ষতি?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতী,
‘আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,
তোমার গৌরব তাহে নিতান্তই ছাড়ে।’
জীবনের সার্থকতা কর্মে, কর্মহীন জীবন মৃত্যুর মতো অর্থহীন। বিশ্বের চতুর্দিকেই সর্বত্র কর্মের চাঞ্চল্য। অথচ অলস অকর্মণ্যের দল বিনা পরিশ্রমেই জীবনে সাফল্য কামনা করে। সাফল্য না পেয়ে আক্ষেপ করে মরে। তারা জানে না সাফল্যের পথ দুঃখবেদনা-কণ্টকিত। যে-কোন কর্মে সাফল্য পরিশ্রমসাপেক্ষ। তাদের আক্ষেপ মাতা বসুমতী কেন তাদের প্রতি করুণা প্রদর্শন করে বিনা চাষেই জমি শস্যশালী করে দেন না, তাদের ভাঁড়ার ভরে দেন না সকল সম্ভারে। তারা ভুলে যায়, স্বয়ং বিশ্বস্রষ্টাই আপন নিয়মে কর্মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তাই তিনি পরিশ্রমী ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করেন মাঠে প্রান্তরে খনিতে, সমুদ্রের বুকে, পাহাড়ের বুকে, “আপনি প্রভু সৃষ্টি বাঁধন প’রে বাঁধা সবার কাছে।”
জীবনে সাফল্য লাভ করতে হলে কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন। জীবনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। কণ্টকে কণ্টকে ক্ষতবিক্ষত। অলস অকর্মণ্যের দল কর্মবিমুখতার কারণে পৃথিবীতে বেঁচে-থাকার প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয়ে আক্ষেপ করে চলে। শেষপর্যস্ত বাঁচার প্রয়োজনে ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে দ্বার থেকে দ্বারে অন্ন ভিক্ষা করে বেড়িয়ে গ্লানিময় জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। কিন্তু বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা। প্রকৃত বলবান ও পরিশ্রমী ব্যক্তি বসুন্ধরার কাছ থেকে সুখী-স্বচ্ছল জীবনের উপকরণ সংগ্রহ করতে পারে। বসুন্ধরার অকুণ্ঠদান নির্বিচারে সকলের ওপর বর্ষিত হলে মানষের পক্ষে কল্যাণকর হয় না।কেননা তাতে সমগ্র মানবসমাজ কর্ম বিমুখ হয়ে পড়বে, সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মহিমার অবলুপ্তি ঘটবে।
৩২॥ সামান্য অ্যাকটা সরলরেখার জন্য মাথা খুঁড়ছি,
পাচ্ছি না।
পৃথিবীতে কোথাও অ্যাকটা সরলরেখা নেই।
প্রসারিত আকাশের নীচে নগ্ন নিগৃহ নিরস্ত্র যূথচারী মানুষের জীবনযাপন সভ্যতা নামক নাট্যের পূর্বেরঙ্গ মাত্র। জন্মমৃত্যুর মধ্যবর্তী সেই মানবজীবন নিছক প্রাকৃতিক এবং জৈবিক সামান্য লক্ষণে চিহ্নিত। অপরিমেয় ঋজুতার বশবর্তী গতিপথ মন নামক এক সম্পদের স্বকৃত আবিষ্কারের ফলে বিঘ্নিত হল। অন্য প্রাণীজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে নিয়ে গেল ঊর্ধ্বতনের সংগ্রামভূমিতে। চৈতন্যের যে-বিন্দু থেকে নিরপেক্ষতার সারল্যগুলি জীবনের মধ্য দিয়ে রেখায়িত হতে বাধা পেত না, সেই বিন্দু, জন্ম দিল সাপেক্ষতার জটিল রেখাগচ্ছে। অস্তিত্বের পক্ষে জরুরী প্রয়োজনগুলি এক মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের, মানবসমাজের, বিচিত্র পরিবেশের সান্নিধ্যকে অবিভাজ্য সম্পর্কর্তা না দিয়ে পারল না। দৈহিক ও মানসিক অভাবগুলো পূরণ করতে সম্পর্কের হাতে মানুষ অর্পণ করল তার বৈধ ও অবৈধ সমস্ত ক্ষমতা। মানুষের সংসার আজ জটিল, সমাজ জটিল, জীবনযাত্রা জটিল, এমন কি তার সৃষ্টিতেও সেই জটিলতা । যে সভ্যতার গতিপ্রকৃতি দরূহ ও বিমিশ্রিত, আয়োজনে-উপকরণে যার প্রায়োগিক জগৎ বহুলবিস্তৃত, যার বিপরীতমুখী জ্ঞানের ভান্ডার পাঞ্জীভূত এবং মানবিক অতিপ্রজতা অবারিত, তা মানুষকে তির্যক গোলকধাঁধার মুখোমুখি করায় ৷ জটিলতাই দুর্বলতা, তাহা অকৃতার্থতা পূর্ণতাই সরলতা।’ কিন্তু আত্মরক্ষার অবিরাম যুদ্ধ সভ্যতা নামে চিহ্নিত হলেও তা সরলতার উন্নততর সভ্যতা নয় ; সে প্রতিমুহূর্তে স্বার্থ, বিরোধ, সংশয়ের দ্বারা যন্ত্রণা-বিদ্ধে, বিপন্ন, পরিতৃপ্তিহীন প্রহাসিক । মানুষ এখন জটিলতার দুর্গে নিরাপদ অধিবাসী হতে চায়। এটি প্রত্যয়ী অনুকাঙ্ক্ষা মাত্র। তার সেই নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে পারে না সারল্য নামক তুলনাহীন ঐশ্বর্যকে, থামাতে পারে না বহুশাখায়িত জটিলতার ক্রম-বিস্তার। প্রসারিতকে সংক্ষিপ্ত করার ধারণাযোগ্যতা ও স্পর্শগম্যতাই বিশুদ্ধ সরলাদশে’র বাধা । তার স্বকৃত ও স্বাগত মানষিক কীর্তি-বৈচিত্র্য এখন অন্তরায়িত উপলব্ধির একনিষ্ঠ সহজ সরল প্রাণশিখা নির্বাপিত করতে সক্রিয়। যে-মানষিক কৌতূহল অবাধ প্রশ্রয় দিয়ে জটিলতা নামক বিকৃতাঙ্গ দৈত্যের আবির্ভাব ঘটিয়েছে তাকে সে বন্দী করতে বা বাধ্য নির্বাসন দিতে পারে না। তাই যতই সামান্য একক বলে সরল-কে বিশেষিত করা হোক না কেন, সেই মূর্তে — অনাবিল সারল্যের জন্য মাননুষের মাথা খোঁড়া ছাড়া উপায় নেই । অন্বেষণকে করুণ মর্ষিত রূপান্তরের প্রতিরূপতা দিয়েই উত্তরণের সান্নিধ্য পেতে হয় ৷
৩৩॥ পিক পাপিয়া কাজ কি পুষে? তারা আবার কি গান গাবে?
