উক্তি–পরিবর্তন
Ukti Poriborton in Bengali Grammar . Practice makes a man perfect . Hence practice from the given Examples of Narration Change . Ukti Poriborton – উক্তি-পরিবর্তনের কিছু নমুনা দেওয়া হল।
উক্তি: বাক্যে বক্তার কথাগুলো যখন যথাযথ উদ্ধৃত করা হয় বা তার ভাবটি প্রকাশকের নিজের কথায় বলা হয়, তখন তাকে বলে উক্তি। বাক্যে উক্তি দু’রকমের : ১. প্রত্যক্ষ ও ২. পরোক্ষ।
১. প্রত্যক্ষ উক্তি: বক্তার কথাগুলো যথাযথ উদ্ধৃত করার নাম প্রত্যক্ষ উক্তি। যেমন, অপূর্ব প্রশ্ন করিল, ‘আপনি এখন কোথায় যাবেন?’নিমাইবাবু হাসিয়া ঘাড় নাড়িলেন, কহিলেন, ‘তোমার নাম কি হে?’ যুধিষ্ঠির বলিলেন, ‘এখনই তাঁকে নিয়ে এস।’ রামসুন্দর আমাদের রায়বাহাদুরের হাতে-পায়ে ধরিয়া বলিলেন, ‘শুভকার্য সম্পন্ন হইয়া যাক, আমি নিশ্চয়ই টাকাটা শোধ করিয়া দিব।’
২. পরোক্ষ উক্তি: বক্তার কথাগুলো যথাযথ উদ্ধৃত না করে ও অর্থ অপরিবর্তিত রেখে তার মূল ভাবটি প্রকাশকের নিজের ভাষায় বলার নাম পরোক্ষ উক্তি। যেমন, অপূর্ব প্রশ্ন করিল যে, তিনি তখন কোথায় যাইবেন। নিমাইবাবু হাসিয়া ঘাড় নাড়িয়া সামান্য তাচ্ছিল্যের সহিত তাহার নাম জানিতে চাহিলেন। যুধিষ্ঠির তখনই তাঁহাকে লইয়া আসিবার আদেশ দিলেন। রামসুন্দর আমাদের রায়বাহাদুরের হাতে-পায়ে ধরিয়া নিশ্চয়তার গলায় বলিলেন যে, শুভকার্য সম্পন্ন হইয়া গেলেই তিনি টাকাটা শোধ করিয়া দিবেন।
উক্তি–পরিবর্তনের সাধারণ নিয়ম
১. প্রত্যক্ষ উক্তিতে বক্তার কথাগুলো যথাযথ উদ্ধরণ-চিহ্ন (‘ ’) বা ড্যাস-এর (—) মধ্যে থাকে। উদ্ধরণ-চিহ্নের আগে পাদচ্ছেদ (,) চিহ্ন বসে। পরোক্ষ উক্তিতে এই উদ্ধরণ-চিহ্ন তুলে দিয়ে উক্তিটির আগে ‘যে’ এই সংযোজক অব্যয় বসাতে হয়।
২. প্রত্যক্ষ উক্তির সর্বনাম, পুরুষ ও ক্রিয়াপদ পরোক্ষ উক্তিতে অর্থানুসারে রূপান্তরিত হয়।
৩. প্রত্যক্ষ উক্তির সম্বোধন পদে পরোক্ষ উক্তিতে কর্মকারক বা দ্বিতীয়া বিভক্তি যুক্ত হবে।
৪. প্রত্যক্ষ উক্তির কতকগুলো বিশেষণ বা ক্রিয়া-বিশেষণ, যেমন, ‘এখন’, ‘এই’, ‘এখানে’, ‘আগামীকাল’, ‘গতকাল্য’, ‘আজ’, ‘ইতিমধ্যে’, ‘এবার’, ‘আসা’; পরোক্ষ উক্তিতে যথাক্রমে ‘তখন’, ‘সেই’, ‘সেখানে’, ‘পরদিন’, ‘পূর্বদিন’, ‘সেদিন’, ‘তৎপূর্বে’, ‘সেবার’, ‘যাওয়া’ ব্যবহৃত হবে।