হংস পোষো, ভোরে উঠেই যা হোক ক’টা ডিম্ব পাবে।
আকাশ পানে চাইছ বৃথা
রামধনুর নাই সার্থকতা,
ঢেউ গুনো না, মৎস্য ধর পরকে দেবে, নিজে খাবে।
পার্থিব বা অপার্থিব জীব বা বস্তুর গরত্ব একান্ত মূল্যায়ন-নির্ভর। তাদের স্বরূপগত মূল্যে নয়, ব্যক্তির স্বাভাবিক ও প্রবণতার দৃষ্টি থেকে সেগুলি বিচার্য’ হয়, নির্ণীত হয় মূল্য এবং সেই পথেই আসে সিদ্ধান্তের আকৃতি। ব্যক্তি থেকে সেগুলি বিচ্ছিন্ন বা সুন্দর, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা বা মানসতা-নিরপেক্ষ, তাদের মূল্য নেই। মূল্যের প্রশ্ন সম্পর্ক’তা-সাপেক্ষ। সম্পর্কের বিশ্বে মূল্যায়নের এই মন্ময়-রীতি, সপ্রাণ বা নিষ্প্রাণের স্বাতন্ত্র্যকে দৃষ্টির উদাসীন দূরত্ব না দিয়ে বিচার, যথার্থ মানবিক ।
যে-ব্যক্তি ভাবপ্রবণ তার কাছে প্রাকৃতিক জগতের নির্বাচিত পাখি আনন্দের কারণ হয়। স্বাভাবিক সংগীতের স্বতোৎসারিত মাধ্যষে মাধুর্যে বনভূমি প্লাবিত করে দেয় যে-সব পাখি তাদের ভাবুক মানষেরা খাঁচায় বন্দী করে এবং সংগীতের সহজ দাক্ষিণ্যে চিত্তকে ধন্য করার সুযোগ নেয়। পাখির প্রীতি থেকে প্রাপ্ত ধ্বনি-সৌন্দর্য’ই তার লক্ষ্য । তাই পাখি বস্তুগত সম্বন্ধের অতীত, তাদের কণ্ঠ-সংগীতেই সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতা। আকাশে বিম্বিত সপ্তবর্ণের বৈচিত্র্য বা নদী ও সৌন্দর্যের তরঙ্গভঙ্গ তাদের চিত্তকে দৃষ্টিগ্রাহ্য সৌন্দর্যের মাধ্যমে প্রসারিত করে। শ্রুতি ও দৃষ্টি-সৌন্দর্যে সে অমরাবতীর তুলনীয়তা পায় । বিষয় প্রবণ বস্তুভূমিক মানুষের কাছে এই প্রসারিত সৌন্দর্য দৃষ্টি অর্থহীন ও শূন্যেগর্ভ মাত্র। অরণ্য ও জলাভূমির যে-সব প্রাণী তার ভোগবৃত্তির জৈবিকতাকে পূর্ণ করতে সহায়ক হয়, সেইগুলিই তাদের কাছে অবারিত মূল্যে পায় । তারা নিসর্গ জগতের বিস্তার থেকে দেহ-চেতনার দ্বারা সেগুলিকে নির্বাচন-মূল্যে দেয় ; বিচ্ছিন্ন করে আনে তাদের প্রাকৃতিক প্রাসঙ্গিকতা। প্রকৃতি হারায় তার পর্ণোয়ত রূপের মালা, বিধৃত হয় ব্যবহারিক যাথার্থে। জৈব ও জৈব-বিরোধী উভয় দৃষ্টিই মানুষিক । মন্ময় দৃষ্টিতে মূল্যায়ন মানবিক যে-অবিকলতা আভাসিত করে, তন্ময় দৃষ্টিতে নেই সেই হার্দ্য নিষ্ঠার মানবিকতা। সংকীর্ণ ইন্দ্রিয়পরায়ণ বাস্তবতাই বিষয়মুখী মানুষিকতার একমাত্র পরিচয় । পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই দৃষ্টির
অধিবক্তা। তাদের ভোগবাদী মানসিকতা রূপানুভূতিকে শুধু প্রশ্ন করে না, ভোগবৃত্তিকে উৎসাহের প্রাহসিকতা দেয় ॥
৩৪ ॥ পৃথিবীর রণরক্ত সফলতা সত্য তবু শেষ সত্য নয় ।
আধুনিক যুগে যুদ্ধই বাস্তব সত্য। অসংগত কিন্তু নির্মম সত্য। শীতল বা উষ্ণ যে- যুদ্ধই হোক না কেন যদ্ধই মানবসভ্যতার প্রথম অভিশাপ এবং শেষ অপকর্ম। প্রাগৈতিহাসিক গোষ্ঠী-যুদ্ধে যার সুচনা তার পরিণতি আধুনিক জাতি-যুদ্ধে। রক্তাক্ত হিংস্র যুদ্ধে দেহবুদ্ধির আদিম বিবর থেকে যাগে-যুগে বেরিয়ে এসেছে, দেশে-দেশে হানা দিয়েছে। কত ছায়াচ্ছন্ন শান্তির নীড় ভেঙে গেছে। কত নিষ্পাপ জীবন মৃত্যুর অন্ধকারে হারিয়ে গেছে । কত সুখ আর স্বপ্ন, আশা আর আসক্তির শবদেহ ঘিরে শৃগাল-শকুন উৎসবমখের হয়েছে। থার্মোপাইলি থেকে ওয়াটারলু, কুরুক্ষেত্র-লঙ্কা থেকে পলাশী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অসংখ্য যুদ্ধের রক্তঝরা কাহিনী ইতিহাস লিখে রেখেছে। উদ্ৰন্ত, বীভৎস, রক্ত-পিপাসু যুদ্ধে বিজয়ী দেশকে দিয়েছে ক্ষমতার সাফল্য, বিজয়ী স্বাধনায়ককে শিখিয়েছে আত্মপ্রতিষ্ঠার উপায় । এই প্রতিষ্ঠা ও সাফল্য তাৎক্ষণিকতার কাছে অভ্যর্থিত হয়েছে, বন্দিত হয়েছে। এসব তথ্যগত, বাস্তব সত্য মাত্র কিন্তু সে সত্য তৎকালীন, সাময়িক, অস্থায়ী সত্য। মানব-ইতিহাসের কাছে তারা চিরন্তন অভিনন্দন পায়নি। নাদির শাহ, এত্তিলা, তৈমুরলঙ, চেঙ্গিস খান, হানিবল, হিটলার, মুসোলিনি প্রভৃতি অসংখ্য যুদ্ধনায়ক কালের ইতিহাসে ঘৃণার অন্ধকারে আবৃত ৷ রণরক্ত সফলতা বিজয়কে বীর্যের, অধিকারকে আদর্শের, পীড়নকে প্রকীর্তির মহিমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
শিশুপাঠ্য-কাহিনীর রোমাঞ্চের আকারে নয়, মহিমার মর্যাদায় বেঁচে থাকাই মানবিক লক্ষ্য। প্রসারিত, পরিপূর্ণ, প্রাণদীপ্ত মানবিকতাই কালের সীমা পার হয়ে যায়, মানুষের নিরুক্ত সত্য চিহ্নিত করে। বুদ্ধ, খ্রীষ্ট, মহাবীর, গান্ধী প্রভৃতি উন্মত্ত যুদ্ধের কথা বলেননি । আবিষ্ট শান্তির কথাই উচ্চারণ করে গেছেন । যদ্ধের লক্ষ্য প্রত্যক্ষ সময়-সীমায় যুক্ত। শান্তির নেই সেই সময়-সীমা। তার অনবচ্ছেদ সাধনাই সত্যের মুখে নিত্য উদ্ভাসিত করে। পরম সত্য মৃত্যুতে নেই, যুদ্ধে নেই, যুদ্ধসাফল্যের জয়োল্লাসে নেই । শাস্তি-দীপ্তি প্রসন্ন ও প্রসারিত মানবিকতায় আছে শেষ সত্য । তারই প্রকর্ষণের সফলতায় জন্ম নেয় প্রেমের পারোৎকর্ষ।
৩৫॥ যে ব্যক্তি কাজ করে তাহারই ভ্রান্তি ঘটে। যে ব্যক্তি নিশ্চেষ্ট ও নিষ্ক্রিয় তাহার ভ্রান্তির আবিষ্কার বিধাতার অসাধ্য।
জীবনের অন্য নাম কর্ম। প্রাত্যহিক বা আদর্শগত জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কর্মময়তাই মানুষের নিকট কাম্য।একজন সফল মানুষের জীবন বলতে স্বকৃত কর্মের সমষ্টিকে বোঝায়। কর্মে সক্রিয়তা ও কর্মহীনতা উভয়ের মধ্যে গতানুগতিকতা, একঘেয়েমি, ক্লান্তিময়তা আছে । তবু নিয়োজিত কর্মেই মানুষের মনের মুক্তি ব্যক্তিতার বিকাশ । কর্মহীনতা মানুষের স্বাভাবিক গঠন আকৃত করতে পারে না। আত্মনিষ্ঠ প্রচেষ্টা ব্যক্তির কাছে সফলতা বহন করে আনে। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রে সফলতার পারোৎকর্ষে’র নেপথ্যে থাকে অনেক ভ্রান্তি, অনেক ব্যর্থতার স্তর। ভুল তার নতুন জ্ঞানের সহায়ক হয়, ব্যর্থতা জোগায় তৎপর প্রণোদনা। যথার্থ কর্মী মানুষ বাধাগুলো স্বীকার করেই অতিক্রমের পথ অন্বেষণ করেন। সুতরাং ভ্রান্তি সফল কর্মের অনিবার্য অংগ ৷ যারা অলস ও কর্ম বিমুখ তাদের একমাত্র দক্ষতা কর্মী মানষের ভুলগুলো চিহ্নিত করে আত্মগৌরব দেখানো। এর ফলে ঘণ্যে নিষ্ক্রিয়তাকে প্রচ্ছন্ন করার চেষ্টা থাকে। নিষ্ক্রিয়তা-জাত পরছিদ্রান্বেষণ কখনো সক্রিয় কর্ম-প্রচেষ্টার সাদৃশ্যে বিবেচিত হয় না। তাছাড়া, নিষ্ক্রিয় মানুষ কখনো ভুল করে না, কারণ ভুল নামক ব্যাপারটির সংগে সক্রিয় ও অনবচ্ছিন্ন কর্মানুসরণের যোগ আছে। কোনো ঐশী-চেষ্টা সেই ভুলের আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়। কাজ যত বড় বা ছোট হোক ভ্রান্তির অবশ্যম্ভাবিতা মেনেও নিতে হয়। ভুলের সংশোধন, সফলতার আবৃত বাস্তবতাকে বর্জন এবং যথার্থ’ যাত্রাপথের অভিগমনযোগ্য নির্মাণ,—এইগুলি মানবজীবনের কর্ম- ক্ষেত্রে জররী বিষয় । দক্ষের বাধার প্রান্তে নীরব বসে থাকা, আকাশকুসুমের শূন্যগর্ভ— চিন্তা প্রভৃতি মানবীয় পরিচয় তুলে ধরে না। কর্ম জগতের মহাসমদ্রে ডুব দেওয়াই বড় কথা, ঘট ভরে তোলাও একান্ত প্রয়োজন, মধ্যবর্তী কালের ভ্রান্তিকে যোগ্য মূল্য দিয়েই সফলতার ঘট ভরে নিয়ে আসা যায়। ব্যক্তি-মানুষ ও মানব জাতির মহৎ সাফল্যের নেপথ্যে এই সত্যই নিহিত ৷
৩৬॥ যেদিন প্রথম তুমি এসেছিলে ভবে,
তুমি শুধু, কেঁদেছিলে, হেসেছিল সবে।
এমন জীবন হবে করিতে গঠন,
মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন।
জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী কালপর্বই মানষের আয়ু ; মানুষের জীবন। জীবের সংখ্যা-বৃদ্ধি মানবজীবনের লক্ষ্য নয়। মানবজাতির সংগে তার অংগ-সাদৃশ্যেও মানব-পরিচিতির নির্দেশক নয়। এমন কি, দৈহিক অস্তিত্ব বজায় রেখে একদিন ভবলীলা সাঙ্গ করে অদৃশ্য হয়ে যাওয়াও তার উদ্দেশ্য নয়। কর্মে ও সাধনায় আদর্শ জীবন আকৃত করাই মানষের যোগ্য আদর্শায়িত পরিচয়। জীবন-গঠনের প্রশ্নটি সেই ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে । সহজাত প্রবৃত্তির গুচ্ছ, বুদ্ধি ও হৃদয় সম্বল করে একটি মানব- শিশুর আবির্ভাব ঘটে পৃথিবীতে। সেইগুলির মাধ্যমে নিজের বৃদ্ধির সঙ্গে বিকাশকে সমান্তরাল অগ্রগতি দিতে হয়। কিন্তু একদিন ব্যক্তির বৃত্ত থেকে বিশ্বের প্রসারিত ক্ষেত্রে তার উত্তরণের অনিবার্য তা দেখা দেয়। বৃহত্তর মানবসমাজেই বাক্তি তার কর্মকে আদর্শ সাফল্য দিতে পারে। নিঃস্বার্থতা, অসঙ্কীর্ণতা, মুক্ত মানবতা, প্রভৃতি তার কৃতকর্মে অভিন্ন হয়ে যায়। মানুষের ইতিহাসে তার জীবন উজ্জল অধ্যায়রূপে স্বীকৃতি পায়। যে-মানুষ চরিত্রকে এইভাবে সুগঠিত করতে পারে সে মৃত্যুতেও অমরত্ব লাভ করে। পৃথিবীতে যে-সব মহৎ মানষের জন্ম হয়েছে, যাদের পরিচয় মানুষের পথিবীকে প্রোজ্জ্বল করেছে, মানবসভ্যতাকে গতিশীল অভিমুখিতা দিয়েছে তাঁদের জন্মমুহুরত সমস্ত মানবশিশুর মতোই একান্ত সাধারণ মাত্র। সীমিত পরিবৃত স্বজন মানুষের মুখে নবজাত শিশু আনন্দ ফোটায়। কিন্তু, ইহজগৎ থেকে বিদায় নেবার পালা খসিয়ে আসার সময় তার জীবনের কর্মের পরিপূর্ণতা তাকে প্রদীপ্ত করে তোলে। জন্মমুহর্তের কান্নার স্থলে উদ্ভাসিত হয় পুর্ণতার হাসি। সেই ব্যক্তি-মানুষটির অভাবই বৃহৎ মানবসমাজের ছিন্ন-হৃদয় কান্নায় স্রোতায়িত হয়। আদর্শ জীবন-গঠনই মানবীয় লক্ষ্য। উত্তরণের মানবিকতাই সেই গঠনকে অব্যবহিত করে ।।
৩৭॥ তুমি বসন্তের কোকিল, শীতবর্ষার কেহ নও।
ব্যক্তির পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা নিয়েই মানবসমাজের ভিত্তিমলে গড়ে উঠেছে। মানুষ নিজের সুখকে অপরের হৃদয়ে স্পর্শ’ দিয়ে আনন্দ পেতে চায়, অপরকে দুঃখের অংশভাগী করতে পেতে চায় সান্ত্বনা। এই মানসিকতার পরিমণ্ডল নিয়েই গড়ে ওঠে মানুষের মধ্যে মানুষের পারস্পরিক প্রীতি, সম্প্রীতি সৌহার্দ্য ও মৈত্রী। হার্দ্য ঔদার্যের ব্যাপ্তির মধ্যেই এই মৈত্রীর বন্ধন হয় দৃঢ়, গড়ে ওঠে সৌহার্দ্যের সার্থকতা, প্রীতির কুসুমগুলি তার সৌরভকে ছড়িয়ে দিয়ে লাভ করে তার পরিপূর্ণতা ।
কিন্তু পৃথিবীতে কিছু, মানুষকে দেখা যায় যারা প্রীতির সৌরভ নিতে জানে না। সৌহার্দ্যের পরিমণ্ডল রচনা করতে চায় তারা আত্মসুখ বা আত্মস্বার্থে’র তাগিদে। সেই কারণেই তাদের বন্ধুত্বে রচনা। যেখানে স্বার্থ চরিতার্থের মধু
উপবন সেখানে সেই স্বার্থপর মধুপে ভিড় নিঃশেষিত হয়, তারা ফিরে চলে যায় ‘সুখের পায়রা’র মত। এই স্বার্থপর মানুষেরা শধু সেখানে স্বার্থ চরিতার্থের কলধ্বনি সেখানেই নিজের স্বরযোজনা করে। প্রকৃতির বুকে যখন আনন্দের কলতান, সবুজের সমারোহে দৃশ্যাবলী যখন নয়নাভিরাম, মানষের মনে সৌন্দর্য ও সুখের স্পর্শ ও সুখের স্পর্শ’ তখন বসন্তের কোকিল প্রকৃতিতে আসে, সঙ্গীতে মাতিয়ে দেয় প্রকৃতির অঙ্গন। কিন্ত যেদিন প্রকৃতির বুক থেকে বসন্তের স্পর্শ চলে যায়, আনন্দের স্তব থেকে যায়, বর্ষার অবিরাম দাপটে যখন প্রকৃতির বুকে অস্থিরতা নেমে আসে—অথবা শীতের হিমেল হাওয়ায় প্রকৃতির অঙ্গনে নেমে আসে নিঃসীম শূন্যেতা, সেই সময় বসন্তের কোকিলের সূর শোনা যায় না। যখন রিক্ততা তখনই কোকিলের অনূপস্থিতি, যখনই পূর্ণতা তখনই তার উপস্থিতি। এই পৃথিবীতে এমন এক শ্রেণীর মানষ আছে, যারা বসন্তের কোকিলের মতই সুখের সন্ধানী, স্বার্থের মধু উপবনে ভ্রমণবিলাসী। আত্মকেন্দ্রিক এই সমস্ত মানুষ ধনী বা ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির সাহচর্য লাভের জন্য সদাব্যাপৃত থাকে। স্বার্থ চরিতার্থের জন্য তারা ক্ষমতাসম্মন্ন ব্যক্তির স্তাবকতা করে । সুখের আকর থেকে সম্পদ গ্রহণ অবিরাম বন্ধুত্ত্বের এক মানস- পরিমন্ডল গড়ে তোলে। কিন্তু, যেদিন সেই ধনীর সম্পদ হ্রাস পেয়ে যায়, ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির ক্ষমতা অবলুপ্ত হয়ে যায়,—তখন সেই আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর মানুষ পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, অচিরেই সেই বন্ধুত্বের খোলস ছেড়ে দূরে যায়। উপকারী ব্যক্তির প্রতি সামান্যতম কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করে না। সেই শূন্যতার দিনে সামান্য উপকারের জন্য এই আত্মকেন্দ্রিক মানুষে এগিয়ে আসে না।
৩৮॥ স্বর্গ আমাদের এত কাছে যে হাত বাড়ালে হাতে ঠেকে। কেবল হাত বাড়ানোই শক্ত ।
মানুষের মধ্যে আছে অনন্ত জীবন। আছে স্বাধীন মনুষ্যত্ব। ইচ্ছাশক্তির দ্বারা অন্তর্নিহিত মনুষ্যত্ব বিকশিত করাই মানবধর্ম। পরিপূর্ণ জীবন ও সম্পূর্ণ মানবিক পূর্ণতা, মনুষ্যত্বের সফলতা। সেই পূর্ণতা বা পরিণতিই কাম্য । পূৰ্ণতাই অমরাবতী।