বিশেষ করে লক্ষ্য রাখবে এর ভাষারীতির দিকে। প্রত্যক্ষ উক্তিতে মূল ক্রিয়াপদটি সাধুরীতিতে থাকলে, উদ্ধৃতির বিষয়টিকেও সাধুরীতিতে রূপান্তরিত করতে হবে, আর প্রত্যক্ষ উক্তির মূল ক্রিয়াপদ চলিতরীতি হলে পরোক্ষ উক্তিতেও চলিতরীতি গ্রহণ করতে হবে।
নির্দেশমূলক বাক্য
১. প্রত্যক্ষ : বলরাম বললেন, ‘আমি এই সভার অধ্যক্ষ, আমার আজ্ঞা অবশ্য পাল্য।’
পরোক্ষ : বলরাম বললেন যে, তিনি ওই সভার অধ্যক্ষ, তাঁর আজ্ঞা অবশ্য পাল্য।
২. প্রত্যক্ষ : রামসুন্দর কহিলেন, ‘তা-হলে তোমাকে যেতে দেবে না, মা।’
পরোক্ষ : রামসুন্দর সস্নেহে কহিলেন যে, তাহা হইলে তাহাকে আসিতে দিবে না।
৩. প্রত্যক্ষ : রাজসিংহ বলিলেন, ‘আমি তোমার জীবন দান করিলাম।’
পরোক্ষ : রাজসিংহ বলিলেন যে, তিনি তাহার জীবন দান করিলেন।
৪. প্রত্যক্ষ : অপূর্ব কহিল, ‘বেলা হয়ে গেল, আমি তবে চললুম কাকাবাবু।’
পরোক্ষ : অপূর্ব কাকাবাবুকে বেলা হইবার দরুন চলিয়া যাইবার কথা বলিল।
৫. প্রত্যক্ষ : আগন্তুক অনুচ্চস্বরে বললেন, ‘মহারাজ, আমি সুবলপুত্র মৎকুনি, শকুনির বৈমাত্র ভ্রাতা।’
পরোক্ষ : আগন্তুক অনুচ্চস্বরে মহারাজকে সম্বোধন করে বললেন যে, তিনি সুবলপুত্র মৎকুনি, শকুনির বৈমাত্র ভ্রাতা।
প্রশ্নবোধক বাক্য (Interrogative Sentences)
প্রত্যক্ষ উক্তিটি প্রশ্নবোধক হলে উক্তি-পরিবর্তনকালে প্রকাশকের ক্রিয়াটি, ‘জিজ্ঞাসা করিলেন’, ‘প্রশ্ন করিলেন’ প্রভৃতি আকারে রূপান্তরিত হয়। বাক্যের শেষে জিজ্ঞাসা (?) চিহ্নের পরিবর্তে পূর্ণচ্ছেদ (।) বসে।
১. প্রত্যক্ষ : সর্দারজী শুধালেন, ‘অন্য কয়েদীরা চুপ করে রইল?’
পরোক্ষ : সর্দারজী জিজ্ঞেস করলেন যে, অন্য কয়েদীরাও চুপ করে ছিল কি না।
২. প্রত্যক্ষ : নিমাইবাবু কহিলেন, ‘তুমি গাঁজা খাও?’
পরোক্ষ : নিমাইবাবু সে গাঁজা খায় কিনা জিজ্ঞাসা করিলেন।
৩. প্রত্যক্ষ : অপূর্ব জিজ্ঞাসা করিল, ‘পলিটিক্যাল আসামী বুঝি?’
পরোক্ষ : অপূর্ব জিজ্ঞাসা করিল যে (লোকটি) পলিটিক্যাল আসামী ছিল কি না।
৪. প্রত্যক্ষ : বেণী ধমক দিয়া কহিল, ‘পারবিনে কেন?’
পরোক্ষ : বেণী ধমক দিয়া জিজ্ঞাসা করিল যে (সে) পারিবে না কেন।
৫. প্রত্যক্ষ : রমা মৃদু কণ্ঠে একবার মাত্র কহিল, ‘পারবে না আকবর?’