কিন্তু, জীবনের পথ মসৃণ ও ঋজু নয় । সংস্কারের আনুগত্য, বুদ্ধির আচ্ছন্নতা, হৃদয়ের সংকীর্ণতা, বিচ্ছিন্ন বোধ মানষের আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তিকে নষ্ট করে। তার ক্ষুদ্র দৃষ্টি ছোট ছোট বিপদ অবসাদ নৈরাশ্য নিরানন্দের দ্বারা অন্ধ হয়। দুর্বল চিত্তে ভয় ও দ্বিধা, শোক ও সংশয়ের আধিপত্য ঘটে। প্রাত্যহিক জীবনের হাটে- বাজারের তুচ্ছ সত্যকেই যে বড় করে ভাবে। অন্যদিকে দেখা যায়, ক্ষমতাবান, মানষের অস্ত্রের স্পর্ধা বাণিজ্যে সমৃদ্ধি, জীবনযাপনের আড়ম্বর ও ঐশ্বর্য স্বর্গের প্রতিস্পর্ধা হয়। নানামুখী প্রবৃত্তির সংক্ষোভে মনষ্যত্বের আদর্শ বিকাশ বাধা পায় । পরিপুর্ণতার পথে দেখা যায় উম্মত্ত প্রতিযোগিতা । অসংগত বিকাশ অসমাপ্তির মধ্যে বিলীন হয়। আত্মশক্তির নির্ভরতা এসব বাধাগুলিকে প্রতিপদে মেনে নেয় । দঃখ, ভয়, শঙ্কার মধ্যে সহজ সার্থকতার পথই অবিষ্ট। বীর্যের দ্বারা তা লভ্য। জীবনের বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে নদীর মত প্রবহমান হতে হয় মননুষ্যত্বকে, নানা পরিবর্তন, তরঙ্গ- তঙ্গ, ভাঙা-গড়ার অবশ্যম্ভাবিতা স্বীকার করে সীমাহীন পরিণামের সমদ্রে বিরতিই পূর্ণতা। পূর্ণতার সত্য মানুষের চিত্তে নিহিত। লক্ষ্যমুখি ইচ্ছাশক্তির সামর্থই জরুরী। অধিকাংশ মানুষের জীবনে সেটি দৃশ্য হয় না। দৃশ্যতাও বাধা পায়। মননুষ্যত্ব বিকাশের দিগ দিগন্ত পূর্ণ অবারিত ঐশ্বর্য মানব গ্রহণ করতে পারে না। ইচ্ছাশক্তির দ্বারা লাভ করতে হবে। “আমরা সংকুচিত হইয়া, দীন হইয়া, অতিক্ষুদ্র আকাঙ্ক্ষা লইয়া, সেই অবারিত ঐশ্বর্ষের অধিকার হইতে নিজেকে বঞ্চিত করিব কেন? হাত বাড়াও।”
সংস্কার,
৩৯॥ জীবনের কাছ থেকে পালানো সহজ, তার সঙ্গে লড়ে জয়ী হওয়াই কঠিন;
কেননা এ লড়াই চিরজীবনব্যাপী, এক মহূর্তে তার বিরাম নেই।
সংগ্রামই জীবন । সংগ্রামহীনতা মৃত্যুর নামান্তর মাত্র। ব্যক্তি ও জাতি উভয়- ক্ষেত্রে এটি সত্য। বিজ্ঞান জানিয়েছে, মানুষ সংগ্রামী দীক্ষা নিয়েছে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে। যোগ্যতমের উদ্বর্তন ঘটিয়েছে। ব্যক্তি-মানুষকেও অনুরূপে সংগ্রামী-পথ বেছে নিতে হয়। জীবনে আদর্শায়িত সাফল্য কাম্য। কিছু সহজাত প্রবৃত্তি ও মানসপ্রকৃতি মূলধন করে যে-শিশুকে পৃথিবীতে প্রবেশের ছাড়পত্র পেতে হয়, সংগ্রামের পক্ষে সে নিরস্ত্র এক অপরিণত মানুষ মাত্র। স্বধর্মের অব্যহত বিকাশের জন্য বহির্জগতের রণক্ষেত্রে তাকে আক্রমী ব্যূহের মধ্যে প্রবেশ ও ব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসার দক্ষতা তৈরী করে নিতে হয়। নিরস্তর দ্বন্দ্বে-সামঞ্জস্যে তার স্বতন্ত্র মানবিক পূর্ণতার এইটিই একমাত্র পথ । তার যাত্রাপথের অবিচ্ছন্ন সঙ্গী হল আত্মশক্তি ও আত্মজ্ঞান । তাই, অর্জিত ও অর্জনশীল সফলতার উজ্জ্বল দৃশ্য পরোভূমি ব্যক্তির নেপথ্যলোকে সংগ্রামী দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে দেখা যায় নীতি ও আদর্শ, জাতীয় প্রভাবী দৃষ্টিকোণ প্রভৃতি সামাজিক উত্তরাধিকারে তার অস্তিত্ব পরিবৃত। যেগুলি তার ব্যক্তিতা-নির্মাণের বিরোধী সেগুলি পায় নির্মম প্রতিরোধ । জীবনকে সুগঠিত করা ও গঠিত জীবনকে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে সুস্থিতি দেওয়া মনের শক্তিসাপেক্ষ। অনিবার্য, নিরন্তর, প্রাণদীপ্ত সংগ্রাম-সামর্থ্য যাদের নেই তারা জীবনের অভিমুখিতার আবরণে পলায়নের প্রকৃতি আবৃত করে রাখে । তারা ধূলিময় সমাজ-সংসার ত্যাগ করে নির্জন-নিঃসঙ্গ গুহায়িত জীবন বেছে নেয়। পৌরুষহীন, অনর্থক, অ-মানুষিক সে জীবন। কিন্তু নির্বাধ পথের যাত্রীদের কাছে সংকীর্ণ আত্মসিদ্ধিই মানবাদর্শ । এইসব পলায়নবাদী ও পলাতক মানষের সৈনিক-ভূমিকা অদৃশ্য । পৃথিবীর আলো-অন্ধকার, পঙ্ক-পঙ্কজ প্রভৃতি বিপরীতকে স্বীকরণের ও আত্মপথ নির্মাণের অভীপ্সু, মানষেই বিবেচ্য। তুলনীয়ভাবে জাতীয় জীবনের ক্ষেত্রে সংগ্রাম ও সংগ্রামবিমাখতার দৃষ্টান্ত দুর্লভ নয়। দেশাচার, লোকাচার, স্বার্থ বৃদ্ধি, বিপরীত জ্ঞান জাতীয় জীবনপ্রবাহকে শৈবালমন্থর করে দেয়। সেখানেও আছে সংগ্রামের গরুত্বে।নিজত্বকে রক্ষা ও বিকশিত করার সপক্ষে স্ববল ও সজ্ঞান ব্যক্তির বা জাতির এই যুদ্ধকাল আমৃত্যু ব্যাপ্ত। তার বিরতিই ব্যর্থতা ।
৪০॥ অতিদীন ও অশক্ত ব্যক্তিরাই দৈবের দোহাই দিয়ে থাকেন ।
সংগ্রাম-চেতনা নিয়ে পৃথিবীতে বাস করাই সত্যকারের বেঁচে থাকা। এই সংসার সমর ক্ষেত্রে যারা নির্ভীক সৈনিক হতে পারেন, প্রতিকূলতার বাধা অতিক্রম করতে যারা অশক্ত ও অক্ষম, মানসিক ভাবে যারা দীন,—তারা পৃথিবীতে সত্যকারের মন্ত্র জানে না। ‘দৈব’কে পরম মলধন ক’রে শুধু, ‘দিন যাপনের আর প্রাণ ধারণের গ্লানি’ বক্ষে বহন ক’রে কোন ক্রমে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করে। জীবনের বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়—যা’রা পৃথিবীতে নানাক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, পেয়েছে প্রশংসার বরমাল্য, তাদের অগ্রগতির মুলধন ‘দেব’ নয় পুরুষাকার, পরনির্ভরশীলতা নয়, সাবলম্বন শক্তি। প্রাসঙ্গিক ভাবে স্মর্তব্য “মানষু আপনার ঘর আপনি রচনা করে।” মানুষ স্বীয় কর্মপ্রয়াসের দ্বারাই ভাগ্য প্রস্তুত করে। বিপদের ঘূর্ণিবাত্যা জীবনের পথকে সংকটময় ক’রে তুললেও তারা কম্পিত হয় না, বিপদ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বিশ্বদেবতার কাছে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে প্রার্থনা জানায় না বরং বিশ্বদেবতার কাছে কামনা করে শক্তি বা ক্ষমতার আশীর্বাদ। কবির ভাষায় এই সমস্ত ব্যক্তিদের প্রার্থনার ভাষা এইভাবে দেওয়া যায়-
‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।’
জীবন-সংগ্রামে কোন বিপদ উপস্থিত হ’লে নির্ভীক ও পরিশ্রমী-ব্যক্তিরা অত্মশক্তিতে বিশ্ববাসী হ’য়ে উক্ত বিপদের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হন। তার ফলস্বরূপে তাঁ’রা পান অকৃত্রিম সাফল্য । পক্ষান্তরে, অশক্ত ও দুর্বল মানুষেরা বিপদের সম্মুখীন হ’লে হয়ে সংকুচিত হ’য়ে যায়, বিপদের মোকাবিলা করার মতো সাহস, শক্তি ও মানসিকতা তাদের থাকে না। তাই বিপদ থেকে ত্রাণ করার জন্যে দৈবের কাছে তারা শক্তি প্রার্থনা করে।
নিজেকে ভাগ্যকর্তা মনে ক’রে নিয়ে অসীম অধ্যাবসায়, নিষ্ঠা ও অকুতোভয়ে উন্নতির সোপাম প্রস্তুত করতে হয় মানুষকে। তার জন্য প্রয়োজন নিরলস সাধনা ও অদম্য কর্মপ্রচেষ্টা। ভীরু ও কর্মবিমুখ হয়ে আদর্শচ্যুতি হ’লে চলবে না। নিষ্ক্রিয় অদৃষ্টবাদী ব্যক্তিদের ভগবান সাহায্য করেন না। তিনি তাঁদেরই সাহায্য করেন যাঁরা কখনই বিরত হন না। ‘God helps those who help themselves.’ কিন্তু অশক্ত ও দুর্বল ব্যক্তির ভীরু ও কর্ম বিমুখ। বিপদের অবির্ভাবে তারা সন্ত্রস্ত হয় এবং তাদের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। তাই তারা উন্নতি লাভ করতে পারে না। জীবনে প্রতিষ্ঠা দৈবাধীন ভেবে তারা কালের হাতে নিষ্ক্রিয় পুতুলের সাদৃশ্যে প্রদর্শিত হয় মাত্র ।।
৪১॥ যথাসাধ্য ভলো বলে ‘ওগো আরো –ভালো
কোন স্বর্গপুরী তুমি করে থাকো আলো?’
আরো ভালো কেঁদে কহে ‘আমি থাকি, হায়,
অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্যায়।’
মানুষের কর্মসিদ্ধি একান্ত সাধ্যসাপেক্ষ। সাধনার মধ্যে তুলনীয় আত্মনিষ্ঠ প্রচেষ্ঠার দ্বারা সে কাজটিকে আদর্শ সফলতা দিতে চায়। যে-কোনো কৃতকর্ম’ তাই, ব্যক্তির প্রতিভা ও দক্ষতার উৎপাদিত প্রতিরূপ মাত্র। সৃষ্টির জগতে মানুষের এবং নিসর্গের জগতে প্রকৃতির সুন্দর কাজগুলি সাধ্য চেষ্টার সীমাকে অতিক্রম করতে পারে না। এইটি বাস্তব, এইটিই সত্য। কিন্তু স্বাভাবিক সত্যের বাইরে আরো একটি উচ্চারণ ও আকাঙ্ক্ষাগত সত্য আছে ; সে-সত্যের কাছে যে কোনো কর্মই মূল্যেবান, কারণ সেটি ভালো হলেও ভালোতর নয়। ভালোতর হওয়ার ব্যাপারটি অবাস্তব ও অসংগত, তা সনিষ্ঠ মানষের সাধ্যের কথা বলে না। আকাশমুখী কল্পনার প্রেরণায়
সে পষ্ট হয়। পৃথিবীর ধূলিময় জগতে তার পদচিহ্ন দেখা যায় না। যারা নিষ্ক্রিয় মানুষ, যাদের মধ্যে কর্মশক্তির পরিবর্তে বিচারী সংকীর্ণ অহংবোধের প্রাধান্য আছে, তারা সৃষ্ট বিষয়ের পারোৎকর্ষকে সাপেক্ষের প্রতিতুলনা দিয়ে অবমূল্যায়িত করে। সফল কর্ম ও তার তন্নিষ্ঠ কর্মীর প্রতি ঈর্ষা প্রকাশই তার একমাত্র শক্তি । এইভাবে সে পৃথিবীতে নিজের গুরুত্ব রচিত ও মহিমান্বিত করতে চায়। সাধ্যাতিরিক্ত কর্ম অসম্ভব, প্রকৃত কর্মী তা নিজের বা অপরের কাছে দাবিও করে না । পৃথিবীতে এরা সংখ্যাগণ্য, বিরল। যারা কিছুই করে না, অলস কল্পনার রঙিন দুর্গে যাদের বাসভূমি, আত্মশক্তির অনুশীলনের দ্বারা সাধ্যকে যারা সম্পন্নতা দিতে পারে না, এবং অনুষ্ঠিত কর্মের মূল্যায়নে স্বরচিত অবাস্তব আদর্শের শরণাপন্ন হয়, তারাই অনন্য- সংখ্যকে। যথার্থ কর্মী মানুষ উচ্চমন্যতার প্রতি উদাসীন থেকে শক্তিকে সাধ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে এবং ঈপ্সিত কর্ম’কে দেয় সাৰ্থক সম্পন্নতা ৷৷
৪২॥ মুকুট পরা শক্ত, কিন্তু মকুট ত্যাগ করা আরও কঠিন।
মুকুট রাজশক্তি ও রাজকীয় দায়িত্বের প্রতীক। কিছু ক্ষমতালোভী মানুষ রাজকীয় সম্পদ ভোগের কামনায়, রাজকীয় ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য তথা রাজমকুটে অলঙ্কত হবার জন্য ক্ষমতা অধিকারের লোলুপ হাত প্রসারিত করে ভোগ ও ঐশ্বর্ষের বিপুল আয়োজনের জীবন অতিবাহিত করবে—এই আশা নিয়ে মকুট পাবার জন্য লোভী হয়ে ওঠে। কিন্তু তীক্ষ্ণদৃষ্টি তথা বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে সেই ক্ষমতালোভী মানুষ যদি রাজমুকুটের প্রকৃত আলঙ্কারিক রূপের দিকে দৃষ্টিপাত করতো তাহলে দেখতে পেতো রাজমুকুটের মধ্যে আত্মগোপন করে আছে বহু মানুষের কল্যাণচিন্তা, দারিদ্রমুক্তির উপায় ও দঃসহ যন্ত্রণার বিরতি রাজসম্পদ বা রাজকীয় ক্ষমতা লাভের জন্য শ্রম ও বৃদ্ধি প্রয়োগ করতে হয়, সংগ্রামী মনের সার্বিক প্রকাশকে রূপ দিতে হয়। কিন্তু একবার সেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে, রাজমুকুট একবার পরিধান করলে, ত্যাগ করা আরও কঠিন। দায়িত্বশীল নৃপতির দায়িত্ব একটা দিক থেকে ক্রমান্বয়ে আর একটি দিকে প্রসার লাভ করে, চিন্তা ও দায়িত্বের ব্যাপ্তি রাজাকে সর্বদাই উৎকণ্ঠিত করে রাখে। বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও রাজ্যের স্থিতাবস্থা অক্ষরে রাখার জন্য সদাব্যাপত থাকেন রাজা। কবি রবীন্দ্রনাথের “গান্ধারীর আবেদন’ কাব্যনাট্যে বর্ণিত দুর্যোধনের সংলাপ থেকে এই, বক্ত্যব্যের সত্যতা পষ্ট হয়ে ওঠে :
‘সম্মুখের অন্তরালে, পশ্চাতের ভয়,
অহর্নিশ যশঃশক্তি গৌরবের ক্ষয়,
ঐশ্বর্যের অংশ-অপহারী ।”
রাজমুকুটের দায়িত্ব তাই সীমাহীন।
এই দায়িত্ব একবার গ্রহণ করলে, দায়িত্বের বৃন্ত থেকে বের হওয়া আরও কঠিন। ইংরাজীতে একটা প্রবাদ আছে :
‘To earn money is hard, to save money is harder and to uitilise money is hardest.”
এই প্রাসঙ্গিকতার সুর নিয়ে বলা যেতে পারে রাজকীয় ক্ষমতা অর্জন করা কঠিন, রাজকীয় ক্ষমতার অধিষ্ঠিত থেকে রাজ্যের স্থিতাবস্থা বজায় রাখা কঠিনতর, প্রকৃত ক্ষমতা ব্যবহার কঠিনতম। রাজমুকুট, তাই, শধু, ভোগ ও বিলাসের ইঙ্গিতবাহী নয়, গভীর দায়িত্ব সচেতনতার প্রতীক ॥
৪৩॥ রাজা ভাবে, নব-নব আইনের ছলে
ন্যায় সৃষ্টি করি আমি” । ন্যায় ধর্মবলে,
আমি পুরাতন, মোরে জন্ম কেবা দেয়—
যা তব নুতন সৃষ্টি সে শুধু, অন্যায় ।
ন্যায়ধর্মের স্রষ্টা কোন ব্যক্তি-মানুষ নয়। শক্তিধর সম্রাটও নয়। প্রকৃতির বিধানই ন্যায়ধর্ম”। তার বিরোধিতাই অন্যায়। মানষের স্বার্থপরতা ও দেহবুদ্ধি প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিবিধির বিপরীত হলে প্রকৃতি তার প্রতিবিধান করে। জীবের বিকাশ ও বৃদ্ধি প্রাকৃতিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য মাত্র। সামঞ্জস্যই জীবন। তার অভাবই মৃত্যু। প্রকৃতির এই ধর্ম’ আদর্শ’ ন্যায়ধর্ম হিসেবে বিবেচিত। পৃথিবীর মত সে পরাতন । নৈসর্গিক বলে সে স্বয়ম্ভু। সংগতি-সৃষ্টিই তার আদর্শ ।
প্রাকৃতিক ন্যায়ধর্মে’র সঙ্গে রাজার নায়ধর্মে’র কোনো সংগতি নেই। রাজার ন্যায়ধর্ম” মূলত সৃষ্ট অন্যায়ধর্ম’ মাত্র। ক্ষমতার দন্ড, ভোগ-লালসা, ব্যক্তি- স্বার্থপরতা, আধিপত্যের ক্রমপ্রসার প্রভৃতি অক্ষুণ্ণ রাখাই রাজার লক্ষ্য । কুসুমাস্তীর্ণ আরাম বজায় রাখার জন্য তিনি শাসনের নামে শোষণ করেন। পীড়ন ও অত্যাচারের উপরে তার রাজদণ্ড উজ্জল দৃশ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু দুর্বিসহ শোষণ-যন্ত্রণা আর অনবচ্ছেদ পীড়ন সাধারণ মানষকেও কোনো বিদ্রোহী করে তুলতে পারে। প্রতিবাদের মানবিকতা, প্রতিঘাতের মানসিকতা সম্পর্কে অবহিত রাজা নতুন-নতুন আইন সৃষ্টি করেন। রাজার কাছে তা আইনের নামে ন্যায়ধর্ম’-সৃষ্টি বলে বিবেচিত হলেও তা অন্যায়েরই নামান্তর মাত্র। মানষের স্বাভাবিক স্বাধীন জীবন আত্মস্বার্থের প্রয়োজনে যিনি শৃংখলিত করতে চান তিনি ন্যায়ধর্মের নন, অন্যায়ের নির্মম স্রষ্টা। নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি ভেবেছেন কত রাজা, আইনের নামে অন্যায়ের কর্মধারা পাঞ্জীভূত করেছেন। ইতিহাসে তারই সাক্ষ্য আছে। রাজার উচ্চারিত ন্যায়ধর্মের জন্য ফরাসী বিপ্লব ঘটেছে, আমেরিকায় ও ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন হয়েছে, বিপ্লবের অস্ত্র নিয়ে জেগে উঠেছে রাশিয়ার নিপীড়িত মানুষে। রাজার ন্যায়ধর্মের উচ্চারণ, তাই, অসত্য ও উপহাস্য। ন্যায়ধর্ম ও আইন দুটি পৃথক জিনিস, পৃথক প্রয়োজন, পৃথক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আবির্ভাব।