পরোক্ষ : রমা মৃদু কণ্ঠে একবার মাত্র জিজ্ঞাসা করিল যে, আকবর পারিবে কিনা।
অনুজ্ঞাসূচক বাক্য (Imperative Sentences)
প্রত্যক্ষ উক্তিটি অনুজ্ঞাসূচক হলে প্রকাশকের ক্রিয়াটি উক্তি-পরিবর্তনের সময় অর্থানুসারে ‘উপদেশ দিলেন’, ‘আদেশ করিলেন’, ‘অনুরোধ করিলেন’ ইত্যাদি আকারে পরিবর্তিত করতে হয়।
১. প্রত্যক্ষ : একদিন রামেন্দ্রসুন্দরকে কহিল, ‘বাবা, আমাকে একবার বাড়ি লইয়া যাও।’
পরোক্ষ : একদিন রামেন্দ্রসুন্দরকে বক্তা তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইবার জন্য খুবই অনুরোধ করিল।
২. প্রত্যক্ষ : দস্যু বলিল, ‘মহারাজ! এই দণ্ড মঞ্জুর করুন।’
পরোক্ষ : দস্যু মহারাজকে ওই দণ্ড মঞ্জুর করিতে অনুরোধ করিল।
৩. প্রত্যক্ষ : মৎকুনি জিহ্বা দংশন করে বললেন, ‘ওকথা আর তুলবেন না মহারাজ। আমার বক্তব্য সবটা শুনুন।’
পরোক্ষ : মৎকুনি জিহ্বা দংশন করে মহারাজকে ওকথা আর না তুলতে ও তাঁর বক্তব্য সবটা শোনার জন্যে অনুরোধ করলেন।
৪. প্রত্যক্ষ : রাজসিংহ বলিলেন, ‘মাণিকলাল, তোমার কন্যা লইয়া উদয়পুর যাও।’
পরোক্ষ : রাজসিংহ মাণিকলালকে তাহার কন্যা লইয়া উদয়পুর যাওয়ার জন্য আদেশ করিলেন।
৫. প্রত্যক্ষ : প্রশ্নকর্তা বলিলেন, ‘আপনি এইখানে থাকুন।’
পরোক্ষ : প্রশ্নকর্তা তাহাকে ওইখানে থাকিবার জন্য উপদেশ দিলেন।
প্রার্থনাসূচক বাক্য
১. প্রত্যক্ষ : মাণিকলাল তখন কাতরস্বরে বলিল, ‘মহারাজাধিরাজ, আমার জীবন দান করুন—রক্ষা করুন—আমি শরণাগত।’
পরোক্ষ : মাণিকলাল তখন কাতরস্বরে সে শরণাগত বলিয়া মহারাজাধিরাজকে তাহার জীবন দান করিতে ও তাহাকে রক্ষা করিতে প্রার্থনা জানাইল।
২. প্রত্যক্ষ : মাণিকলাল বিনীতভাবে বলিল, ‘মহারাজাধিরাজ! অনুগ্রহ করিয়া আমার প্রতি লঘু দণ্ডের বিধান করুন।’
পরোক্ষ : মাণিকলাল বিনীতভাবে মহারাজাধিরাজকে অনুগ্রহ করিয়া তাহার প্রতি লঘু দণ্ডের বিধান করিতে প্রার্থনা করিল।
৩. প্রত্যক্ষ : রমণী কহিল, ‘শৈলেশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।’
পরোক্ষ : রমণী শৈলেশ্বরের নিকট প্রার্থনা জানাইল যে, তিনি যেন তাঁহার মঙ্গল করেন।
৪. প্রত্যক্ষ : নরেন্দ্রনাথ দেবীকে বলিলেন, ‘মা, আমায় শুদ্ধা ভক্তি দাও।’
পরোক্ষ : নরেন্দ্রনাথ দেবীর কাছে প্রার্থনা করিলেন যে, দেবী যেন তাঁহাকে শুদ্ধা ভক্তি দেন।
৫. প্রত্যক্ষ : তিনি বলিলেন, ‘ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করুন।’
পরোক্ষ : তিনি ঈশ্বরের নিকট সকলের মঙ্গল প্রার্থনা করিলেন।
বিস্ময়াদিসূচক বাক্য
বিস্ময়াদিসূচক প্রত্যক্ষ উক্তিকে ভাব বুঝে ‘বিস্ময়’, ‘আনন্দ’, ‘খেদ’ ইত্যাদি অর্থবোধক শব্দের সাহায্যে পরোক্ষ উক্তিতে রূপান্তরিত করতে হয়।
১. প্রত্যক্ষ : নিমাইবাবু কহিলেন, ‘দেখো বাবা, এসব কথা যেন কোথাও প্রকাশ করো না।’
পরোক্ষ : নিমাইবাবু আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া ওইসব কথা কোথাও প্রকাশ করিতে তাহাকে নিষেধ করিলেন।
২. প্রত্যক্ষ : আকবর আলি এবার চোখ খুলিয়া সোজা হইয়া বসিয়া বলিল, ‘সাবাস! হ্যাঁ—মায়ের দুধ খেয়েছিল বটে ছোটবাবু। লাঠি ধরলে বটে!’
পরোক্ষ : আকবর আলি এবার চোখ খুলিয়া সোজা হইয়া বসিয়া মুগ্ধ ও সপ্রশংসকণ্ঠে ছোটবাবু যে যথার্থই মায়ের দুধ খাইয়াছিল তাহা বলিয়া তাহার (ছোটবাবুর) লাঠি ধরিবার কৃতিত্বের কথা বলিয়াছিল।
৩. প্রত্যক্ষ : শাশুড়ী ঝংকার দিয়া উঠিয়া বলে, ‘শ্রী তো ভারি! যেমন ঘরের মেয়ে তেমনি শ্রী!’
পরোক্ষ : শাশুড়ী ঝংকার দিয়া উঠিয়া তাচ্ছিল্যের কণ্ঠে বলিল যে, উহা আদৌ স্ত্রী নহে। যেমন ঘরের মেয়ে শ্রীও তেমনই হয় জানাইয়া সে আরও বিরক্তি প্রকাশ করিল।
৪. প্রত্যক্ষ : নিমাইবাবু হাসিয়া বলিলেন, ‘আগে তো পাই!’
পরোক্ষ : নিমাইবাবু আগে পাওয়া যায় কিনা তাহাতে সংশয় প্রকাশ করিলেন।
৫. প্রত্যক্ষ : জগদীশবাবু চটিয়া কহিলেন, ‘দয়ার সাগর! পরকে সেজে দিই, নিজে খাইনে! মিথ্যেবাদী কোথাকার!’
পরোক্ষ : জগদীশবাবু চটিয়া দয়ার সাগর বলিয়া (তাহাকে) ব্যঙ্গ করিলেন। পরকে সাজিয়া দেয়, নিজে খায় না বলিয়া উপহাস করিলেন এবং মিথ্যাবাদী বলিয়া ধমক দিলেন।
উক্তি–পরিবর্তনের আরও কিছু নমুনা (More Examples of Narration Change)
১. প্রত্যক্ষ : যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে আপনি সৌম্য?’ আগন্তুক উত্তর দিলেন, ‘মহারাজ, ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন, আমার বক্তব্য কেবল রাজকর্ণে নিবেদন করতে চাই।’ যুধিষ্ঠির বললেন, ‘সহদেব, তুমি এখন যেতে পার।’
পরোক্ষ : যুধিষ্ঠির সেই সৌম্য কে ছিলেন জানতে চাইলেন। উত্তরে আগন্তুক মহারাজকে তাঁর ধৃষ্টতা ক্ষমা করতে অনুরোধ করে তাঁর বক্তব্য কেবল রাজকর্ণে নিবেদন করতে চাইলেন। যুধিষ্ঠির সহদেবকে তখন চলে যাবার আদেশ করলেন।
২. প্রত্যক্ষ : ভীষ্ম বললেন, ‘মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, এই সভায় দ্যুতনীতিবিরুদ্ধ কোনও কর্ম যাতে না হয় তার বিধান আপনার কর্তব্য। আমি প্রস্তাব করছি শ্রীকৃষ্ণকে সভাপতি নিযুক্ত করা হোক।’ দুর্যোধন আপত্তি তুললেন, ‘শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবপক্ষপাতী।’ কৃষ্ণ বললেন, ‘কথাটা মিথ্যে নয়। আর আমার অগ্রজ উপস্থিত থাকতে আমি সভাপতি হতে পারি না।’
পরোক্ষ : ভীষ্ম মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে ওই সভায় দ্যুতনীতিবিরুদ্ধ কোনও কর্ম যাতে না হয় তার বিধান যে তাঁর কর্তব্য তা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে সভাপতি নিযুক্ত করার প্রস্তাবের কথাও বললেন। শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবপক্ষপাতী বলে দুর্যোধন আপত্তি তুললেন। শ্রীকৃষ্ণ স্বীকার করলেন যে তাঁর (দুর্যোধনের) কথাটা মিথ্যে নয়। আর তাঁর অগ্রজ উপস্থিত থাকতে তিনি যে সভাপতি হতে পারেন না, তাও বললেন।