৪৪॥ হাত জোড় ক’রে নয়, হাত মুঠো করেও নয় ।
পেতে হলে হাত লাগাতে হবে।
সাফল্যই জীবন । সাফল্যই মানবিক অভীপ্সা। নিষ্ক্রিয়, নিশ্চেষ্ট জীবনে নেই সফলতার বিদ্যুৎ ঝলকানি। ব্যর্থতার দুর্ভেদ্য অন্ধকারই তার ভাগ্যের একমাত্র সঞ্চয়। সক্রিয় মানষে তা মেনে নেয় না। প্রয়োজন হয় সফলতার পথটি নির্ণয় করা। ব্যক্তির সহজাত প্রবৃত্তি, আত্মবল ও মননের সঙ্গে আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের সংযোগ ঘটানো প্রয়োজন, এই সংযোগরেখাই সেই পথ। দুস্তর বাধা, দুর্গম দূরত্ব, বিভেদী আবহ সেই পথে নিরন্তর দৃশ্য হতে পারে। এ-সব মেনে নিয়েই যেটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় তা হল ব্যক্তির প্রকৃতিগত মানসতা। মানসতাই আভিমুখিতাকে সঠিক পথ নির্বাচন করায়।জীবনে মানষের অনেক কিছ, আবশ্যক। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান প্রভৃতি জীবনযাপনের বিষয়গুলির পাশাপাশি স্বাধীনতা, অধিকার, স্বীকৃতি প্রভৃতি নৈতিক জীবনীয়গুলিও জরুরী। বর্ণ, শ্রেণী, সমাজ ও অর্থ অ-মানবিক নানা বৈষম্য সৃষ্টি করে। দেশের যারা সাধারণ অথচ সংখ্যাগুরু, তারা অসাম্যের স্বদেশে শোষণের বঞ্চনার জীবন জোটায়। মানবিক সফলতার জন্য ভাঙতে হয় অসাম্যের অচলায়তন, দিতে হয় স্বাধিকারের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু অর্জনের ক্ষেত্রে প্রার্থনার আনুগত্য লক্ষ্যসিদ্ধি ব্যর্থ করে। আত্মশক্তির অভাব, আশ্রম আলস্য, অনুগ্রহ-নির্ভরতা কখনো সাফল্য দিতে পারে না। ‘ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ’। ভিক্ষার দৈন্যে অবিশ্বাসী মানষ প্রতিবাদের পথ অনুসরণ করে। নিছক শারীরিক আস্ফালনও সিদ্ধির বাধা । কেননা যে-দাবির সঙ্গে আনুপাতিক শ্রমের যোগ নেই, সে দাবি নিরালম্ব ও শূন্যগর্ভ । সাফল্যের উৎস ঘনিষ্ঠ শ্রমে। ভিক্ষাবৃত্তি নয়, নিরর্থক দাবি নয়, শ্রমশক্তিই সাফল্যের সম্ভাবনাকে পরিণতি দেয়। মানুষের চাওয়ার সঙ্গে পাওয়াকে মেলাতে হলে যোগ্য মানসতার নির্মিতি একান্ত প্রয়োজন। সে-মানসতার পরিচয় আগ্রহী কর্ম-সচেতনায় নিহিত। ব্যক্তি-জীবনের প্রসঙ্গে এই সত্য জাতীয় জীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি জাতির আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপায়ণের ক্ষমতা জাতির শ্রম-প্রবণতায় দৃশ্য হয়। ঘৃণ্য পরানুগ্রহ, উদ্ধত আস্ফালন জাতির বিকাশের পথ রুদ্ধ করে। চাই তন্নিষ্ট শ্রমমুখিতা। স্বনির্ভরতার আদর্শ মেশানো সক্রিয়। শ্রমশক্তিই অর্জনের অঙ্গীকার, সাফল্যের সংকেত ৷
৪৫॥ বিশ্ব-পিতার মহাকায়বার এই দুনিয়াটা।
মানষে তাহার মহা মূলধন কর্ম তাহার খাটা।
বিশ্বস্রষ্টার সৌন্দর্যলীলায় লীলায়িত এই পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জীবরূপে আবির্ভূত হয়েছে মানুষে । এই পৃথিবী যেন তাঁর বিশাল ব্যবসাক্ষেত্র আর তিনি তার মালিক। এই অনন্ত বিস্তৃত ব্যবসা ক্ষেত্রে মানষে তাঁর প্রধান মলধন। কারণ সাধারণ ব্যবসায়ী যেমন তার ব্যবসায় পুঁজি অর্থাৎ মূলধন ঠিকমতো ব্যবহার করলে ব্যবসায় লাভ করে, জীবনে উন্নতি করতে সক্ষম হয়, তেমনি মূলধনরপে মানুষকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ী অর্থাৎ নিখিল জগতের সর্বজীবের মহাদেবতা তাঁর লীলাক্ষেত্র বসুন্ধরাকে আরও সুন্দর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন। কোন উর্বর জমিতে উপযুক্ত জল, সার ইত্যাদি নিয়ে ঠিকমতো চাষ করলে প্রচুর ফসল ফলে, যেগুলি চাষীদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু ঠিকমতো চাষ না করলে যতই তার উর্বরতা থাক না কেন, তাতে কি সোনারূপ ফসলের সম্ভাবনা দেখা যায়? তেমনি এই বিশাল মনুষ্য শক্তির অপচয় হলে, মানুষ কর্মবিমুখ হলে কি বিশ্বের রূপে মহিমময় হয়ে উঠতে পারে? নিশ্চয়ই পারে না। রামপ্রসাদ সেনের ভাষায়-
‘এমন মানবজমিন, রইলো পতিত
আবাদ করলে ফলতো সোনা ।
এখানে ‘আবাদ’ কথাটির অর্থ কর্ম’। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যদি কর্মক্ষেত্রে নিজেদের নিয়োগ করে তাহলে তাদের বাসস্থান এই পৃথিবী অপরূপ শোভায় শোভিত হয়ে ওঠে। তাতে মানুষ যেমন সন্ধান পায় সুখ ও আনন্দের অফরেস্ত ভাণ্ডারের তেমনি বিশ্ব-পিতা, যিনি এই মানষের জন্মদাতা, তিনিও পরম আনন্দিত ও খুশী হন। কারণ, সন্তান পিতার মহিমা ও গৌরব বৃদ্ধি করলে পিতা সন্তানের উপর খুশী হবেন,—এ তো স্বাভাবিক নিয়ম।
কর্মই জীবন। পৃথিবীর চতুর্দিকে কর্ম-চাঞ্চল্যের স্পন্দন অনভূত হচ্ছে। চারদিকে জীবনের উম্মাদনা । কেবল অলস, নির্জীব, অকর্মণ্য ও অদৃষ্টবাদী ব্যক্তির দল কর্মবিমুখ হয়ে অদৃষ্টের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। তারা বিস্মৃত হয়ে যায় যে, স্বয়ং বিশ্বপিতাই আপন নিয়মে কর্মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ।
‘কর্মযোগে তাঁর সাথে এক হয়ে ঘর্ম পড়ুক ঝরে।’
বা, ‘তারি মতো শুচিবসন ছাড়ি আয় রে ধূলার ‘পরে।’
কর্ম বিমখে ও কুসংস্কার-বিজড়িত মানষে এই আহ্বান উপেক্ষা করে অলস হয়ে বসে থাকে । তারা অকৃতজ্ঞ, কৃতঘ্ন, কারণ, যে বিশ্বপিতা তাদের পৃথিবীতে স্থান দিয়েছেন সেই বিশ্বপিতার পরম মহিমময় সৃষ্টি পৃথিবীকে সুন্দর অপরূপ করার মানসিকতা তাদের মধ্যে দেখা যায় না। তাই বিশ্বপিতা তাঁর এই অকর্মণ্য সন্তানদের উপর সন্তোষ বিধানে বিমুখ হন। তারা জীবনে সুখী হতে পারে না। এই সকল মানষে নকল মুদ্রার মতোই বিশ্বপিতার কাছে মূল্যহীন, অচল মুলধন মাত্র ।
৪৬॥ বেদীতে না বসিলে আমাদের উপদেশ কেউ মানে না, রঙ্গমঞ্চে না চড়লে আমাদের অভিনয় কেউ দেখে না, আর কাষ্ঠমঞ্চে না দাঁড়ালে আমাদের বক্তৃতা কেউ শোনে না ।