৩. প্রত্যক্ষ : শকুনি তাঁর পাশাটি মুষ্টিবদ্ধ করে বললেন, ‘আমার অক্ষ কাকেও স্পর্শ করতে দেব না।’বলরাম বললেন, ‘আমি এই সভার অধ্যক্ষ, আমার আজ্ঞা অবশ্য পাল্য।’শকুনি উত্তর দিলেন, ‘আমি তোমার আজ্ঞাবহ নই।’
পরোক্ষ : শকুনি তাঁর পাশাটি মুষ্টিবদ্ধ করে বললেন যে, তাঁর অক্ষ কাকেও স্পর্শ করতে দেবেন না। উত্তরে বলরাম বললেন যে, তিনি ওই সভার অধ্যক্ষ, তাঁর আজ্ঞা অবশ্য পাল্য। শকুনি উত্তর দিলেন যে, তিনি তাঁর আজ্ঞাবহ নন।
৪. প্রত্যক্ষ : যুধিষ্ঠির উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘আমি কোনও কথা শুনতে চাই না, দ্যূতপ্রসঙ্গে আমার ঘৃণা ধরে গেছে। আমরা যুদ্ধ করেই হৃতরাজ্য উদ্ধার করব। জ্যেষ্ঠ তাত, প্রণাম, আমরা চললাম।’
পরোক্ষ : যুধিষ্ঠির উত্তেজিত হয়ে বললেন যে তিনি কোনও কথা শুনতে চান না, দ্যূতপ্রসঙ্গে তাঁর ঘৃণা ধরে গেছে। তাঁরা যুদ্ধ করেই হৃতরাজ্য উদ্ধার করবেন। এরপর জ্যেষ্ঠ তাতকে প্রণাম জানিয়ে তাঁদের চলে আসার কথা জানালেন।
৫. প্রত্যক্ষ : ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার জয় হল?’বলরাম বললেন, ‘যুধিষ্ঠিরের। দুই পক্ষই কূট পাশক নিয়ে খেলেছেন, অতএব কপটতার আপত্তি চলে না।’ যুধিষ্ঠির তখন জনান্তিকে বলরামকে মৎকুনির বৃত্তান্ত জানালেন। বলরাম তাঁকে বললেন, ‘আপনার কুণ্ঠার কিছুমাত্র কারণ নেই। কূট পাশকের ব্যবহার দ্যূতবিধিসম্মত।’
পরোক্ষ : ধৃতরাষ্ট্র কার জয় হল জানতে চাইলেন। উত্তরে বলরাম যুধিষ্ঠিরের কথা বললেন। তিনি আরও জানালেন যে, দুই পক্ষই কূট পাশক নিয়ে খেলেছিলেন, অতএব কপটতার আপত্তি চলে না। যুধিষ্ঠির তখন জনান্তিকে বলরামকে মৎকুনির বৃত্তান্ত জানালেন। উত্তরে বলরাম তাঁকে বললেন যে, তাঁর কুণ্ঠার কিছুমাত্র কারণ নেই। কূট পাশকের ব্যবহার যে দ্যূতবিধিসম্মত তাও তিনি বললেন।
৬. প্রত্যক্ষ : মৎকুনি বললেন, ‘মহারাজ, স্থিরো ভব, আপনার সমস্ত সংশয় আমি ছেদন করছি। যদি আপনি ধৃতরাষ্ট্রের আয়োজিত অক্ষ নিয়ে খেলেন তবে আপনার পরাজয় অনিবার্য। ধূর্ত শকুনি সে অক্ষ খেলবে না, হাতে নিয়েই ঐন্দ্রজালিকের ন্যায় বদলে ফেলে নিজের আগেকার অক্ষেই খেলবে।’
পরোক্ষ : মৎকুনি মহারাজকে স্থির হতে বলে ও তাঁর সমস্ত সংশয় ছেদন করার কথা জানিয়ে বললেন যে, যদি তিনি ধৃতরাষ্ট্রের আয়োজিত অক্ষ নিয়ে খেলেন তবে তাঁর পরাজয় অনিবার্য। তিনি আরও জানালেন যে, ধূর্ত শকুনি ওই অক্ষে না খেলে হাতে নিয়েই ঐন্দ্রজালিকের ন্যায় বদলে ফেলে নিজের আগেকার অক্ষেই খেলবে।
৭. প্রত্যক্ষ : নিমাইবাবু হাসিয়া ঘাড় নাড়িলেন, কহিলেন, ‘তোমার নাম কি হে?’‘আজ্ঞে, গিরিশ মহাপাত্র।’‘একদম মহাপাত্র! তুমিও তেলের খনিতে কাজ করছিলে, না? এখন রেঙ্গুনেই থাকবে? তোমার বাক্স-বিছানা ত খানাতল্লাসী হয়ে গেছে, দেখি তোমার ট্যাক এবং পকেটে কি আছে?’
পরোক্ষ : নিমাইবাবু হাসিয়া ঘাড় নাড়িয়া তাহার নাম কি জানিতে চাহিলেন। উত্তরে (সে) বিনীতভাবে গিরিশ মহাপাত্র বলিয়া পরিচয় দিল। নিমাইবাবু মহাপাত্র উপাধিটিকে সামান্য ঠাট্টা করিয়া সেও তেলের খনিতে কাজ করিতেছিল কিনা তাহাতে সংশয় প্রকাশ করিলেন। তাহার বাক্স-বিছানা যে খানাতল্লাসী হইয়া গিয়াছে তাহা জানাইয়া তাহার ট্যাক এবং পকেটে কি ছিল তাহা দেখিতে চাহিলেন।
৮. প্রত্যক্ষ: নিমাইবাবু কহিলেন, ‘তুমি গাঁজা খাও?’ লোকটি অসঙ্কোচে জবাব দিল, ‘আজ্ঞে না।’ ‘তবে এ বস্তুটি পকেটে কেন?’
পরোক্ষ: নিমাইবাবু সে গাঁজা খায় কিনা জানিতে চাহিলেন। লোকটি অসঙ্কোচে বিনীতভাবে তাহার অসম্মতি জানাইল। নিমাইবাবু ওই বস্তুটি অহেতুক পকেটে রাখিবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন।
৯. প্রত্যক্ষ: অপূর্ব প্রশ্ন করিল, ‘আপনি এখন কোথায় যাবেন?’ ‘জাহাজ ঘাটে। চল না আমার সঙ্গে।’ ‘চলুন। আপনাকে কি আর কোথাও যেতে হবে?’
পরোক্ষ: অপূর্ব জানিতে চাহিল তিনি তখন কোথায় যাইবেন। উত্তরে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি জাহাজ ঘাটে যাওয়ার কথা বলিলেন। তিনি তাঁহার সঙ্গে যাওয়ার জন্য (অপূর্বকে) স্নেহের দাবি জানাইলেন। অপূর্ব সম্মতি জানাইয়া তাঁহাকে আর কোথাও যাইতে হইবে কিনা তাহাও জানিতে চাহিল।
১০. প্রত্যক্ষ: রাজপুত্র বলিলেন, ‘তুমি আমাকে চেন?’ দস্যু বলিল, ‘মহারানা রাজসিংহকে কে না চিনে?’ তখন রাজসিংহ বলিলেন, ‘আমি তোমার জীবন দান করিলাম। কিন্তু তুমি ব্রাহ্মণের সর্বস্ব হরণ করিয়াছ, আমি যদি তোমাকে কোন প্রকার দণ্ড না দিই, তবে আমি রাজধর্মে পতিত হইব।’
পরোক্ষ: রাজপুত্র সে (দস্যু) তাহাকে চিনে কিনা জানিতে চাহিলেন। দস্যু মহারানা রাজসিংহকে যে সবাই চিনে তাহা বলিল। তখন রাজসিংহ বলিলেন যে, তিনি তাহার জীবন দান করিলেন। কিন্তু সে ব্রাহ্মণের সর্বস্ব হরণ করিয়াছিল। তিনি যদি তাহাকে কোন প্রকার দণ্ড না দেন, তবে তিনি রাজধর্মে পতিত হইবেন।
১১. প্রত্যক্ষ: দস্যু বলিল, ‘এ অধমের নাম মাণিকলাল সিংহ। আমি রাজপুত কুলের কলঙ্ক।’ রাজসিংহ বলিলেন, ‘মাণিকলাল, আজি হইতে তুমি আমার কার্যে নিযুক্ত হইলে, এক্ষণে তুমি অশ্বারোহী সৈন্যভুক্ত হইলে—তোমার কন্যা লইয়া উদয়পুরে যাও; তোমাকে ভূমি দিব, বাস করিও।’
পরোক্ষ: দস্যু বলিল যে ওই অধমের নাম মাণিকলাল সিংহ, সে রাজপুতকুলের কলঙ্ক। রাজসিংহ মাণিকলালকে সেইদিন হইতে তাঁহার কার্যে নিযুক্ত হইবার আদেশ দিলেন। ওইক্ষণে সে অশ্বারোহী সৈন্যভুক্ত হইল জানাইলেন এবং তাহার কন্যা লইয়া উদয়পুর যাইতে হুকুম করিলেন। তিনি তাহাকে ভূমি দিবার প্রতিশ্রুতি দিলেন ও বাস করিবার অনুমতি দিলেন।