খ্যাতি-লোভ মানষের চিরন্তন প্রবৃত্তি। একক মানষে আত্মকেন্দ্রিক। স্বরচিত জীবনের সংকীর্ণ বৃত্তে তার অবস্থান। সামাজিক মানুষে সম্পর্কের জগতে প্রসারিত হতে চায় । বহুর মধ্যে নিজের অস্তিত্বকে সে শব্ধে, নির্মাণ করে না, তাকে বিশিষ্টতায় প্রদীপ্ত করতে আগ্রহী হয়। এই আগ্রহই খ্যাতি-লোভ। এই মানসতাই লোকখ্যাতির প্রতি আসক্তি। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাত মানুষ একই সমতল ভূমিতে দর্শক ও শ্রোতার মুখোমুখি হন না। লোক-জগৎ থেকে নিজেদের আচরণ ও উচ্চারণের জগৎকে দরেত্বের উচ্চতা দেন। ভূমিকার সঙ্গে ভূমিরও অনিবার্য’ বদল ঘটান। পরিবত মানষের কাছে গ্রহণীয় ও বরণীয় হবার জন্য তাঁরা এই পথই মনোনীত করেন। এইভাবেই সমাজের নিকট ও দূর দিগন্তে তাঁরা প্রসারিত হয়ে পড়েন এবং নিজের খ্যাতির ভাণ্ড ভক্ত-মণ্ডলীর নিবেদিত অর্ঘ্যে পূর্ণ করে চলেন । খ্যাতি-পিপাসু মানুষকেও মহাজনদের অনুসৃত পথই স্বীকার করে নিতে হয় ।খ্যাত হওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হচ্ছে প্রত্যক্ষতায় আসা এবং সেইজন্য মনোনীত মঞ্চারোহণ। সামাজিক লোক-খ্যাতির প্রচলিত প্রতিমানটি যতই প্রতিষ্ঠিত হোক, আরোহণের ব্যাপারটি ব্যক্তির সংগত ক্ষমতা-নির্ভর। উচ্চস্থানে ওঠার ক্ষমতা থাকা চাই । কেননা, এ ক্ষমতা শারীরিক নয়, মানসিক। প্রেরণাকে অননুশীলনের মাধ্যম না দিলে সফলতা আসে না । আয়ত্তের বহির্ভূত উচ্চস্থানে ওঠার প্রচেষ্টা মহাপতনের কারণ হয়। কিন্তু যে-ব্যক্তি সক্ষম ও অভিপ্রায়ী, আরোহণের স্তর তাঁর অবিচল পদক্ষেপের অনাগত হয়; দৃশ্য বাধাগুলো পেরিয়ে তিনি সেই স্তরে তাঁর মঞ্ছারোহণ-পর্ব সমাপ্ত করেন যেটি খ্যাতির প্রত্যক্ষ অনুষংগ। অভীপ্সা তখন সিদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হবার পথটি দৃশ্য ও সংক্ষেপিত করে। সামাজিক জীবনের বিভিন্ন সাফল্যের মুলে আছে নিজেকে আপাত উচস্থ করার বিচিত্র কৃত্রিম পর্ব। সাধারণ মানুষ তাকেই যথাযথ অসাধারণ বলে মূল্যায়িত করে ॥
৪৭॥ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় :
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
ব্যক্তির স্বভাবই অন্য ব্যক্তি বা বস্তুর মূল্য-নির্ণায়ক। ব্যক্তির স্বভাবগত বৈচিত্র্যই পৃথিবীতে এত বিভিন্নতা ও বিভেদের কারণ। বিষয়কে মানসিক বা জৈবিক উপযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়। সম্পর্কতার সামঞ্জস্যেই আসে তার সোওরতার প্রকাশ। একটি শস্যকণা মোরগের সুখানুভুতি বর্ধিত করে, কিন্তু একটুকরো উজ্জ্বল হীরক তার কাছে উদাসীন ও নিষ্প্রভ মূল্যের। এর বিপরীত ঘটে সৌন্দর্য চেতন ব্যক্তির কাছে। হীরক পায় অসীম রূপগত মূল্যায়ন, শস্যের নেই সেই সামর্থ্য। কবিতা রচনায় প্রসঙ্গের ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই উপাদান বিপরীত প্রেরণায় রূপায়িত হয়। কল্পনাশক্তির প্রকারভেদে সৃষ্ট চিত্রকল্প সংগত পার্থক্যে দৃশ্য হয় । হার্দ্য রূপানভূতি পার্ণিমার চাঁদকে সুন্দর সুখের সাদৃশ্যে ভাবে। উপমায়, রূপকে, উৎপ্রেক্ষায় কল্পনা তখন আলংকারিক মক্তি খোঁজে। অপরূপতায় অতি-আবিষ্টতা যে কবি ব্যক্তিতার পরিচয় উম্মাদ্রিত করে সে-ব্যক্তিতা জৈব-চেতনার দ্বারা নির্মিত নয়। তাতে নেই প্রাত্যহিক জীবনে বাঁচার সংগ্রামী সত্য, শ্রম ও স্বেদের যন্ত্রণা, রৌদ্র-বৃষ্টির অসহনীয়তা। মানসিক উপভোগের চৈতালিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা সেই কবি-প্রবণতার নির্মাতা। কিন্তু যে-সংবেদনশীলতা জৈবিক ক্ষুধার কান্না, দারিদ্র্যের পীড়ন, উপবাসের হাহাকারে আকৃত সে নিসর্গকে দূরত্বের সৌন্দর্ষে আদর্শায়িত করে না। কল্পনাশক্তি তখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মনোনীত প্রতিনিধি হতে পারে না, অগণ্য বাস্তব যন্ত্রণা-বিদ্ধ মানসতার অনিবার্য প্রতিভূ হয়। বাস্তবের রূড় , রুক্ষ, ধুসর পরিবেশে কবি-চৈতন্য তার শিকড় মেলে দেয়, তাই কবিতার পুষ্পায়নে আসে নতুন সমাধান ৷ ক্ষধিত মানুষের কাছে উজ্জ্বল চাঁদের বৃত্তাকৃতি ও বর্ণ একখানি ঝলসানো রুটির সাদৃশ্যে কল্পিত হয়। কল্পনা-নির্ভর সুন্দর ও অচেনা প্রসঙ্গ রূপান্তরিত হয় সন্নিহিত অতিচেনা প্রসঙ্গে । সমস্যাকীর্ণ কালপর্বে যথার্থ সমাজচেতনাই কবির কাছে প্রার্থিত। রুটির চিত্রকল্পে তারই জৈবিক সংকেত
৪৮॥ মরার পরে অল্প লোকই অমর হইয়া আছেন, সেইজন্য পৃথিবীটা বাসযোগ্য হইয়াছে ।
পৃথিবীটা পশুর নয়, মানুষের। যোগ্যতমের উদ্বর্তন মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে আধিপত্যের দুর্বার ক্ষমতা। বুদ্ধি ও দক্ষতা, প্রত্যয় ও প্রচেষ্টায় তার সাফল্য আজ সার্বভৌম। অসাধারণ ব্যক্তিদের আবিষ্কার ও উদ্ভাবন প্রাকৃতিক প্রতিরোধগলি ভেঙে পৃথিবীকে করেছে মানুষের স্বাভাবিক সংযত বাসভূমি। মানুষের সভ্যতা এগিয়ে চলেছে। সভ্যতার ক্রমবিস্তার বলতে মানুষের লক্ষমুখী সাফল্যই বোঝায়। এই সাফল্যের নেপথ্যে আছে মহৎ ব্যক্তিদের আদর্শ কীতিগুচ্ছ। সুদূরপ্রসারী বিকীর্ণতার জন্য মানবসমাজ সেই কীর্তির মানুষগুলিকে শ্রদ্ধা জানায়, তাঁদের মৃত্যুর পরে কৃতজ্ঞতায় শ্রদ্ধানত হওয়ার জন্য নির্মাণ করে স্মৃতিচিহ্ন। বিস্মৃতিপ্রবণ মানুষে সব কৃতি মানুষের কথা মনে রাখতে পারে না । অনেকেই বিস্মৃতির তিমিরে হারিয়ে যান, পরবর্তী গৌরব পূর্ববর্তী গৌরবের মানুষেকে বর্জন করে। সংখ্যাগণ্য মানুষই অমরত্ব অর্জন করেন । তাই তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন স্থাপিত হয় এবং সংখ্যাল্পতার কারণে সেই স্মৃতিচিহ্নগুলি অধিকাংশ মানুষের জীবনযাপনের স্বাভাবিকতাকে বিঘ্নিত করে না। পৃথিবী বলতে কিছু, মৃত্যুত্তীর্ণ মানুষের, ক্রিয়াকর্মের ভূমি বোঝায় না, অধিকাংশ সাধারণ মানুষের জীবনপ্রবাহ অব্যাহত রাখে যে মাটি তাকেই বোঝায়। পৃথিবীর বাসযোগ্য অস্তিত্ব ও অগ্রগতির মূলে আছে এই সব মানুষে, যাদের স্মৃতিস্তম্ভ কোনোদিন নির্মিত হয় না, কিন্তু পৃথিবীকে যুগ-যাগান্তর ধরে তারা গতিময় করে রেখেছে । শ্রম ও বিশ্রামের সংসার, প্রাত্যহিক জীবনযাপনের সংসার তাদের কলগানে ধ্বনিত হয়। ধূসর দৈনন্দিনতা তাদের ছোট ছোট হাসিকৌতুকে ঝলমল করে। সমাজের প্রাণপন্দন তাদের গতিবিধিকে মুখরতা দেয়। তারাই সংসারকে গতিময় করে, অবিচ্ছিন্ন প্রবহমানতায় বাঁধে। সাধারণ জীবনস্রোতে তরঙ্গভঙ্গ তুলে একদিন তারা মৃত্যুকে মেনে নেয়। অমরত্বের চিহ্নহীন এই জীবন তবু, ব্যর্থ নয়। প্রাকৃতিক সৃষ্টির প্রাচুর্য সংখ্যাগণাকে পরিণতি দেয়, কিন্তু ঝরে-পড়া অধিকাংশই প্রাণপ্রবাহকে নিশ্চিত করে। অমরত্বের সংখ্যাল্পতায় পৃথিবী বাসযোগ্য হয় আর সাধারণ মানুষ সমাজকে সঙ্গ ও জীবনকে গতি দিয়ে সেই বাসযোগ্যতাকে প্রসন্ন ও যথার্থ অবিকলতায় উজ্জ্বল করে।
৪৯॥ জীবনে সভ্যতার সাজ খোলাই কঠিন, পরা সহজ।
মানুষ অভ্যাসের দাস। সামাজিক বোধের উন্মেষই তার স্বনির্বাচিত দাসত্ব সূচিত করে। সামাজিক সত্তা পরামর্শ দিল আদিমতাকে আবৃত করতে, পারস্পরিতাকে প্রসারণ দিতে। অস্তিত্বের প্রয়োজনে মেনে নেওয়া পরামর্শই জন্ম দিল এক আদর্শ জীবন-যাপন পদ্ধতি, যার নাম সভ্যতা বা মানবিকতা। আত্মরক্ষা ও আত্মবিকাশের অভিঘাত সভ্যতার বৃত্তের ক্রমবৃদ্ধি ঘটিয়ে মানষের মনে সঞ্চারিত করল নৈসর্গিকতা থেকে সুন্দর হওয়ার প্রবণতা। নগ্নতা পেল আবরণ, নিঃসঙ্গতায় এল সমাজ, নিগৃহতা আশ্রিত হল। অগ্রবর্তী মানষিকতা জীবনের প্রতিটি প্রসঙ্গে নিয়ে এল বৈচিত্র্য, আর রূপান্তর ঘটিয়ে চলল । আজকের মানুষের কাছে সভ্যতা নতুন উদ্ভাবিত আদর্শ নয়, উত্তরলব্ধ সম্পদ। অভিজ্ঞতার অনুশীলনে সভ্যতা হয়ে উঠেছে অভিযোজন সামর্থের শক্তি, গতিশীল আচরণ। সভ্যতাই মানুষের অভ্যাসে এনেছে কর্মসম্পাদনের সমতা ও ক্ষিপ্রতা, স্বতশ্চলতা ও যথাযাথ্য ; আয়াস ও প্রতিরোধ শক্তি। নিরাপত্তা ও শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি, সবই দান করেছে সভ্যতা। আজকের মানুষ তার অন্তরায়িত আচরণকে পিছনের দিকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানষের জীবনে বারে– বারে হানা দেয় ; মানুষ ঘটায় যুদ্ধ ও হত্যা, শোষণ ও যন্ত্রণা ৷ সভ্যতা-বিরোধী ঘটনা অশ্রুকে করেছে নির্ঝর, রক্তকে করেছে নদী। কিন্তু মানষের অর্জিত সভ্যতা, উজ্জল মানবিকতা তারই প্রতিরোধ করেছে। পিছু-ফেরা পরিবর্তন আর সম্ভব নয় । সেই নগ্নতা, সেই বর্বরতা, সেই আদিমতার জীবনে প্রত্যাবর্তনের অর্থ সভ্যতার মৃত্যু, মানবিকতার মহাপ্রয়াণ। জীবন কখনো পীড়ন চায় না, পরাজয় চায় না । সভ্যতাকে বর্জন করা যায় না বলে বর্জন করা অনুচিত। তাই সভ্যতা-বিরোধিতাকে আঘাত হানার জন্য পৃথিবীর ঘরে ঘরে সদাজাগ্রত মানবিকতা তার হাতিয়ার নিয়ে প্রস্তুতে কেননা, সভ্যতার ঐচ্ছিক দাসত্বই উজ্জ্বল মানবিকতার অঙ্গীকার ॥
৫০॥ মানষের চরিত্র, বিশেষত তাহার দোষগুলি, ঝোপঝাড়ের মধ্যেই থাকে
এবং শব্দ শুনিলেই দৌড় মারিতে চায়, এইজন্যই নিন্দায় এত সুখ।
মানুষ সুখান্বেষী। ব্যক্তির সফলতার অন্য ব্যক্তি প্রশংসা-ধ্বনি করে, বিফলতায় বা ত্রুটিতে নিন্দা-মুখের হয়। নিন্দাও একপ্রকার সামাজিক আচরণ। প্রশংসা নয়, নিদার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। বাক্তি বা গোষ্ঠীকে পৃথিবীতে কিছু কাজ করতে হয়। কাজই কর্মী’কে চেনায়। চেনায় ধন্য হয় না এমন মানষের কৌতূহল বৃত্তি কর্মীর চরিত্রে ও কাজের মধ্যে ডুব দেয়, ভেতরের সত্যকে খোঁজে। অপরের সত্য তার কাছে যথার্থ নয়, আবৃতের প্রতি দুর্মার স্পৃহা তার। বৃদ্ধির একটা উৎকন্দ্রিক দিক আছে, যার দ্বারা প্রত্যক্ষ সত্য বর্জিত হয়, নিন্দাই দুর্লভ অন্তর্নিহিত সত্য যোগ্য প্রাপ্তিরূপে মূল্যায়ন পায়। বাহিরের সত্যও সত্য, সেটা ফলের সাধারণ সত্য, আঁটির সত্যই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে যাঁরা আদর্শ বা গুণী তাঁদের ভাগ্যে নিন্দা জোটে বেশি। কেননা তাঁরা কিছু কাজ করেন, তাঁদের কাজ মানবসমাজের কল্যাণের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক, সেই কৃতকর্ম’ তাঁদের চরিত্রকে সাধারণের ঊর্ধ্বে উন্নীত ও প্রদীপ্ত করে । নিষ্কর্মা মানুষের ক্ষেত্রে নিন্দার্হ কিছু থাকে না, নিরবচ্ছিন্ন নিন্দা বর্ষণই তাদের একমাত্র কাজ । জীবনের শূন্যেতাকে এইভাবে তারা হাস্যকর পরিপূর্ণতা দিতে চায়। তবু, সামাজিক প্রয়োজনের দিক থেকে নিন্দার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। নিন্দা যথার্থকে চেনায়, তুলনায় হাজির করে, সংশোধন করায়। পারোৎকর্ষের সাফল্যের পথ সাধারণত সুদেীর্ঘ হয়, সেই পথ ভ্রান্তিতে বিসর্পিত আর নিন্দায় কণ্টকিত । মহত্ত্বের গৌরব উজ্জল হয় এ-সব বাধাকে সানন্দ স্বীকৃতি ও উত্তীর্ণতা দিতে সক্ষম হলে। নিন্দাই সমাজকে বিকৃতির হাত থেকে বাঁচায় । অবিশ্যি নিন্দুক মানুষ এ-সব তত্ত্ব-চিন্তায় বিনিদ্র রজনী কাটায় না ; বা বিদ্বেষের বিষ ছড়ায় না। বিদ্বেষে সুখ নেই, মাত্র নিন্দায় সে সুখ পেতে চায়। ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর ছোটখাটো আবৃত ত্রুটিগুলি যে পলায়নধর্মী, ভীর, ও চঞ্চল সে বিষয়ে সে অবহিত। শিকারীর মত প্রচ্ছন্নকে প্রকাশ করা, পলায়নকে বন্দী করার স্বভাব তার। সহজলভ্য বা নিশ্চলকে বাঁধায় কোন আনন্দ নেই। গতিকে বিদ্ধ নয়, বন্দী করেই একপ্রকার সুখ পায় সে। হাল্কা বা সাধারণ হলেও এ-সুখের সামাজিক মূল্য অনেকখানি ॥
৫১॥ শীত যদি এসে যায়, বসন্ত কোথা রয়।
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত – এই ষড়ঋতু চক্রে বর্ষযাত্রা আবর্তিত ৷ একটি ঋতু পরেরটির জন্যে আত্মদান করে, নিজের মধ্যেই জাগিয়ে তোলে আরেকটির সম্ভাবনা—এই হল প্রকৃতির নিয়ম। গ্রীষ্মের পরে যেমন বর্ষা এবং তারপরে শরৎ আসবেই তেমনি শীতের পরে বসন্তের আগমন অনিবার্য’। তাই খরবৈশাখে প্রকৃতি যখন জলতে থাকে তখন যদি কেউ ভাবে যে এই গ্রীষ্মই পৃথিবীর শেষ ঋতু, এর পরে নবীন মেঘের ঘোমটা মাথায় শান্ত স্নিগ্ধ জলের ঝারি নিয়ে বর্ষারাণী আসবে তাহলে সে সম্পর্ণে ভুল করবে। তেমনি ভুল হবে একথা ভেবেও যে পাহাড়ি দেশের হিমেল পরশ নিয়ে উত্তরপাবন যখন জীবজগতের দঃখ বয়ে আনবে, সে দঃখের কোনো শেষ নাই । বরং উলটো কথাটাই ঠিক। ফাল্গুনের উজ্জল প্রভাতে শীত-বায়ুর হি-হি করা আর্তনাদ হয় পরাভূত। মলয় পবনের রথে চড়ে হাতে নতুন ফলের গুচ্ছ আর পাগল- করা গানের সম্ভাবনা নিয়ে যার আবির্ভাব হয় সে ঋতুরাজ বসন্ত। গভীর প্রত্যয়ে শেলীকে তাই বলতে শুনি, If winter comes can the spring be far behind? শীত যদি আসে বসন্ত কি দূরে থাকে?
প্রকৃতিরাজ্যের এই সত্যটিকে আমরা মানবজীবনেও দেখতে পাই। সাময়িক দুর্যোগে আমরা যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি তখন স্বাভাবিক দূর্বলতাবশেই একথা ভাবি যে এই দুর্ভাগ্যের বুঝি আর শেষ নাই। কিন্তু এ অবস্থা কখনো স্থায়ী হতে পারে না। বরং প্রভাতের পূর্বে যেমন গভীর রাত্রির অন্ধকার বিরাজমান তেমনি আনন্দের আগেও একটি বেদনার দিন যদি আসে তাতে নিরাশ হবার কিছু নাই। দঃখের বিষ পান করতে পারলেই অমৃতময় সুখের দিন আসে। রবীন্দ্রনাথের গানে আছে-“দঃখের মন্থন বেগে উঠিবে এই অমৃত । শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যুভীত।”