১২. প্রত্যক্ষ: মাণিকলাল বলিল, ‘ব্রাহ্মণের যাহা আমরা কাড়িয়া লইয়াছিলাম, তাহা শ্রীচরণে অর্পণ করিতেছি। পত্র দুইখানি আপনারই জন্য। দাস যে উহা পাঠ করিয়াছে, সে অপরাধ মার্জনা করিবেন।’
পরোক্ষ : মাণিকলাল বলিল যে ব্রাহ্মণের যাহা তাহারা কাড়িয়া লইয়াছিল তাহা শ্রীচরণে অর্পিত হইল। সে আরও জানাইল যে, পত্র দুইখানি তাঁহারই জন্য। দাস যে উহা পাঠ করিয়াছিল ওই অপরাধ মার্জনা করিবার সে অনুরোধ করিল।
১৩. প্রত্যক্ষ : তাপসীরা কহিতে লাগিলেন, ‘বৎস! এই সকল জন্তুকে আমরা আপন সন্তানের ন্যায় স্নেহ করি; তুমি কেন অকারণে উহারে ক্লেশ দাও? আমাদের কথা শুন, শান্ত হও, সিংহশিশুকে ছাড়িয়া দাও।’
পরোক্ষ : তাপসীরা সস্নেহে বৎসকে বলিতে লাগিলেন যে ওই সকল জন্তুকে তাঁহারা আপন সন্তানের ন্যায় স্নেহ করেন, তাঁহারা আরও জানিতে চাহিলেন যে সে কেন অকারণে উহাদের ক্লেশ দেয়। তাঁহাদের কথা শুনিতে, শান্ত হইতে ও সিংহশিশুকে ছাড়িয়া দিতে তাঁহারা আদেশ করিলেন।
১৪. প্রত্যক্ষ : পরে রাজা তাপসীকে জিজ্ঞাসিলেন, ‘এ দেবভূমি, মানুষের অবস্থিতির স্থান নহে; তবে এই বালক কি সংযোগে এখানে আসিল?’ তাপসী কহিলেন, ‘ইহার জননী অপ্সরা সম্বন্ধে এখানে আসিয়া এই সন্তান প্রসব করিয়াছেন।’
পরোক্ষ : পরে রাজা তাপসীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে চাহিলেন যে, উহা দেবভূমি, মানুষের অবস্থিতির স্থান নহে; তবে ওই বালক কি সংযোগে ওখানে আসিল। তাপসী বলিলেন যে উহার জননী অপ্সরা সম্বন্ধে ওখানে আসিয়া ওই সন্তান প্রসব করিয়াছিলেন।
১৫. প্রত্যক্ষ : রামসুন্দর বলিলেন, ‘ছি মা, অমন কথা বলতে নেই। আর এ টাকাটা যদি আমি না দিতে পারি, তা-হলে তোর বাপের অপমান। আর তোরও অপমান।’
নিরু কহিল, ‘টাকা যদি দাও তবেই অপমান। তোমার মেয়ের কি কোনো মর্যাদা নেই। আমি কি কেবল একটা টাকার থলি, যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ আমার দাম।’
পরোক্ষ : রামসুন্দর স্নেহকাতর কণ্ঠে বলিলেন যে, অমন কথা বলিতে নাই। আর ওই টাকাটা যদি তিনি না দিতে পারেন তাহা হইলে তাহার বাপের অপমান। আর তাহারও অপমান। নিরু উত্তরে বলিল যে, টাকা দেওয়া হইলেই অপমান। তাঁহার মেয়ের কি কোনো মর্যাদা নাই! সে কি কেবল একটা টাকার থলি, যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ তাহার দাম!